সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮
Monday, 14 May, 2018 12:49:41 am
No icon No icon No icon

কবে বৃষ্টি পড়েছিল


কবে বৃষ্টি পড়েছিল


শান্তা মারিয়া : বৃষ্টি পড়ছে। অবিশ্রাম জল পতনের গান। চারতলার উপরে অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। বাইরে মেঘ ডাকলেই বা কি আর জল ঝরলেই বা কি। টাইলস করা মেঝেতে তো তার কোন ছাপ ফুটে ওঠে না। মনে পড়ছে পুরনো ঢাকার আমাদের সেই একতলা বাড়ি। ইট-সুরকির দালান। বৃষ্টির দিনগুলোতে মেঝেতে ড্যাম্প ভাব। দেওয়ালও ভিজে ভিজে।একদিকে চারটি ঘর আর টানা বারান্দা নিয়ে পাকা দালান। তবে বারান্দার ছাদ টালির। তার সঙ্গে লাগোয়া খাবার ঘর আর বড় একটি বসার ঘর; পাকা দেওয়ালে টিনের ছাদ।সেই টিনের ছাদে আর টালির বারান্দায় বৃষ্টির গান হার মানায় কনসার্টকে। ঝমঝমিয়ে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন বৃষ্টির একটানা সুরে মনটা উদাস হয়ে যায়। সকালে জোর বৃষ্টি দেখলেই প্রথম প্রশ্ন স্কুলে যাব কিভাবে? ছোট্ট একটা কালো পিচ্চি বেবি অস্টিন গাড়ি অবশ্য আছে। কিন্তু রাস্তায় পানি জমলে তার মধ্যে ও যাবে? কাভি নেহি। স্রেফ ইঞ্জিনে পানি ঢুকে অচল হয়ে পড়বে পথের মধ্যেই। তার চেয়ে রিকশাই ভালো।রিকশায় রেকসিনের পর্দা দিয়ে কোনমতে ঢেকে বসা গেল।আলুবাজারে, নাজিমউদ্দিন রোডে আর পশু হাসপাতালের সামনে অবধারিতভাবে পানি জমে থাকবে রাস্তায়। তার সঙ্গে সুয়ারেজ লাইন মিলেমিশে একাকার।যাহোক কোনভাবে যদি বা পৌছালাম স্কুলে তো শুনলাম আজ রেইনি ডে। জানি না আজকাল স্কুলে রেইনি ডের ছুটি দেয় কি না। আমার ছোটবেলায় কিন্তু রেইনি ডে ছিল দারুণ আনন্দের দিন। এ যেন বাড়তি পাওয়া আনন্দ। আর যদি বা স্কুল হতো তাহলেও বৃষ্টির দিনে স্যার-আপাদের মেজাজও থাকতো অনেক নরম। সেদিন তেমন লেখাপড়া হতো না। বরং গান, গল্পবলা এগুলোই বেশি চলতো। অনেক টিচারই আসতে পারতেন না বৃষ্টি ঠেলে। তাদের ক্লাসের সময়টায় কেউ একজন এসে বলে যেতেন ছবি আঁকতে বা পুরনো পড়া পড়তে। ব্যস আমাদের আমাদের পায় কে। ‘নাম দেশ ফুল ফল’, চোর ডাকাত দারোগা পুলিশ, চড়াই পাখি বারোটা, অথবা আন্তাকসিরি শুরু হয়ে গেল। তখন অবশ্য আন্তাকসিরি বা অন্তাক্ষিরি এসব নাম জানতাম না। তবে খেলাটা একই। আমাদের স্কুলে এই গানের খেলাটাকে আমরা বলতাম সপ্তবর্ণা। বন্ধু নুসরাতের কন্ঠে একটা গান এখনও কানে ঝংকার তোলে, ‘আজি এ শ্রাবণ নিশি কাটে কেমনে’। 
ঝড়-বৃষ্টির দিনে বাড়িতে থাকলে আরও মজা। শিল পড়লে তা কুড়ানোর জন্য সে কি আকুলতা। সন্ধ্যায় বৃষ্টি হলে অবধারিতভাবে বিদ্যুৎ চলে যেত। তখন মোমবাতি আর হারিকেনের দাপট শুরু। মোমবাতির আলোয় পড়লে চোখের ক্ষতি হবে তাই তখন পড়া বারণ। নেহাত পরদিন যদি পরীক্ষা না থাকতো তাহলে বৃষ্টির সন্ধ্যায় লেখাপড়ার পাট বন্ধ। বরং মোমবাতির আলোয় চলতো লুডু খেলা। আমি কোনদিন লুডুতে চোরামি করতে পারি না। সেজন্য চট করে হেরে যেতাম। আবার ছক্কা উঠলে সে কি মজা। পাকা গুটি কেউ খেয়ে নিলে চোখে পানি চলে আসতো। আমার মা বৃষ্টির দিনে কবিতা বলার খেলা শুরু করতেন। রবীন্দ্রনাথের শিশু বই থেকে একের পর এক আমি আর মা পাল্লা দিয়ে মুখস্ত বলতাম।ব্যাটারি চালানো টুইন ওয়ানে রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেটও বাজানো হতো। 
কাগজের নৌকা, পাখি, এরোপ্লেন বানাতে মা আর ভাইয়া ওস্তাদ। আমাকে ওরা বানিয়ে দিতেন। বৃষ্টির দিন মানেই খিচুড়ি, ডিম দোঁপেয়াজি, বেগুনভাজা। ছাতা মাথায় দিয়ে বাবা চলে যেতেন হোসেন মার্কেটে মাংস কিনে আনতে। খাসির মাংস বেশি খাওয়া হতো। আর নলির হাড় থেকে মজ্জা খাওয়ার বেলায় আমি আর ভাইয়া কাড়াকাড়ি। বাবা অবশ্য আমাকেই তার ভাগেরটা দিয়ে দিতেন। ছোট বলে এই বাড়তি সুবিধা।বৃষ্টির দিনে যদি বিদ্যুৎ থাকতো তাহলে টিভি দেখাও চলতো অবশ্য। আর হাওয়াই ফাইভ ও, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান কিংবা অন্য কোন প্রিয় টিভি সিরিজের দিন কারেন্ট চলে গেলে রাগ করতাম বৃষ্টির ওপর। 
বৃষ্টি হলেই মনে মনে আশা হতো উঠোনে নিশ্চয়ই জল জমবে।তাহলে চুপি চুপি পানিতে নামা চলবে। যদিও এটা নিয়ে মা থাকতেন চিন্তায়। কারণ তাহলে মুরগির ঘর থেকে মুরগিগুলোকে সরিয়ে বারান্দায় আনতে হবে। বাবার চিন্তা আরও বেশি। গ্যারেজে যদি পানি জমে তাহলে গাড়িটাকে বালির বস্তার উপরে তুলতে হবে। বৃষ্টির দিনে মুড়ি সর্ষের তেলে পেঁয়াজ কাঁচা মরিচে মেখে খেতে যে কি মজা।চালভাজাও মজা কম না অথবা চিঁড়ে ভাজা। পাতাপিঠাও তেলে ভাজা হতো। বেগুনি বা পিঁয়াজু। বৃষ্টির দিন মানেই প্রতিদিনের রুটিন থেকে ছুটি। আমার খুব মজা লাগতো মোমবাতির গলে পড়া মোম দিয়ে নানা রকম আকৃতির কিছু একটা বানাতে। সত্যিই ‘কিছু একটা’। কারণ আদপে সেটা কিছুই হতো না।বৃষ্টির রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুম আসতো জম্পেস। বাগান থেকে ভেসে আসতো হাসনা হেনার সুবাস। ঝড় বৃষ্টিতে বাজ পড়লে বাবার কোলে গিয়ে বসে থাকতাম। বাজের শব্দে এখনও আমি ভয় পাই। কিন্তু বাবার কাছে ছুটে যাবার উপায় কি আর আছে?

লেখক : শান্তা মারিয়া, কবি, সাংবাদিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK