বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮
Friday, 11 May, 2018 06:33:44 pm
No icon No icon No icon

মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের প্রধান কারণ সৌদী আরব-ইরানের শাসকগোষ্ঠী


মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের প্রধান কারণ সৌদী আরব-ইরানের শাসকগোষ্ঠী


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দুই বৃহৎ, প্রভাবশালী, শক্তিশালী, নেতৃত্ব দানকারী আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তি হচ্ছে সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্বের দাবীদার সৌদি আরব এবং বিশ্বের শিয়া মতালম্বীদের শক্তিকেন্দ্র ইরান। দুটাই ইসলামী রাষ্ট্র হলেও তারা দুটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল(কাঠামো)। সৌদি-ইরানের মধ্যকার স্বতন্ত্র‍্য ও পরস্পরবিরোধী জাতিগত, মাযহাবী, আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক/ধর্মীয় চিন্তাচেতনা, বিপ্লব, বিরোধের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আল সৌদ এবং ওহাবীদের প্রধান আধ্যাত্নিক নেতা আব্দুল ওহাব চুক্তির মাধ্যমে রাজতন্ত্র, ওহাবী মতাদর্শ ও শরীয়া আইনের সমন্বয়ের ভিত্তিতে সৌদি আরবে ইসলামী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। আল সৌদ ওহাবী ওলামাদের নিয়ে গঠিত ওলামা পরিষদকে তার রাজকীয় শাসনকার্যের অংশ করে নেন। জাতীয় পরিষদের নাম রাখা হয় সূরা মজলিস। আল সৌদের রাজপরিবারই বংশানুক্রমিকভাবে সৌদি আরব শাসন করে আসছে। সৌদির রাজপরিবার/ওহাবী শাসকগোষ্ঠী হচ্ছে মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ/পরাশক্তির প্রাচীন, বিশ্বস্ত মিত্র। সৌদি ওহাবীরা সুন্নি মাযহাব ব্যতিত অন্য কোন মাযহাবীদের মুসলমান বলে মনে/স্বীকার করেন না। শিয়া মাযহাবীদের তারা রাফেজী(ধর্মচ্যুত) এবং কাফের(বিধর্মী) মনে করেন। তারা অনারব ইরানীদের আরব জাতির অংশ এবং ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ হিসাবে স্বীকার করেন না। অনুরূপভাবে অনারব তুরুস্কের তুর্কীদের প্রতিও সৌদিদের বিরূপ মনোভাব আছে। সৌদি শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্রনীতি/মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং ওহাবীজম/অভ্যন্তরীণনীতি সম্পূর্ণরূপেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং শিয়া মাযহাব বিরোধী। শত্রুর শত্রু বন্ধু এই স্বাভাবিক নীতিতে সম্প্রতি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ইস্যুতে ইসরাইলের সাথেও কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তুলেছে। অথচ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে প্রধান শত্রু ও হুমকিই হচ্ছে এই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠাকে ঠেকাতে/নিয়ন্ত্রণে রাখতে সৌদি-মার্কিণ-ইসরাইলের মধ্যে কৌশলগত আঞ্চলিক মিত্রতার বন্ধন গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য বিস্তারকে পারসিকরণ ও শিয়াকরণের নামে কাল্পনিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং অব্যাহতভাবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে সৌদি রাজতন্ত্র অভ্যন্তরীণ/আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইরান বিরোধী জনমত এবং কূটনৈতিক প্রভাব গড়ে তুলতে চাইছে। এর মাধ্যমে সৌদির সুন্নি রাজকীয় শাসকগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণক্ষেত্রে সৌদি সংহতিকে সুসংহত করে সকল রাজনৈতিক সমস্যা/বিরোধীতাকে মোকাবেলা করতে চাইছে। আঞ্চলিকক্ষেত্রে নিজেদের সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর অভিভাবক হিসাবে গুরুত্ব তুলে ধরতে চাইছে এবং আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসাবে নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে চাইছে। এ সমস্ত কারণে সৌদি আরবকে ইরান, শিয়া মাযহাবীদের, ইরানের এবং তার মিত্রদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু, হুমকি হিসাবে গণ্য করে ইরান ও তার মিত্ররা।

ইরান ও সৌদি আরব কি যুদ্ধে যাচ্ছে

আর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান হচ্ছে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবীরা তাদের আধ্যাত্নিক নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্ব এবং আহবানে মার্কিণ-সৌদির তাবেদার রেজা শাহ পাহলবীর স্বৈরাচারী শাহতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে বিপ্লবী ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান ইরান নির্বাচিত উদার/মধ্যপন্থী ইসলামী দলের সরকার নিয়ন্ত্রিত বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল। ইরানী জনগণ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর সরাসরি ভোট ও নির্বাচনের মাধ্যমে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে থাকে। তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চেতনা এবং শরীয়া আইনের ভিত্তিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরিচালনা করে থাকেন। সারা বিশ্বের অধিকাংশ সুন্নি/শিয়া/মালিকী মাযহাবপন্থী রাজনৈতিক দল/মিলিশিয়া বাহিনীর ইসলামী আন্দোলন/বিপ্লব/সরকার পরিচালনার মূল প্রেরণা/কেন্দ্রস্থল হচ্ছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অব্যাহত সফলতা। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচারী আরব রাজতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্র বিরোধী আদর্শ/মূল্যবোধগুলোর জন্য ইরানকে সৌদির রাজতন্ত্র, ওহাবীজম, মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা সভ্যতা, ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রতি প্রধান আদর্শগত, সামরিক, আঞ্চলিক হুমকি/প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গণ্য করা হয়। এজন্য ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-সৌদি আরব তাদের প্রধান ও চির শত্রু ভাবে, তার পতন এবং ধবংস কামনা করে। ইরান মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদকে ইরানের প্রতি প্রধান হুমকি, ইসরাইলকে অবৈধ দখলদার ইহুদী রাষ্ট্র, সৌদি রাজতন্ত্রকে স্বৈরাচারী, মার্কিণ পরাশক্তির তাবেদার এবং ইসরাইলের দোসর ভাবে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের মিত্রদের রণকৌশলগত এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে চাপের মুখে/নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিজেকে নিরাপদ রাখাই ইরানের প্রধান লক্ষ্য। সৌদি-ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় মাযহাবী, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আদর্শগত চিন্তাচেতনা, পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার উদগ্র আকাঙ্ক্ষাই সৌদি-ইরানের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিরোধ, শত্রুতা, সংঘাত, লড়াইয়ের পটভূমি সৃষ্টি করেছে।

সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় হারিরি

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৯৮০ সালে খোমেনী বিরোধী বিভিন্ন প্রভাবশালী পশ্চিমা ও আরব রাষ্ট্র নেতাদের নেপথ্য মদদে ইরাকের সুন্নি সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করে। ইরান-ইরাক যুদ্ধে সৌদি আরব, তার বিভিন্ন আরব সুন্নি রাজতান্ত্রিক/একনায়কতান্ত্রিক মিত্র রাষ্ট্রগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাশক্তিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের সাদ্দামের পেছনে সমবেত/একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং তাকে সর্বাত্নক সমর্থন/সহযোগীতা করেছিল সাদ্দামকে দিয়ে ইরানের বিপ্লবী ইসলামী সরকার/খোমেনী সরকারের পতন ঘটানোর অভিন্ন লক্ষ্যে। এদিকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের ঢামাডোমের ভেতর ইসরাইল ১৯৮২ সালে লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ লেবানন দখল করে নেয়। দীর্ঘ আট বছর ইরান ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পাশাপাশি নিজের সামরিকশক্তি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করে এবং লেবাননে ইসরাইলের আধিপত্য কমাতে, নিজের প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যে লেবাননের শিয়া মিলিশিয়াদের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯০ সালে সিরিয়ান বাহিনী লেবাননের শাসক মিশেল আউনকে পরাস্ত করে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানোর পর আগ্রাসী প্রতিবেশী ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং লেবাননে স্থিতিশীলতা রক্ষার ইস্যুতে সিরিয়া-ইরানের মধ্যে, সিরিয়াপন্থী আমাল মিলিশিয়া ও সিরিয়ান মিত্রবাহিনীর সাথে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর পারস্পারিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে আপোষমূলক মিত্রতা গড়ে উঠেছিল। একই সাথে আশির দশকের সময় থেকে ইরানের ইসলামী সরকার সকল বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র/শত্রুতা, কূটনৈতিক চাপ/হুমকি, সামরিক হামলা/আগ্রাসনের সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য ও মোকাবেলা করে নিজের অস্তিত্ত্ব ও বিপ্লবী আদর্শকে রক্ষা করতে/টিকিয়ে রাখতে পারমানবিক শক্তি অর্জন করার লক্ষ্যে গোপনে পারমানবিক কর্মসূচী প্রকল্প শুরু করে এবং চালিয়ে যায়। ইরান নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বলিষ্ঠ প্রবক্তায় পরিণত হয়। তারা ইসরাইলকে জোরপূর্বক আরবভূমি দখলকারী অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্র বলে মনে করে। ২০০০ সালের পর থেকে ইরান, সিরিয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহর গোপন সমর্থন, সহযোগীতায় ফিলিস্তিনের গাজা স্ট্রিপ ও পশ্চিম তীরে শেখ আহমেদ ইয়াসিনের কট্টর স্বাধীনতাকামী সুন্নি ইসলামী সংগঠন হামাস যথেষ্ঠ সামরিক শক্তি অর্জন করে। মিশরের ইসলামী ব্রাদারহুড, আলজেরিয়ার ইসলামী সালভেশান ফ্রন্ট, তুরুস্কের এরদোগানের একেপি দলগুলো কমবেশি ইরান, রাশিয়ার প্রতি মিত্রভাবাপন্ন, মার্কিণ-পশ্চিমা-ইসরাইল-সৌদি বিরোধী। তাই তাদের প্রতি সৌদি আরব বৈরী ভাবাপন্ন।

২০০১ সালে মার্কিণ-পশ্চিমা আগ্রাসনে আফগানিস্তানে সৌদী-পাকপন্থী সুন্নি তালেবান সরকার এবং ২০০৩ সালে মার্কিণ-পশ্চিমা আগ্রাসনে ইরাকের মার্কিণ-ইসরাইল-সৌদি-ইরান বিরোধী সুন্নি সাদ্দাম সরকারের পতনের ফলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়। সাদ্দামের পতনের পর মার্কিণ-পশ্চিমা-সৌদি অনুগত ইরাকের সংখ্যালঘু সুন্নিগোষ্ঠীকে কয়েক বছর ক্ষমতায় বসিয়ে রাখা গেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারনে ইরাকের গেরিলা যুদ্ধের রণাঙ্গণে এবং নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে শেষপর্যন্ত শিয়াদেরই উত্থান/জয় হয়। ইরান ও ইরাকের শিয়ারা মাযহাবী কারণে পরস্পরের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন। ২০০৬ সালে ইসরাইল লেবাননের উপর আবার আগ্রাসন চালালে ৪৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলী বাহিনীকে লেবাননের সীমান্ত থেকে হটিয়ে দিয়ে হিজবুল্লাহ কার্যত সামরিকভাবে বিজয় অর্জন করে এবং লেবাননের রাজনীতির ময়দানেও হিজবুল্লাহ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। আর লেবানিজ সুন্নি গ্রুপের নেতা সাদ হারিরি সৌদিপন্থী। সুন্নি গ্রুপকে দিয়ে সৌদি আরব লেবাননে হিজবুল্লাহকে চাপে রাখার কৌশল গ্রহন করেছে। ২০০৬ সালে হামাস ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হলে তা সৌদি-মার্কিণ-পশ্চিমা সমর্থিত পিএলও/ফাতাহ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। এরফলে এক বছরের মধ্যে হামাস জোট সরকারের পতন হয় এবং হামাস-ফাতাহর মধ্যে অবিরাম সংঘাত চলতে থাকে। ফাতাহ পশ্চিম তীর আর হামাস গাজা স্ট্রিপ শাসন করতে থাকে। এরপর হামাস কয়েক দফা ইসরাইলের হামলাকে প্রতিরোধ করে টিকে আছে। আরব বসন্তকালে মার্কিণ ও পশ্চিমাদের আগ্রাসনে লিবিয়ার একনায়ক গাদ্দাফীর পতন হলে লিবিয়ায় সৌদিপন্থী মিলিশিয়া জোট ক্ষমতায় বসে। মিশরের নির্বাচিত মুসরির ব্রাদারহুড সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উচ্ছেদ করে মার্কিণ-সৌদি অনুগত সেনাপ্রধান আব্দুল সিসি মিশরের ক্ষমতায় বসে। একইভাবে সিরিয়াতেও মার্কিণ ও পশিচমা জোট আগ্রাসনের মাধ্যমে বাশার সরকারের পতন ঘটাবার পরিকল্পনা করে এবং প্রথমদিকে সৌদি ও তার আরব মিত্রদের সমর্থিত ইসলামী জঙ্গীরা অনেকটা সফলতা লাভ করলেও ইরান, হিজবুল্লাহ, রাশিয়া বাশারের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করার পর সিরিয়ায় মার্কিণ, পশ্চিমা জোট, সৌদি জোটের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সিরিয়ায় বাশার সরকার ইরান-রাশিয়ার এবং বিদ্রোহীরা যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির সমর্থনের জোরে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এজন্য সিরিয়ার যুদ্ধকে মার্কিণ পরাশক্তি ও রাশিয়ার মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ বলা হয়েছে। ২০১২ সালে আরব বসন্তকালে বাহরাইন ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের শিয়াদের আন্দোলনের পেছনে ইরানের মদদ আছে বলে মনে করে এবং প্রচারণা চালায় সৌদি আরব ও তার মিত্ররা। তুরুস্কের এরদোগানের একেপি ইসলামপন্থী সরকারের সাথে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরবের বিরোধের ফলে এবং এরদোগানের প্রতি ইরান ও রাশিয়ার মিত্রভাবাপন্ন নীতির কারণে তুরুস্কও ইরান-রাশিয়ার প্রতি কিছুটা নমনীয় ও কৃতজ্ঞ। ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সাথে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাতারের প্রবল বিরোধ সৃষ্টি হবার কারনে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে, কাতারের উপর সর্বাত্নক অবরোধ আরোপ করে এবং কাতারকে তাদের ১৩-দফা শর্ত মেনে নেবার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে কাতারের প্রতি ইরান ও তুরুস্ক মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং সর্বাত্নক সহযোগীতা নিয়ে কাতারের পাশে এসে দাড়ায়। ফলে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি জোটের অবরোধ অনেকাংশে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ২০১২ সালে ইয়েমেনে সাবেক সুন্নি ও সৌদি মিত্র একনায়ক সালেহের অনুগত হাদীকে শিয়া মতালম্বী হুতি আনসারুল্লাহ ক্ষমতাচুত্য করে ক্ষমতা দখল করলে সৌদি আরব এটাকে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র, নিজের মিত্রশক্তির ক্ষমতা হারানোর পরাজয় হিসাবে গণ্য করে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে ইয়েমেনের উপর অবরোধ আরোপ করে। এরপর ইসলামী সামরিক জোট বানিয়ে হুতিদের ক্ষমতাচুত্য করে হাদীর সুন্নি গ্রুপকে পুনরায় ইয়েমেনের ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে ইয়েমেনের উপর সামরিক আগ্রাসন/হামলা শুরু করে। প্রতি উত্তরে ইয়েমেনের হুতিরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি জোটের ধারনা হুতিদের উত্থান এবং তাদের ক্ষেপনাস্ত্র ক্ষমতা অর্জনের পেছনে আছে ইরান।

গত উনিশ শতকের আশির দশকের ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইসলামী/মুসলিম বিশ্বের এই দুই বৃহৎ প্রভাবশালী, শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তির মধ্যকার দা-কুড়াল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র/অঞ্চলের সরকার/ক্ষমতাসীন দল/বিরোধী পক্ষ, রাজনৈতিক দল/গোষ্ঠী, সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া গ্রুপ তাদের পক্ষে/বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে/নিতে বাধ্য হয়েছে। ইরান-সিরিয়া-লেবাননের হিজবুল্লাহ মিলে, গাজার হামাস-ইরাকের শিয়াজোট-ইয়েমেনের হুতি আনসারুল্লাহকে নিয়ে একটি কৌশলগত মিত্রজোট এবং আঞ্চলিক প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে। ইরান ও তার মিত্রদের সাথে আছে মার্কিণ পরাশক্তি ও পশ্চিমা জোটের প্রধান শত্রু রাশিয়া। অপরদিকে সৌদি আরব-আরব আমিরাত-বাহরাইন-মিশর-সূদান-মৌরতানিয়া মিলে, লেবানন-ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের সুন্নি গ্রুপগুলোকে নিয়ে এবং মিত্রভাবাপন্ন কুয়েত, জর্দান, লিবিয়া, ওমান, মরক্কো, জিবুতি, পশ্চিমতীরের ফাতাহকে নিয়ে একটি অক্ষজোট ও আঞ্চলিক প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে। তাদের সাথে আছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটিশ-ফ্রান্স জোট, ইসরাইল। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া ইরান ও তার মিত্রদের পক্ষে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-ফ্রান্স, ইসরাইল সৌদি আরব ও তার মিত্রদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সৌদি-ইরানের মধ্যকার প্রবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বকে নিজেদের স্ব স্ব জাতীয় স্বার্থ ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য সদ্ব্যবহার করছে/করার সুযোগ পাচ্ছে/নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইসরাইল অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্রশক্তিগুলো। ইরানের ইসলামী সরকার, সিরিয়ার বাশার সরকার, তাদের সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ, ফিলিস্তিনের হামাস গ্রুপ, রাশিয়ার মধ্যকার এই আঞ্চলিক মিত্রতার প্রভাব বলয়, ইরাকে শিয়াজোট ও ইয়েমেনে হুতি আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থান/ক্ষমতা লাভ/দখল সৌদি আরব, মার্কিণ পরাশক্তি, ইহুদীবাদী ইসরাইল এবং তাদের আরব ও পশ্চিমা মিত্রদের চিন্তিত, আতংকিত ও বিক্ষুদ্ধ করে তুলেছে। তাই তারা সবাই মিলে ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি ও কুর্দি গ্রুপ, লেবাননের সুন্নি ও খ্রীস্টান গ্রুপ, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের পিএলও/ফাতাহ গ্রুপ, ইয়েমেনের হাদী নিয়ন্ত্রিত সুন্নি গ্রুপের মাধ্যমে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেনের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রাখার চেষ্টা করছে এবং রাশিয়া, ইরান, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ, হামাস, হুতি আনসারুল্লাহকে দুর্বল করার, চাপে রাখার চেষ্টা করছে। সৌদি-ইরান এবং তাদের পক্ষ/বিপক্ষ অবলম্বন কারীদের মধ্যকার বিরোধ/শত্রুতা/সংঘাতে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে বিভিন্নভাবে আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক সমস্যা, বিরোধ, সংঘাত, যুদ্ধ সৃষ্টি হয়েছে এবং সারা মধ্যপ্রাচ্য/মুসলিম বিশ্ব অস্থিতিশীল, সংঘাতময়, যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। যা কার্যত সারা সমগ্র ইসলামী/মুসলিম বিশ্বকেই বিভক্ত, অস্থিতিশীল, সংঘাত প্রবল, রক্তাক্ত, ধবংস, দুর্বল করে দিচ্ছে। এরফলে বিশ্ব ইসলামী সংস্থা ওআইসি, আরব রাষ্ট্রদের সংস্থা আরবলীগ, ছয়জাতি উপসাগরীয় সহযোগীতা পরিষদ জিসিসি তিনটি সংস্থাই কার্যত অকার্যকর, বিভক্ত, দুর্বল, ঐক্যহীন, শক্তিহীন, নাম সর্বস্ব এবং সৌদি আরব, তার মিত্রদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষাকারী গ্রুপভিত্তিক(গোষ্ঠীগত)প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

২০০১ সালে মার্কিণ-পশ্চিমা জোটের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধাভিযানের সময় থেকে এবং ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরুর পর থেকে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, তাদের আরব ও পশ্চিমা মিত্ররা ফিলিস্তিন/লেবানন ইস্যু, ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, তুরুস্ক/কাতার সংকট প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইরানের কূটনীতি ও রণকৌশলের কাছে মার খেয়ে/পরাস্ত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে করার/ইরানকে যুদ্ধে জড়াবার হুমকি দিচ্ছে এবং তারা সেই পরিকল্পনাকে নিয়েই ধীর লয়ে এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এবং পারমানবিক শক্তি অর্জনের ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরব আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষকে ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেবার কথা বলছে। প্রয়োজনে ইরানের উপর আবার নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার/ইরানকে আক্রমন করার হুমকিধমকি দিচ্ছে। ইরানও সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা ইসরাইল ও সৌদি আরবের উপর আক্রমন করে তাদের মাটির সাথে মিশিয়ে দেবার কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রকেও চরম শিক্ষা দেবার হুশিয়ারী দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদকালে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য ও জার্মানীসহ ছয় জাতির সাথে সম্পাদিত পরমানু চুক্তিকে বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট/ভ্রান্ত চুক্তি বলে তা বাতিল করার/যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরে যাবার দাবী জানিয়ে এসেছে/হুমকি দিয়েছে। জাতিসংঘ ও ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স-জার্মানীর অনুরোধ উপেক্ষা করে শেষপর্যন্ত ট্রাম্প এই পরমানু চুক্তিকে বাতিল করেছেন এবং চুক্তিপূর্ব অবরোধ পুনরায় ইরানের উপর আরোপের ঘোষনা দিয়েছেন। এতে সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধ সৃষ্টি হবার এবং ছড়িয়ে পড়ার মত বিস্ফোরক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইরানের বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের যুদ্ধাভিযান ইরান, সৌদি আরব, ইসরাইলসহ সারা আরব উপদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বের জন্য চরম বিপদজনক/বিপর্যয়কর/ধবংসাত্নক/রক্তস্নাত পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। এই যুদ্ধে মর্যাদা রক্ষার্থে, মিত্রদের বাঁচাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য অব্যাহত রাখতে রাশিয়াকেও অনিবার্যভাবে আসতে/জড়াতে হবে। যে মহাযুদ্ধ/আগুনের লেলিহান শিখা, রক্তস্রোত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপকেও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করবে। যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথকে করবে সুপ্রশস্ত। তাই সৌদি আরব তার আরব মিত্রদের নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, তাদের পশ্চিমামিত্র ব্রিটিশ-ফ্রান্সের সমর্থন নিয়ে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে এবং ইরানও পাল্টা রাশিয়া ও তার আঞ্চলিক আরব মিত্রদের সহায়তা নিয়ে সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিজেকে ও মিত্রদের রক্ষার লক্ষ্যে সারা মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার যে কূটনৈতিক ও সামরিক ছায়াযুদ্ধ বিভিন্ন দেশে শুরু করেছে এবং চালিয়ে যাচ্ছে তাতে কেবল সেইসব দেশই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে না, সংঘাত/যুদ্ধে বিপর্যস্ত/ধবংস হচ্ছে না এবং এতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়ে এবং তাকে পাল্টা প্রতিরোধ করতে গিয়ে সৌদি আরব এবং ইরানও ক্রমান্বয়ে নিজেদের তৈরি করা অগ্নিকুন্ডলী, সংঘাত ও যুদ্ধের ভেতরই ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়ছে/পড়বে অবসম্ভাবীভাবে। এতে সৌদি আরব ও ইরানও অভ্যন্তরীণ/আঞ্চলিক সংঘাত/যুদ্ধে বিপর্যস্ত/ধবংস হয়ে যেতে পারে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কার্যত ইসলামী বিশ্ব এবং বিশ্বের মুসলমানরাই। তাই সকল পক্ষকে নিজেদের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় মঙ্গলের স্বার্থেই সংযত হয়ে চলতে হবে, যুদ্ধ-সংঘাতে মদদ দান/জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বিচক্ষণতার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং স্থিতিশীলতা অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারে একসাথে কাজ করতে হবে।

সৌদি-ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পরস্পরবিরোধী ধর্মীয়/মাযহাবী, জাতিগত ও রাজনৈতিক আদর্শগত চিন্তাচেতনা, পররাষ্ট্রনীতিমালা, আঞ্চলিক প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা, সৌদি-ইরানের মধ্যে প্রবল রাষ্ট্রীয় বিরোধ, শত্রুতা, সংঘাত, লড়াইয়ে পটভূমি সৃষ্টি করেছে দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। সৌদি-ইরান নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা, লড়াইয়ে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকার কারণে তারা উভয়েই বিশ্বে ইসলাম ও মুসলিম উম্মার শক্তি, মর্যাদা বৃদ্ধি, সমস্যা, সংঘাত, যুদ্ধ-রক্তপাত বন্ধ/সমাধান, ঐক্য, শান্তি, স্থিতিশীলতা স্থাপন করার চেয়ে নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তিকে সুসংহত করা, নিজেদের আদর্শগত, মাযহাবী চিন্তাচেতনা বিশ্বে রপ্তানী করার ব্যাপার নিয়ে, ঘৃণা ছড়ানোর ব্যাপারে, আঞ্চলিক প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার বিরোধ/সংঘাত সৃষ্টি/মোকাবেলার কৌশল প্রণয়ন ও মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন করা নিয়েই সদা/অধিক ব্যতিব্যস্ত থাকে। এরফলে মধ্যএশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত ভূ-ভাগের বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন মতাদর্শ, জাতিগত, মাযহাবী ইসলামী/জাতীয়তাবাদী মিলিশিয়া গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল/সামরিকবাহিনী/তাদের সমর্থিত/নিয়ন্ত্রিত সরকার নিজেদের জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বার্থে সৌদি-ইরানের পক্ষে/বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক জাতীয়/অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক বিরোধ, ষড়যন্ত্র, সংঘাত, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে/পড়ছে। সৌদি-ইরানের এই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব-সংঘাতে তাদের আন্তর্জাতিক মিত্র হিসাবে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের পক্ষে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের পক্ষে রাশিয়া অবস্থান নিয়েছে। তারা তাদের নানাভাবে উস্কানী, মদদ, সহায়তা দিচ্ছে। এরফলে মধ্যএশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র/অঞ্চলগুলো সৌদি-মার্কিণ এবং ইরান-রাশিয়া জোটের দ্বন্দ্ব/সংঘাতের কারণে অভ্যন্তরীণ/আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, বিরোধ, অসন্তোষ, সংঘাত, যুদ্ধ/গৃহযুদ্ধের, স্থায়ী উর্বর ধবংসাত্নক ও রক্তস্নাত রণাঙ্গন/ভূমিতে, পশ্চিমাদের সর্ববৃহৎ অস্ত্র-সমরাস্ত্র বিক্রির বৃহৎ স্থায়ী লাভজনক বাজারে পরিণত হয়েছে। আর এই অন্তহীন ধবংসাত্নক ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত/যুদ্ধে বিভিন্ন রাষ্ট্র/অঞ্চলের আরব-অনারব/শিয়া-সুন্নি মুসলমানদের রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, ধবংস স্তুপে পরিণত হচ্ছে ইসলামী/মুসলিম বিশ্বের প্রাচীন-আধুনিক উন্নত-সমৃদ্ধ আরব/অনারব মুসলিম জনপদগুলো। দীর্ঘদিন ধরে লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, সোমালিয়া, উত্তর নাইজেরিয়া, লিবিয়া, রাশিয়ার চেচেনিয়া/দাস্তেগান এবং বাহরাইন, তুরস্ক, মিশর, লিবিয়া, তিউনিশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজাকিস্তান, কিরজিকিস্তানসহ খোদ ইরান, সৌদি আরবের নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক/সামরিক অসন্তোষ, গোলযোগ/সংঘাত/গৃহযুদ্ধের মূল প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ কারণ সৌদি-ইরানের মধ্যকার সুতীব্র আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা/লড়াই।

সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার আঞ্চলিক স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠা, মর্যাদা লাভের ব্যাপার, আদর্শগত, জাতিগত, মাযহাবী বিরোধ, সংঘাত, অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে ইসলাম/মুসলমানদের বিধর্মী শত্রুরা এবং তাদের অনুগত/তাবেদার স্বার্থপর, ক্ষমতা/অর্থ লিপ্সু মোনাফেক মুসলমানরা। তারা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে/নিজেরা ক্ষমতায় বসতে মার্কিণ-পশ্চিমা, অমুসলিম শক্তিদের স্বার্থের পক্ষে কাজ করছে। ফলে বিভিন্ন মুসলিম/অমুসলিম দেশের/অঞ্চলের মুসলমানদের উপর বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্রশক্তি/জাতিগুলো নির্বিচারে আগ্রাসন, হামলা, হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের জনপদ রক্তস্নাত, ধবংস করছে। একইভাবে ইসলামের শত্রুরা মিলে এবং মোনাফেক মুসলমানদের দিয়ে আল কায়দা, বিশ্বে তার বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখা এবং তাকফিরি/দায়েশ/আইএসআইএফ(আইএস)-র মত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী জঙ্গী সংগঠন সৃষ্টি করে মুসলিম বিশ্বে সৌদি-ইরান, শিয়া-সুন্নি মাযহাবী, আরব-অনারব জাতিগত বিরোধ, সংঘাতকে নতুনভাবে, ব্যাপকভাবে উস্কে দিয়েছে/দিচ্ছে, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মুসলিম/অমুসলিম নির্বিশেষে নিরীহ মানুষকে হত্যা/আহত/পঙ্গু করেছে, তাদের পরিবার/জীবন/সম্পদকে ধবংস করে দিয়েছে। তারা ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে, মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে, মার্কিণ ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জেহাদের কথা বলে নিজেদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড, অস্ত্র/মাদক ব্যবসাকে ধর্ম/জেহাদ/যুদ্ধের আড়ালে লুকিয়ে রাখছে। নিজেদের জেহাদী সহযোদ্ধাদের এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বোকা বানাচ্ছে/ধোকা দিয়ে যাচ্ছে। তারা সারা বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষের কাছে শান্তির ধর্ম ইসলাম এবং মুসলমানদের সম্মানকে ভূলুন্ঠিত, ছোট, বিতর্কিত করেছে, ইসলাম ধর্ম ও সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের গায়ে টেরোরিস্ট/মিলিটেন্ট/জঙ্গী/সন্ত্রাসী পরিচয়ের ব্লাক লেবেল(কালো চিহ্ন)এঁটে দিয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র/অঞ্চলের মুসলমানদের উপর বিদেশি বিধর্মী শক্তিদের আগ্রাসন, হামলা, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষন, শাসন, শোষন, লুন্ঠনের সুযোগ/পথ সৃষ্টি করে দিয়েছে/দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে রাজনৈতিক গোলযোগ, সহিংসতা, সংঘাত, গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে এবং তাকে দীর্ঘস্থায়ী করে সেইসব দেশ, জাতি, গোষ্ঠী, দল, সরকারকে উচ্ছেদ, দুর্বল, ধবংস করে দিয়েছে/দিচ্ছে। আর এতে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, রণকৌশলগত দিক থেকে লাভবান হয়েছে/হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের ভেতরকার শত্রু মোনাফেক মুসলমান, বিদেশী অমুসলিম শত্রুরা এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীরা।

এখন তাদের মূল লক্ষ্য ইরান-সৌদির মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বাধিয়ে সৌদি-ইরান রাষ্ট্র দুটিকে কার্যত ধবংস ও দুর্বল করার ব্যবস্থা করা। ইরানের ইসলামী শাসকগোষ্ঠীদের উচ্ছেদ করে ইরানের রাজপাটে তাদের অনুগত বিশ্বস্ত তাবেদারগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানো, সৌদি আরবকে দুর্বল করে মার্কিণ-ইসরাইল-পশ্চিমাদের একান্ত অনুগত ও নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। সৌদি-ইরানের তেলের খনি/সম্পদ, সামুদ্রিক পথ ও সমুদ্র বন্দরগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে তা লুন্ঠন ও ব্যবহার করার আরো ভাল ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা সার্বিক ও দীর্ঘমেয়াদীভাবে সুনিশ্চিত করা। সেই সাথে আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক, লিবিয়া, মিশর, আলজেরিয়া, তুরুস্কে মার্কিণ-পশ্চিমা বিরোধীদের নির্মূল করার মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন করা। তাছাড়া এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ/অস্থিতিশীলতা, সংঘাত/গৃহযুদ্ধ, রক্তপাত, ধবংসযজ্ঞ, দুর্ভোগ/অসহায়ত্ব দেখে তো সৌদি-ইরানের শাসকগোষ্ঠীদের নিজেদেরই সাবধান হয়ে যাওয়া উচিত। বিদেশী শক্তিদের ষড়ন্ত্রের ফাদে পা দিয়ে/মদদে পরস্পরের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে একগুয়েমীপনা/যুদ্ধ করার মত আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে সৌদি-ইরানের এবং তাদের শাসকগোষ্ঠীদের করুণ পরিণতি ও ধবংস ডেকে আনবে। তাই সৌদি-ইরানের উচিত মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া ও কাজ করা। তাহলে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই তাদের বিরোধ/বিদ্বেষ হতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা, সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত, ধবংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাবে/পেত। সৌদি-ইরান রাষ্ট্র দুটো এবং তাদের শাসকগোষ্ঠী নিজেরাও অনেক নিরাপদ হবে। রক্ষা পাবে অভ্যন্তরীণ/আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং এরফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বিরোধ সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত, ধবংসযজ্ঞ থেকে। তাই সৌদি এবং ইরানের শাসকগোষ্ঠীদের উচিত সর্বপ্রকার আঞ্চলিক সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত থেকে সৌদি আরব ও ইরানকে নিরাপদ দূরুত্বে রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা একক ও যৌথভাবে। সারা বিশ্বে ইসলাম এবং মুসলমানদের মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধি, উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করা।

মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের প্রধান কারণ সৌদী আরব-ইরানের শাসকগোষ্ঠী

লেখক: আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
[email protected] gmail.

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK