বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮
Monday, 16 Apr, 2018 12:31:32 am
No icon No icon No icon

ধর্ষণ রসিকতায় আত্মহননের পথে শব্দটি


ধর্ষণ রসিকতায় আত্মহননের পথে শব্দটি


রাহাত হুসাইন: শিরোনামটা পড়ে কি অভাগ হলেন। এ কেমন কথা শব্দ আবার ধর্ষণ হয় কি করে। খটকা লাগলো বুঝি। আসলে খটকা লাগারই কথা। সম্প্রতি কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা দেশবাসী চিন্তিত । ধর্ষণের মহামারি এবং নারীদের নিরাপত্তা  নিয়ে গোটা সমাজ যখন নতুন করে ভাবছে ঠিক তখনই একজন নারী অভিনেত্রী ধর্ষণ নিয়ে করলেন রসিকতা। রসিকতায় ধর্ষণ নামক শব্দটি ভীষণ লজ্জিত। শব্দটির মুখে চুনকালী পড়েছে। সুযোগ থাকলে হয়তো আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেত ধর্ষণ শব্দটি।  

বলছি চিত্র নায়িকা পূর্ণিমার কথা। ঢাকাই চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন অভিনয় করে  এই নায়িকা কাড়িকাড়ি খেতাব জুড়েছেন। তার অভিনীত প্রায় ছবিই সফল বললে ভুল হবে না। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে  ধর্ষণ নিয়ে তিনি রসিকতা করলেন।  রসিকতাপূর্ণ আলাপ আলোচনায় ধর্ষণ কে সুরসুরি দিলেন। ধর্ষণ নিয়ে তার এরকম রসিকতা যে অমানবিক মননের পরিচয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

সম্প্রতি  একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সেলিব্রিটি শো'তে চলচ্চিত্র জগতের আরেক নক্ষত্র খলনায়ক মিশা সওদাগরকে পূর্ণিমা প্রশ্ন করেন কার সঙ্গে ধর্ষণ দৃশ্যে অভিনয় করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন আপনি? উত্তরে মিশা সওদাগর জানিয়েছিলেন , মৌসুমী ও পূর্ণিমার সঙ্গে। উত্তর শুনে  পূর্ণিমা হা হা হা করে হেসে ওঠলেন। তার এ হাসিই জেনো বলে দিচ্ছে তার বিবেকের দুয়ারে তালা পড়েছে। ধর্ষণকে তামাশার বস্তু বানিয়ে ফেললেন তিনি। ধর্ষণ নিয়ে যখন গোটা  দেশের মানুষ উদ্ভিন্ন।  তখন অভিনেত্রী করলেন ধর্ষণ নিয়ে তীর্যক ঠাট্টা।

আমাদের অভিনেতাও খলচরিত্র জাহির করতে বিলম্ব করলেন না। প্রশ্ন শুনেই ঝটপট উত্তর দিলেন। তিনিও ভেবে দেখলেন না এটা কেমন প্রশ্ন। এ  প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে কি না। অভিনয় শিল্পীরা কি আমাদের সমাজের  মুল অংশের বাহিরে থাকেন?  তারা কি জানে না, একটি মেয়ে ধর্ষণ হওয়া মানে একটি পরিবার ধ্বংস হওয়া, কয়েকটি স্বপ্নের মৃত্যু। একটি মেয়েকে নিয়ে তার পরিবারের বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন এমনকি মেয়েটি নিজেও কত স্বপ্ন দেখে। একটি মেয়ে ধর্ষিত হলে হাজারো স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। সামাজিক ভাবেও নির্যাতিতা মেয়েটির পরিবারের মৃত্যু হয়। সমাজের অন্যান্যরা নির্যাতিত পরিবারের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে আড়চোখে তাকায়। সবাই নির্যাতিত মেয়েটির দোষ খুঁজতে থাকে। 

সমাজের সাধারণ মানুষগুলো হলে গিয়ে রঙ্গিন পর্দায় অভিনয় শিল্পীদের অভিনীত  ছবি দেখে তাদের জনপ্রিয় করে তুলেন। তারা হয়ে ওঠেন সমাজের  অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।  যুব-যুবতীদের বিরাট অংশ তাদের লাইফ স্টাইল ফলো করে। নিজেদের কে তাদের মত করে সাজাতে চায়। এই সাধারণ মানুষদের  আভিনয় শিল্পীরা ভক্ত বলেই জানে। 

অভিনয় শিল্পীদের অনেক মেয়ে ভক্ত রয়েছে ।  যারা স্কুলে পড়ালেখা করার সময় টিফিনের টাকা জমিয়ে ছবি দেখেছেন।
তাদেরই কোন মেয়ে ভক্ত ধর্ষণের শিকার হয় আর সে যদি তা নিয়ে রসিকতা করে তাহলে বিষয়টা কতটা অমানবিক হয়। অভিয়ন শিল্পীর অমানবিক মননের পরিচয় ফুটে ওঠে তার এ রসিকতায়। প্রিয় অভিনয় শিল্পীর দুর্দিন ভক্তরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের জন্য মিছিল, মিটিং, পিকেটিং করতে দিধা করে না। 
ভক্তের দুরদিনে অভিনয় শিল্পীরা পাশে থাকাতো দূরের কথা তাদের আচরণ দেখে মনে হলো ভক্তের ধর্ষণে তারা আনন্দিত হন। তারা জানে ভক্তরা চোখ থাকিতে অন্ধ। অভিনয় শিল্পীরা যত অন্যায় করুক তা দেশি দিন কারো মনে থাকবে না। 

পূর্ণিমার ধর্ষণ রসিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হওয়ার পর বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়। অবশেষ বাধ্য হয়েই ক্ষমা চান তিনি। ক্ষমা চেয়েই দায়মুক্তি নিলেন। পূর্ণিমা ও মিশা সওদাগরের এ কথোপকথন সহজে নিতে পারেনি মৌসুমীর স্বামী অভিনেতা ওমর সানী।পূর্ণিমাকে উদ্দেশ করে ওমর সানী বলেছেন, ডেফিনিটলি এ ধরনের প্রশ্ন করার আগে তোমার বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত ছিল পূর্ণিমা । মিশা সওদাগরকে উদ্দেশও সানী আরো বলেন, তুই একজন শিক্ষিত মানুষ। তুই এতবার মানুষের কাছে মাফ চাস, এটা আমার ভালো লাগে না, তুই বলিস, মৌসুমী আমার গুড ফ্রেন্ড; সানী আমার গুড ফ্রেন্ড। তার জন্য মৌসুমী বলেছে এইভাবে ধর্ষণ কর, এইটা কোন ধরনের উত্তর দেওয়া? আমি জানি তুই কোনো ইন্টেনশন থেকে উত্তর দেস নি, তবে উত্তর দেয়ার স্টাইলটা আরও বেটার হওয়া দরকার ছিল। ধর্ষণ শব্দ নিয়ে যে পূর্ণিমা   ঠাট্টা করেছে।  তা স্পট করলেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী নিজেও।  মৌসুমী তার স্বামীর ফেসবুক পাতায়  লিখেছেন, আপনারা জানেন কয়েকদিন আগে একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানে ‘ধর্ষণ’ নিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি হাসি তামাশা করার নয়।

অভিনেত্রীর ধর্ষণ রসিকতা নিয়ে নিরবতা পালন করলেন আমাদের দেশের নারীবাদী সংগঠনগুলো। তাদের এই নিরবতা কি প্রমাণ করে নারীর কতৃক নারী নির্যাতন  বৈধ। তাদের এই নিরবতায় ধর্ষণ শব্দটিও লজ্জানত হয়ে গেছে।  প্রায়শই কোথাও কোনো নারী নির্যাতন হলে নারীবাদী সংগঠনগুলোকে প্রেসক্লাবের  সামনে মানববন্ধন, বক্তৃতা বিবৃতি দিতে দেখা যায়। এমনকি টেলিভিশনের টকশো'তেও আলোচনার ঝড় তুলেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো নারী অভিনেত্রীর ধর্ষণ রসিকতা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। নেই কথা বলার ফুসরত,  মিছিল- মিটিং কিংবা বিবৃতি দেওয়ার সময়। নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তার নিয়ে যে কেউ কুটক্তি কিংবা মশকারা করুক না কেনো সবক্ষেত্রেই নারী সংগঠনগুলোকে প্রতিবাদ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তা যদি না হয় তাহলে নারীবাদী আন্দোলন সমাজে শুধু পুরুষ বিষয়ে বিদ্বেষ ছড়াবে। 

লেখক: সাংবাদিক
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK