শনিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮
Friday, 13 Apr, 2018 10:45:23 am
No icon No icon No icon

বাংলা সাল এবং পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের ঐতিহ্য এবং গৌরবময় সমৃদ্ধ ইতিহাস


বাংলা সাল এবং পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের ঐতিহ্য এবং গৌরবময় সমৃদ্ধ ইতিহাস


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: আরবী/ইসলামী হিজরী সনের দিন তারিখ নির্ভর করে সম্পূর্ন চাঁদের উপর। হিজরী দিনের সূচনা হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনের পর। আর সনাতন হিন্দু পন্ডিতদের প্রাচীন সৌরবর্ষ পঞ্জিকা ছিল সূর্যের উপর ভিত্তি করে প্রণীত। সূর্য উদয়ের সময় থেকেই সৌর দিন গণনা শুরু হোত। তখন বাংলায় শাকাব্দ সৌর সনের প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে মধ্য এশিয়া অঞ্চল থেকে আগত মোঙ্গল বংশোদ্ভূত ভারতবর্ষের মুঘলরা এই উপমহাদেশে বিশাল মুঘলিয়াত/মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্বাঞ্চলের সুবা বাংলা(বাংলা প্রদেশ) ছিল এই মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সর্ববৃহৎ জনবহুল গুরুত্বপূর্ণ সুবা(প্রদেশ)। হাজার হাজার বছর ধরে বাংলার এবং ভারতের মানুষের জীবনাচার কৃষিভিত্তিক। কৃষির উপর নির্ভর করেই এই অঞ্চলের মানুষের লোকাচার, লোকজ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সুখ-দুঃখ, কষ্ট-সংগ্রামময় জীবন এগিয়েছে। এই মুঘল শাসকরা এবং তাদের প্রশাসন হিজরী সন অনুসারে খাজনা আদায় করত। এজন্য বিশেষ করে সুবা বাংলাসহ মুঘল সাম্রাজ্যের সকল সুবায় খাজনা আদায় করা নিয়ে প্রচুর বিপত্তি শুরু হয়। কারণ এখানকার চাষাবাদ ছিল ঋতু ভিত্তিক। মুঘল সম্রাট আকবর তাই বিভিন্ন সুবার জন্য স্বতন্ত্র ফসলী সন প্রবর্তন করেছিল বলে আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে লেখা আছে। তবে সেগুলো স্বতন্ত্র হলেও সমন্বয়মূলকভাবে করা হয়েছিল বোধ হয়। এজন্যই বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ১লা বৈশাখ উৎসব ১৪-১৫ এপ্রিলের মধ্যে হয়ে থাকে আজও। এক্ষেত্রে আকবর সুবা বাংলার এই রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত সমস্যা বাস্তব সম্মত উপায়ে সমাধানকল্পে এবং এখানকার কৃষক প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্তে বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও চিন্তাবিদ আমীর ফতেউল্লাহ শিরাজীকে চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রুপান্তরিত করার দায়িত্ব ও নির্দেশ দেন।

সম্রাট আকবরের আদেশক্রমে ফতেউল্লাহ শিরাজী হিন্দু পুঞ্জিকার সৌর সন এবং আরবী হিজরী চান্দ্র সনের ভিত্তিতে নতুন বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা তৈরী করেন। শিরাজীর সুপারিশে সম্রাট আকবর পারস্যের ফার্সি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দ ১০মার্চ(মতান্তরে ১১মার্চ)থেকে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। কিন্তু সম্রাট আকবর ২৯ বছর পূর্বে থেকে এই নতুন বাংলা পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এর মূল কারণ প্রথমত: সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী ৯৬৩ হিজরী সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং দ্বিতীয়ত: ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর ৯৬৩ হিজরীর ১ম মোহররমে সম্রাট আকবর মাত্র তের বছর বয়সে ২য় পানি পথের যুদ্ধে হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্যকে পরাজিত করেছিলেন। ফলে তিনি যে মাসে সিংহাসনে আরোহণ করেন তার নিকটতম হিজরী বছরের প্রথম মাসকে ভিত্তি হিসাবে গ্রহন করা হয় নতুন ফসলি বাংলা সনকে। সম্রাট আকবর তার ঐ যুদ্ধ বিজয়গাথাকে, নিজের সিংহাসন আরোহণের বছরকে স্মরণীয় রাখতে এবং অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ২৯ বছর পূর্বের হিজরী সন থেকে আজকের বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার প্রবর্তন করেছিলেন। আর ঐ বছর বাংলার প্রচলিত শাকাব্দের ১লা বৈশাখ এবং ইসলামী হিজরী সনের ১ মাসের ১ম মোহররম একই দিনে এসেছিল/মিশেছিল। ৯৬৩ হিজরীর ১ম মোহররমকে বাংলা সালের ১ম বৈশাখে পরিচিহ্নিত করে বাংলা সন শুরু করা হয়। ১,২,৩ এভাবে হিসাব না করে মূল চলতি হিজরী বছর ও মাসের প্রথম তারিখ থেকেই বাংলা সন, মাস, তারিখ গণন্য শুরু করা হয়েছে। ফলে ৯৬৩ হিজরী ১লা মোহররম মোতাবেক ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকেই বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার সূচনা হয়েছে।

৯৬৩ হিজরীর ১লা মোহররম মাস ছিল বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে বৈশাখ মাস। এজন্য বৈশাখ বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখ থেকে নববর্ষ/বাংলা বর্ষবরণ ধরা হয়। প্রথমে এই নতুন সনের নামকরণ করা হয়েছিল তারিখ-ই-ইলাহী/ফসলী সন। পরবর্তীকালে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই ফসলী সন বঙ্গাব্দ/বাংলা সাল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। সেই মুঘল আমল থেকেই ১লা বৈশাখ উৎযাপিত হয়ে আসছে। তবে তখন তার ভিন্নতা ছিল। তখন এটি জমিদার ও প্রজা শ্রেণি কেন্দ্রীক উৎসব হিসাবে পরিচিত ও প্রচলিত ছিল। অনেকের মতে, নবাব মুর্শিদ কুলি খান সম্রাট আকবর প্রবর্তিত তারিখ-ই-এলাহী অনুসরণ করে বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্তে বাংলা সন প্রচলন করেছেন। আর তারিখ-ই-বাংলার তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব মুর্শিদ কুলি খানই পুন্যাহ উৎসব চালু করেন। সে সময় ব্যবসাবাণিজ্যে সুস্পষ্ট উন্নতির ছাপ পরিলক্ষিত হবার প্রেক্ষাপটে পুন্যাহ অনুষ্ঠানের আনুসঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসাবে তিনি হালখাতা প্রথারও প্রচলন করেছিলেন। সে সময় ১লা বৈশাখের আগের দিন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে প্রজাদের সরকারের সর্বপ্রকার খাজনা, মাশুল, শুল্ক পরিশোধ করতে হোত। পরের দিন তথা ১লা বৈশাখের দিন ভূমির মালিক তথা জমিদারগণ নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়িত করতেন। এই ছিল পুন্যাহ ও হালখাতা উৎসব। এই উপলক্ষ্যে নৌকা বাইচ, যাত্রাপালা, ষাড়ের লড়াই, মোড়গ লড়াই, পুতুল নাচ, লাঠি খেলা, কুস্তি, যাত্রা-পালা গান, মেলার ন্যায় বিভিন্ন লোকজ খেলা ও বিনোদন উৎসবের আয়োজন করা হোত।

বাংলা সন কোন মুসলিম শাসক প্রবর্তন করেছিলেন এই নিয়ে ব্যাপক সংসয় ও বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে মুঘল সম্রাট আকবর আবার অনেকের মতে নবাব মুর্শিদ কুলি খান বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তারা যে কেউ হোক/না হোক মুসলিম শাসকদের শাসনামলে এবং তাদের কারো নির্দেশেই এই ফসলী বাংলা সন প্রবর্তিত হয়েছিল এটা সুনিশ্চিত। তবে আমির ফতেউল্লাহ শিরাজীই যে এই হিজরী সৌর বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেছিলেন এই বিষয়ে কোন সংসয় নেই। কারণ সন আরবী, সাল ও তারিখ ফার্সী শব্দ। এই বাংলা সন/বঙ্গাব্দের দুইটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমতঃ আবহমান বাংলার প্রাচীন কৃষিভিত্তিক পেশা ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করেই মুঘল শাসকরা এই বাংলা বর্ষ প্রবর্তন করেছিল। দ্বিতীয়তঃ এই বাংলা সন/বঙ্গাব্দ সালটি আরবী/ইসলামী হিজরী সনের সাথে সম্পর্কিত। কারণ বাংলা সনের মূলে হিজরী সাল বিদ্যমান। নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জিতে হিজরী চান্দ্র সনের হিসাবকে হিজরী সূর্য সনের হিসাবে এবং এর মাধ্যমে হিজরী চান্দ্র সনকেই কৌশলে বাংলা সৌর সনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। প্রাচীন সেন যুগ থেকেই ঢাকায় নগর জীবনের প্রথম সূচনা হলেও মুঘলরা ১৬১০ সালে বুড়িগঙ্গার নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ঢাকায় সুবা বাংলার নতুন রাজধানী স্থাপন করলে ঢাকা অন্যান্য মুঘল নগরী দিল্লী, লাক্ষ্ণৌর ন্যায় পরিপূর্ণ মুঘল নগরী হিসাবে গড়ে উঠে। ফলে সেই মধ্যযুগের মুঘল শাসনামলে ঢাকার নগর সভ্যতাটি বিকাশ লাভ করেছে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বহিরাগত অভিজাত মুঘল, বর্ণ হিন্দু, সুলতানী শাসনামলের স্থানীয় আফগান মুসলমান, নমঃশুদ্র হিন্দু সম্প্রদায় এবং গ্রামাঞ্চল থেকে আগত ও স্থানীয় নগরজাত অধিবাসীদের হাত ধরে। যা পরবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল জুড়েই এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। ফলে মধ্যযুগ থেকেই ঢাকার স্থানীয় অধিবাসীরা এবং তাদের উত্তরসূরী/বংশধরগণ স্থায়ীভাবে নগরজাত আদি ঢাকাইয়া অধিবাসীতে রূপান্তরিত হলেও তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সংস্কৃতিকে কখনও পরিত্যাগ করেনি। ফলে তাদের মাধ্যমে বহু গ্রামীণ লোকজরীতি, খাবার, উৎসব, মেলা ঢাকায় প্রচলিত হয়ে সেগুলো নগরের নাগরিক জীবন এবং সভ্যতার অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ হয়ে গেছে। এটা কেবল ঢাকা নয় বরং সারা পূর্ববাংলা/বাংলাদেশের সকল শহরাঞ্চলের মানুষের সাথে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের একটি ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠতর আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সুপ্রাচীন গ্রামীণ সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রধান দেশ। মোট জনসংখ্যার ৭০% মানুষ গ্রামেই বসবাস করে এবং ৬০% মানুষ প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে আজও কৃষি ও চাষাবাদের সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িত। এই কারণেই ঢাকার নগরবাসী কর্তৃক উদ্ভূত, বিকশিত, জনপ্রিয় আধুনিক ১লা বৈশাখের লোকজ উৎসবটি ঢাকা শহর থেকে অন্য সকল শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং বাংলাদেশের সার্বজনীন জাতীয় লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে।

অপরদিকে নিতান্ত বাঙালী পরিচয়ের কারণে এবং পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় লোকজ উৎসব ১লা বৈশাখের প্রভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা প্রদেশ দুটির ভারতীয় বাঙালীরাও বিশ শতকের প্রথম দিক থেকে ঘটা করে ১লা বৈশাখ উৎযাপন করছে। এই দিন পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতেও জাতীয় ছুটি ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছে এটি বাংলাদেশীদের মতো প্রাণের উৎসব নয়। কারণ ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বাঙালী বাবুরা হচ্ছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীদের হাতে গড়া রাজধানী কলকাতা নগরীর এবং ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষায় শিক্ষিত নগরজাত অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত অধিবাসী/জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরী/বংশধরগণ। আর তাদের মধ্য থেকে নানাবিধ কারণে যে বর্ণ হিন্দুরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে দলে দলে পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এসে স্থায়ী/অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং বসতি স্থাপন করেছিল তারাও ছিল শিক্ষিত, অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত নগরজাত মানুষ। যাদের সাথে এই অঞ্চলের গ্রামের সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কোন কালেই ছিল না। গড়েও উঠেনি/তারা গড়তেও চায়নি। তাই গ্রামের দরিদ্র, নিরক্ষর, খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা, তাদের লোকজ সংস্কৃতির সাথে কখনও পরিচিত এবং সম্পৃক্ত ছিল না। এম আকতার মুকুলের মতে তারা ছিল বর্ণিত পূর্ববাংলার বহিরাগত স্যাটালাইট নগরবাসী। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ অন্যন্য শহরের মানুষের সাথেও গ্রামের মানুষের কোন ঘনিষ্ঠতর আর্থ- সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেনি/নেই। ১৯১৪-১৯১৮ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ১৯১৭ সালে যুক্তবাংলায় প্রথমবারের মত আনুষ্ঠানিভাবে ১লা বৈশাখ পালনের কথা জানা যায়। সেবার ব্রিটিশ রাজভক্ত ও সেবক বর্ণ হিন্দুরা ব্রিটিশ সরকারের জয় কামনা করে হোমকীর্ত্তণ ও পূজার আয়োজন করেছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে তা যুক্তবাংলার জমিদারদের খাজনা আদায়ের পুনাহ্ন উৎসবে রুপান্তরিত হয়। এই সময় থেকে তারা ১লা বৈশাখের দিন খুব ঘুম থেকে উঠে সকালে নতুন কাপড় পড়ে ধুমধামের সাথে পূজা সেরে পহেলা বৈশাখ দিনের সূচনা করত। এরপর তারা তাদের কাচারী ঘরে/ জমিদার বাড়িতে প্রজাদের মিষ্টি আপ্যায়ণ করে তাদের সাথে পুরাতন বছরের হিসাব শেষ করে নতুন বছরের হালখাতার হিসাব খুলত। পর্যায়ক্রমে তা শহরের হিন্দু ব্যবসায়ী ও মহাজনদের মধ্যে হালখাতা প্রথাটি প্রচলিত হয় এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাদের দেখাদেখিতে তাদের মধ্য থেকে তা যুক্তবাংলার বাঙালী ও অবাঙালী মুসলমান জমিদার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ১লা বৈশাখের প্রচলন হয়েছে। ঢাকার নবাব পরিবারও বৈশাখী উৎসব পালন করত বলে জানা যায়। ১৯৩৫ সালেও যুক্তবাংলায় বৈশাখী উৎসব পালনের ব্যাপারটি পরিলক্ষিত হয়। এই সমস্ত কারণে ১লা বৈশাখ উৎযাপনকে একশ্রেণির মুসলমানরা অজ্ঞতাবশত সাধারণ হিন্দুদের পূজা, হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের খাজনা আদায় ও হালখাতা খোলার ব্যাপার ও উৎসব বলে মনে করছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আজও। যা নিতান্তই ভ্রান্ত ধারনা এবং মিথ্যাচার মাত্র। যার অবসান হওয়া উচিৎ। আর এই ব্যপারে সরকারী প্রশাসন, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, সুশীল সমাজ, প্রেস ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়াগুলোকে অগ্রণী, বলিষ্ঠ, কার্যকর উদ্যেগ গ্রহন করতে এবং প্রচারণা চালাতে হবে।

১৯৪৭ সালে যুক্তপাকিস্তান হাসিলের পর পূর্ববাংলা/ পূর্বপাকিস্তান প্রদেশে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজধানী ঢাকায় বাংলা নববর্ষ উৎযাপন নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের সাথে যুক্তবাংলা বিভাগও সম্পন্ন হয়। যুক্তবাংলার মূল নদী বিধৌত কৃষি ও মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা যুক্তপাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথা বাতিল ঘোষনা করা হলে প্রাচীন পুন্যাহ্ন প্রথারও বিলোপ ঘটে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলেই পূর্ববাংলার বাঙালীদের মধ্যে বাঙালী জাতিবাদ ও সাংস্কৃতিক নব জাগড়ণের সূচনা হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অবাঙালীরা এবং তাদের পদলেহী এদেশীয় দোসরা প্রথম থেকেই পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের লোকজ বাঙালী সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি/হিন্দুয়ানী বলে মনে করেছে এবং প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যা তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী করে তোলে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রণ্ট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে কেন্দ্র এবং পূর্ববাংলা প্রদেশে সরকার গঠনের পর বাঙালী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবীরা বাংলা নববর্ষে সরকারী ছুটির জোড়ালো দাবী করে। তাদের দাবী মেনে নিয়ে মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হকের সরকার বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকারী ছুটি ঘোষনা করেন এবং প্রথম সরকারীভাবে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী শাসকচক্র সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচুত্য করে ক্ষমতা দখল করে। সামরিক আইয়ুব সরকার ১৯৫৮ সালে বাংলা নববর্ষের সরকারী ছুটি বাতিল করে দেন। যা বাঙালীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী করে তোলে। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী চক্রের এই বাঙালী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে ছায়ানট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান সরকার কর্তৃক যুক্তপাকিস্তানের রেডিও ও টিভিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি এবং সংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে পূর্বপাকিস্তানের বাঙালীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এই ছায়ানট প্রতিষ্ঠানটি সরকারী নিষেধাজ্ঞা ও বাঁধাকে উপেক্ষা করে ১৯৬৭ সালে রমনার পাকুড়মূলে(বটমূলে) বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদী বর্ষবরণের সূচনা করে। তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত এসো হে বৈশাখ এসো এসো এসো সংগীতটি সমবেত স্বরে গেয়ে শুরু করে ১লা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। যা পরবর্তীকালে ১লা বৈশাখ উৎসব শুরুর রেওয়াজ হিসাবে ঢাকার এক প্রথাগত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালে বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে ঘটা করে ১লা বৈশাখ পালন করা হয় যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আধুনিক পহেলা বৈশাখ উৎসবটি এই সময় থেকে পূর্বপাকিস্তানের ঢাকা শহরের বাঙালীদের লোকজ উৎসব হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। ১লা বৈশাখ হয়ে উঠে এই অঞ্চলের মানুষদের আত্নপরিচয়ের শেকড়স্থল।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ১লা বৈশাখকে জাতীয় পার্বন হিসাবে অন্তর্ভূক্ত ও ঘোষনা করলে তখন থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১লা বৈশাখ উদযাপিত হতে থাকে। আর ১৯৮৭ সাল থেকে সংশোধিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশে গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী পূর্বপাকিস্তান সরকার বাংলা একাডেমিকে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কারসহ লিপ ইয়ারের বিষয়টি বিজ্ঞান সম্মত করার দায়িত্ব প্রদান করে এবং এই মর্মে ড: মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটির সুপারিশ গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। সুপারিশে বাংলা প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং পরের সাত মাস ৩০ দিন নির্ধারণ করা হয়। প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর ৩৬৫ দিন নিয়ে গঠিত বছর ফেব্রুয়ারী মাসে ১ দিন বেড়ে ৩৬৬ দিনে পরিণত হবার লিপ ইয়ারে ফাল্গুন মাস একদিন বেড়ে ৩১ দিন হবে। এ কারণে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নববর্ষ একদিন আগেপিছে তথা বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৫ এপ্রিল উদযাপিত হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে সংশোধিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশে গৃহীত হয়।

নব্বই দশকের সময় থেকে ১লা বৈশাখের জনপ্রিয়তার পাবার মূল কারণ শহরের বিকাশমান সাধারণ মধ্যবিত্তশ্রেণির মানুষের শহুরে যান্ত্রিক নগর সভ্যতার ভেতর গ্রামীণ লোকজ আনন্দ পাবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, ইচ্ছা এবং ঐতিহ্যকে স্মরণ করার, ফিরিয়ে আনার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর হালখাতা উৎসব পালনে উৎসাহ দেবার মূল কারণ ব্যবসায়ী, পেশাদার সংস্কৃতি সেবী-শিল্পীরা রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে ১লা বৈশাখ উৎসব উদযাপনকে ব্যপকতা দান করেছে। এভাবে নব্বই দশকের সময় থেকে ১লা বৈশাখ ভিত্তিক লোকজ উৎসবটি ঢাকা শহর থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের জাতীয় লোকজ উৎসবে পরিণত হয় এবং চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা উৎসবটি ১লা বৈশাখের মূল আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে উঠে। যার মূল্যবোধ ও স্বরূপ সার্বজনীনতায় সমৃদ্ধ। ১লা বৈশাখ সরকারী ছুটির দিন হিসাবে গৃহীত হয়েছে। শিল্পী রফিকুন নবী(রণবী)-র তথ্য মতে, ১৯৮৬ সালে যশোরের চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্যেগে ব্যানার, ফেস্টুন, মুখোশ সজ্জিত হয়ে প্রথম বৈশাখ উপলক্ষ্যে বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে(১৩৯৬ বঙ্গাব্দ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এবং যশোরের চারুপীঠের উদ্যেগে ১লা বৈশাখে বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে ঢাকায় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তবে প্রথম বছর এই শোভাযাত্রার নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। পরের বছর ১৯৯০ সালে ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক ও ভাষাসৈনিক এমদাদ হোসেনের প্রস্তাবে এর নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়। পরবর্তীকালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ১লা বৈশাখ উৎসবের অপরিহার্য ঐতিহ্য এবং প্রধান আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে। ১৪০২ সালের পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত গ্রেগারিয়ান বর্ষ পঞ্জিকানুসারে প্রতি খ্রীষ্টীয় সালের ১৪ এপ্রিল ১লা বৈশাখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঐতিহ্য অনুসারে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার প্রাচীন পুরানো নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক সময়ের মানদন্ডের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে রাত ১২টা ১মিনিট থেকে বাংলা সালের দিন গণনা নির্ধারণ করা হয়।

১লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসাবে ১লা বৈশাখকে বরন করে নেয় হালখাতা খোলার মাধ্যমে। বাংলা নতুন বছরের হিসাব খুলে পুরান হিসাবকে হাল নাগাদ(আপডেট) করাকেই খাল খাতা খোলা বোঝায়। দোকানীরা ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ণ করে থাকে। শহরগুলোতে বিভিন্ন মার্কেট এবং বাসাবাড়িতে গ্রামীণ লোকজ সাজে সজ্জিত করা হয়। মেলার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানে বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন যে, পান্তা-ইলিশ কোন কালেই গ্রামাঞ্চল এবং শহরাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যগত খাবার ছিল না। তবে গ্রামের সাধারণ কৃষক, জেলে, মজুর ও খেটে খাওয়া মানুষরা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতে হয় বলে তারা রাতে পানিতে ভেজানো মাটির খোড়ার পান্তা ভাত সকালে পানি ঝড়িয়ে, তা একটু লবন, পেয়াজ, কাঁচামরিচ ডলে খেয়ে থাকে। বর্তমানে শহরগুলোতে বিভিন্ন পাবলিক এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে পান্তা-ইলিশ/চিংড়িসহ হরেক রকম ভর্তাভাজি দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা লোক দেখানো প্রথা এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগীতার ফলে শুরু হয়েছে। এটা মূলত শহুরে বিত্তশালী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বৈশাখী রসনা বিলাস এবং মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের ফটকা ব্যবসায়ের আনুষঙ্গীন অংশ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পাবলিক স্পটে(উদ্যান, মাঠ, শিক্ষাঙ্গণ), বাসাবাড়ি, এপার্টমেন্টে নানা ধরনের গোষ্ঠীগত ও পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গেট টুগেদারের ব্যবস্থা করে থাকে। এখন শহরাঞ্চলের মানুষরা অনেকেই ঈদ-পূজার মত বৈশাখের দিনেও পড়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামা-কাপড়, জুতা-সেন্ডেল কেনাকাটা করে থাকে, পরিচিতজনদের বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী দিয়ে থাকে এবং মার্কেটগুলোতে ব্যপক পণ্য-সামগ্রী বিক্রি হয়ে থাকে। বৈশাখের দিন অনেকে তাদের পরিবার, বন্ধু বা পরিচিতজনদের নিয়ে রমনার বটমূল, পরিচিতজনের বাসায়, বিভিন্ন মার্কেট, মেলা, বিনোদন স্থলে বেড়াতে যায়, মজার সব খাবার, পিঠাপুলি খায়, নানা ধরনের জিনিসপত্র কেনাকাটা করে থাকে। আবার অনেকে ব্যক্তিগত/সম্মিলিত ভাবে বাসা, ফ্লাট/ এপার্টমেন্টে মেহমান দাওয়াত করে ও একসাথে মিলে সাংস্কৃতিক বিনোদন আয়োজন, বাচ্চাদের খেলার, আড্ডা মারার, খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে। আর গ্রামাঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়। নাগরদোলা চড়ার, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ দেখার, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য, কাপড়, খাবার বিক্রিকিনি হয়। মাঠে ষাড়ের ও মোড়গ লড়াইয়ের, গরু গাড়ি ও ঘোড়া দৌড়ের প্রতিযোগীতা, বিভিন্ন নদীর তীরবর্তী এলাকায় নৌকা বাইচ, কুস্তি প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করা হয়।

বর্তমানে ১লা বৈশাখভিত্তিক বাংলাদেশের জাতীয় লোকজ উৎসবটি সারা বিশ্বের প্রবাসী বাংলাদেশী বাঙালী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিমন্ডলেও ব্যপকভাবে প্রসারিত এবং পরিচিত হয়েছে। এরফলে বিশেষ করে ১লা বৈশাখ কার্যত বাংলাদেশের এবং প্রবাসের বাংলাদেশী বাঙালী সম্প্রদায়ের নিজস্ব জাতীয় লোকজ উৎসব হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
২০১৬ সাল থেকে সরকার চাকরীরত ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী উৎসব ভাতার প্রচলন করেছে। এইদিন প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান এবং গণভবনে সর্বস্তরের মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো ১লা বৈশাখের দিন চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের এবং সারা বিশ্বের বাঙালীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের, গর্বের। তাই এবার বাংলাদেশ সরকার নতুন বাংলা বছরকে বরন করে নিতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করার নির্দেশ দিয়েছে। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, এই একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব বৈসাবী তিনদিন ধরে উদযাপিত হবে। বৈশাখ ও বৈসাবী উৎসব উদযাপনকে কেন্দ্র/উপলক্ষ্য করে আমরা বাংলাদেশী বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী উপজাতিরা পৃথকভাবে হলেও কিন্তু একই অভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে প্রত্যাহিক নগর ও বাস্তব জীবনের যান্ত্রিক কোলাহল ও চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে, দুঃখ-কষ্ট ভুলে নিজেদের জীবনকে একটু রাঙানোর জন্য এবং আনন্দময় করার জন্য আনন্দ-উল্লাস, হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠছি/উঠার চেষ্টা করছি। নিজেদের হারানো লুপ্ত প্রায়/অবশিষ্ট বিদ্যমান/দৃশ্যমান দেশজ লোকজ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধগুলোকে নানা ভাবে, উপায়ে স্মরণ, উপস্থাপন, লালন, সংরক্ষণ এবং পুনর্জাগড়ণের চেষ্টা করছি। বৈশাখ আমাদের বাংলাদেশী বাঙালীদের প্রাচীন, উন্নত, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, উচ্চ সাংস্কৃতিক অভিরুচিকে সুস্পষ্ট এবং গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। আত্নপরিচয়ের শেকড়ভূমে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সবাইকে বৈশাখী শুভেচ্ছা।

ফিরিয়ে দাও আমার মানচিত্র

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র সাংবাদিক, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
 যোগাযোগের জন্য[email protected] gmail.

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK