বুধবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৮
Monday, 26 Mar, 2018 11:47:59 pm
No icon No icon No icon

উল্টো দর্পণ


উল্টো দর্পণ


বিদ্যুৎ ভৌমিক: সেই যে সেই দিন গুলো-র আমি নামক মানুষটা  , অনেকটা বয়েস ধন্য হয়ে বেঁচে আছে ! ভিতর ও অতলান্তের একেবারে গভীরে জ্বলনের জ্বালা নিয়ে না মরে একপ্রকার বেঁচে-ই আছে বলতে পারি ! কারা যেন মধ্যরাতের ঘণ্টা শুনিয়ে নির্ঘুম করে আমাকে । ওরা কে বা কারা , কি-বা পরিচয় ওদের ,-- সেটা আমার জানা নেই ! তবে এটা ঠিক ওদের ডাকে আমি স্বপ্ন ঘুম থেকে জেগে উঠি প্রতিনিয়ত , একই ভাবে ! এটাও বলতে পারি সময়-সত্য করেছে আম্মাকে । কীভাবে উজান হেসে স্বপ্ন ধুলো মনে মেখে বেঁচে আছি ,- সেটা মনে করলেই অশরীর দুঃখ প্রহর গুলো আর্তনাদ করে ওঠে ! হয়তো কোনভাবে এই প্রবাহমান দুঃখ আমাকে    আদ্যোপান্ত ভাবে ভালবাসতে শিখিয়েছে , তা-না হলে আমি কেন মরছি না ,-- বলতে পারেন ? প্রতিটা রাত , প্রতিটা দিন একা ও একক নিঃসঙ্গ হয়ে আছি আ-মি এই আমি নামক মানুষটা ! চোখের পাতাগুলো সেই-যে সেই  থেকে অন্ধ কারুকাজ নিয়ে উল্টো দর্পণে রোজ-রোজ বৃষ্টিতে ভেজে ! শূন্য ঘরটায় আরও শূন্য মনে হয় নিজেকে । অসময়ে ওরা এলে ; চোখ থাকে চুপ ! অলৌকিক চাঁদ ডোবা  অন্ধকার ঝিমিয়ে পড়েছিল আমার বিছানায় । প্রতিদিন এই সময় ঘুমের দরজায় লাথি মারে স্মৃতি ! দশদিক থেকে মৃত্যুর বিলাপ শুনি । মাঝে-মধ্যে কেঊ যেন দু'পয়সা চেয়ে বসে স্বপ্নের শেষে ! লাথি খাবার প্রকৃত ভিক্ষুক আসলে আমিও । মজার মানুষ খায় প্রতিপলে লাথি , অথচ ঘুটঘুটে আঁধার ; ভিতরে মৃত প্রজাপতি ! খুব একটা বিষণ্ণ মনে হ'লে সব বয়সের তালা খুলি । ছায়া চোর দুলে ওঠে অন্ধকার দেয়ালে ! তবুও নানান অক্ষরের নিঃশ্বাস প্রত্যন্তে পোড়ায় আমাকে । খুব একটা ভালো নেই সময় ও আমি ! এই জন্যেই গোটা দিনটা ডালপালা পেতে আমার কাছে এগিয়ে আসে । গভীর ইচ্ছায় বুক পেতে চেয়ে আছি ****  তাই তালা খুলি ; নিছক বদলে ফেলি আমার নির্ঘুমের ৫২ -টা বছর ! এটা-কি জীবন , না অন্য কিছু ?                                                                 প্রতিদিনের 'ডায়রি'-টা লিখতে বসে মধ্য বয়স্ক এক পুরুষ । নাম , ঠিকানা , পরিচয় , বিদ্যা-বুদ্ধি , বেকার না বাঊণ্ডুলে , কিম্বা প্রেমিক অথবা  নিরস চেহারার ৫২-বছরের কেউ একজন ! এসব নিয়ে কি বলতেই হবে ? যদি বলি , তবে মানুষটার নামটাই বলবো । ওর বাপের দেওয়া নাম হোল , শ্রীমান তমোনাশ । পদবী-টদবী , না বললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে ? অতো তর্কে না গিয়ে তমোনাশ বাবুর কথায় আসি । এই মানুষ-টা এক প্রকার একা হয়ে থাকা নিঃসঙ্গ একজন মানুষ ! ৫২-টা বছর একমাত্র একাই কাটিয়ে দিয়েছেন একটা ঘরে ! কলেজ স্ট্রীটের একটা প্রকাশন দপ্তরে সামান্য কটা টাকার বেতনভূক কর্মচারী , -- আজকের গল্পের এই চরিত্রটি  ! বলতেই হচ্ছে , তিনি থাকেন শ্যামবাজার এলাকায় । এর আগে তমোনাশ বাবু তার বাপ-ঠাকুরদার ভিটে দেবীপুরে থাকতেন ! একটা বিশেষ পারিবারিক অশান্তির কারণে বছর ১৫ কি ২০ হবে , তিনি দেবীপুরের সব সম্পর্ক ত্যাগ করে চলে এসেছেন শ্যামবাজারের তেলী পাড়ায় । তমোনাশ'-বাবুর আর সব দাদা-ভাই , সবাই যে-যার প্রতিষ্ঠিত । লোকটার পিতৃদেব ঈশ্বর অনন্ত প্রসাদ একটা কলকাতার বিদেশী কোম্পানি-তে মোটা অঙ্কের বেতন নিয়ে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন । অবসর নেবার বছর পনেরো পর অনন্ত প্রসাদের দু - চোখে তুলসী পাতা পড়ে ! শুনেছি দেবীপুরে বেশকিছু জমি-জায়গা ওনার ছেলেদের নামে করে দিয়ে চোখ বুজেছেন ! তমোনাশের'- নামেও দু-চার বিঘা জমি আছে । এতোসবের মধ্যেও কোন হেলদোল নেই তমোনাশের ! সেই-যে দেবীপুরের জন্মভিটে ছেড়ে চলে এসেছে , আর ওমুখো সে হয় নি ! বাড়ির মধ্যম সন্তান সে । বড়দা সরকারি চাকরি করেন , আর ছোট ভাই হুগলী জেলার নামী প্রমোটার । তমোনাশের মা যমুনাবতী  , সেও বেঁচে নেই । স্বামী  অনন্ত প্রসাদের মৃত্যুর বছর পাঁচ কাটতে না কাটতে-ই   তিনিও তার ইহলোকের সমস্ত মায়া কাটিয়ে স্বর্গধামে যাত্রা করেন ! দাদা ও ভাই-এর সংসার হয়েছে , স্ত্রী  ছেলে-পুলে নিয়ে সুখী পরিবার ! কিন্তু তমোনাশ , এক জায়গায় থেমে আছে ! ওর ভাগ্য-দুর্ভাগ্য , তা কিন্তু নয় । ও- যেন নিজের মত করে বাঁচতে চেয়েছে ।                                                                                                                                                                                                                             প্রথম থেকেই ও একই রকম । কোন পরিবর্তন আসেনি জীবনে ! কাজ সেরে বাড়ি ফিরেই রান্না চাপিয়ে দেয় তমোনাশ ।  বাড়ি নয় ভাড়াবাড়ি । অনেক দিনের ভাড়াটে তমোনাশ । রাতের খাওয়া সেরে রোজ এই সময় লিখতে বসে যায় । কি লেখে , সেটা ঈশ্বরী জানেন ! বিপরীত মুখে চলার অভ্যাস এই লোকটার নেই , আর নেই বলেই নিজের সমস্ত ইচ্ছাগুলো মন থেকে সরিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই ! এরকম একজন ভিন্ন স্বভাবের মানুষ-কে আমি খুব সামনে থেকে দেখেছি । গত ১২ কী ১৩ বছর আগে কলেজ স্ট্রীটের প্রকাশন দপ্তরে তার সাথে আমার প্রথম আলাপ । দিনটা মাসের শেষ  শনিবার ছিল । তমোনাশ বাবু একটা টেবিলে বসে মাথা গুঁজে  আমার কবিতার বইয়ের প্রুফ দেখছিল । আমি ভেতরে ঢুকতেই প্রুফ থেকে মুখ  তুলে তমোনাশ এক গাল হাসি ছড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে ফেললো ; দাদা আপনার বইয়ের-ই প্রুফ দেখছিলাম । আমি ধন্য আপনার মত একজন কবির কাব্যগ্রন্থের প্রুফ আমি দেখছি ! আমি এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম ! তমোনাশ আমাকে বসতে বললো । এরপর চা-শিঙাড়া এলো । গল্প হচ্ছিলো ওর সাথে । সমস্ত গল্প জুড়ে শুধুমাত্র সাহিত্য এবং কবিতানির্ভর আলোচনা চলছিলো । সেদিন  তমোনাশের কথা- বার্তায় ভীষণ বুদ্ধি ও মেধার পরিচয় পেয়েছিলাম । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম  ওর দিকে । ওর যে বিশ্ব সাহিত্যের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য , সেটা ওর সাথে কথা না ব'লে জানা যেতো না ! এক পাঁচিলের ওপাড়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা সেটা যেমন বোঝা যায় না , ঠিক তেমন তমোনাশের মতো মানুষের সাথে আলাপ না হলে সেটা অনুধাবন করা যেতো না । সেদিন অনেক কথাই বলেছিল তমোনাশ । বেশিরভাগ  ওর অতীতের ফেলে আসার দিন গুলোর কথা । যে-কেউ ওর সাথে কথা বললে কথা হারিয়ে ফেলবেই , এটা আমি হলপ করে বলতে পারি । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক তমোনাশ । কালো ফ্রেমের চশমা । মাথা ভর্তি কাঁচা-পাকা চুল । মোটা গোঁফ । কানের দু-পাশে সাদা ঝুলপি । গায়ের রঙ শ্যাম বর্ণ । পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা । এই হোলো ওর শারীরিক পরিচয় । আমার কবিতার বইটা প্রকাশ হয়ে গেছে অনেক দিন ! এদিক ওদিক প্রথম শ্রেণীর কাগজ গুলোতে সেই বই নিয়ে আলোচনা বেড়িয়েছিল । কিন্তু তারপর থেকে তমোনাশের সাথে আমার আর দেখা-সাক্ষাৎ হয় নি ।                                                                                                                                                                                                                                                                         - ' একটা ঘুড়ি উড়ছিল একা-একা , অথচ ওই দূরের বর্ণনীল আকাশটায় কেউ ছিল না ! একটা সমুদ্রের নগ্ন ঢেউগুলো হাজার বছর পর ফিরে এসে ছিল । তার অতলান্তে নেমে এল বৃষ্টি শেষে আবার অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ! একটু-একটু করে নষ্ট হচ্ছিলো পুরনো আকাশটা । ভারী বৃষ্টিতে উড়ছিল একটা পাখি । ওর ডানা ভাড়ী হয়ে ছিল বৃষ্টির জলে । তবুও সে উড়ছিল । চোখে বহুকাল ধরে  পুষে রেখে ছিল গভীর অভিমান । ওই-যে ঘুড়িটা ; ওর সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছিল পাখিটা । সাত জন্মের স্বপ্ন গুলো উড়তে-উড়তে দুজনে ভাগ করে নিচ্ছিল ! '- অনেক দিন পর একটা ভালো লেখা পড়লাম কোলকাতার একটা নানকরা ম্যাগাজিনে । এতো সুন্দর দর্শনমূলক কবিতা দেখে মনে-মনে অবাক হচ্ছিলাম ! কে এই কবি ? এর আগে-তো এই কবির লেখা আমি কখনো পড়িনি ! উনি কে ? কে-এ-এ-এ ? কি অদ্ভুত নাম 'বিচিত্রবীর্য' ! এটা কবির আসল নাম নয় ।  কি জানি কী মনে হোলো , ওই ম্যাগাজিন দপ্তরে ফোন করলাম ! সম্পাদক মহাশয়কে সরাসরি ফোন করলাম । উনি আমাকে যা বললেন ; সেটা শুনে আমার অন্তঃস্থলটা কিছুক্ষণের মধ্যে ভেঙে যেতে লাগলো ! কবির নামটা শুনে নিজের কানকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । সম্পাদক বাবু আমাকে কবির সম্পূর্ণ পরিচিতি মেইল করে পাঠিয়ে দিলেন । সবটা প'ড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম ! এই সেই কবি , যিনি বেশ কয়েক বছর আগে আমার কবিতার বইয়ের প্রুফ দেখেছিলেন ! উনি আর নেই ! ওনার মৃত্যু হয়েছে ! কবির আসল নাম , তমোনাশ চৌধুরী'-- **** নামটা দেখেই চমকে উঠলাম আমি ! কী এমন হোল , যে মৃত্যু বরণ করতে হলো আমার গল্পের এই চরিত্র-কে ? মনের মধ্যে হাজার-হাজার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল ! রাতের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের পর সিগারেট ফুঁকে চলছিলাম , আর মনে-মনে ভেবেই চলছিলাম তমোনাশের কথা । যিনি চলছে এক মনে দারুচিনি দ্বীপের ভেতর ; তিনি নির্ভেজাল এক ঋষি / অর্জুন ও ভীম এবং দ্রোণের মতোই আন্তর্জাতিক পুরুষ / জন্ম বৃত্তান্ত লিখে রাখার মতো পাগলামি ওর মাথায় কখনো চাপেনি ভুল বশত / অঢেল প্রশ্রয়ে ভারসাম্যহীন হন-নি কখনো / উনি নষ্ট দরজায় এসে কড়া নাড়েন মধ্যরাতে প্রতিদিন *** তিনি কবি~তমোনাশ , কবি~তমোনাশ !!                                                                                                                                                                                                                                          

লেখক: বিদ্যুৎ ভৌমিক                                                                                                                                                                                                                                                                  ভারতবর্ষ , পশ্চিমবঙ্গ ( মল্লিকপাড়া , শ্রীরামপুর , হুগলী )                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                     

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK