রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Monday, 26 Mar, 2018 12:28:47 pm
No icon No icon No icon

বাংলাদেশের বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেনির স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ


বাংলাদেশের বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেনির স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে সর্বক্ষেত্রে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অখন্ড/যুক্তবাংলা প্রেসিডেন্সি প্রদেশে হিন্দু ও মুসলমানের অবস্থান এবং অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, বিপরীতমুখী, বৈষম্যমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, সাংঘর্ষিক। এর মূল কারণ ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক শাসন নীতি ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি(ভাগ কর এবং শাসন কর নীতি)। সুবা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবাবী ফৌজ পলাশী যুদ্ধের প্রান্তরে মীরজাফর, রবার্ট ক্লাইভ ও হিন্দু অভিজাতদের মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলে পরাজিত হলে কার্যত সুবা বাংলার স্বাধীনতার পতন হয় এবং সেই সাথে বাংলায় মুসলমান শাসনেরও অবসান ঘটে।ইংরেজ/ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী অভিজাত হিন্দুদের প্রধান মিত্র হিসেবে গ্রহন করে। ফলে বাংলার রাজপাটে দৃশ্যত ও কার্যত ইংরেজরা নতুন শাসকগোষ্ঠী হিসেবে এবং তাদের অনুগত হিন্দু অভিজাতরা তাবেদার অপশক্তি আবির্ভূত হয়। এরপর তারা তাদের প্রশাসনিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক এবং রণকৌশলগত সুবিধার্তে রাজধানী উত্তরের মুসলিম প্রধান মুর্শিদাবাদ থেকে দক্ষিণের সমুদ্র নিকটবর্তী হিন্দু প্রধান কলকাতায় স্থানান্তরিত করে। বাংলার রাজপাটে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অধিষ্ঠান এবং রাজধানী স্থানান্তর করার ব্যাপার দুটি ছিল অভিজাত ও সাধারণ বর্ণ হিন্দুদের কাছে শাসকগোষ্ঠী ও প্রভুর পরিবর্তন মাত্র এবং তাদের শ্রেণিগত উন্নতির এক সুবর্ণ সুযোগ লাভ। মুঘল ও নবাবী শাসনামলে তারা মুঘল ও নবাব শাসকগোষ্ঠীর সাথে মিত্রতা স্থাপন করে ও বজায় রেখে মুসলমান শাসকগোষ্ঠীর সমান্তরাল শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। একইভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং ব্রিটিশ গভর্মেন্টের ঔপনিবেশিক শাসনামলেও বর্ণ হিন্দুরা খ্রীষ্টান ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়ে নিজেদের অবস্থান, মর্যাদা, সম্পদ, শক্তি অক্ষুন্ন রাখার এবং উত্তরোত্তর আরো বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এদেশের অভিজাত ও সাধারণ মুসলমানদের কাছে পলাশীর বিপর্যয় ছিল রাজ্য শাসনের ক্ষমতা, মর্যাদা, সম্পত্তি, জমিদারী, ভূমির উপর অধিকার সব হারানোর, ধবংসের বেদনা, ক্ষুদ্ধতা, হতাশা। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অভিজাত ও স্বল্প ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মহাজন, কেরানী, সিপাহী, পন্ডিত, জমিদার ও পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। বাস্তবতা উপলব্ধি করে এবং সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে অভিজাত হিন্দু সমাজ সংস্কারকরা প্রথমদিক থেকেই সচ্ছল বর্ণ হিন্দুদের সন্তানদের অদূর ভবিষ্যতে সরকারী চাকুরী, সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি, শক্তি, মর্যাদা সুনিশ্চিত করার জন্য শহরের পাড়ায় পাড়ায়, বিভিন্ন জেলার গ্রামে ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। আর মুসলমানরা কাফেরের ভাষা মনে/প্রচার করে ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করে এবং তা থেকে দূরে সরে থেকে আরবি-ফার্সী-উর্দু ভাষার মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে পড়ে থেকে রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যক্তি জীবনের সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে, দুর্বল, দরিদ্র, নিঃস্ব হতে থাকে/হয়ে যায়। পলাশীর বিপর্যয়ের প্রায় চার দশক পর ইংরেজ সরকার ফার্সীর পরিবর্তে ইংরেজিকে রাজভাষা হিসেবে ঘোষনা করলে ইংরেজিতে অজ্ঞ ফার্সীভাষী মুসলমান অভিজাতরা ব্রিটিশদের রাজদরবারে চাকুরী করার/ পাবার যোগ্যতা হারায় এবং সেই সব পদে নতুন ইংরেজি শিক্ষিত বর্ণ হিন্দুরা দ্রুত/পর্যায়ক্রমে নিয়োগ লাভ করে/করতে থাকে। এ সময় হিন্দু সমাজ সংস্কারকরা বর্ণ হিন্দুদের আরো

ফিরিয়ে দাও আমার মানচিত্র

উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি মাধ্যম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত প্রজন্ম সৃষ্টির পথ এবং বর্ণ হিন্দুদের শেণিগত উন্নতি-সমৃদ্ধি-মর্যাদা-শক্তি বৃদ্ধির পথ সুপ্রসস্ত করে দেয়। ইংরেজি শিক্ষায় সুশিক্ষিত বর্ণ হিন্দুরা রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যক্তি জীবনের সর্বক্ষেত্রে সরকারী চাকুরী, পেশাগতক্ষেত্রে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রসর হতে, উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করতে থাকে দ্রুত গতিতে এবং এরফলে তারাই প্রথম কোলকাতা ও পূর্ববাংলায় তথা যুক্তবাংলায় পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির পত্তন করেছিল। ইংরেজিকে রাজভাষা ঘোষনার আরো তিন-চার দশক পর কলকাতায় পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেনি পরিপূর্ণতা অর্জন করে সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি, শক্তি, মর্যাদা অর্জন সুনিশ্চিত করে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর সমান্তরাল/সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। অপরদিকে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষাহীন, চিন্তাচেতনাহীন, অনগ্রসর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, হতাশাগ্রস্ত, মর্যাদা, শক্তিহীন ফার্সী-আরবি শিক্ষিত উর্দুভাষী মুসলমানরা তা চেয়ে চেয়ে দেখছিল আর হা হুতাশ, আফসোস করছিল।

পলাশীর বিপর্যয়ের প্রায় এক'শ বছর পর মুসলমান নেতৃবৃন্দ/সমাজ সংস্কারকগণ ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর, দুর্বল, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শোষিত, নির্যাতিত মুসলমানদের সার্বিক অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশ/ইংরেজ সরকারের সাথে সহযোগীতা করার, মিত্রতা স্থাপনের এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহনের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করে/সক্ষম হয়। আর এই সময়ে বাংলা-ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা ও কংগ্রেসীরা হিন্দু ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে হিন্দু রাজ/রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুগপদভাবে একদিকে গোপনে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লব ও অন্যদিকে রাজপথে স্বাধীনতার দাবীতে আন্দোলন শুরু করেছিল। তারা ছিল একই সাথে প্রবল মুসলিম স্বার্থ বিরোধী এবং ব্রিটিশ শাসন বিরোধী। যা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার ও সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে চিন্তিত, আতংকিত, বিক্ষুদ্ধ, প্রতিহিংসা পরায়ন করে তুলেছিল। ফলে তারা পরস্পরকে মিত্র হিসাবে গ্রহনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল। পূর্ববাংলার মুসলমান নেতাদের দাবীর প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে সংযুক্ত ফোর্ট উইলিয়াম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী প্রদেশকে দ্বিখন্ডিত করে/ বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা ও আসামকে একত্রিত করে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন ও প্রতিষ্ঠা করে এবং ঢাকা শহরকে এই নতুন প্রদেশের রাজধানী বলে ঘোষনা করে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহন করে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবে এই নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক ক্ষমতায় মুসলমানরাই প্রাধান্য বিস্তার করে। সারা পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে আনন্দ, উল্লাসের ঢেউ বয়ে যায়, তারা আত্নপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জেগে উঠতে থাকে। কিন্তু এই বঙ্গভঙ্গ ও এই নবগঠিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ প্রতিষ্ঠা কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পূর্ববাংলার স্থানীয়/কলকাতা প্রবাসী অভিজাত হিন্দু জমিদার শ্রেণির আর্থিক স্বার্থে প্রবল আঘাত হানায় তারা প্রথম থেকেই ধর্মের নামে ও মুসলিম বিরোধীতার নামে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের অবাঙ্গালী হিন্দুদের সাথে মিলে সর্বভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবাদী স্বদেশি আন্দোলন গড়ে তোলে/পরিচালনা করে পুনরায় বঙ্গভঙ্গ রদ ও পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য। এরফলে একদিকে এই অঞ্চলের অভিজাত ও সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানরা নিজেদের প্রদেশকে গড়ে তোলার জন্য, নিজেদের সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর, প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিক্ষার প্রসার করার, মুসলিম মূল্যবোধ/সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে তোলার, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এর পাশাপাশি এই নতুন মুসলিম প্রদেশটির ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, মুসলমান সম্প্রদায়ের জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা সুরক্ষার জন্য একটি সর্ব ভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর হয়ে উঠে। তারই চূড়ান্ত ফলশ্রুতি ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের জন্ম লাভ। কিন্তু ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির কারনে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে পুনরায় বাংলাভাষী পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গকে একত্রিত করে নতুনভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সি প্রদেশ গঠন করে এবং কলকাতাকে পুনরায় এই প্রদেশের রাজধানী করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষনা করায় স্বতন্ত্র পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থার মধ্যে এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সম্প্রদায়গত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারা, দ্রুত উন্নতি-সমৃদ্ধির সুন্দর ও সুনিশ্চিত সুযোগটি নস্যাৎ হয়ে যায়। ঢাকা নগরী পরিপূর্ণ আধুনিক রাজধানী হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। মুসলমানদের কাছে ব্রিটিশ সরকার বিশ্বাসঘাতক, কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, কলকাতার হিন্দু বাবু ও পূর্ববাংলার হিন্দু জমিদাররা কুচক্রী/ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই বঙ্গভঙ্গের সময় থেকেই কলকাতার হিন্দু বাবু ও পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যকার ঘটি-বাঙ্গালের আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিরোধ চরম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, দাঙ্গায় পর্যবসিত হয়। বঙ্গভঙ্গের পর হতাশাগ্রস্ত পূর্ববাংলার মুসলমান নেতৃবৃন্দ এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনগ্রসর মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষার সুবিধার্তে একটি পূর্নাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুরোধ করলে ব্রিটিশ সরকার পুনরায় মুসলমানদের আস্থা অর্জন করতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে। এবারও এর বিরুদ্ধে কলকাতার বর্ণ হিন্দুরা প্রবল আন্দোলন শুরু করায় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কারনে সাত বছর বিলম্বিত হলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববাংলার শহরের সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের এবং গ্রামাঞ্চলের অনগ্রসর, দরিদ্র মুসলমান ও শুদ্র হিন্দু কৃষকের ঘরের সন্তানরা কম খরচে সহজে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার ও উচ্চশিক্ষিত হবার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করে। এরফলে বিশেষ করে পূর্ববাংলার সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার পর্যায়ক্রমে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ঢাকা ও পূর্ববাংলার এই নব্য উচ্চ শিক্ষিত মুসলমানরাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশ করে অভিজ্ঞতা, উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করতে শুরু করে এবং পরবর্তীকালে তারাই ঢাকাসহ পূর্ববাংলায় প্রথম বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির পত্তন করে। তারা পুর্ববাংলার দোর্দন্ড প্রতাপশালী, শক্তিশালী, বিত্তশালী হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং সর্বক্ষেত্রে অগ্রসরমান, প্রতিষ্ঠিত কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রবল প্রতিপক্ষ/প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে শুরু করে। বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে কংগ্রেস ও বর্ণ হিন্দুদের সর্বক্ষেত্রে অবিরাম মুসলিম স্বার্থবিরোধী তৎপরতা, কার্যকলাপ, ঘন ঘন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ব্রিটিশভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ভাবার ও প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, প্রচারণা, সশ্রস্ত্র বিপ্লবী তৎপরতা, রাজনৈতিক আন্দোলন অভিজাত ও বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুসলমানদের চিন্তিত, আতংকিত করে তোলে। ত্রিশ দশকের দিক থেকে উত্তর ভারতের অভিজাত মুসলমানরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করে কংগ্রেস ও হিন্দুদের সাথে সমমর্যাদা, অধিকার নিয়ে সম্মানের সাথে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বাঁচা, উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভপর নয়। তাই তারা তাদের শ্রেনিগত ও সম্প্রদায়গত দাবীর পক্ষে নিজেদের গ্রহনযোগ্যতা অর্জন ও শক্তি বৃদ্ধি করতে যুক্তবাংলার মুসলমান নেতৃবৃন্দের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য/আতাত/মিত্রতা গড়ে তোলে। বিশেষ করে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তবাংলা প্রদেশে মুসলমানদের ব্যপক বিজয় অর্জন, মুসলিমলীগের সমর্থনে কৃষক-প্রজা পার্টির নেতৃত্বে সরকার গঠন, ফজলুল হকের যুক্তবাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, মুসলিমলীগে হক সাহেবের যোগদান প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমলীগের প্রবল শক্তি বৃদ্ধি করে এবং অভিজাত ও বিকাশমান মধ্যবিত্ত মুসলমান শ্রেণিকে উদ্দীপ্ত, দুঃসাহসী করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটেই মিঃ জিন্নাহ ১৯৩৭ সালে তার এক ভাষনে হিন্দু-মুসলমানকে দুটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা দাবী করে দ্বি-জাতি তত্ত্ব ঘোষনা করেন। ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিমলীগের সম্মেলনে যুক্তবাংলার প্রধানমন্ত্রী ও বাঙালী মুসলমানদের নেতা ফজলুল হক তার লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম প্রধান ভারতের উত্তর-পূর্ব আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ, রাজ্য, এলাকাসমূহের সমন্বয়ে একাধিক তথা দুইটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী উত্থাপন করেন। সর্বভারতীয় মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতভাবে তার প্রস্তাব সমর্থন ও অনুমোদন করে। এর ভিত্তিতেই পূর্বের বাংলা-আসামের বাঙ্গালী মুসলমানরা ও পশ্চিমভারতের অবাঙ্গালী মুসলমানরা মিলে পাকিস্তান আন্দোলন গড়ে তোলে এবং তারা ব্রিটিশ সরকার, কংগ্রেস ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দকে প্রবল চাপের মধ্যে ফেলে। পাকিস্তান আদায়ের দাবীতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের প্রভাবে কলকাতায় ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়। কলকাতার হিন্দুরা যুক্তবাংলা প্রদেশ বিভাগ ও তাদের জন্য স্বতন্ত্র প্রদেশ প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন শুরু করে। এই সময় যুক্তবাংলার কিছু উদারপন্থী বাঙালী কংগ্রেস ও মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যাসাম্য নীতি ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন সার্বভৌম অখন্ড বাংলা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা করলেও কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের কেন্দ্রীয় অবাঙালী নেতাদের নেপথ্য ষড়যন্ত্রের কারণে তাদের মহৎ উদ্যেগটি নস্যাৎ হয়ে যায়। ফলে ১৯৪৭ সালে যুক্তবাংলা ও যুক্তপাঞ্জাব প্রদেশ দুটি বিভাগ করার পর ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যকে দ্বি-খন্ডিত করে মুসলমানদের জন্য মুসলিম প্রধান পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ-অঞ্চলসমূহ একত্রিত করে যুক্তপাকিস্তান আর অবশিষ্ট সকল অমুসলিম ও অহিন্দু ভূখন্ড নিয়ে ভারতীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্রপুঞ্জ দুটি স্বাধীনতা অর্জন করে।

পরাক্রান্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার, সারা ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থিত সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার প্রবল বিরোধীতা, প্রতিরোধ, ষড়যন্ত্রকে অগ্রাহ্য/মোকাবেলা করে ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রধান পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমানরা মিলে রাজপথে ও পার্লামেন্টে পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি পাকিস্তান হাসিল করায় সারা যুক্তপাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে উল্লাস বয়ে যায়। তাই তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কাছেই যুক্তপাকিস্তান ছিল স্বপ্নের আবাসভূমি। বিশেষ করে পাকিস্তান আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহন, জোড়ালো সমর্থন এবং আত্নত্যাগ স্বীকার করেছিল বাংলা-আসামের বাঙালী মুসলমানরাই। যুক্তপাকিস্তান রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠন, প্রতিষ্ঠা, হাসিলেও ছিল তাদেরই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তারা ছিল যুক্তপাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বলিষ্ঠ সমর্থক। পাকিস্তান আন্দোলন এবং যুক্তপাকিস্তান হাসিলের মাধ্যমে নিজেদের জন্য দ্রুত সম্প্রদায়গত/জাতিগত অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিল। তারা আশা করেছিল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, সংখ্যাসাম্য নীতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠার কারণে/তার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা কার্যত তাদের হাতে/নিয়ন্ত্রনে থাকবে/পরিচালিত হবে। কিন্তু যুক্তপাকিস্তান হাসিলের পর খুব দ্রুত/ক্রমেই পূর্ববাংলার মুসলমানদের কাছে যুক্তপাকিস্তান হাসিলের আবেদন, উল্লাস ও গর্ব ফিকে হয়ে আসতে থাকে। স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমি হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও যুক্তপাকিস্তানের সর্বময় শাসন ক্ষমতা পশ্চিমপাকিস্তানের সংখ্যালঘু পাঞ্জাবী ও মোহাজির শাসক চক্রের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। তারা তিনদিক ভারত পরিবেষ্টিত পূর্ববাংলার অবস্থান এবং বাঙ্গালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সর্বদা চিন্তিত ছিল। তারা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের ভারত ও হিন্দুদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তাদের দেশজ বাঙালী সংস্কৃতিকে হিন্দু ভাবাপন্ন্য সংস্কৃতি বলে বিশ্বাস করত/প্রপাগান্ডা চালাত। এমনকি তারা এদেশের বাঙালী মুসলমানদের হিন্দু ও কাফের এবং নিজেদের ইসলামের সেবক ও পাকিস্তানের রক্ষক মনে করত। এজন্য তারা সর্বদা ষড়যন্ত্র করেছে অবৈধ অগনতান্ত্রিক পন্থায় যেকোনভাবে বাঙালী মুসলমানদের ক্ষমতার বাইরে রাখার আর পাঞ্জাবী অভিজাত রাজনৈতিক/ সামরিক চক্রকে রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখার। এজন্য তারা প্রথমে পাকিস্তান মুসলিমলীগকে দিয়ে, এরপর তারা পশ্চিমপাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে/সামরিক শাসক চক্রকে সমর্থন-সহযোগীতা করে ক্ষমতা ধরে রাখার/ক্ষমতার অংশীদারীত্ব ভোগ করার জন্য ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা করেছে। এই সমস্ত কারণে পূর্ববাংলা/পূর্বপাকিস্তানের সংখ্যাগ রিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে চরম তিক্ততার অনুভূতি, নিরাপত্তাহীনতা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং তীব্র পাঞ্জাবী শাসকগোষ্ঠী ও পশ্চিমপাকিস্তান বিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি করে। তবে হাজার বৈষম্য সত্ত্বেও পূর্বপাকিস্তানে চট্রগ্রাম-রাজশাহী-জাহাঙ্গীরনগর তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য কলেজ ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করার ফলে সারা পূর্বপাকিস্তানের মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এরফলে একদিকে পূর্ববাংলায় বিকাশমান পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরো দ্রুত/অব্যাহত গতিতে বিকশিত হতে থাকে/বিকাশ লাভ করতে থাকে এবং সেই সাথে পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকাসহ চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা সকল বিভাগীয় শহরগুলো উন্নত ও সম্প্রসারিত হতে থাকে দ্রুত গতিতে। ৪৮-এ ঢাকায় মিঃ জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুকে যুক্তপাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ভাষনের বিরুদ্ধে, ৪৯-এ এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ভাবাদর্শপুষ্ট ও স্বার্থ রক্ষাকারী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে, ৫২-তে বাংলাভাষাকে যুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে, ৫৪-এর নির্বাচনে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ধারক যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে ও পশ্চিম পাকিস্তানের তাবেদার মুসলিমলীগকে এদেশের মাটিতে কবরস্থ করতে, ৫৬-তে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি কর্তন করে আওয়ামীলীগ নামকরণে ও একে পূর্বপাকিস্তানের বাঙ্গালীদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণতকরণে, ৫৮-তে সামরিক অভ্যুত্থান ও শাসনের প্রতিবাদে, ৬২-তে আইয়ুবের ধর্মাশ্রিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে, ৬৬-র ছয়দফা ভিত্তিক কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন, ৬৯-এর সামরিক শাসক আইয়ূব বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে, ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো সকল প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আন্দোলন ও বিপ্লবে পূর্ববাংলার বিকাশমান মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেতৃত্বদানকারী ও অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। তারা বাঙালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিজেদের প্রদেশকে নিজেদের হাতে শাসন করতে এবং সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করতে মরিয়া হয়ে পড়ে। সত্তুরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ তার ছয়দফাসহ ছাত্রসমাজের এগারদফা এজেন্ডার ভিত্তিতে এবং কোনপ্রকার কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রণয়ন করা হবে না অঙ্গীকার করে নির্বাচনে অংশগ্রহন করে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রতিবারের ন্যায় এবারও পশ্চিমপাকিস্তানের পাঞ্জাবী সামরিক শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক চক্র যেকোন পন্থায় বাঙালীদের দমন ও অধিকার বঞ্চিত করে শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে পড়ে, আলোচনার নামে সময় ক্ষেপনের এবং সামরিক অভিযানের গোপন প্রস্তুতির ষড়যন্ত্র শুরু করে। এরফলে পূর্বপাকিস্তানের হতাশাগ্রস্ত ও বিক্ষুদ্ধ বাঙালীরা যুক্তপাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবী তুলে ব্যাপক প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করে। এই দুই দশকের বিকাশমান ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী বাঙালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও ক্ষমতালিপ্সু পাঞ্জাবী অভিজাত শ্রেণির মধ্যকার ধারাবাহিক অব্যাহত বিরোধ, বিদ্বেষ, সন্দেহ, সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাক রাজনৈতিক ও সামরিক শাসক চক্রের নির্দেশে পাকহানাদার বাহিনী বাঙালীদের উপর জাতিগত হত্যা, নির্যাতন, লুন্ঠন, দমনাভিযান চালালে বাঙ্গালীরাও ২৬ মার্চ পূর্বপাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র বলে ঘোষনা করতে এবং পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্নক মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্নসমর্পন করলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম লাভ করে। হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এই নদীবিধৌত বাংলার অনার্য বাঙালী জনগোষ্ঠী এবং বাঙালী মুসলমানরা তাদের জন্য নিজস্ব আবাসভূমি ও রাষ্ট্র বাংলাদেশ অর্জন ও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ও সর্বোচ্চ অর্জন।

এই নতুন রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায়/রাজপাটে বাংলাদেশের নাগরিকরা তথা বাংলাদেশীরা কার্যত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানরা অধিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান যুগের বিকাশমান মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নিত হয়েছে। নিজস্ব আবাসভূমি এবং স্বাধীন রাষ্ট্র লাভের ফলে বিশেষ করে এদেশের বাঙালী মুসলমানদের সামনে সর্বক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবার, উন্নতি করার, সমৃদ্ধি অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ এসে পড়ে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা অর্জন করে। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ/ছয় দশকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক, ব্যবসা-শিল্প, রাজনীতি, প্রশাসন, কৃষি-ক্ষুদ্র শিল্প খাত, স্থল-রেল-নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ণ সর্বক্ষেত্রে যথেষ্ঠ/কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি, সাফল্য, উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, আরো করছে। সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ণে, অগ্রগতি, উন্নয়নে বাংলাদেশ সারা দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বল্প আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক বিরাট অংশ আজ আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জন করে আধুনিক অভিজাত, রুচিশীল উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশীরা আজ নির্বিঘ্নে দেশ-বিদেশের সর্বত্র, সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধির শীর্ষপানে পৌছাবার অফুরন্ত সুযোগ লাভ করেছে। দেশ ও দেশবাসী এগিয়ে যাচ্ছে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, মুক্তির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির এই অদম্য আকাঙ্ক্ষাই আমাদের পরাক্রমশালী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক, তাদের তাবেদার হিন্দু জমিদার-জোতদার, কলকাতার বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সর্বভারতীয় কংগ্রেস, পশ্চিমপাকিস্তান, তাদের তাবেদার মুসলিমলীগ, পাঞ্জাবী রাজনৈতিক- সামরিক শাসক চক্র, শক্তিশালী সশস্ত্র পাকহানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আন্দোলন, প্রতিরোধ সংগ্রাম, সশস্ত্র যুদ্ধ করতে উদ্দীপ্ত, দুঃসাহসী করে তুলেছিল। ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয় ও বাংলায় মুসলিম শাসনের পতন থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয় পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২১৪ বছরের পরাধীনতা, শোষন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে এদেশের সংগ্রামী ছাত্র-তরুন সমাজ, কৃষক শ্রেণি, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সাধারণ জনগণ আন্দোলন, সংগ্রাম এবং আত্নত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের ইসলামী মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখা, এদেশের ভূখন্ডভিত্তিক বাঙালী জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরা, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসার/প্রতিষ্ঠা, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, সর্বক্ষেত্রে সবার জন্য বাধাবন্ধনহীন সমষ্টিগত অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধির সুযোগ লাভই হচ্ছে আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মননভূমে রচিত, লালিত আজন্মের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মর্মার্থ/মূল নির্যাস। কারণ এই দেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির সর্বাত্নক স্বাতন্ত্র জাতিগত নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, আর্থ-রাজনৈতিক অস্তিত্ত্বের মর্যাদা সুরক্ষা, অধিকার আদায়/প্রতিষ্ঠা, উন্নতি/সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত, মুক্তি/স্বাধীনতা অর্জনের চেতনা/মূল্যবোধ ও স্বপ্নাকাঙ্ক্ষাকেই ধারন করেছিল আমাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার আন্দোলন, গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার অবিনাশী চেতনা। জয় বাংলা।

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK