সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Saturday, 24 Mar, 2018 11:43:49 am
No icon No icon No icon

মেয়েটি পুড়ে যাওয়ার আগে...


মেয়েটি পুড়ে যাওয়ার আগে...


সংহিতা দেব: ময়ূরী দে হত্যাকান্ড নিয়ে লেখার পর, নববিবাহিতার বিদগ্ধ পোড়া ছবি দেওয়ার পর অনেকেই আমাকে বলেছিলেন, "আপনারা মেয়েটি মরার আগে কোথায় থাকেন? " যদিও দায় আমার নয় দায় আপনারও নয়, আমরা ক্রোধে কষ্টে এইসব দায় একে অপরের দিকে ঠেলি। নিন আরো একটি দুর্গাপুরেরই ঘটনা বলছি, এবং পোড়ার আগেই বলছি। কোন্ সহৃদয় ব্যক্তি একটা পোড়া আটকাতে পারেন দেখি। শুকনো সান্তনা নয়, এগিয়ে এসে সুন্দর একটা জীবন কি আমরা দিতে পারি? পারিনা.....কারণ মেয়েটিকে গুছিয়ে হত্যা করে তার নিজেরই পরিবার। পাত্রচয়ন থেকে পণদান সব তার আপনজনদেরই অবদান।

ছোট্ট সোনালী কে তখন ঈশ্বর গড়ছেন নিজের ছাঁচে, মর্ত্যলোকে বিশ্বাস-দম্পতীর জীবনে ভয়ানক এক দুর্ঘটনা ঘটল। বিষধর একশাপের দংশনে জীবন বিপন্ন হল। মৃত্যু অবশম্ভাবী জেনে দিন গুনতে গিয়েও থেমে যেতে হল, মৃত্যু গ্রাস করল না তাকে। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় বাড়িতে মন্দির স্থাপিত হল। সদ্য গর্ভবতী হলেন মিসেস বিশ্বাস, মনে করলেন ঈশ্বর স্বয়ং তার গর্ভে এসেছেন। সংস্কারাচ্ছন্ন মনুষ্যজাতি আমরা। সব সময় বেস্টটা আমার জন্যই হাজির মনে করে নিই। কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ধরে রাখতে পারিনা "ইয়েস, বেস্টটাই হচ্ছে"। আশা রাখি সর্বোত্তম সুখ কোন এক দূরগত ভগবান আমায় দেবেন । দিলে কিন্তু টের পাইনা, ভরসাও নেই সেই ভগবানে যে তিনি অলরেডি দিয়েছেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টিকে আমারই তরে। অতঃপর কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন বিশ্বাস দম্পতী।

২২বছর আগের ঘটনা এটা। এখন ২২ বছরের তরুণী সোনালী। তার বাবা দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে উচ্চপদস্থ, মা শিক্ষিকা, দাদা প্রফেসর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে,বৌদি উচ্চতর শিক্ষায়রত, পেশায় শিক্ষিকা। সোনালীর বিদ্যাচর্চায় ত্রুটি রাখেন নি তারা। মিউজিক স্পেশালাইজেসন নিয়ে গ্রাজুয়েশন করেছে সে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিস্টান্সে ক্লাসিক্যাল মিউজিকে ডিগ্রী প্রাপ্ত হয়েছে। এছাড়াও বঙ্গীয়পরিষদ আর চন্ডিগড় বোর্ড থেকে আর্ট এন্ড ক্রাফট নিয়ে মাস্টার্স করেছে 
7th yrs এর কোর্সে। এত ভুমিকা করছি এর পরের ঘটনাটি বলব বলে।

এত কিছু পড়ার পর যখন সোনালী নিজের পায়ে দাঁড়াতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফর্ম তুলে আনছে বা ইন্টারভিউ উত্তীর্ণ হচ্ছে তখন তাকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না দূরের চাকরীতে । কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাড়ির মেয়ে এত দূরে যাবে না। চাকরী করার অনুমতি পাবে তখনই যখন কার্যক্ষেত্র বাড়ির আসেপাশে হবে। কারণ সে দূরে গেলে সংসার দেখবে কে ? বলে রাখি,তার উচ্চপদস্থ কলেজের শিক্ষক দাদা তার উচ্চশিক্ষিত বৌদিকে নিয়ে বাড়ির বাইরে নিজেদের পৃথক সংসার গড়েছেন দুজন সর্বক্ষণের কাজের দাসীকে সাথে নিয়ে। বিশ্বাস ফ্যামিলির থাকার জায়গা অনেক বড়, অনেকগুলো ঘর ফাঁকা থাকে কিন্তু তবু তারা নিজের বাড়িতে ফিরে আসে না। কারণ, মাথার উপর অসুস্থ মা, অবিবাহিত বোনের দায়ভার যদি নিতে হয় সেকারণেই। মাত্র ২২ বছরের সোনালীকে অসুস্থ মা, বয়স্ক বাবার সেবা ছাড়াও ঘরের আনাচ কানাচ পরিস্কার, রান্নাবাড়ি, সমস্তরকম গৃহকর্ম করতে হয়, কারন সে আর্ট-ক্রাফটে মাস্টার্স বা মিউজিকে গ্রাজুয়েট যতই হোক না কেন বিয়েই তার মোক্ষ প্রাপ্তি দেবে তাই আগে বাসনমাজা -কাপড়কাচা-ঘরঝাড়ায় তাকে নিপুন হতেই হবে, এবং নিয়মিত অভ্যেসে তা রাখতে হবে। সমস্ত করেও মেয়েটি ছোট্ট একটা প্রাইভেট ইউনিটে ড্রয়িং শেখায়, কারণ বড় হয়েছে হাত খরচের দায় তার। যখন সে সমস্ত সাংসারিক কর্ম সেরে রেওয়াজ করতে বসে,তার মা যিনি কিনা রিটায়ার্ড শিক্ষিকা, তিনি সিরিয়াল দেখায় অসুবিধে বলে তাকে রেওয়াজে বসতে বাধা দেন। অর্থাৎ এই যে সোনালীর গানের সার্টিফিকেট সব পাত্রপক্ষের মনোরঞ্জনের জন্যই ছিল, আজ সোনালী তা বুঝতে পারছে। তার দাদা, যে কিনা সমাজের এ-গ্রেট নাগরিক, তিনি প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এসে মাকে নোটিস দিয়ে যান "২২টা বছর তো হল, ঘর খালি কর, বোঝা মুক্ত হও, মেয়েকে বিদায় কর তারপর নাহয় আমরা ফিরব বাড়ি।" উচ্চশিক্ষিত একমাত্র পুত্রকে কাছে পেতে, আঁতিপাতি করে তারা সোনালীর পাত্র দেখছে অর্থাৎ ঘাড়ের বোঝা নামানোর চেষ্টায় আছে। মেয়ে সন্তান, যে নাকি ঈশ্বরের আশির্বাদে কোলে এসেছিল, সে ২২টা বছরে মা-বাবার বুকের টুকরো হতে পারেনি, ঘাড়ের বোঝা হয়েছে অনায়াসেই। এরপর আমরা বিচার করি পুড়ে মরা মেয়েটির স্বামীর আর শাশুড়ির? মাত্র এইটুকুই নয়, আরো যুক্তি আছে মেয়েকে চিতায় তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে। তার মা-বাবা- দাদার ভাষায় সে কুরূপা। তার গায়ের রঙ ময়লা, তার নাক চোখ মুখ হয়তো বা আকারে আয়তনে সেই মাপের নয়, যে মাপের হলে বিশ্বসুন্দরী তকমা পাওয়া যায়। যাদের রক্ত, মাংস, জিন-এ গঠন হয়েছে সোনালীর তারা নিজেরাই আলোচনা করে, "তোকে বিয়ে করতে হবে এই বয়সেই, কারন তুই দেখতে ভালো না,বয়স বাড়লে কচি মধুমাখা ভাবটা থাকবে না তখন কে বিয়ে করবে?" "টাকা পয়সা যত চায় দেবো,গাড়ি দেবো,পণ দেবো তবে তোকে লোভে পড়ে বিয়ে করতে আগ্রহী হবে।" প্রতিদিন সোনালী তার মাকে মিনতি করে বোঝায়, যেন বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে না দেয়, যেন পণ না দেয়, সেই টাকা যেন ওর সিকিউরিটির জন্য রাখে, সেই টাকা দিয়ে যেন ওকে ব্যবসা খুলে দেয়, তবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ও নিজের পছন্দে বিয়ে করতে পারে। আর প্রতিদিন মায়ের মৌনতা ওকে বুঝিয়ে দেয় চিতার উত্তাপ পেতে দেরী নেই ওর। কাহিণীতে ট্যুইস্ট ছিল আরো একটি ছোট্ট নাটক। কলেজে পড়তে এক একজনের সাথে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এই মেয়ে। বয়সে অনেকটা বড় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারী কর্মী সেই ছেলে জানার সুবাদে তড়িঘড়ি সোনালীর পরিবার পাত্রপক্ষের বাড়ি যায় এবং এলাহি কারবার দেখে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। যেহেতু নতুন প্রেমের সময়সীমা খুব বেশিদিন হয়নি,ছেলেটি সময় চায়। কিন্তু পাত্র হাত ছাড়া হওয়ার ভয়ে এত চাপ দিতে থাকে যে সেই পরিবার অপছন্দ করতে শুরু করে সোনালীকে আর পাত্রটি তিতিবিরক্ত করে রোজ অশান্তি, ঝগড়া ক্রমে মারধোর করতেও বাকী না রাখায় সোনালী শক্ত হাতে বেড়িয়ে আসে সেই রিলেশনশিপ থেকে। তারপর মহাধুমধামে সেই প্রেমিকের বিয়ে হয়ে যায় চোখের সামনেই। যুক্ত হয় আর এক কথার তীর প্রতিনিয়ত, " তুই সুপাত্র ধরে রাখতে পারলি না"......প্রতিদিন নিজের নিকটতম আশ্রয়, নিকটস্থ আত্মীয় মা-বাবার কাছে কথা শুনে যেতে হয় আজও সেই প্রেমিকপ্রবরকে ধরে বিয়ে করতে পারেনি বলে। এমতবস্থায় নানা সম্মন্ধ দেখতে দেখতে কিছু সুপাত্রের সন্ধানও আসে,যারা সুপ্রতিষ্ঠ ব্যাংগালোর ও চেন্নাইতে। তারা জানায় সোনালীর গান ও আর্টের গুণ নিয়ে বসে থাকতে হবেনা বিয়ের পর সেই সব শহরে।আরামসে জব পেয়ে যাবে, নেচে ওঠে সোনালির মন বিয়ের জন্য কিন্তু নাকচ করে দেয় তার মা বাবা দাদারা। কারন দূরে বিয়ে হলে, অসুস্থ মা ও বাবার দেখভাল সারাজীবন করবেটা কে?

সুতরাং মূল বক্তব্য হল, উচ্চশিক্ষিত মেয়ের তারা বিয়ে দেবেন প্রচূর যৌতুকের বিনিময়ে এবং নাগালের মধ্যে সেই মেয়ে যাতে থাকে তেমন কোন পাত্রকে কিনে নেবেন যাতে তাদেরই সেবায় লাগে। বিয়ের আগে বিনা পয়সার দাসী নিজের মেয়ে, বিয়ের পরেও সে গোলাম থাকবে পাত্র যেমনই হোক।

আমরা একটি মেয়ে পুড়ে যাবার পর তার বর শ্বশুরকুলের বিচার করি। ভেবে দেখিনা সমর্থ একটি মেয়েকে প্রতিদিন পোড়ার জন্য গুছিয়ে রেডি করছে তার নিজেরই পরিবার। মেয়ের সুখের জন্য বিশাল দান ধ্যান করছে সমাজকে দেখিয়ে, নিজেরই মেয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করে দেয় তার নিজেরই পরিবার। পুড়ে যাওয়া মেয়েটির কাঠকয়লার মত মুখশ্রী বুঝতে দেয়না আমাদের, তার রঙ কালো ছিল কিনা, বিয়ের আগে সেই কালো রঙের হিসেবে পাত্রনির্বাচন করে, দামদর হাঁকে তার নিজেরই পরিবার। এই মেয়েটিও পুড়তে চলল বছর কয়েকের মধ্যেই, ডাক ঢোল পিটিয়ে, চন্দনে-গয়নায় সুসজ্জিতা করে তাকে সতী বানানোর জন্য জন্মের পর থেকে গুছিয়ে তোলে তার নিজেরই পরিবার......... তার পিত্রালয়ই তার সতীঘাট এটা আমরা বুঝি কি ?

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK