রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Wednesday, 21 Mar, 2018 02:30:28 pm
No icon No icon No icon

অসীম সাহসী পৃথুলাকে বীরের মর্যাদা দেয়া হোক


অসীম সাহসী পৃথুলাকে বীরের মর্যাদা দেয়া হোক


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: বর্তমান/সমকালকে ছুয়ে যে সময়কাল ভূত/ভবিষ্যতকালকে স্পর্শ ও প্রভাবিত করে তাকে মহাকাল বলে। বিশ্বের বিখ্যাত ও প্রতিভাবানরা সবাই তাদের স্ব স্ব অবিস্মরণীয় কর্ম/কৃতিত্ব/অবদানের জন্য নিজ নিজ সমকালকে জয় করে মহাকালকে স্পর্শ ও জয় করতে পেরেছেন বলেই তারা কেবল স্বদেশে/স্বজাতির কাছে সফল/বিখ্যাত/অনুকরণীয় নন, যুগ যুগান্তর ধরে দেশ/বিদেশের মানুষের কাছে স্ব স্ব অবিস্মরণীয় কাজ/কৃতিত্ব/অবদানের জন্য অনুকরণীয় ও আদর্শ হিসাবে গণ্য/সম্মানিত/স্মরণীয় হন। তেমনি যে মানুষ কোন স্থানে কোন ভয়াবহ সমস্যা/পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে, ধৈর্য্য ধরে, সাহস করে যেকোন প্রতিকূল পরিস্থিতি/বিপদ/সমস্যাকে মোকাবেলা করে/ভয়কে জয় করে/সমস্যাকে সমাধান করে/বিপদ/সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আবার নির্দ্বিধায়/প্রয়োজনে নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজের পরিবার/পরিজন/বন্ধু/অন্যের মান, জীবন, সম্পদ বাঁচাতে নিজের প্রাণকেও বিপন্ন্য/আত্নসর্গ করতে পারে তিনি নিঃসন্দেহে রণাঙ্গনের অকুতভয় বীর যোদ্ধাদেরই সমগোত্রীয় এবং তাদের তুলনা করা চলে একমাত্র সেই বীর যোদ্ধাদের সাথেই। সেই উনিশ শতকের সত্তরে ঢাকার রাজপথে হাজার হাজার সাহসী প্রতিবাদী স্বাধীনতাকামী ছাত্রী/তরুনী রাজপথে নেমে এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবীতে আন্দোলন করেছিল ছাত্র/পুরুষ আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি। একইভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণেও হাজার হাজার পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত শত নারীও দেশ-মাতৃকার টানে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের পরিবার/পরিজন/ভবিষ্যত/জীবনের মায়া/সর্বপ্রকার ভয়/মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অসীম সাহসের সাথে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র/বোমা হাতে যুদ্ধ করেছে, এমন কি অনেকক্ষেত্রে নিতান্ত দেশি দা/কুড়াল/লাঠি দিয়েও পাকিস্তানী সৈন্যদের উপর আক্রমন করেছে, তাদের হত্যা করেছে, নিজেরাও অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীকে এবং দুর্গত মানুষকে নিজ নিজ সাধ্যমত নানাভাবে সাহায্য/সহায়তা করেছে। সেই নাম জানা/অজানা দেশপ্রেমিক বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও আত্নত্যাগ ইতিহাসের পাতায় ঠাই নিয়েছে। আর তাদের মধ্যে কয়েকজন জীবীত সৌভাগ্যবতী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং বীরের মর্যাদা লাভ করেছে। তারা সবাই বাংলাদেশের নারী জাগড়ণের এবং মুক্তির অগ্রদূত, আইকন। ১২/০৩/২০১৮ সোমবার তারিখে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে (বিএস-২১১) ফ্লাইটটি নেপালের কাঠমন্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেয়। সেখানে দুপুর ০২:২০ মিনিটে বাংলাদেশ থেকে আগত উক্ত ফ্লাইটটির ল্যান্ডিং গিয়ার রানওয়েতের ভূমি স্পর্শ করার সাথে সাথেই রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ে পাশের ফুটবল খেলার মাঠে। এ সময় বিমানের সামনের সব কাঁচ ও দুইপাশের জানালার কাঁচগুলোও ভেঙ্গে যায়, সেই ফুটবল মাঠে বিধবস্ত হয়ে তাতে আগুন লেগে যায়। এ সময় অনেকেই নিহত/আহত হয়ে পড়েন, যে যার মত করে বিমান থেকে বের হবার আপ্রাণ চেষ্টা করেন/করেছেন। বিমানটিতে যাত্রী ছিল ৬৭ জন। ৩২ জন বাংলাদেশী, ৩৩ জন নেপালী, ১ জন চাইনিজ ও ১ জন মালদ্বীপান ছিলেন। এছাড়া বিমানের ৪ জন ক্রু ছিলেন। এই দুর্ঘটনায় ৫১ জন নিহত হন/হয়েছেন তখন/পরে। তার মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশী। এতে ২২ জন বাংলাদেশী যাত্রীসহ ৪ জন ক্রুই নিহত হন। ১৯ মার্চ কাঠমন্ডুস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে সকালে পরিচয় সনাক্তকারী নিহত ২৩ জনের ধর্মীয় মোতাবেক গোসল করানো, কাফন পড়ানোর পর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কার্গো বিমানে করে ২৩ জনের লাশ কফিনে করে নিয়ে আসা হয়। বাকী ৩ জনের লাশ আনা হবে ডিএনএ টেস্ট ও শনাক্তকরণের পর। এরপর কফিনগুলোকে আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। তাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আসা প্রতিনিধিগণ কফিনগুলোতে পুষ্পরাজি অর্পণ করে ও শোকবার্তা জানায়। সেখানে বিকালে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবার পর পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকের নাম উল্লেখ/ঘোষনা করে তাদের নিজ নিজ পরিবার/পরিজনদের কাছে/হাতে কফিনগুলো বুঝিয়ে দেয়া/হস্তান্তর করা হয়। আর সবার মত নিহত কো-পাইলট পৃথুলার পরিবার/পরিজনও এসেছিল কফিনে ভরা পৃথুলার নিথর দেহকে নিয়ে যেতে। পৃথুলার কফিন নিতে এসেছিল ওর মা, নানু, ছোট খালা, বান্ধবী পাইলট সামিয়া, দূর সম্পর্কের এক নানা। বার বার 'মা ও মা' বলে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন পৃথুলার মা রাফেজা বেগম।

তাকে সান্তনা দিতে গিয়ে পৃথুলার বন্ধু পাইলট সামিয়াও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। পৃথুলার নাম ধরে কফিন নিতে আসার আহবান করলে তারা সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এরপর শ্যামলীতে তৃতীয় নামাজে জানাজার পর পৃথুলাকে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত কো-পাইলট পৃথুলার বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় সুশিক্ষিত, সাহসী পাইলট, প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য অকালেই তাকে এই পৃথিবী ও পরিবারের মায়া ছিন্ন করে পরপারে চলে যেতে হোল। বিমান দুর্ঘটনার পর আগুনের লেলিহান, ধোয়ায় আচ্ছন্ন বিমানের কো-পাইলট পৃথুলা রশিদ নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, মৃত্যুর হাতছানিকে আগ্রাহ্য করে নিজের সাহস, বুদ্ধি, প্রচেষ্টা দিয়ে সাধ্যমত যাত্রীদের বাঁচাবার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় থাকাবস্থায় বীরের মত মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করেছেন। যেন একটি সুন্দর স্বপ্নের/আদর্শের অপমৃত্যু। একটি সুন্দর উড়ন্ত প্রজাপতির আত্নাহুতি। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১০ জন মানুষ, যাদের সবাই নেপালী যাত্রী নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পান, প্রাণে বাঁচেন। সেই সৌভাগ্যবান জীবীত নেপালী যাত্রীরা সবাই সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পৃথুলার বীরোচিত ভূমিকার কথা বলেছেন/বর্ননা দিয়েছেন দেশ/বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে কৃতজ্ঞতার সাথে। সারা নেপালের গণমাধ্যম সম্মানের সাথে পৃথুলাকে 'ডটার অব বাংলাদেশ' বলে আখ্যায়িত করেছে। প্লেনের বিপদাপন্ন্য অসহায় যাত্রীদের বাঁচাতে গিয়ে বীরের মত পৃথুলার আত্নত্যাগ তাকে, তার পরিবার, দেশ, জাতি, নারী সমাজকে বিশ্ব দরবারে গৌরবান্বিত করেছেন। এদেশ ও জাতি ধন্য এ যুগেও পৃথুলার মত এত দুঃসাহসী নিঃস্বার্থ আত্নত্যাগী বীর কন্যাকে পেয়ে। বীরের মর্যাদাই পৃথুলার একমাত্র যর্থার্ত প্রাপ্য। তাই পৃথুলাকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ও পদকে ভূষিত করা হোক এবং একই সাথে তার পরিবারকে সরকারীভাবে সর্বাত্নক সহায়তা দেয়া হোক। পৃথুলাকে রাষ্ট্র ও সরকার তার বীরোচিত ভূমিকা, অবদান ও আত্নত্যাগের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিলে আগামীতে অন্যরাও তার মত দেশ, জাতি, মানবতার টানে অন্যের সম্মান, জীবন, সম্পদ বাঁচাতে নিজের জীবন বাজী রাখতে এবং নির্দ্বিধায় প্রাণ উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত হবে/কার্পণ্যবোধ করবে না। পৃথুলা তোমার জন্য সারা দেশবাসীর ভালবাসা, শ্রদ্ধা রইল। তারা তোমার বীরোচিত সাহস ও ভূমিকার জন্য গর্বিত। তোমার আত্না শান্তি পাক। আল্লাহ তোমাকে জান্নাত দান করুন। আমিন।

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK