বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮
Saturday, 10 Mar, 2018 12:00:08 pm
No icon No icon No icon

পরলৌকিক


পরলৌকিক

 বিদ্যুৎ ভৌমিক: বাড়িটার সামনে ভীষণ ভিড় , লোকে-লোকারণ্য । রাত তখন রাত নয় , যাকে বলে ভোর রাত ।  একটা এম্বুলেন্স এসে দাঁড়ালো দত্তদের গ্রিলের গেটটার সামনে  । ওটা যেন অনেককাল নির্ঘুম , শুধু ছুটে-ছুটে ক্লান্ত বিষণ্ণ ! বাড়ির ভেতর থেকে চার-পাঁচজন ভোররাতে  চারপাশের অন্ধকার মেখে এগিয়ে এলো । তখন ট্রান্সফরমার ফেল করেছে , তাই লোডশেডিং ! ভোর  সাড়ে তিনটের সময়ে এতো নিকষকালো অন্ধকার যে কাঊকে চেনা যাচ্ছেনা । এম্বুলেন্স থেকে দুজন বেরিয়ে এসে দত্তদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো । বিড়ি-সিগারেটের উল্কাতে চার-পাঁচজনের মুখগুলো অদ্ভুত ঠেকছিল । কি হয়েছে , সেটা তখনো জানা যায়নি ! তবে কিছু একটা-যে হয়েছে , সেটা অনুমান করা যাচ্ছে । এমনিতেই দত্তরা একটু চুপচাপ , খুব একটা কারোর সঙ্গে এলামেশা ওদের নেই বলা যায় । প্রায় ১২-কি ১৩ বছর হবে এ বাড়ির গৃহকর্তা মৃত্যুঞ্জয় বাবু মারা গেছেন । স্ত্রী আরতিদেবী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর একেবারে একলা হয়ে পড়েছেন । তিন পুত্র ও তাঁদের স্ত্রীরা কে কতটা ওনার খেয়াল রাখেন , সেটাই চিন্তার কারণ ! আসলে তাদরে মায়ের এখন এমন পরিস্থিতি যে মা-ও ভাগ হয়ে গেছে ! প্রত্য ছেলেরা এখন  প্রতিষ্ঠিত , নিজেদের বৌ-ছেলে মেয়েদের নিয়ে মেতে থাকেন । মায়ের প্রতি অবহেলা দিন কে দিন হয়ে চলেছে ! আসলে মার কাছ থেকে যে সব কিছু নেওয়া হয়ে গেছে । মা এখন বাতিলের দলে ! মা যেন ফুরিয়ে গেছে !                                                            কিছুদিন ধরে আরতি দেবীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না । রাত হ'লেই বুকের ভেতরটা অসম্ভব যন্ত্রণা হয় ! ছেলেদের ব'লে-ব'লে মুখে থুতু উঠে গেছে ! একমাত্র মন্দের ভালো মেজ রত্নটি । ভালো হবার কারণ , আরতি দেবীর মধ্যম সন্তানটি    একটা বেসরকারি অফিসের পিয়নের চাকরি করে । অভাবের সংসারে-ও  ছেলেটার  মনটা  ফুলের মতো সুন্দর আর আগুনের  পবিত্র । গতবছর শীতের দিকে ওর মায়ের চোখের ছানি অপরেশন করে ছিল ছেলেটা । বড় ও ছোট এবং তাদের শ্রীমতীরা সেটা নিয়ে হাসাহাসি করেছিল ! মা'-নামক একজন যে এই একই বাড়িতে আছে , সেটা ওরা ভুলেই গেছে ! এক কথায় ভুলতে বসেছে ! আরতি দেবী মেজ সন্তানের কাছে বরাবর-ই থাকতেন । অবশেষে ওইদিন ভোররাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেলেন ! ডাক্তার ডাকার সময় টুকু দিলেন না ! আরতি দেবী ছবি হয়ে দেয়ালে ঝুলে গেলেন ! ওনার বড় ও ছোট পুত্র প্রচুর  লোকজন , পাড়া পড়শি , আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে মা'-এর হাই প্রোফাইল শ্রাদ্ধ করেছিল ! লোক দেখানো মা'-এর  শ্রাদ্ধ হল ! কিন্তু মায়ের আত্মার শান্তি কি হল ? সেটাই প্রশ্ন !                                                                                                    ইদানীং সুপ্রিয়-র রাত হলেই মনে হয় বাড়িটার চারপাশে যেন কে হেঁটে-চোলে বেড়াচ্ছে ! সুপ্রিয় হলেন আরতি দেবীর  সেই অল্প পয়সার বেতনের চাকরি করা  মেজ সন্তান । স্ত্রী  নবীনা-কে সুপ্রিয় রোজ রাতের ঘটনা সকালে অফিস যাবার আগে বলেন , কিন্তু নবীনা স্বামীর ওই সব আজগুবি ভুতুড়ে কথায় কান দেন না , বরং সুপ্রিয়-কে বলেন ; এই সব ভাবনা ছেড়ে অন্য চিন্তা করো যাতে সংসারটার উন্নতি হয় ' । এই ভাবে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে দুলছিল ওদের সময় ! হঠাৎ গত পরশুর রাতে নবীনা বাথরুম করতে গিয়ে সিঁড়ির কাছে শুনতে পেলেন কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে ! সিঁড়ির চারপাশটা বেশ আবছা অন্ধকার ছিল ! এতো রাতে কে ডাকবে ! মনে মনে চিন্তা করেও উত্তর সে পাচ্ছিলনা ! অকস্মাৎ নবীনা দেখল , একজন বৃদ্ধা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ! নবীনা নিজের চোখ-কে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না , কানকেও না ! অথচ আধো আলো-ছায়ার মধ্যে স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করল একজন বয়স্ক বৃদ্ধা মহিলা তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ! এতো রাতে বাড়ির গেট খুলে এই মহিলা কি করে বাড়ির ভেতরে ঢুকল , তাছাড়া এ বাড়ির গেটে -তো রাত দশটার পর তালা পড়ে যায় ! তাহলে উনি কি করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন ? নবীনার চোখে-মুখে ও মনে হাজার চিন্তার জট পাকাচ্ছিল ! ভুত-প্রেত কিম্বা অশরীরী আত্মা '- এ সব সে ছোট থেকেই বিশ্বাস করত না । কেউ এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে নবীনা তার যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে ওদের  আলোচনার  বিষয় বস্তু-কে ধরাশায়ী করে দিত । কিন্তু গত পরশু-র রাতে ওর কি মতিভ্রম হয়েছিল ! চারপাশের অন্ধকার ঠেলে ঝিঝি পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছিল , আর থেকে থেকে হেমন্তের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস নবীনার মন-প্রাণ-শরীর-কে শীতল করে তুলছিল !  কি যে ঘটতে চলেছে , সেটা অনুধাবন করার মতো  শক্তি নবীনা যেন হারিয়ে সেই মুহূর্তে হারিয়ে ফেলছিল ! কি করবে , সেটা সে বুঝতে পারছিল না ! এক দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে ছিল ওই মহিলার দিকে ! রাত তখন কটা , কে জানে ! সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল ! হঠাৎ এক চেনা কণ্ঠস্বরে নবীনা সম্বিৎ ফিরে পেল ! বৌমা , আমি তোমার অভাগা শাশুড়ি ! এই অসময়ে আমাকে সামনে দেখে ভয় পেওনা ! আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না ! কিছুদিন ধরে মনে মনে ভাবছি তোমার সাথে কথা বলব , কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠছিল না ! আজ হঠাৎ করে আমার  সেই সুযোগটা এসে গেল ! জানো বৌমা , তোমার স্বামী অর্থাৎ আমার মেজ ছেলে সুপ্রিয়-র চিন্তায়~চিন্তায় আমি মরেও শান্তি পাচ্ছি না । ছেলেটার রোজগারের  সামান্য কটা টাকা দিয়ে তুমি কি সুন্দর বুদ্ধি করে সংসারটা-কে  সাজিয়ে গুছিয়ে তুলেছ দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি ! এটা বৌমা একমাত্র তোমার জন্যেই সম্ভব হয়েছে ! তবে ছেলেটার ওই কটা টাকায় কি আগামী দিনগুলো চলবে , তুমিই বলো ? যাই হোক বৌমা  একটা গোপন কথা আজ তোমায় বলছি , তুমি আবার পাঁচ কান করোনা । তোমার শ্বশুর মশাই যখন বেঁচে ছিলেন তখন সুপ্রিয়-র কথা ভেবে আমাকে ওর ভবিষ্যৎ-এর চিন্তা করে বেশ কিছু টাকা আর আমার পুরনো সোনার গহনা আমাকে উনি আমার কাছে  গচ্ছিত রেখে চোখ বুজেছেন ! মরার আগে আমাকে বলে গিয়ে ছিলেন , বৌমা তোমার বুদ্ধিমতী ওর হাতে আমার জমানো অর্থ ও সোনাদানা দিয়ে তবেই তুমি মরবে । তোমার শ্বশুরের কথা আমি রাখতে পারিনি , তার আগেই মরেছি ! শোনো মন দিয়ে বৌমা , আমার শোবার ঘরের বিছানার মধ্যে যে মস্ত একটা পাশ বালিশ আছে তার ভেতরে-ই আছে তোমার শ্বশুরের লোকানো সুপ্রিয়-র জন্য টাকা আর সোনাদানা ! ওগুলো নিয়ে তুমি আম্মাকে মুক্তি দাও বৌমা ' ! সেদিনের সেই অদ্ভুতুড়ে ঘটনার পর নবীনা ও সুপ্রিয়-র সাংসারিক জীবন মধুময় হয়ে ওঠে । এরপর থেকে নবীনা আর কোনদিন ওর শাশুড়ি-কে দেখতে পায় নি , এমনকি সুপ্রিয় রাত হলেই কখনো শুনতে পেত না বাড়িটার চারপাশে কেউ হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে !       

*************  বিদ্যুৎ ভৌমিক                                                                                                               

৬৫/১৭ , ফিরিঙ্গী ডাঙা রোড , মল্লিকপাড়া , শ্রীরামপুর , হুগলী , পিন- ৭১২২০৩                     

পশ্চিমবঙ্গ , ভারতবর্ষ , ( মোবাইল নং ৮৬৯৭৯৪১৪৪৯ )                                                      

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK