মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৮
Sunday, 14 Jan, 2018 03:14:48 pm
No icon No icon No icon

এক সময় ভাংতো নদী, এখন ভাঙ্গে সংসার


এক সময় ভাংতো নদী, এখন ভাঙ্গে সংসার


আলম রায়হান: এক সময় নদী ভাংতো। বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের পানি আগ্রাসন এবং আমাদের মুর্খ প্রবনতা ও দখল প্রক্রিয়ায় অনেক নদীই এখন খাল; অতপর ড্রেন। থেমে যাচ্ছে পানি প্রবাহ; নদীর আর ভাংবেটা কি! কিন্তু তাই বলে তো ভাঙ্গন প্রক্রিয়া থেমে খাকতে পারে না। এ জন্য হয়তো এখন ভাংছে সংসার। এর পিছনেও রয়েছে ভারতের সাংস্কৃতির আগ্রাসন এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের প্রভাবে পরিবর্তিত জীবন ধারা।
সামরিক শাসকরা ক্ষতা টিকিয়ে রাখার জন্য যে চামচা বাহিনী তৈরী করেছেন তাদের দৃষ্টাতের কারণে ম্নাুয়ের চাহিদা বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।চার দিকে কেবল চওয়ার দল! এর সেঙ্গে আকাশ সংস্কৃতির নামে যুক্ত হয়েছে অপসংস্কৃতি। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো ভারতে না দেখা গেলেও তাদেরগুলো আমাদের দেশে অবাধে দেখা যায়। আর এগুলোর কতিপয় সিরিয়াল সংসার ভাঙ্গার মহা দাওয়াই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপিত জীবনে বাউন্ডারী ছাড়া লোভ এবং নারী-পুরুষ সমান অধিকারের জিকির, কেউ কাউকে সহ্য করতে চায় না; মান্য করা তো অনেক দূরের বিষয়। এখন প্রায় পানি শূন্য নদী ভাঙ্গন রূপান্তরিত হয়েছে লোভে ভরপুর সংসার ভাঙ্গনে।
মধ্যরাতে টেলিভিশনের বেফজুল টকশোর মতো এতোসব কথা বলার উদ্দেশ্য একেবারে ব্যক্তিগত। আর তা হচ্ছে, আমার সংসার জীবন। এখনকার সময়ে সংসার না ভাঙ্গাটাই বড় খবর। আমার সংসার এখানা ভাঙ্গেনি, ভাঙ্গার সুযোগও নেই আর। স্বভাবগত কারণে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো তাৎক্ষনিকভবে বলার প্রবনতা এবং মগজ দিয়ে বিচার না করে হৃদয় দিয়ে পরিচালিত হবার কারণে পেশাগত জীবনে তো বহুবার ভাঙ্গনের কবলে পড়েছি। স্বভাবের এই দিকটার প্রভাবতো সংসার জীবনেও পড়েছে। কিন্তু সংসার ভাঙ্গেনি। সংসার না ভাঙ্গার পিছনে প্রধান কারণ হয়তো বিয়ের ব্যাপারে পারিবারিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়া এবং অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্তমানকে একমাত্র গুরুত্বপূর্ন বিবেচনা না করা। এবং সবার উপরে, দাম্পত্য জীবনের পারস্পরিক বিশ্বাসের স্থানটি সচতেনভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করা। বলে রাখা ভালো, আমার স্ত্রীকে সাধারণভাবে সহজ সরল মনে হলেও দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন ব্যবস্থাপনার জটিল অংকে খুবই দক্ষ। অন্য কারো সঙ্গে পড়লে আমার সংসার টিকতো কিনা তাতো আর বলা যাবে না, কারণ এক হাতে তালি না বাজলেও একজনের কারণে সংসার ভাংতে পারে। কিন্তু আমার স্ত্রী অন্য কারো সঙ্গে পড়লেও তার সংসার ভাংতো না, এ কথা নিশ্চিভাবে বলা যায়। যেমন ভাঙ্গেনি আমার সঙ্গে ।
বিয়ের ব্যাপারে কি কারণেই যেনো আমার এক রকম গাছাড়া ভাব ছিলো। এর কারণ একাধিক। হয়তো প্রধান ছিলো, ‘বিয়ে করে খাওয়াবো কি- সার্বজনীন দুর্গা পুজার মতো সার্বজনীন এই আতংক। সব মিলিয়ে বিয়ের ব্যাপারে আমার দিক থেকে কোনো আগ্রহ ছিলো না। এদিকে আমি সংসারের বড় ছেলে, তার উপর বিয়ের বয়স গোধুলী বেলায় এসে ঠেকেছে। সেই ধারা চলতে থাকলে হয়তো রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের মতো লগ্ন পেরিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি আমার কেয়ারিং বাবার কারণে। আচ্ছা, মুজিবুল হককে দাদার বয়সে এসে ঘটা করে বর সাজতে হলো কেন, যুবক বষসে তার বাবা কি বেঁচে ছিলেন না?
থাক মন্ত্রীর কথা। আমার নিজের কথা বলি। ছেলের মতামতের উপর ভরসা করে ‘আর সময় নষ্ট করা যায় না- এই ’ সিদ্ধান্তে উপনিত হইয়া’ বাবার নেতৃত্বে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনরা নেমে পড়লেন পাত্রী সন্ধানে। হারানো গরু খোজার মতো!এদিকে আমি ছিলাম আমার তালে। আমার ধারণা ছিলো, বাবার বিবেচনা, মায়ের পছন্দ এবং ভাইদের মূল্যায়ন এক সরল রেখায় আসবে না এবং আমাকে সহসা বিয়ের ঝামেলায় পড়তে হবে না, অন্তত আরো কিছু সময় পাওয়া যাবে। যে কারণে বিয়ের কন্যা দেখার কোন আগ্রহ আমার ছিলো না। এবং ২৯ বছর বয়সে বর সেজে তুলে আনার আনুষ্ঠানিতার আগে বৌ দেখিওনি। আর দেখলেও যে খুব একটা তফাত হতো তো মনে হয় না। কারণ, অন্যের বিয়ের জন্য যতবার কন্যা দেখতে গেছি তার সবটাতেই পক্ষে ভোট দিয়েছি। যে কারণে আমার ছেলের ঘোষণা হচ্ছে, তার বিয়ের জন্য কনে দেখতে যাবার সময় আমাকে নেয়া হবে না; আর নেয়া হলেও আমার ভোটিং পওয়ার থাকবে না। বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছে তার মায়ের উপর। কিন্তু তার মা দারিদ্র বিমোচনের বাসনায় ছেলের দিকে যে পরিমান ঝুকে পড়েছে তাতে সহসা তার কপালে বিয়ে জুটবে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আমার বিয়ে যখন প্রায় ঠিক হয়েগেলো তখন আমাকে কনে দেখতে বলা হলো। সংসদে ‘হ্যা ভোট’দেয়ার মতো আয়োজন। তখন ভাবলাম, কষ্টকরে নিজের দেখাদেখির আর কি আছে, পরিবারের সবাইতো দেখেছে। কিন্তু তখনতো আর খেয়াল করিনি, আমার বাবার সিদ্ধান্তের কাছে আর সকলকে জাতীয় সংসদের মতো ‘হ্যা ভোট’দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার উপায় নেই। তখন যদি খেয়াল করতাম, বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় আমি নিজেইতো কিঞ্চিত তোতলাই; সেখানে আমার ভাই, মা আর স্বজনরা কতটুকু কি মতামত দিতে পারবেন। অতএব বিয়ে হয়েগেলা সামন্তবাদী মানসিকতার বাবার একক সিদ্ধান্তে। তিনি শুধু কন্যাকে গুরুত্ব দেননি; প্রাধান্য দিয়েছেন বংশ ধারাকে। সম্ভবত এতা ভাঙ্গনের মধ্যেও আমার সংসার টিকে থাকার এটিও একটি বড় কারণ।
ব্যক্তিগত জীবনে দারিদ্র ও পেশাগত জীবনে অঘটন যেমন পিছু ছাড়েনি, তেমনই এখনো আমাকে ছাড়েননি আমার স্ত্রী। দারিদ্র নিয়ে তার কষ্ট থাকলেও ‘মানিা-মানবো’ ধরনের অভিযোগ আছে বলে মনে হয় না। লাগাতার দারিদ্রের মধ্যে থাকলেও আমার স্ত্রী কয়েক দিন আগে বললেন, আমরা আগের চেয়ে ভালো আছি। আমি বললাম, কি ভাবে? তিনি বললেন, আগে তুমি একলা ইনকাম করতা, এখন ছেলেও ইনকাম করে। আমার বুঝতে আর বাকি রইলো না, দারিদ্র বিমোচনের বিষয়ে আমার উপর ভরসার পালায় ইতিটেনে সে এখন ছেলের দিকে ঝুকেছে। আমার সংসার টিকে থাকার এটিও হয়তো একটি কারণ। অনেক স্ত্রী আছেন, স্বামীর দারিদ্রের নিষ্পেষণ থেকে মুক্তির জন্য স্বামীর সমকক্ষ কারো দিকে ঝোকেন। আর মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মানসিকতার যুগে এখন তো আর কেবল দারিদ্র থেকে মুক্তির বাসনা নয়, কত রকম বাসনাই তো থাকে! কাজেই নদীর চেয়েও ভয়ানকভাবে ভাংছে সংসার। বিপন্ন হচ্ছে সমাজ।
এতো ভাঙ্গনের মধ্যে দাড়িয়ে থেকে আমাদের বিবাহিত জীবনের বয়স কবে ২৫ বছর কবে হবে সে ব্যাপারে একটি আগ্রহ আমার ছিলো প্রচন্ডভাবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বছর দুই ধরে প্রায়ই আলোচনা করছিলাম। এনিয়ে অনেক বেশী আলোচনা হয়েছে। বেশী করলে যা হয়, তেমন একটি ভুল হয়ে গেছে আমাদের ক্ষেত্রেও। দুই বছর ধরে আলোচনা করে আসছি, এবারের ৩০ নভেম্বর আমাদের বিয়ের ২৫ বছর পূর্তি হবে। এ হিসেবে এবার সীমিত আয়োজন। দুজনের উপহার বিনিময় হলো, ছেলেও দিলো আমাদের দুজনকে। অন্যকথা বলে ছেলেকেও কিছু নগদ ধরিয়ে দিলাম। কিন্তু গোল বাধলো কেক অর্ডার দেয়া নিয়ে। এ বিষয়টি কিভাবে উপস্থাপন করবো তা নিয়ে সংকোচ হচ্ছিলো। সংকট কেটেগেলো ছেলের কারণে। সে তার মাকে কেকের অর্ডার দেবার প্রস্তাব দেয়ায় আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘তোমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে, কেকের জন্য আর খরচ করতে হবে না; আমিই দেই।” আগেই কেকের অর্ডার দেবার বিষয়টি চেপে গেলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। সম্ভবত কথার ধরণ দেখে আমার উকিল ছেলের সন্দেহ হয়েছে। আমার নিত্যদিনের কাগজপত্রের মধ্যে কেকের অর্ডারের কাগজটি সে ঠিকই খুজে বের করেছে এবং তার মাকে দেখিয়ে বলেছে, ‘দেখেছো, তোমার স্বামী আগেই কেকের অর্ডার দিয়ে রেখেছে।”
অতি সীমিত আয়োজন এবং সীমাহীন পারিবারিক আনন্দের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে যখন সম্ভাব্য গেষ্ট লিষ্ট করার পালা চলছে তখন বছর হিসেব করার খেয়াল চাপলো। কুষ্টিনামা বিচারের মতো কাগজ-কলমে হিসেব করে দেখাগেলো, ২৫ বছরতো পূর্তি হয়নি, হয়েছে ২৪ বছর পূর্তি। আমি স্ত্রীকে বললাম, রুমু ২৫ বছর পূর্তি তো হয়নি, অনুষ্ঠান বাদ! সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রী বললেন, ‘টেলিভিশনে দেখ না, বর্ষ পূর্তির পরিবর্তে বর্ষে পদার্পন অনুষ্ঠান করে- আমরাও সেভাবে করবো।” নাটকের ডায়লগের মতো সে সঙ্গে সঙ্গে এ কথা বললো কিভাবে! তা হলে কি সে আগেই হিসেব করে চুপচাপ ছিলো? আমার এই স্ত্রীকে তার পরিচিতজনরা চেনেন সোজা-সরল লোক হিসেবে! এই হচ্ছে ‘সোজার’ নমুনা। এই মহিলার সংসার ভাঙ্গা কি অত সহজ!
নির্ধারিত দিনে কেক কাটা হলো। অতি ঘনিষ্ঠজনরা উপস্থিত ছিলেন, এদের মধ্যে সক্রিয় ছিলো ২৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান। বর্তমান সময়ে অনেকেরই এই বয়সের ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার মৃত্যু সংবাদ নিয়েও নির্লিপ্ত থাকে। সাংবাদিক রশিদ আল আমিনের ভাষায়, একদিন হয়তো বাবার লাশের পাশে দাড়িয়ে সেলফি দেয়ার যুগ আসবে। অবৈধ মাদকের ছোবল আমাদের সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে- ভাবলে অন্ধকার দেখি। একই সঙ্গে আমার ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। বলে রাখা ভালো, সন্তান নিয়ে এই প্রশান্তি অর্জিত। ভাঙ্গনের আগ্রাসন থেকে বিবাহিত জীবন রক্ষা করা যেমন, তেমনই সন্তান রক্ষায় মা-বাবা হিসেবেও নাজিউর রহমান মঞ্জুরের মতো সতর্ক থাকা জরুরী। তা না হলে সংসার ভাঙ্গে, বখে যায় সন্তান; এদের মধ্যে অনেকে হয় ঐশী, নিদেন পক্ষে ইয়াবা তমাল!

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK