রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮
Thursday, 11 Jan, 2018 12:46:15 am
No icon No icon No icon

আমরা নারীরাই পারি


আমরা নারীরাই পারি


জেসমিন চৌধুরী : ছোটবেলা মাকে নিয়ে রচনা লেখার সময় বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য নেপোলিয়নের কোটেশন দিতাম, ‘গিভ মি আ গুড মাদার অ্যান্ড আই ইউল গিভ ইউ আ গুড ন্যাশন’। বড় হয়ে ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ জাতীয় কথা্র সাথে নেপোলিয়নের এই কথাটিও আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হতে শুরু করেছিল। কেন নারীর উপরেই থাকবে সংসারকে সুখী করার দায়িত্ব, ভালো জাতি গড়ার গুরুভার? কিন্তু ইদানিং আবার আমার মনে হচ্ছে নারী উন্নয়নের খাতিরেই নারীকে এই গুরুভার নিতে হবে। কেন একথা বলছি ব্যাখ্যা করতে হলে অনেক কিছুই বলতে হয়। যৌন নির্যাতন নিয়ে আমার একটা লেখা প্রকাশিত হবার পর আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন অনেকেই যারা শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। তারা কেন আমাকে বা আমার মত অন্যান্য লেখকদের বার্তা পাঠান? তারা কী বলতে চান? তারা নিজের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা কাউকে চুপিচুপিও কখনো বলতে পারেননি, আমাদের মত প্রকাশ্যে বলা তো দূরের কথা। তারা আমাকে ধন্যবাদ জানান বিষয়টা সবার সামনে তুলে ধরবার জন্য। নিজে কেন সবসময় চুপ থেকেছেন তারও একটা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। এসব কথা পরিবারের মানুষদের সাথে শেয়ার করতে গিয়ে আরো বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে চুপ করে থাকাটাকেই নিরাপদ মনে হয়েছে। কিন্তু তারা জানেন এসব বন্ধ করতে হলে এসব নিয়ে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। 

ডিভোর্স নিয়ে লেখার পর অজস্র ডিভোর্সি নারীর কাছ থেকে মেসেজ পেয়েছিলাম। ডিভোর্সের কারণে তাদেরকে সমাজে নানান দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, পদে পদে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, এসব কথা কারো সাথে শেয়ার করে এতোটুকু স্বস্তি পেতে চান তারা।

ডিভোর্সির তুলনায় ডিভোর্স দিতে অক্ষম নারীরাই আমার সাথে যোগাযোগ করেন বেশি। তারা মুখ বুজে সহ্য করে চলেছেন অসুখী দাম্পত্য জীবনের সীমাহীন কষ্ট অথবা স্বামীর হাতে অকথ্য নির্যাতন তবু সামাজিক অসম্মান, পরিবারের অসহযোগিতা, একা সন্তান পালনের গুরুভার, আবার নতুন করে শুরু করতে না পারার সম্ভবনা- এমন অসংখ্য ভয় তাদের পায়ে পায়ে জড়িয়ে থাকে, সামনে এগোতে দেয় না। তারা চাইলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন না, নির্যাতক স্বামীকে ছেড়ে যেতে পারেন না। এইসব অক্ষমতা তাদেরকে নিজের কাছেই এতো ছোট করে রাখে যে মাথা তুলে দাঁড়ানোর স্বপ্নই আর দেখা সম্ভব হয় না।

আমি তাদেরকে বুঝাই- একবার সাহস সঞ্চয় করে চেষ্টা করে দেখুন। নিজের ওপরে বিশ্বাস আনতে পারলে অন্যরাও আপনার উপর আস্থা রাখতে শুরু করবে। বাচ্চাদের কথাই তো ভাবছেন?

একটা নির্যাতন-নির্ভর, অসুখী, আস্থাহীন সম্পর্কের ভেতরে বাচ্চাদের জন্য কোনো মঙ্গলই নিহিত নেই। একজন আত্মবিশ্বাসী মা একাই সন্তানদেরকে অনেক সুন্দরভাবে বড় করতে পারে, যা একজন নির্যাতিত দুর্বল মায়ের পক্ষে স্বামীর সাথে থেকেও সম্ভব নয়। বিশ্বাস করুন, আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন নারীদের অবশ্য এতো সহজে এই উপদেশ দিতে পারি না কারণ আমি যতই বলি না কেন, 'আপনারা চিৎকার করে বলুন নিজের উপর নির্যাতনের কথা, মুখোশ উন্মোচন করে দিন ধারে কাছের দানবগুলোর', আমি জানি এটা কতটা কঠিন। আমাদের সংকীর্নতা আর সংবেদনশীলতার অভাবের কারণেই এটা এতো কঠিন। আমাকে অকপটে তাদের শৈশবের যৌন নির্যাতনের কথা বলছেন একান্তে, কিন্তু সবার সামনে এসব কথা তুলে ধরবার সাহস তাদের নেই।

তারা চুপ করেই আছেন, ফলে নির্যাতনকারী বড় ভাইয়ের বন্ধু অথবা বাবার চাচাতো ভাইয়ের সাথে এখনো সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে হচ্ছে। শৈশবের শারিরীক নির্যাতন পরিণত হয়েছে আজীবন মানসিক নির্যাতনে। শুধু কি তাই?

নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ানো এইসব নির্যাতনকারী হয়তো একইভাবে নির্যাতন করে চলেছে আরো কত শিশুকে, তার খবর কে রাখে?

যারা বিভিন্ন সময়ে আমাকে কমেন্টে বা ইনবক্সে সাহসী লেখার জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং সেই সাথে নিজের সাহসের অভাবের জন্য লজ্জা এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন, আমি তাদেরকে দোষারোপ করি না। আপাতদৃষ্টিতে সমাজকে আমাদের রক্ষক বলে মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে আমরাই সমাজের রক্ষক। ছোটবেলা থেকে আমাদের মনে লজ্জা, দ্বিধা এং সংকোচের বীজ বুনে দিয়ে সমাজ আমাদেরকে প্রস্তুত করেছে নিজেকে পুড়িয়ে হলেও ঘুণে ধরা সামাজিক নিয়মকানুনগুলো রক্ষা করবার জন্য। এই প্রক্রিয়ায় সাহসের কোন স্থান নেই। এই সাহসের অভাবের অপরাধ আপনার বা আমার নয়। কার, তাও বলে লাভ নেই।

আমরা ভীরু হলেও আমাদের মেয়েদের হাতে কিন্তু অশেষ ক্ষমতা। নিজেদের জীবন ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু আমাদের কোল জুড়ে আসে নতুন জীবন, আমাদের সন্তান। আমরা আমাদের সন্তানদের সাহসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজের এই অক্ষমতার অপরাধ মোচন করতে পারি। আমাদের অতীত, আমাদের বর্তমান হয়তো অনেক অন্ধকার, কিন্তু আমাদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দেবার মাধ্যামে ভবিষ্যতকে আলোকিত করে তুলবার চেষ্টা করতে পারি।

তর্ক করা যেতে পারে, কেন নারীকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে? নিতেই হবে তা ও নয়, তবে সন্তান যেহেতু মায়ের কোলেই আসে, মায়ের সাথেই কাটে তার গড়ে ওঠার প্রারম্ভিক দিনগুলির বেশিরভাগ সময়, মায়ের দ্বারাই সম্ভব সন্তানের মনে সাহস আর পরিচ্ছন্নতার বীজ বুনে দিয়ে একটা সুন্দর সমাজ গড়ার চেষ্টা করা।

এদেশে সন্তান বড় হবার সাথে সাথে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার অনেক নারীর জীবনের মোড় ঘুরে যেতে দেখেছি আমি। এক্ষেত্রে স্কুল একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। এদেশে স্কুলের কারিকুলামে শান্তিপূর্ণ সমাজ এবং পারিবারিক জীবন নিয়ে অনেক শিক্ষামূলক ধারণা সমন্বিত থাকে যার ফলে দেখা যায় কিছুটা বড় হবার পর মায়ের প্রতি ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাচ্চারা। অনেক সময় তারাই পুলিশ ডেকে নির্যাতক বাবাকে ধরিয়ে দেয়, মায়ের সাহস এবং ইচ্ছার অভাব সত্ত্বেও নির্যাতনের প্রতিকার সাধিত হয় সমস্ত পরিবারের জন্যই যা শেষ পর্যন্ত মংগল বয়ে আনে।

আমার নিজের জীবনের মোড় ঘুরাতেও আমার সন্তানদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। একটু বড় হবার পর তারা আমাকে যে সাহস এবং সহযোগিতা যুগিয়েছে তা আমি আমার অভিভাবকদের কাছ থেকেও পাইনি। নিজের বিক্ষিপ্ত জীবনে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, কিন্তু সন্তানদেরকে অবচেতন ভাবেই হয়তো এমন শিক্ষা দিতে পেরেছিলাম যে একটু বড় হবার পর তারা ভালো মন্দের বিচার করতে সক্ষম হয়েছিল। শুধু মায়ের পাশেই নয়, যে কোনো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখেছিল।

তাই বলব আমরা যেসব নারীরা নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি, রুখে দাঁড়াতে পারিনি বা পারছি না তারা নিজেদের সন্তানদেরকে অন্তত মুক্তমনের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ভূমিকা রাখতে পারি। অতীতকে বদলানো যায় না, কিন্তু বর্তমানকে বদলানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য একটা সুন্দর অতীতের জন্ম দিতে পারি আমরা।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে।
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK