মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮
Monday, 08 Jan, 2018 12:44:27 am
No icon No icon No icon

স্বপ্নঘোর (দ্বিতীয়পর্ব)


স্বপ্নঘোর (দ্বিতীয়পর্ব)


সংহিতা দেব: শ্রমণের বেড়ে ওঠার প্রতিবেলার সাক্ষী হয়ে উঠতে থাকে ঋতু। দিন দিন ঘর সংসারে অমনোযোগ আসতে থাকে। শ্রীনিকাদের বাড়িই আপন হয়ে ওঠে,কারণ শ্রমণকে ছেড়ে থাকা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না।ছোট্ট শ্রমণও ঋতু-ভক্ত হয়ে পরে ক্রমে। বছর তিনেক বয়সের পর ঋতুদের বাড়ি গেলে না ফেরার যত অজুহাত সব জোড়ো করে। তারপর থেকে অলিখিত ভাবেই শ্রমণ ঋতুর সন্তান হয়ে যায়। চিরস্থায়ী বাস শুরু করে সেখানে ঋতুর বাড়ির পাশের কিন্ডারগার্ডেন টায় ভর্তি হয়ে। রাধিকার সব যত্ন শ্রীনিকাকে ঘিরেই চলতে থাকে।পাশাপাশি ঋতুর দাম্পত্যে পূর্ণতা এনে দেয় নিজের ছেলেকে দান করে।

স্কুলের গণ্ডী পার করে ইংরাজীকে সাম্মানিক বিষয় করে কলেজ ভর্তি হয় শ্রী। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন স্কুলের পত্রিকায় প্রথম স্বলিখিত ছড়া লিখে লেখিকা হিসেবে হাতে খড়ি দিয়েছিল।সেই থেকে সাহিত্যচর্চার স্রোতে যেন ভেসে যেতে পারে সেই অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছে স্কুল শিক্ষিকারা।পাশাপাশি মায়ের স্বপ্ন আর নিজের আকাঙ্ক্ষা শ্রী-র কলমকে দিন দিন উন্নততর করে তুলেছে।
কলেজে পড়াকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় স্বরচিত কবিতা, গল্প,মুক্তগদ্য, নানা উপলব্দি লিখে ফেলতে থাকে। প্রকাশিত হতে থাকে প্রায় সব লেখাই। গ্রাজুয়েশনের আগেই ভবিষ্যতের পেখম মেলতে থাকে শ্রীনিকার লেখিকাসত্ত্বা।

এরপর স্নাতকত্তরে প্রবেশ করে প্রথমদিনই পাশের সিটে সহযাত্রী হওয়া পরাগ চোখ টেনেছিল তার উদাত্ত সুরেলা কন্ঠস্বরে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনই বাসে যাওয়ার সময় আলাপ হয়েছিল পরাগের সাথে। গভীর কালো চোখের অধিকারী পরাগ প্রতিদিন যাতায়াতের সংগী হয়ে ওঠে শ্রীনিকার। বাস রাস্তায় বাড়ি থেকে তিনটে স্টপেজ পেড়িয়ে ইউনিভার্সিটি। শেষ দুটো স্টপেজে পরাগ একসাথে যেত। রাস্তার ভয়, অযাতিত লোকের কুদৃষ্টি এড়িয়ে পরাগের গা ঘেষে বসে ঘন্টা দেড়েকের পথ সুগম হয়ে উঠতে লাগল ক্রমেই।
কদিন থেকেই পরাগের শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। মুখে কিছুর প্রকাশ নেই, কিন্তু চোখের তলায় অনিন্দ্রা জনিত কালোছাপ, উস্কোখুস্কো চুল,জ্বর জ্বর শরীর নিয়েও ক্লাস কামাই করছিল না। শ্রী একটা অদ্ভুত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল পরাগের।

--- ভাবছি কদিন স্টাডিলিভে থাকব
---- কেন? ছুটি নিলেই পড়ায় কি মন বসবে তোর?
---- তা কি করে বসবে? তোর সাথে বাসে আসা যাওয়াতেই আমার পড়াশুনো।
----- ইয়ার্কি করিস না পরাগ, আমাদের বাসা চেঞ্জ করবে বাবা।বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না আজকাল। ফ্যাক্টরির কাছেই বাড়ি খুঁজছে বাবা। তখন আমার আর এই রাস্তায় যাওয়া হবে না।
---- তবে আগে থেকেই বন্ধ করে দি, কি বলিস?অভ্যাস বড় নির্মম জিনিস শ্রী। ইউনিভার্সিটির টান না বাস-জার্নির টান বুঝিনা।
---- তবে আমি কদিন আসা বন্ধ করি পরাগ? দেখ টানটা কিসের!!

এলো মেলো সেইদিনের কথা গুলো বার বার মনে আসছিল হাসপাতালের অসহায় অবস্থায় বসে রোমন্থনে। ৮টা বাজতে চলল, ডঃ রাউন্ডে আসলে জানতে পারবে আর কত দিন মাকে রাখতে হবে এখানে। রক্ত পরীক্ষার রেসাল্ট টাও বড় ডঃ আসলেই বলবেন, সেই অপেক্ষা। পেইন কিলার ইঞ্জেকশন দেওয়া আছে বলে খিদে পেটেই অচৈতন্য হয়ে রাধিকা ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ নড়াচড়ায় শ্রীর ভাবনা জগতে ঝাঁকুনি লাগে,ফিরে আসে বাস্তবে।

মা --- তুই আজ একটু স্নান করে এসেছিস তো শ্রী? আমি তো এত ঘুমোচ্ছি, কত বেলা হল বুঝতেই পারছিনা।

শ্রী --- হ্যাঁ মা, সব ঠিক আছে। তুমি ঘুমোও যতটা পারো।রেস্ট ছাড়া জলদি ঠিক হবে না।
মা --- তুই আর কতদিন ছুটি নিবি। কাল বাড়ি নিয়ে চল, আমি ঠিক সারাদিন শুয়ে থাকব, তুই তবে অফিস জয়েন করতে পারিস। আর কত যে ক্ষতি করব, মা হয়ে তোর।

শ্রী --- তুমি একটু থামো তো মা,আমি দেখি ডঃ এল কিনা।রাতের খাবার আনতে যেতে হবে তো আবার।

এই বলে মা এর কথা গুলো এভয়েড করতে রুমের বাইরে চলে গেল শ্রীনিকা। ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার আগেই ছিল সময়টা।পরাগের শরীরটা খারাপ যাচ্ছিল। প্রথম যে দিন ও ছুটি নিল শ্রী একা গেলো বাসে। প্রথমদিনেই অভিজ্ঞতা এত বাজে হল,বুঝল এত দিন পরাগ সাথে ছিল বলে কতটা সহজ হত রাস্তায় চলা। এই উপলব্ধি হয়েছিল, পুরুষ তবে প্রয়োজন জীবনপথ সুগম করতে!! বাসে জানালার ধারে বসেছিল।পাশে মোটাসোটা এক ধুমসো টাইপ লোক বসল এসে। অকারণেই শরীরের চাপে চেপে ধরছিল শ্রীনিকাকে জানালার সাথে লোকাটা। যতটা সম্ভব জানালা ঘেঁষে সরে গেছিল শ্রী।কোন কারণ ছিল না তবু লোকটা তার আসুরিক শক্তি দিয়ে ক্রমশ চেপে ধরেছিল ওকে।উগ্র তামাকের গন্ধে বমি পাচ্ছিল শ্রীর।সাহস করে একবার বলল,"আপনি একটু সরে বসুন আমার তো কষ্ট হচ্ছে।" লোকটি সাহস পেলো আরো বোধয়, ওর কচি কন্ঠস্বর শুনে। ডানপাশে বসা লোকটা অদ্ভুত ভঙ্গীতে নিজের বাঁ-হাতের থাবাটা শ্রীনিকার ডান উরুতে চেপে ধরেছিল, একটু বাস ঝাঁকুনি দিলেই। তারপর ডান হাত টাকে নিয়ে অদ্ভুত অভ্যস্ত ভঙ্গীতে শ্রীয়ের শরীরের ভিতর চালিয়ে দিতে চাইছে।প্রবল এক চাপে ডুকরে কান্না উঠে আসতে লাগল শ্রীর। গলা ধরে এল আর অঝোরে চোখের জল ঝরতে লাগল। লজ্জা, ভয়,অস্বস্তিতে জানলার দিকে মুখ ফেরালো শ্রী সংকুচিত হয়ে কান্না লুকোতে। নিষ্পেষ হতে লাগল ওর ডান উরু আর পাঁজরের আশেপাশটা বারংবার।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে অসুস্থ হয়ে পরেছিল। এ এক এমন অভিজ্ঞতা যা মুখ ফুটে কাওকে বলার মত স্মার্টনেস শ্রী এর ছিল না। ভীষণ সেকেলে ভাবে মানুষ হয়েছে ও। অচেনা পুরুষদের থেকে সাবধান হতে বলেছে মা বারংবার । কিন্তু পুরুষ বলতে পরাগ, সৌরভ, রাহুল এরাই ওর কাছের। এর বেশি অচেনা পুরুষ বলতে প্রফেসররা, যাদের কাছাকাছি হয়েছে কখনো সখনো। ইউনিভার্সিটি ছাড়া একা কোন দিন যায় নি ও কোথাও, আজ একা রাত জেগে হাসপাতালে কাটিয়ে দিচ্ছে। বাস্তব মানুষকে মজবুত করে, বয়স্কও করে তোলে। বয়স যতই বাড়ুক পরিস্থিতির মাটিতে পা না রাখলে ম্যাচ্যুরিটি আসে না তা জীবন দিয়ে বুঝেছে শ্রী। সম্বিত ফিরে আসে ডঃ এর আসার শব্দে। সেদিন মোবাইল ফোনের ব্যবহার সে বা পরাগ করত না। খুব সাধারণ ভাবে মানুষ হচ্ছিল ওরা। তাই নিজের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ সব নিজের ভিতরে গচ্ছিত রাখার এক সুন্দর স্বভাব তাদের গড়ে উঠেছিল। অস্থিরতা, উগ্রতা কিছুই ছিল না স্বভাবে। একরাশ চাপা অভিমান নিয়ে কান্না আটকেছিল বাকী পিরিওড গুলোয়। ছুটির অনেকটা আগেই সেদিন বেড়িয়ে এসেছিল। ফেরার পথে বাসে আর বসার সাহস দেখায়নি। দাঁড়িয়ে ছিল টানা। রাতে বাড়ি ফিরে জ্বর এসে গিয়েছিল। জ্বরের ঘোরে তীব্র তামাকের গন্ধে চমকে উঠেছিল কয়েকবার। মার বুকে মুখ গুঁজে ঘ্রাণ নিয়েছিল নিশ্চিন্ততার,মমত্বের। রাধিকা টের পেল তার বুকের আঁচল ভিজে উঠেছিল কান্নায়। শ্রী অনুভব করেছিল যৌবনের প্রথম ধাপে প্রবেশের ধাক্কা।ভাবনা গুলোয় ছেদ পড়ল নার্স দিদির ডাকে, ব্যাল্কোনি ছেড়ে ঘরে গেল শ্রীনিকা।

ডঃ --- ইনি আপনার মা? খুব সামাণ্য উন্নতি এই তিন দিনে। সময়সাপেক্ষ সমস্যা আপনার মায়ের। কোন পুরোণো আঘাত থেকে নার্ভের সমস্যা হচ্ছে। শিরদাঁড়ার শেষে নার্ভে প্রেসার পরে পা অচল হয়ে যাচ্ছে।
শ্রী---- নিয়ে যেতে পারি কি মাকে বাড়িতে? যদি রেস্ট আর অসুধে ইম্প্রুভ করবে বলেন.... আমার আসলে ছুটি নেই আর। একা এখানে রেখেই বা যাই কি করে মাকে!! 
ডঃ ---- কোমর থেকে পা দুটো অবশ হয়ে গিয়েছিল যে তা সম্পুর্ণ সচল করতে ইলেক্ট্রিক সক এর প্রয়োজন কিছুদিন। হাসপাতালেও সেই ব্যবস্থা আছে। বাড়িতে নিয়েও প্রাইভেটে ফিসিও থেরাপি করাতে পারেন আপনি। কিন্তু ব্যয় সাপেক্ষ। ব্লাড রিপোর্টে ভিটামিনসের ঘাটতি আছে কিছু। কাল আরো কিছু ব্লাড টেস্ট করে ছুটি দিয়ে দেবো তবে।
শ্রী ---- একটু ভেবে,আলোচনা করে জানাচ্ছি নার্স দিদিকে জানিয়ে দিচ্ছি তবে।

আলোচনা....!!! কার সাথে করবে এই আলোচনা শ্রী!! এক গ্লাস জলও যাকে নিজের হাতে নিতে হয়নি আজ তার কাঁধে সকলের খাদ্য-পানীও। কলমের শিল্পে, কাব্যে- কবিতায়- স্বপ্নঘোরে জীবনপথ চলছিল যার, আজ তার কলম চলে অফিসের হিসেব কষে। ঘরের প্রতিটা সিদ্ধান্ত বাবা নিত,বাইরের প্রতিটা সিদ্ধান্তে পরাগের ছোঁয়ায় জীবন সুরেলা ছন্দে এগোচ্ছিল, হঠাৎ দুজনের একসাথে চলে যাওয়া হৃদপিন্ডকে স্তব্ধতা এনে দিয়েছিল। সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে আবারো আজ অচৈতন্য মা হাসপাতালে, উদ্রান্ত চোখ বাইরের অন্ধকারে আশ্রয় হাতরায়। ঘুমহীন পরিশ্রান্ত শরীর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা মাকে হাসপাতালে ফেলে যাবে নাকি রেখে যাবে ওই ভাড়াবাড়ির চিলেকোঠাতে....

চলবে....

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK