মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮
Monday, 08 Jan, 2018 12:41:38 am
No icon No icon No icon

স্বপ্নঘোর (প্রথমপর্ব)


স্বপ্নঘোর  (প্রথমপর্ব)


সংহিতা দেব: পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের অস্তাচলের দিকে তাকিয়ে, আনমনে বসেছিল শ্রীনিকা। কতক্ষণ যে ওই ভাবে কেটে গেল আজ! হাসপাতালের বেডটা জানালার ধারে পাওয়াটা হয়তো এই তিনদিনের অসুধ-গন্ধ মোড়া অন্ধকারাবৃত জীবনের সব থেকে সুপ্রাপ্তি। এই কথা ভেবেই মনে মনে সকলকেই ধন্যবাদ দিচ্ছিল শ্রীনিকা। মাত্রাতিরিক্ত উদ্বিগ্নতা যখন স্থিত হয়ে আসে,প্রশান্তির দিকে এগোয় ভাবনা তখন অব্যক্ত করুণার প্রস্রবণ বয় অন্তরে। সকলের প্রতি এক অসীম ধন্যযোগ অনুভূত হয়। বেঁচে আছি বলে সকলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন পরমপিতা বলেই অনন্ত ধন্যবাদ জ্ঞাপন চলেই আসে মননে। একটুকরো গরাদ যে একটা গোটা আকাশ দিতে পারে, প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য অফুরন্ত বাতাস দিতে পারে তা শ্রীনিকা এই ২৩ বছরের জীবনে অনুভব করে ওঠার মত ফুরসৎ পায়নি। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল যেন নার্সদিদি এসে কাঁধে আলতো হাত ছোঁয়ানোতে।

নার্স----- কাল আর কয়েকটা টেস্ট এর জন্য রক্ত নিয়ে নেবো, তারপর বিকেলে মাকে তুমি বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। আজ একবার বাড়ি ঘুরে এসো যাও,স্নান টুকু করে এসো অন্তত। তেমন ভয়ের কিছু নেই আর।আমি তো রইলামই।

শ্রীনিকা --- আমি ঠিক আছি দিদি,মাকে ফেলে বাড়ি যেতে মন চাইছে না। কালই একসাথে ফিরবো একেবারে।

নার্স --- ডঃ বোস ৮টার দিকে রাউন্ডে আসবেন। তখন আমি কথা বলে নেবো,আমি তো আছিই। তুমি বরং একটু ফ্রেস হয়ে এসো বোন। এই তিন দিন স্নান টুকু করনি।তুমি বিছানা নিলে মাকে কে দেখবে,মায়ের কথা ভেবেই না হয় যাও শ্রীনিকা, বাড়ি হয়ে এসো একবার।নিজের শরীর টাও তো বুঝতে হবে?

শ্রীনিকা --- আমার আর কিছু হয়না গো দিদি,হবেও না। আমি রাতের পর রাত জাগতে শিখে গেছি।দিনের পর দিন অভুক্ত থাকতেও পেরে যাই এখন। বাস্তব কি আর নরম থাকতে দেয়? আমি একদম শক্ত সমর্থ দেখো।

এই বলে অমলিন একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেলল সে। হাসি যে জোৎস্না ফোটায় তা এইমুহূর্তে নার্স দিদি উপলব্দি করল। শ্রীনিকা বলেই চলল,
------ আসলে দিদি আমি ভেংগে পড়লে বাকি
তিনটে প্রাণ ঝরে পড়বে। বাঁচার আশাই হারিয়ে ফেলবে তারা আমায় পরে যেতে দেখলে। তাই ওদের বাঁচিয়ে রাখতেই আমার সচল থাকা। আমার প্রাণপাত খাটুনি ওদের হাসি ফোটায় না কেবল,ওদের আশ্বাস যোগায় ভবিষ্যতের। তাই চিরতরে চোখ বোজার আগে টানটানে চোখে তাকিয়েই থাকব দিদি,চোখ আমি বুঝছি না।বিশ্রাম আমার চাইই না।ওদের জীবিত দেখাটাই আমার রেস্ট। আমার ব্রেইন সেল গুলো বিশ্রাম পায় এতেই। শরীরের বিরামও আর লাগে না দিদিভাই।

এই কথাই মনে ঢেউ তুলছিল, অস্তগত সূর্যের লাল আভার সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল একটু আগেই শ্রী। স্কুলে সবাই শ্রীনিকাকে শ্রী বলেই ডাকত। জন্মলগ্নেই নিটোল মুখটা দেখে ঋতু কাকিমনি নাম দিয়েছিল, শ্রীনিকা,পদ্মাসনে আসীন লক্ষ্মী। বন্ধুরাও শ্রীমাখা মুখটাকে আদর করে শ্রী বলেই ডাকত। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যখন উচ্চমাধ্যমিকের সব থেকে বেশি নম্বরটা স্কুলকে এনে দিয়েছিল কলা বিভাগে,তখন স্কুলের বড়দিও বলেছিলেন তুইই আমাদের শ্রী। কত মানুষের চোখে তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে পেয়েছে সে।নিজেও প্রতি পলকে স্বপ্নঘোরে বেঁচেছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর উঁচুনীচু পাথর ফেলা রাস্তা দিয়ে বাস ধরতে ছুটেছে আর আর ভেবেছে, আর মাত্র তো ক'টা বছর, তারপরেই কলেজে পড়াবে ও।তখন এই রাস্তাতেই গাড়ি চালিয়ে কলেজে যাবে। যে ক'জন ছাত্র ছাত্রীকে পাবে সকলকে ও ওর গাড়িতেই নিয়ে যাবে। তাদের সংগ দেবে আর্থিক ভাবে,শারীরিক ভাবে। আর বলবে,"তোরা অনেক পড়,আমি আছি".....

যতটুকু সময় বাড়িতে থাকত,মায়ের পিছন পিছন ঘুরে কাজ করে বেড়াতো, নিজে স্বপ্নে ভাসত আর মাকে ডোবাতো.....
শ্রী ---- দেখো মা, প্রথম কলেজে জয়েন করেই আমি ছাদের ঘরটাকে লাইব্রেরী বানিয়ে ফেলবো। তুমি আমাদের জন্য পড়তে পারোনি তো কি? আমি তোমায় পড়াবো। আকণ্ঠ পড়াবো মা দেখো।

মা --- তোদের দেখেই তৃপ্তি মা।আমার কি আর বয়স থাকবে তখন ?

শ্রী ---- কি যে বল মা,শিক্ষার আবার বয়স কি? তোমার সখের সব বই কিনে আনব আমি।তোমার মুখের সামনে খাবার তুলে ধরারও লোকের ব্যবস্থা করবো আমি দেখো।

মা --- নিজের স্বপ্ন তো মেলাতে পারিনি মা । তোদের মধ্য দিয়েই সেই অপূর্ণতাকে পূরণ করা রে আমার। প্রতিটা মা-ই তো এই ভাবে নিজেকে খুঁজে পায় সন্তানের মধ্যে। একদিন বড় হবি, গায়ে-গতরে নয়,নামে-ডাকে। সেদিন যত জনকে পারবি পড়তে সাহায্য করবি। বিতরণেই বাড়ে জ্ঞান।

শ্রী --- হ্যাঁ মা, অশিক্ষার তো কোন চিকিৎসা নেই। আজ এত নির্যাতন , লড়াই,অভাবের কষ্ট সব তো অশিক্ষা থেকেই মা।

মা --- সত্যিই বড় হয়ে যাচ্ছিস শ্রী। এটা ভেবেই দিন গুণি। সব সমস্যার মূলেই অশিক্ষা। শিক্ষাই দয়াশীল করে,মানুষ করে,ভালোবাসায় বাঁচতে শেখায়। জলদি বড় হয়ে যা,আশেপাশের মানুষ বাঁচতে শিখুক,বাঁচিয়ে তোল তুই।

এই বলে মেয়ের চুলের ভিতর আংগুল বুলিয়ে আদর করে দেয় রাধিকা পরম স্নেহে। শ্রীনিকার ছোট ভাই শ্রমণ ছোট থেকেই কাকা-কাকির কাছে থাকে। সন্তানহীন দম্পতি তারা। ঋতুকাকিমনিরর প্রথম সন্তানের ভ্রূণ নষ্ট হয় পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই,ঘুমের ঘোরে। অপুষ্ট শিশুকে নাকি ভুমিষ্ট করেন না ঈশ্বর। এই কথা ভেবে ঋতু মন কে শক্ত করে, সারাজীবন দুর্বল হয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেন ঈশ্বর হয়তো ভালোর জন্যই। 
তারপর দ্বিতীয় সন্তানের মৃত্যু হয় ঋতুর, সেই গর্ভাবস্থাতেই ৬ মাস ২১ তম দিনে।মানসিক জোর ফিরে পায়নি আর রায়-দম্পতি। সে বছরই শ্রীনিকার ভাই শ্রমণের মতো ফুটফুটে দেবশিশু আসে রাধিকার কোল জুড়ে। প্রতিদিন দেখতে আসত রায় দম্পতী ছোট্ট শ্রমণকে। এক অদ্ভুত মায়া মাখানো অস্ফুট চাহনি শ্রমণের, সম্মোহিত করে রেখেছিল ঋতুকে। কোল আলো করে থাকা শ্রমণের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই বাঁ-হাতটা উঠে আসত ঋতুর মেদহীন তলপেটে। সারে ছয়টা মাস ধরে কত ঈশ্বরীয় অনুভূতি দিয়েছিল তার সন্তান। ভোরবেলা খিদে পেলেই তোলপাড় করতো তলপেটটা। খাবার খেলেই শান্ত হয়ে যেত,কি সেই অব্যক্ত প্রশান্তির মায়া, সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছে না ঋতু কিছুতেই। ঘরে তখন কেউ জোড়ে শব্দ করলেই ঋতু বলতো," মাম্মু ঘুমোচ্ছে না? " সেই মাম্মু ঘুমিয়ে পড়ল একদিন চিরতরে, মাঝরাতে অসম্ভব এক ঝাকুনির মধ্য দিয়ে। চমকে উঠে বসেছিল ঋতু। কু ডেকেছিল মনে। মনকে বুঝিয়েছিল, " মাম্মু আমার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বোধয় এখন থেকেই।আমাল মাম্মু আমাল মতই তো হবে। " এই বলে মনপ্রাণ ডুবিয়ে আদর করে, আবার ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল ঋতু। তারপর সকাল থেকেই ডাক্তার - হাসপাতাল - সকলের কান্না - উদবিগ্নতা - সি.সেকশন, কত কি ঝড় কটা দিন ধরে। পাথর হয়ে গিয়েছিল ঋতু। যে যা বলেছে, তাই শুনেছে বাধ্য শিশুর মত। দুগ্ধগ্রন্থি থেকে অঝোরে নিঃসরণ হয়েছে মাতৃদুগ্ধ, ভিজে গেছে শরীর, অপারেশনের যন্ত্রণা সয়েছে, উদ্ভ্রান্ত চোখে রাত গুনেছে, স্তনদুগ্ধক্ষরণের অপত্যস্নেহ সয়েছে, অক্লান্ত হাতদুটো হাতরে ফিরেছে স্ফিত তলপেট। তবু পায়নি তুলতুলে স্পর্শ, পায়নি সন্তানকে ছুঁতে। আজও একি ভাবে বাঁ-হাতটা অবচেতনে উঠে আসে নিজের জঠর ছুঁতে, খুঁজতে থাকে অভ্যন্তরে বেড়ে উঠছিল সেই অনাঘ্রাত দেবশিশুকেই....

..... চলবে

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK