শনিবার, ১৪ জুলাই ২০১৮
Friday, 05 Jan, 2018 12:45:56 am
No icon No icon No icon

ডিয়ার স্যান্টা


ডিয়ার স্যান্টা


সংহিতা দেব: তুমি দাদু, সবার দাদু, আমার মায়ের দাদু, আমার দাদু, আমার ছেলেরও দাদু। তাই যুগ যুগ ধরে সবার আবদার তোমার কাছে। কিছু তো করার নেই। আবদারের জায়গাটাই তুমি দিয়েছ।দিনে দিনে জনসংখ্যা বাড়ছে, আবদারও বাড়ছে, তুমি তাই বলে হাঁপিয়ে উঠবে তা তো আর হয় না। কে শুনবে তোমার এই কথা? কে মানবে? আমি কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি স্যান্টা তুমি আজকাল বড্ড অবহেলা করছ আমাদের।

দেখো ছোটবেলায় ডিসেম্বর আসবে বলে পুজোর পর থেকেই অপেক্ষা করতাম, আর ডিসেম্বর এলেই দিন গুনতাম ২৫ তারিখের। এই দিন সকালে পাড়ার বেকারি থেকে বাবা প্যানকেক নিয়ে আসত। কেকগুলো কিছুটা লম্বা ছোট শিবলিঙ্গের আকারে হত। পাতলা কাগজ সেঁটে থাকত গায়ে। কাগজ খুঁটে তুলে ফেললেই সাদা সাদা বড় বড় মোরব্বা দেখা যেত। গোল গোল পিস করে কাটতাম, স্থির করতে পারতাম না কোনটা খাব। যেই পিস টায় মোরব্বা বেশি যথারীতি সেটা তুলে নিতাম। তারপর সারাদিন ঘুরে ফিরে অন্যদের জন্য রাখা পিস গুলো থেকেও মোরব্বাগুলো খুঁটে নেবার তালে থাকতাম সারাদিন। সেই একটা কেকদিবস যে কত কাঙ্ক্ষিত ছিল তা তো তুমি জানতে? আরো যখন বড় হলাম মূল্যহিসেবে কেক এর দর বাড়ল,কদরও। আকারে বড়, কাজু, কিসমিস, রঙিন ড্রাইফ্রুট ওয়ালা কেক আসত তখন বাড়িতে। চকলেট কালারের,ভেজ/ননভেজ আর নানা ফ্লেভারের। পাড়ার বেকারী ছেড়ে তখন শহরের নতুন হওয়া বড় ঝাঁচকচকে কনফেক্সনারি থেকে কেক আনা হত। সেও বড় আনন্দের ছিল স্যান্টা। তারপর আরো বড় হলাম আর একটা ছোট্ট ফেরেস্তা এল ঘরে। তুমি তো জানোই প্রতিবছর ২৪ তারিখ বিকেলে ওকে লুকিয়ে কত গিফট, কত চকলেট কিনেছি। ২৫ ডিসেম্বর আসার আগেই আমার যে কি উন্মাদনা হত লুকিয়ে লুকিয়ে গিফট কিনে ছেলে ঘুমোলেই ওর বালিশের তলায় রাখা অবধি যে কি টেন্সনে কাটাতাম। ছেলেও আগের রাতে কিছুতেই শুতে চাইত না। ও দেখবেই কখন তুমি আসছ আর ওর মোজাতে গিফট ভরে দিচ্ছ এই অপেক্ষায় কত রাত জাগত। তারপর ২৫ তারিখ সকালে একগাল হাসি ভরে বিছানাতেই খেলনা, ছবি আঁকার বই,রঙ এই সব নিয়ে দারুণ একটা দিন কাটাতো।

কিন্তু এইগুলো সব বছর কয়েক আগের কথা। আজকাল আর যেন দিন বড় লাগে না স্যান্টা। বড়দিনটায় কি আসতে আসতে কাঁচি চালিয়ে দিচ্ছ তুমি স্যান্টা ? ছোট হয়ে যাচ্চে যেন কেমন দিনটা প্রতিবছর একটু একটু করে। সব কিছু এত অফুরন্ত চারিদিকে তোমার আসার চমকটা হারিয়েই ফেলেছি স্যান্টা কয়েকবছর হল। এই দেখো না, ডিসেম্বর পরেছে থেকে রোজ কেক আসে বাড়িতে। ছেলের স্কুলের টিফিনে কেক, বিকেলের কফিতে কেক, হঠাৎ আসা অতিথিদের সেবায় কেক,কেউ আসলেও উপহার আনে সেই কেক, অলস দিনে কিছু ভালো লাগছে না কি করি...কেক খাও...এত্ত কেক রোজ রোজ। এখন আবার মেপে খেতে হয়,রোজ আমি একটু করে আকারে আয়তনে বেড়ে চলেছি তাই মোরব্বাটাও খুঁটে ফেলে দিতে হয় এখন। তবে আর কিসের আনন্দ স্যান্টা দাদু ? এত কেন কেকের দোকান চারিদিকে বল!! আর গিফট এর আনন্দ কোন কালে যে হারিয়ে ফেলেছি কি বলব সে কথা তোমায়। রোজই প্রায় নতুন সোরুম উদ্বোধন হচ্ছে, রোজ নিত্য নতুন অফার। আজ শীত-বাম্পার তো কাল বর্ষা-ধামাকা নাতো পরশু গরম-সেল। আজ বারো হাজারের জিনিস কিনলে ছয় হাজারে দেবে কাল পাঁচহাজারের জিনিস কিনলে লটারিতে গাড়িও পেতে পারি। প্রতিটা ফাঁকা মাঠে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-হেমন্ত জুড়ে মেলা-মেলা-মেলা আর সেল-সেল-সেল। কই আর সেই ২৫ ডিসেম্বরের অপেক্ষা। আমি তো আর অনুভব করিনা। আমার ১২ বছরের ছেলেও হেসে উড়িয়ে দেয় বছর কয়েক আগে থেকেই দেখছি। বিশ্বাস করাতে পারিনা তুমি যে এসে ওকে গিফট দিতে সেই কথা। এই টুকু বাচ্চাও বলে,"তোমরা ছোট ছিলাম বলে গিফট এনে দিতে স্যান্টার নাম করে। আমি আর বাচ্চা নেই আমায় আর ঠকাতে পারবে না।" কি বলব, স্যান্টা উৎসবের ডেট মানে আজকাল যেন ক্যালেন্ডারে সংখ্যা হয়েই থেকে গেছে। তুমি কি ফিরিয়ে দিতে পারো শিশুদের শিশুত্ব? তবে দিও..... তুমি ফিরিয়ে দিতে পারো সারাবছর অপেক্ষার পর একটা কেক এর বিশেষ দিন? তবে দিও..... আমাদের মত একশ্রেণীর মানুষ স্তুপ স্তুপ সামগ্রীর নীচে দম চাপা জীবন কাটাই। আর একদল দুস্থ- অবহেলিত-অভুক্ত মানুষের নিত্য দিনের একটুকরো রুটির জন্য হাহাকার, একচিলতে বস্ত্রের জন্য লজ্জাটুকু ঢাকতে না পারার লড়াই রোজ রোজ। তুমি কি সমতা এনে দিতে পারো আমাদের সকলের মধ্যে? তবে দিও...... এই শীতের দুপুরে ফাটা ঠোঁটে হাসি ফোটাতে গিয়ে যখন রক্ত ঝরে পরে, সারা শরীরে একফোটা তেলের অভাবে যখন দগদগে ঘা নিয়ে উস্কোখুস্ক চুলের যাযাবর বাচ্চাটাকে শীতে কুঁকড়ে থাকতে দেখি তখন একটুকরো কেক ওদের স্বপ্নমোড়া মোজায় এবার থেকে দিয়ে দিতে পারো কি স্যান্টা? তবে দিও.....

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK