শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮
Wednesday, 03 Jan, 2018 11:47:23 pm
No icon No icon No icon

তারাও বেঁচে আছে


তারাও বেঁচে আছে


সংহিতা দেব : বেঁচে থাকার জন্য যে প্রতিনিয়ত লড়াই মানব জাতির, খুব সহজেই বেঁচে আছি বলে বোধ হয় টের পাই না। বছরের শেষ হয় অফুরন্ত হাসি, আনন্দ, খাদ্য, পাণীয়, বাজি, রোশনাই দিয়ে। বছর শুরুও করি যে যতটা পারি উচ্ছাস জুটিয়ে নিয়ে। এরই মাঝে আজ চোখে পড়ল এক দল অন্য ধারায় বয়ে চলা মানব জাতীর। তারাও বেঁচে আছে, রোজ বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। তাদের নতুন বছর আসছে যাচ্ছে, তাদের সূর্য উদয় হচ্ছে অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু সে দিকে নজরপাত করার মন নেই তাদের, বুঝিয়ে দিলেও তারা বুঝতে পারবে না কাকে বলে ৩১সে ডিসেম্বর রাত বা কাকে বলে ১লা জানুয়ারির সকাল।

মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলা থেকে আসা একদল উপজাতী আজকাল পশ্চিমবংগের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নদীয়া থেকে তারা এসেছে মুর্শিদাবাদে। বহরমপুরের গঙ্গা সংলগ্ন এক মাঠে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতি গড়েছে,সেখানেই রান্না, সেখানেই নিদ্রা, সেখানেই জ্বলছে গনগনে আগুনের আঁচ । লোহা পিটিয়ে সাড়াশি, দা, হেসো, নানা সাইজের কাটারি বানায় তারা। যেখানে যায় সেখানেই দলে দলে তারা আস্তানা গাড়ে খোলা মাঠে।একদলে ২০/২২ জন থাকলে পুরুষ এর সংখ্যা সেখানে অর্ধেকেরও কম। অনুর্ধ ত্রিশ এর কিছু মহিলা আর তাদের সাথে নানা বয়সের অনেক বাচ্চা। অপুষ্টি জনিত শারীরিক গঠনের মহিলাবৃন্দের সাথে অভুক্ত, রোগগ্রস্থ কিছু বাচ্চা সর্বক্ষণ মায়ের আঁচল ধরে খিদের তাড়নায় বায়না করে চলেছে। দেখে বিষ্মিত হয়ে যেতে হয়, রুগ্ন, অযত্নে চামড়া ঝলসে যাওয়া চেহেরার রমণীগণ কি সাংঘাতিক পরিশ্রমে লোহা পিটিয়ে সামগ্রী বানাচ্ছে পুরুষের মতই সমান তালে। কি কঠোর সেই হাতের পাঞ্জা যা দিয়ে বিশাল আকারের লোহার হাতুরিটা মাথার উপরে তুলে ক্রমাগত তপ্ত লোহার খন্ডতে পেষণ করছে। ঈশ্বর সৃষ্ট কোমল শরীরের অধিকারিণী মহিলা জাতকে , বাঁচার লড়াইয়ে সমান তালে যুজতে হচ্ছে পুরুষের সাথে আজ। "দেবী" শব্দে হয়তো সংজ্ঞায়িত করা যায় এদেরকেই। তারা, সীতা, সরিতা, রেশমা এরা হিসেব দিল ৫০/৬০ টাকা কিলো দরে ওরা লোহা ক্রয় করে ৩০০টাকা কিলো দরে বিক্রি করে লৌহ সামগ্রী বানানোর পর। এই কাজ তারা আগে অর্ডার নিয়ে করে। কিন্তু প্রশ্ন হল দিনে কটা অর্ডার তারা পেতে পারে? যাযাবরের জীবনে তাদের স্থায়ীত্ব কত টুকু? ভ্রাম্যমান এই জাতির ব্যবসার তো নির্দিষ্ট স্থান নেই। তবে কতগুলোই বা অর্ডার জোটে তাদের? অক্লান্ত শক্তি ক্ষয় করে অর্ডারি মাল বানিয়ে তারা কত টুকু রোজগারই বা করে যা দিয়ে নিজেদের খাওয়া জোটে, বাচ্চার ভরণ পোষণ হয়? তাদের বলা কথা অনুযায়ী রাতের রুটি সবজি টুকু তাদের জুটে যায়। পরের দিনের জন্য কোন সঞ্চয় তাদের নেই। পরে দিন শুরু করে আবার নতুন উদ্যোগে তারা।

এই সকল কিছু পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্ন এল বেশ কিছু। শহরাঞ্চলে এই যে একটা মাঠে তারা আস্তানা গাড়ছে এই অনুমতি তারা পাচ্ছে কার কাছ থেকে? কিসের বিনিময়ে তারা শীতের রাতে ফাঁকা মাঠে সুরক্ষা পাচ্ছে? আমরা যখন তাদের ছবি তুলছি, কথা বলছি লক্ষ্য করলাম খানিকটা দূর থেকে হঠাৎ উড়ে এসে বাবু সম্প্রদায়ের একব্যক্তি অসম্ভব রাগান্বিত ভ্রুকুটি দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকল । আমাদের সাজ পোশাক, হাতে ক্যামেরা দেখে মহিলা গুলো এগিয়ে আসছিল আড়ষ্টতা কাটিয়ে। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে দেখে তারা অস্বস্তিকর মুখভঙ্গি করে সরে যায়। প্রশ্ন আসে, কে সেই ব্যক্তি? মহিলা গুলো যে গতর খাটিয়ে দুবেলার দুটো রুটি জোগাড় করার চেষ্টায় রত, তাদের সেই পরিশ্রান্ত গতর আদৌ কত টা সুরক্ষিত ? তাদের একান্ত নিজের আদরের শরীর টিকিয়ে রাখার দায়ে যে তাদের এই ভ্রাম্যমান জীবন,সেই শরীরে তাদের নিজেদের অধিকার কতটুকু ? লোহারি হিসেবে তাদের এই রূপ কি উপরের মুখোশ ? দেহব্যবসাটাই কি তাদের মূল উপজীব্য নাকি সৎ পথে অক্লান্ত পরিশ্রমে বাচ্চাগুলোর মুখে দুদানা খাদ্য তুলে দেওয়ার জন্য তারা ধর্ষিত, নিপীড়িত? কে দেবে এর জবাব?

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK