শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮
Monday, 25 Dec, 2017 11:52:24 pm
No icon No icon No icon

ছোট্ট ভ্রমন, বিজয়ের আনন্দ ও শীতার্ত মানুষের চিৎকার


ছোট্ট ভ্রমন, বিজয়ের আনন্দ ও শীতার্ত মানুষের চিৎকার


মো. জাহাঙ্গীর হোসেন: ১৩ই ডিসেম্বর ২০১৭ সাল, অফিস থেকে বাসায় আজ একটু আগেই ফিরে এসেছি, বাসায় গিয়ে কাপড় পাল্টে , ট্রাউজার ও গেন্জি পরেই হাটতে নামলাম- বুকের ভিতর কেমন একটা ভাল লাগা কাজ করতে লাগল, দেশ প্রেমের ঘুমন্ত বিবেকটা সুপ্ত থাকলেও ডিসেম্বর ও মার্চ মাসে কিন্তু মনের ভিতর সরাসরি অনুভব হতে থাকে, নিচে নামতেই এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা, খুব স্নেহ করি, ও ও আমাকে বড় ভাইয়ের মতই সন্মান করে, চা খেতে খেতেই বলল ১৪ই ডিসেম্বর রাতে ওরা কুয়াকাটা বেড়াতে যাবে, সদলবলে ওরা সাতজন – কি স্বপ্ন , কি ভাললাগা, কি উচ্ছাস, ভালই লাগে ওদের দেখলে, বাংলাদেশ আসলেই এগিয়ে যাচ্ছে, ছোট ছোট ২৫/২৬ বছরের ছেলেগুলো কত বড় বড় চাকুরী করছে এবং বেশ ভাল বেতন ও ওরা পাচ্ছে। গার্মেন্টস সেক্টরে বেশ ভাল আয় উন্নতির একটা পরিধি তৈরী হয়েছে। আমার সামনেই সে তার বন্ধুদের নিয়ে ফোনে নানা পরিকল্পনা করতে থাকল। নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকালাম, আমরা ও তো এমনই করতাম, বেড়াতে যাবার আগের দিন রাতে যেন ঘুমই আসতো না, তারুন্য, আহা তারুন্য, খুব ভাল সময় এটি, ছুটে চলার এই উদ্দিপনা কিন্তু মানুষের অবচেতন মনে সবসময় খেলা করে, পারিপার্শ্বিকতার চাপে প্রায়শ্ই এ খেলার খেলোয়াড় হওয়া যায় না, কিন্তু মন তো চায়, এই মনকে শিকল পরাতে হয়, আত্মকেন্দ্রিক কারাগাড়ে নিজের মাঝে নিজেকে বন্দিদশায় রাখতে হয়, এটাই বোধয় জীবন। কথায় কথায় ভাইটি এত আনন্দিত, নতুন ছেলের বাবা হয়েছে, তার অতি প্রিয় এক বন্ধুর আবার আমার ততবীরে চাকুরী হয়েছে, তাছাড়া আমার প্রতি তার ভাইসম একটা শ্রদ্ধাবোধ সব সময় অনুভব করত, ভাল লাগে, এই মানুষগুলোর ভাললাগা, ভালবাসা, নিঃস্বার্থ ভালবাসা, ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের ভালবাসা, যাহোক কথায় কথায় সে বলে উঠলো, ভাই আপনিও চলেন আমাদের সাথে কুয়াকাটা, আমি খুব অবাক হলাম। আমার স্নেহসম ছোট ভাইটি না হয় আমাকে ওর সাথে ভ্রমন সঙ্গী করতে পারে, কিন্তু বাকীরা – ওরাতো আমাকে চিনে না, যাহোক ওর পিরাপিরিতে রাজি হলাম, কিন্তু শর্ত একটাই , বরিশাল পর্যন্ত যেতে পারব, ওখান থেকে ওরা কুয়াকাটা চলে যাবে আর আমি দুপুরে (গ্রীনলাইন) রওয়ানা হয়ে রাত নয়টায় ঢাকায় ফেরত আসব। নদী আমার ভীষন প্রিয়, তারপর মস্তবড় জাহাজ- আমিও যেন শৈশবে ফেরত যাচ্ছিলাম, গিন্নি ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ এ বাবার বাড়ি গেছে, উপলক্ষ, মেয়ে ও ছেলেদের (ভাগনের বিয়ে ) গায়ে হলুদে অংশগ্রহন করা, ১৬ ই ডিসেম্বর ১৭ ( দুপুর বেলা উভয় পক্ষের সম্মিলিত অনুষ্ঠান) বিয়ের অনুষ্ঠান, সুতরাং আমাকে শনিবার অবশ্যই স্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে। ১৪ ই ডিসেম্বর ২০১৭ , সন্ধে সাতটার মধ্যে সবাই বিভিন্ন স্থান হতে সদরঘাট লঞ্চ টারমিনালে চলে আসল,  আমিও পৌছলাম, সবার সাথে খুব দ্রুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল।সন্মানজনক একটা বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব – এটাও একটা মুগ্ধ সম্পর্ক। ধূমপানে বিষপান, কে শুনে কার কথা, ঢাকার বাইরে যাচ্ছি তা ও আবার বিশাল লঞ্চে , ওদের ছাটাছুটি দেখে খুব ভালই লাগছিল, কেউ সুরভিতে যাবে, কেউ আবার সুন্দরবন লঞ্চে যাবে, কেউ বলছে একটাই স্টাফ কেবিন পেয়েছে আর সেটা আবার এ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের স্টাফ কেবিন, ঠিক করতে বললাম, পাঁচ হাজার টাকায় ছোট্ট কেবিন, তবুও যেন ওটাই স্বর্গীয়। লঞ্চে উঠে সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করল, এই লঞ্চের ছাদে উঠতে হবে, সারারাত গান হবে, গিটার সহ ছোট খাট বাদ্যযন্ত্র ওরা নিয়ে এসেছে, এটাইতো জীবন-এখানেইতো জীবনের সার্থকতা। রাত ১১ টা পর্যন্ত দারুন হই চই, খোলা আকাশ, হাজারো তারার মেলা, আজ যেন তারারা একটু বেশিই জ্বল জ্বল করছে, যা হোক লঞ্চের সামনে খোলা আকাশের নিচে, চাদর বিছানা হল, আশে পাশে তারুন্যের আরো অনেক চাদরে লঞ্চের সামনের অংশে পুরুটা ভরে গেল, গলা ছাইরা গান , নাউ ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে , ওরে ছালেকা, ওরে মালেকা, আস্তে আস্তে দেশের গান – একসাগর ও রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলা যারা, লোম গুলো কেমন দাড়িয়ে গেল, এটাই বোধয় দেশপ্রেম, লক্ষকোটি মানুষ এখনো জানি দেশের যে কোন প্রয়োজনেই দেশের জন্য ঝাপিয়ে জীবন দিয়ে দিবে, এটা আমি মানি ও বিশ্বাস করি। রাত ১১ টার পর , শীতের রাতের ঠান্ডা কনকনে বাতাস যেন সবাইকে কাবু করতে লাগল, কেউ কেউ তাস খেলা ফেলে, গান আস্তে আস্তে বন্ধ করে, শীতের হাত থেকে বাঁচার প্রচেষ্টা করতে লাগল। রাত ১২ টার দিকে স্টাফ কেবিনে ছোট ০৪ ভাইয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে, খোলা আকাশের নিচে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তবুও আমিতো স্বার্থপরের মত কেবিনে যেতে পারি না, যদিও আমার সাথে যারা ছিল, তারা খুব অনুরোধ করছিল। অচেনা হাজার হাজার মানুষ লঞ্চের নিচে , উপরে, একতলায়, দোতলায়, বারান্দায়, ছাদে কি সুন্দর করে ঘুমিয়ে যাত্রাপথ সম্পন্ন করছে, কি দারুন ব্যপার তাই না। ঠান্ডায় আর উপরে থাকতে পারছি না, লঞ্চের ভিতরে এদিক সেদিক হাটার চেষ্টা করলাম, দুরুহ হাটা, তাই ক্যান্টিনের পাশে দাড়িয়ে দাড়িয়ে বেশ কয়েক কাপ চা খেলাম। সঙ্গের ছেলেগুলো, আমার ছোটভাইসম, বন্ধুসম, এত আন্তরিক ব্যবহার করল, বেশ ভাল লাগল, অনেকেই বলে এখনকার ছেলেগুলো বখে গেছে, কথাটা আসলে সত্যি নয়, ওদের কে বুঝতে হবে, যুগের সাথে ব্যক্তিত্বকে ঘরে রেখে কিছুটা তালতো মিলাতে হবে, যেমনটা আমাদের বাবা দাদারা আমাদের সাথে করেছিলেন। আমি কিন্তু তারুন্যের উচ্ছাস নিয়ে খুব উচ্ছসিত, ওদের স্বপ্ন, ওদের কোলাহল, ওদের পথচলা, আমার ভাল লাগে, অত্যন্ত সুদূরপ্রশারী ওদের চিন্তা-চেতনা, রাত সারে ১২ টার দিকে সবাই মিলে নিচে লাঞ্চ করলাম, কেউ পোয়া মাছ, কেউ ইলিশ, কেউ মুরগী, লঞ্চের উপরে খেলতে ও গান গাইতে গাইতে ইতিমধ্যে অনেক ভাই বেরাদরও হয়ে গেছে – বাংলার মানুষ গুলো এত সহজ-সরল, এত প্রান খোলা, বড়ো বাঁচতে ইচ্ছা করে-এত ভাললাগা, এত ভালবাসা পেলে কার না বাঁচতে ইচ্ছা করবে। বন্ধুর মতো স্নেহ, ভালবাসা ও ওদের কাছ হতে শ্রদ্ধা সবই পেলাম, রাত তিনটার দিকে ওরা (যারা কেবিনে ছিল) আমাকে কেবীনে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেদিল, তোষারপাত থেকে যেন একটু নাকিতশীতুষ্ণ আবহাওয়ার ব্যবস্থা পেলাম। কথন যে ভোর হয়ে গেল, ওরা আমাকে জাগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত মমতার সাথে কোয়াকাটার উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা হল। লঞ্চ থেকে নামার আগে আমার স্কুল সময়ের এক বন্ধুর সাথে দেখা হেয় গেল, বিশাল লম্বা চওড়া হাজী সাহেব ( আমার দোস্ত, বাবু) ওই আজম, ওই আজম – আমার ডাক নাম , বুঝতে আর বাকী রইল না, সেই ছোট বেলা, সেই একসাথে ঘুরে বেড়ানো, ঢাকা শহরেই দুই বন্ধুর পুকুর খুজে নিয়ে গোসল করা, টিভির নায়িকাদের নিয়ে মজার মজার গল্প করা, বয়স হয়ে গেছে, আগের মত ও আর নেই, তবুও হৃদযের যে টান, ওই আজম – ওই আজম – বন্ধুত্বের ভালবাসার টানই আলাদা, যা হোক, ভোর ৫.৩০ মি. এ কই যাই, আমার বন্ধু ওর সালার বিয়েতে এসেছে, বরিশাল শহরে শ্বশুর বাড়িতে হাজারো আত্মীয়, স্বজন থাকার কারনে, ও হোটেলে থাকবে আজ রাতে, সকালে আমার কারনে রুমটা বুকিং দিয়ে আমাকে রুমটার চাবি দিয়ে, আমরা দুজনে বরিশাল শহরটা ঘুড়তে বের হলাম, বেশ গোছানো শহর, ভোর বেলা তখন ঘুমন্ত শহর, বিবির পুকুর ধরে বয়েল হোটেলে বেশ করে নাস্তা খেলাম, মনটা ভরে গেল, টাটকা সব্জী, পরাটা, ডিম ও আসল ছোলার ডাল – ঢাকায় তো ছোলা বলে কি সব খাওয়ায়। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সাথে মানুষের মূল্যেবোধ, সততা, সদিচ্ছা কিছু কিছু মানুষের নষ্ট হযেছে, এসব দেখলে ভাল লাগে না। বাইরে থেকে ঘুরে এসে সুন্দর গোছানো টিপটপ রুমে গোসল করেই, লেপের নিচে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি, দুপুর ০২.১৫ মি. এ বাইরে থেকে এক প্যাকেট চিকেন বিরিয়ানী নিয়ে ১৫ ই ডিসেম্ব‘ ১৭ এ দুপুর ৩ টায় গ্রীনলাইন রকেট লঞ্চে উঠরাম, দিনের আলোতে লঞ্চে ভ্রমন যে এত মধুর, জানতামই না। মস্তবড় নদীর উপর দিযে লঞ্চ যাচ্ছে, বুকে একটা কেমন আনন্দ ভাব অনুভব করছি, আহা কি সুন্দর পানি, চারিধারে সবুজ, দিগন্ত থেকে দিগন্তে যেন গাছের পাহাড়, দুর দিগন্তে মিলে গেছে, আমাদের রকেট শন শন করে দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে পদ্মা নদীর বুক চিরে, কত শত নৌকা ঢেউয়ের দোলায় দুলছে, খুব সুন্দর একটা দৃশ্য যা রাতের ভ্রমনে উপভোগ করা যায় না। দুপুর ০৩.৩০ থেকে ৫.৩০ পর্যন্ত স্টিমারের ছাদে বসে বসে দেশটার সৌন্দর্য দেখলাম, বুকের ভিতর ১৫ ই ডেসেম্বর, একদিন পরই বিজয় দিবস,কি অহংকার , কি আত্মত্যাগ, কি দেশপ্রেমের উপলব্ধিতে উজ্জিবিত মানুষগুলো সেই ২৫ শে মার্চ ৭১ হতে ১৬ ই ডিসেম্বর’ ৭১ পর্যন্ত কত অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের জন্য, আমরাও তাদের অবদানের কথা ভুলিনি, তাদের এই অবদানকে মাথার উপরে রেখে প্রজন্ম হতে প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছি এবং দিচ্ছি। সন্ধা হতেই অন্ধকারে বাইরে তেমন দেখা যাচ্ছে না, ছাদ থেকে নিচে নেমে এসে সিটে বসলাম, অভিজাত শ্রেনী – কতশত মানুষ, কতশত কথা , কত রকম আচরন, বাচ্চাগুলো সব ব্যতিব্যস্ত মোবাইল ও ট্যাব নিয়ে, ওরা কি সত্যি

আমাদের মত করে মানুষ হচ্ছে, সেই ছোটা ছুটি, একজন আরেকজন কে বোঝা, একে অপরের তরে ব্যথিত হওয়া, একে অপরকে সাহায্য করা, বোধ হয় হচ্ছে, তবে বাবা মাকে আরও বেশি করে নজর দিতে হবে, শহরে খোলা আকাশ দিতে হবে, খেলাধুলার মাঠ দিতে হবে, নির্মল বিনোদনের জন্য দিতে হবে খেলাধুলার আঙ্গিনা। আমার পিছনে একটি ১০/১২ বছরের মেয়ে অন্যদের থেকে আলাদা, বেশ জমিয়ে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে, কি দারুন গল্প করছে ভূতের গল্প, বামে আরেক পিচ্চি মামুনি বল্ল এই আস্তে বল, আঙ্কেল বোধহয় ঘুমায়নি, দেয়ালেরও কান আছে, আহা! শৈশব, সেই ভাল লাগার শৈশব, হাজারো চেষ্টায় না ফিরে পাবার শৈশব – সব ছেলেমেয়েরা আনন্দের সাথে এ সময়টুকু পার করুক, এটাই কামনা করি এখন আমি সবসময়। আমার ডান পাশে বিশাল একটি অভিজাত পরিবার, ভাই, বোন, মামা, চাচা ও বেশকিছু মুরুব্বী ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভ্রমন করছে, সাথে ৮/৯ বছরের একটি প্রতিবন্ধী মেয়ে, মাঝে মাঝেই চিৎকার করে উঠছে, অভিজাত শ্রেনীর অনেকেই কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে এবং অনেকে বিরক্ত হচ্ছে, আমি ও অন্যান্য অনেকেই বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছি, এরা তো আমাদের সমাজেরই অংশ, এই পরিবার টিকে এই শিশুটির পাশে আমাদেরই দাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা প্রশংসনীয় কেননা তারা শিশুটির সাথে আর দশটি শিশুর মতই আচরন করছে, এ ধরনের শিশুর ক্ষেত্রে এটাই কাম্য এবং এই আচরনই এদেরকে সমাজের মূল ধারায় আসতে সাহায্য করবে।

স্টিমার ঘাটে ভিরল, ভীরল রাত ০৯.৩০ মি. এ, সবাই একসাথে নামার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ঢাকায় ঠান্ডা একটু কম, গত রাতের ঠান্ডার কথা এথনো ভুলিনি, একটা মাফলার, একটা শীতের কাপড়ের যে কি প্রয়োজন মানুষের বেচে থাকার, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এখন শহরের কোলাহলে ফিরে আসার পালা, ঘাটের রাস্তায় আসতেই দেখি একলোক লুঙ্গিটা সারা গায়ে জড়িয়ে পল্টনের রাস্তায় কাচু মাচু হয়ে  শীতে কষ্ট পাচ্ছে, ইচ্ছে করছিল গায়ের সোয়েটার বা ব্যাগের সোয়েটার থেকে একটা দিয়ে দিই, মানুষের ভীড়, সংশয়, লজ্জা, পাছে লোকে কিছু বলে, সব মিলিয়ে দেয়া হল না। সদরঘাট হতে রিস্কা নিয়ে চলে এলাম হোটেল আল রাজ্জাক এ , রাতের খাবার টা খাবার জন্য , হঠাৎ করে ভর্তা দিযে খেতে ইচ্ছা হল, যাহোক স্মৃতিতে ভেসে উঠল, যখন ঢাকা ক্যন্টনমেন্ট এ চাকুরীরত ছিলাম, তখন আমি ক্যাপ্টেন, অফিসার্স মেস এ থাকতাম, মাঝে মাঝে ইচ্ছা হত গরম পরাটা, ডিম ভাজী আর মাছের রান্না করা শুধু সব্জী দিয়ে পরাটা খাই, সেই উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে মধুমিতা সিনেমা হলের পাশে ইটালিয়ান হোটেলে খেতে আসতাম, অমৃত লাগত, বড় বড় হোটেলে বুঝি না কেন যে ভর্তা, ভাজি, ঘরোয়া সব্জী বানায় না, যে কারনে গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ড এর পাশে এসে, পরাটা ডিম ও মাছের সব্জী দিয়ে খাচ্ছি, পাশেই অনেক ছেলেপেলে হাভাতে গরীব, বেশ ময়রা কাপড় পরিহিত, কর্মজীবী ছেলেরা খাচ্ছে, ওদের মাথায় , হাতে, লাল সবুজের ব্যান্ড বাধা, ভাললাগা, খুব ভাললাগা কাজ করল। চারদিক থেকে বেজে আসছে ও আমার দেশের মাটি , একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি, সালাম, সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরনে- লোমগুলো দাড়িয়ে উঠল, দেশের জন্য এই যে ভালবাসা, এটা আমাদের সবার ভিতরেই আছে, দেশের জন্য জানি সবাই মোরা আমৃত্যু প্রস্তুত আছি । খাবার শেষ করে আবার রিক্সা নিয়ে রওয়ানা হলাম, খুব খারাপ লাগছে, এত দরীদ্র মানুষগুলো এই শীতের রাতে গুটি সুটি হয়ে শুয়ে আছে, একটু গরম কাপড় শরীরে নেই, আহা! এই মানুষগুলোই না কত আদরে সোহাগে না মায়ের আঁচলের নিচে ছিল, খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিছুদুর যেতেই রাস্তার উল্টোপাশে ফুটপাতে দেখি সস্তাদরে সোয়েটার বিক্রয় হচ্ছে (প্রতি পিস ২০ টাকা), রিকশাওয়ালাকে উল্টোদিকে গিয়ে রিস্কা থামাতে বললাম, আমার সামর্থ মত ২৫ পিস সোয়েটার বিভিন্ন বয়সের সাইজ অনুযায়ী বেছে নিলাম, বেশ সময় ব্যয় করতে হল, শীতও আস্তে আস্তে বাড়ছে। বিদেশীদের স্টাইল ও সাইজ কত অদ্ভূত, বাংলা সাইজের সাথে যায় না। রিকশাওয়ালা মহা খুশি, ওর ও ওর পরিবারের সদস্যদের জন্য সাইজ মত সোয়েটার নিয়ে নিল। আমিই তাকে উপহার হিসাবে দিলাম। এবার বিতরনের পালা, শাহাবাগ, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্তর, ঢাকা মেডিকেল - যেখানেই শীতার্ত অসহায় মানুষ পেলাম, তাদেরকে সাধ্য ও সামর্থ অনুযায়ী দিলাম। শীতের যে কি কষ্ট তা তো আমি গত রাতে স্টিমারে বুঝেছি। আজ শীতের কাপড় পেয়ে হতদরিদ্র মানুষগুলোর আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে, বাধা দেইনি, স্বাধীন দেশে মানুষে মানুষে ভালবাসা, মানবতার তরে ভালবাসার উদাত্ত দোয়ার তো সবারই খোলা থাকা উচিত। সব মানুষ কে আমি খুশি করতে পারিনি, সাহায্য করতে পারিনি, যদিও আমার রিক্সাওয়ালা মহা আনন্দে বলছিল, স্যার সবাই যদি আপনার মত করে ভাবত। রিক্সাওয়ালাকে বললাম মায়া, মমতা, ভালবাসা, স্নেহ, প্রেম, দেশাত্মবোধ সবার ভিতরই আছে, এককজনের প্রকাশ একেকরকম। পৃথিবীতে ভালমানুষের সংখ্যাই বেশি, না হলেতো পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যেত। সমাজে অন্যায় – অবিচার হলেই দেখি শত কোটি মানুষ প্রতিবাদ করে। আর এই প্রতিবাদগুলো আমরা আজ ফেসবুকে বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পারছি ও নিজেদের মতামত দিচ্ছি। যে কটা সোয়েটার ছিল তা বিলি করে চলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করেই বাম দিকে, আমার বাম হাতটা ঠান্ডা একটা হাত আমার হাতকে জড়িয়ে ধরল, বাবা, আমারে একটা সোয়েটার দিয়া যা, স্বামী মরছে, সবকয়টা পোলাপান আমারে ফালাইয়া গেছে, এই হাইকোর্ট মাজারের আশে পাশে বাইচা আছি রে বাপ, আল্লায় আমারে বড় ভালবাসে, নেয়নারে বাপ, নেয় না। ওনার আর্তোনাদ, ওনার কষ্ট, যেন এক সন্তান তার মায়ের জন্য কষ্ট অনুভব করল। রাত প্রায় ১২ টা মানে, একটু পরই ১৬ ই ডিসেম্বর’ ৭১, চারিদিকে আলো আর আলো, শিশু একাডেমির আলো, শাহাবাগের আলো, জাদুঘরের আলো, সচিবলয়ের আলো, এল ই ডি, এর আলোতে লাল, সবুজ রংয়ে যেন সব আলোকিত, জানি এ আলো বিজয় দিবসের আলো যা বাংলাদেশের সবার মনের ভিতর আছে, যা সবাইকে আলোকিত করে। সবার এই আলোতে ভাসিয়ে দিলাম নিজেকে, অত রাতে বড় কিছু করতে পারব না, ছোট একটু কিছূতো করতে পারব, একজন মাকে তো শীতের করাল ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে পারব, খুলে দিলাম নিজের গায়ের লাল টকটকে সোয়েটারটা, কি আনন্দে – কি তৃপ্তিতে মা আমার সে সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে নিল। এ ভাললাগার, এ ভালবাসার, কি কোন মূল্য আছে, দেয়া যাবে । এমন মা, বোন, বাবাসহ অসহায় হাজারো লক্ষ মানুষ দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত, হাজারো শীতার্ত হাত আজও আমাদের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে, একটু কষ্ট, একটু বুদ্ধি, একটু মানবতা থাকলে কিন্তু আমরা সবাই সবাইকে সাহায্য করতে পারি। জানি তা আছে, চলুননা আজই একটি মোমের আলো নিয়ে পথে নেমে পরি, জ্বলে উঠুক না হাজার হাজার মোমের আলো, ঘুচে যাক না সকল আঁধার, এখানেই মানবতা, এখানেই মানবতার জয়, এখানেই যে প্রকৃত দেশাত্বপ্রেমের বিজয় নিহিত।

স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস
প্রতিটি বাঙালির বুকে নিহিত
বাংলার আনাচে কানাচে
অন্যায়- অত্যাচার হোক একেবারেই নিগৃহিত।

স্বাধীনতা আনা যতনা সোজা
রক্ষা করা সে যে আরো কঠিন
মানুষ, মানবতা যেন স্বাধীন দেশে ব্যথা না পায়
তবেই দেশ হবে প্রতৃক স্বাধীন।

“মানবতার জাগরণে ছোট্ট প্রয়াস।”

“বড় ভালবাসি মা-বাবাকে, সম্মান করি গুরুজন ও দেশকে আত্মোৎসর্গে বলিয়ান আছি, দেশের যে কোন প্রয়োজনে।”


***************************
লেখক: মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK