মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
Wednesday, 06 Dec, 2017 12:17:11 pm
No icon No icon No icon

আমার কিছু কাজের ইতিহাস-৩৪


আমার কিছু কাজের ইতিহাস-৩৪


প্রবীর বিকাশ সরকার: মানসদা জানতেন আমি কলকাতায় যাচ্ছি। ওয়েলকাম জানিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, এখনই চলে এসো! আমি আর তোমার বৌদি তো রেডি হয়ে আছি তোমাকে পাওয়ার জন্য! চলে এসো! এলে সব কথা হবে। ফ্রিজে সব রেডি আছে! 
মানসদা খুব মজার মানুষ আগেই বলেছি, মুক্তচিন্তক, আধুনিক মানুষ। তাঁর পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের। কাজেই পূর্ববঙ্গের মানুষ পেলে কথাই নেই! কৌশিকদেরও পূর্বপরুষ পূর্ববঙ্গের। কলকাতার ৯০ শতাংশ মানুষই তো পূর্ববঙ্গের! কলকাতাকে গড়েছে পূর্ববাংলার বাঙালরাই। কাজেই কলকাতা তো আমাদেরই! দূরের কিছু নয়। 
আমি বললাম, আজ শনিবার, আগামীকাল রোববারেই যাবো। আর মাত্র একদিন। 
বললেন, ঠিক আছে। রোববারে চলে এসো বিপুলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে অপেক্ষায় আছি!
কথামতো রোববারে সকালবেলা বিপুলকে নিয়ে হাজির হলাম চমৎকার সাজানো গোছানো শহর সল্টলেকে। খুব ভালো লাগলো জায়গাটি। অনেক নাম শুনেছি। এখানেই নির্মিত হচ্ছে ‘ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র’ জাপানশীর্ষ রবীন্দ্র-গবেষক অধ্যাপক কাজুও আজুমার নেতৃত্বে। তারই কাজ পরিদর্শন করার জন্য গতবার গিয়েছিলাম আজুমা স্যারের প্রতিনিধি হয়ে। সেটাই আমার কলকাতা তথা ভারতে প্রথম ভ্রমণ। বাঙালির শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত-রাজনীতি তথা বাঙালি -সংস্কৃতির রাজধানী কলকাতাকে দেখে মিশ্র অনুভূতি হয়েছিল! সেই কোন্ শৈশবে কলিকাতার নাম শুনেছি মার মুখে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের মুখে---যা ছিল স্বপ্নের মতো! সেই স্বপ্ন জয় করতে পেরে দারুণ আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেছিলাম! আবার ভীষণ নোংরা দেখে বিস্মিতও হয়েছিলাম! কয়েকটি এলাকা অবশ্য আধুনিকতার আলোয় ঝলমল করে উঠছিল। মোট ছ’বার ভ্রমণ করেছিলাম কলকাতা যেসব অম্লমধুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সবই লিখেছি ‘আমার দেখা কলকাতা’ দীর্ঘ স্মৃতিকথায়। এখানে আর বলতে চাই না।
মানসদার বাসায় গিয়ে কী যে দারুণ আনন্দ হয়েছিল যা কোনেদিন বিস্মরণের উপায় নেই! বৌদি যেমন স্মার্ট, শিক্ষিত এবং অমায়িক ব্যবহার তা আমাকে ও বিপুলকে অভিভূত করেছে! নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছেন। আর মানসদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ভারতীয় বিয়ার দিয়ে! অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আমরা আড্ডা দিয়েছি কয়েক ঘণ্টা! সব শুনে মানসদা বললেন, দাঁড়াও। তোমার সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছি এখনই। তিনি কাকে যেন ফোন করলেন মোবাইল থেকে এবং কথা বললেন। তারপর ফোন ছেড়ে বিপুলকে বললেন, তুমি স্বপ্না প্রিন্টার্স নামে একটি প্রেস আছে বারাসাতের কাছে মধ্যমগ্রামে তুমি চেনো নাকি? সেটা কাছে হবে কলকাতার চেয়ে। 
বিপুল হেসে বললো, সেটার কথাই বলতে চাচ্ছিলাম আপনাকে! আমি গিয়েছিলাম। ম্যানেজার অলোকবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তিনি প্রতি কপি ৫৮ রুপি চান। 
মানসদা বললেন, ও চাইবেই। প্রবীর, ৫০ হলে কোনো আপত্তি আছে? 
আমি বললাম, আমিও তাই ভাবছিলাম। কোনো আপত্তি নেই। 
---ওকে। তাহলে ৫০ রুপিতেই কাজ হবে। মেটার রেডি করে চলে যাও। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। অলোক আমাদেরই লোক। কোনো সমস্যা হবে না। 
শনিবার রাতেই আমি ইলাস্ট্রেটরে ফরমেট তৈরি করে রেখেছিলাম। কিছু লেখা নিয়ে এসেছিলাম সেগুলো আলাদা হার্ড ডিস্ক থেকে বের করলাম। তারপর কি কি লেখা দেয়া যায় খসড়া করলাম। শিহাবকে কি কি লেখা দরকার একটা তালিকা লিখে মেইল করলাম আপাতত। ৪৮ পৃষ্ঠার ম্যাগাজিন লেখা তো প্রচুর দরকার যেহেতু বিজ্ঞাপন নেই! বিপুল বেশ রাত পর্যন্ত আমাকে সঙ্গ দিল। তার উত্তেজানায় ঘুম নেই! ও কখনো দেখেনি পিসিতে কীভাবে পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের লেআউট করতে হয় এবার দেখার খুব ইচ্ছে।
সাত দিন আর কোথাও বের হলাম না ‘মানচিত্র’র কাজ করি আর বিয়ার পান করি ছাদের ওপর গিয়ে লুকিয়ে কারণ তার স্ত্রী শিল্পী একদম পছন্দ করে না মদপানি। উত্তেজিত বিপুল বিস্ময়ভরা চোখে দেখছিল রাত জেগে জেগে মানচিত্র কীভাবে তৈরি করছি এমএস ওয়ার্ড, ইলাস্ট্রেটর, ফটোশপ আর ইন্টারনেট থেকে তথ্য ও ছবি ডাউনলোড করে। যেদিন কালার প্রিন্ট আউট করে অর্ধেক মেটার তাকে দেখালাম সেদিন সে কী উল্লাস তার! বার বার বলছিল, দারুণ কাজ প্রবীরদা! দারুণ কাজ! কী কাজ জানেন আপনি---এই ঘরে বসেই ৫২ পৃষ্ঠার একটি কাগজ একাই তৈরি করে ফ্যালছেন! অবিশ্বাস্য লাগছে আমার কাছে! ডিজাইনও হয়েছে জব্বর! 
আমি বললাম, হে। এবার পাল্টে ফেলেছি ‘মানচিত্র’র লেআউট! অন্যরকম একটা আউটলুক দেবার চেষ্টা করছি। গিঞ্জি বা ঠাসা নয় যথেষ্ট নিঃশ্বাস ফেলার জানালা রাখছি। ভালো লাগবে পাঠকের আশা করি। আসলে কালারফুল কাজ হলে লেআউট করতে দারুণ মজা লাগে! 
---ভালো লাগবে না মানে কী বলছেন! আলবৎ লাগবে! বিপুলের উত্তর। 
আমি বললাম, ইচ্ছেটাই বড় কথা বিপুল! ইচ্ছে থাকলে নানাভাবেই কাজ করা যায়। সেইসঙ্গে উন্নত রুচিবোধ আর চ্যালেঞ্জিং পাওয়ার থাকতে হবে। জাপান হচ্ছে সেই দেশ তুমি কিছু খোলা মন নিয়ে করতে চাইলে পারবে। জাপানিরা উদার মনে সহযোগিতা করবে। কোনোকিছু তারা শুরু করলে শেষ না করে ছাড়ে না! আমরা বাঙালিরা পারি না। পেছনে টেনে ধরে, এগুতো পারি না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। 
---হে প্রবীরদা। আপনার কষ্ট আমি অনুভব করি। জাপানে এত কাজ করেছেন কোনো মূল্যায়নই আপনার হয়নি! খুব দুঃখজনক! 
আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, পুরস্কার, মূল্যায়ন ইত্যাদির জন্য তো আর কাজ করি না। কাজ করি ভালো লাগে বলে, আনন্দ পাই বলে। মেটার তৈরি করতে করতে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম প্রেস থেকে ফোন আসার। দু-তিনদিন পর বিপুলের কাছে এক বিকেলে ফোন এলো, ৫০ রুপিতেই রাজি অলোকবাবু। মেটার কবে দেয়া হবে জানতে চাইলেন। বুঝলাম মানসদা রাজি করিয়েছেন। বিপুলকে বললাম, বলো, আগামীকালই যাবো আলাপ করার জন্য। 
বিপুল তাই বললো। আমি বললাম, এক কাজ করো জসীমকে ফোন করে বলো এত টাকা লাগবে। দ্রুত পাঠাবার জন্য।
পরের দিন প্রেসে যাওয়ার পর ম্যানেজার অলোকবাবুর সঙ্গে পরিচয় এবং আলাপ হলো। খুব দিলখোলা মানুষ। কথায় কথায় জানালেন, ঢাকায় মাঝেমাঝে যাওয়া হয়। পূর্ববঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিশাল বড় জায়গা নিয়ে প্রকল্প! অনেকগুলো মেশিন, জাপানি মেশিনও আছে। হাইডেলবার্গ ও ভারতীয় মেশিনই বেশি। ২৪ ঘণ্টা কাজ হচ্ছে। চা-পর্বে জানতে পারলাম, এখানে আনন্দমেলা, সানন্দা, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দি টেলিগ্রাফ পত্রিকার কালার সাপলিমেন্টগুলো ছাপা হয় রোটারি মেশিনে। আনন্দ পাবলিশার্সের বইও ছাপা হয়ে থাকে এখানে। দারুণ অ্যাপায়ন করলেন কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে। জাপানের কোয়ালিটিফুল কাজ সম্পর্কে তাদের ধারণা আছে জানতে পেলাম। জাপানি কাজও হয় এখানে মাঝেমধ্যে। কাজেই ‘মানচিত্র’ও যত্ন নিয়ে জাপানি মেশিনেই ছাপা হবে। জাপানের মতো শতভাগ না হলেও ৮০ ভাগ ভালো কাজ হবে বলে আশ্বাস দিলেন অলোকবাবু। শিগগিরই মেটার দিয়ে যাবো আমি বললাম।
জসীমকে ফোনে সব জানালাম। সে বললো টাকা আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে খোঁজ নেয়ার জন্য। সে কাগজ পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে অধীর হয়ে! মেইলে মেটার পিকচার করে পাঠিয়েছিলাম দেখে খুব আনন্দিত হয়েছে।
যাহোক, সম্পূর্ণ মেটার তৈরি হলো দশ দিনের মাথায়। কিছু অন্য কাজ ছিল সেগুলোও করতে হয়েছে। প্রিন্টআউট করে ডামি তৈরি করে বিপুলের হাতে দিলাম। সে চোখ বড় বড় করে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখছিল আর দারুণ হয়েছে! দারুণ হয়েছে বলছিল!
মেটার পেন ড্রাইভে করে প্রেসে দিয়ে আসার এক সপ্তাহ পরে ‘মানচিত্র’ কাগজ বান্ডিল বান্ডিল গাড়িতে করে দিয়ে গেল বিপুলের বাসায়। সেদিন কলকাতার কাজ সেরে বাসায় ফিরে কাগজ দেখে ভালো লাগলো। রং কোথাও মার খায়নি। তবে কাটিংটা ভালো হয়নি। বিপুল তো কাগজ পেয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়তে লেগে গেল দিকবিদিক ভুলে! উত্তেজনায় তার মুখ তখন দেখার মতো ছিল! আর সেটাই হৃদয় দিয়ে অনুভব করলাম আমি!
রাতে স্কুলের দোতলায় যে রুমে মাঝেমাঝে আমি থাকতাম সেখানে দুজনে কিং ফিসার বিয়ার খুলে সেলিব্রেট করলাম। গভীর রাত পর্যন্ত নানা কথা বললাম। পরবর্তী মানচিত্র কেমন হবে! আসলেই জসীম চালিয়ে যাবে কিনা এই সন্দেহও বিপুল করেছিল।
এবং তার কথা এবং আমার স্ত্রী নোরিকোর কথাই সত্যি হয়েছিল। টোকিও ফিরে দ্বিতীয় সংখ্যাও করে দিয়েছিলাম ‘আমাদের মানচিত্র’ নামে ঢাকায় ছাপা হয়েছিল। এবং বাজে ছাপা হয়েছিল। আমি দমে গেলাম। জসীমকে কিছু বললাম না। কারণ খুব সাড়া ফেলেছিল নবযাত্রার ‘মানচিত্র’ সেটা সে আনন্দচিত্তে উপভোগ করছিল! কিন্তু তৃতীয় সংখ্যার কাজ যখন ধরেছিলাম তখন জানালো ঢাকায় সমস্যা হয়েছে। তার বড় বোন রাজি নয় জসীম কোনো কাগজ প্রকাশ করুক! কারণ আর জিজ্ঞেস করিনি এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। বুঝলাম পারিবারিক ঝামেলা হয়েছে। হতেই পারে। পিতৃমাতৃহীন জসীমের অভিভাবক হচ্ছেন বড় বোন, তাঁর কথা শোনা অবশ্যই উচিত। এভাবে ‘মানচিত্র’ নবযাত্রায় হোঁচট খেয়ে বন্ধ হয়ে গেল। শুনে বিপুল স্তদ্ধ হয়ে গেলেও বললাম, তোমার সন্দেহই সঠিক ছিল। ভালোই হলো, এবার দুরন্ত তেজে শিশুপত্রিকার কাজটি হাতে নেব।চলবে

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK