বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
Friday, 13 Jul, 2018 12:41:53 pm
No icon No icon No icon

ক্রোয়েশিয়া দেশটি কেমন?


ক্রোয়েশিয়া দেশটি কেমন?


ক্রোয়েশিয়া দলটির খেলোয়াড় ও তাদের খেলা সম্পর্কে অনেকেই জানি। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া দেশটি সম্পর্কে জানি কি? জানলেও কতটুকু? আজ জানাবো ‘ক্রোয়েশিয়া’ দেশটি কেমন?লিখেছেন জয়িাউদ্দীন চৌধূরী(জডে সেলিম)।
জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা :ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ ক্রোয়েশিয়া। দেশটির রাজধানী জাগ্রেব। ইউরোপের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত এই জায়গাটির সরকারি নাম রিপাবলিক অফ ক্রোয়েশিয়া। প্রায় হাজারেরও বেশি নানা আকৃতির দ্বীপ রয়েছে ক্রোয়েশিয়ার উপকূলে। তবে এর আশপাশে শুধু জল আর জল। সেখানকার অপূর্ব সুন্দর দ্বীপগুলি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ক্রোয়েশিয়ার আয়তন ৫৬ হাজার ৫৪২ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বে দেশটির অবস্থান ১২৬তম। ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যা ৭১ লক্ষ ৭১ হাজারের কিছু অধিক। ক্রোয়েশীয় দেশটির সরকারি ভাষা। ভাষাটি রোমান বা লাতিন লিপির একটি পরিবর্তিত সংস্করণে লিখিত হয়। একই ভাষা সার্বিয়াতে সার্বীয় ভাষা, বসমিয়াতে বসনীয় ভাষা নামে পরিচিত, এদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। ক্রোয়েশিয়ার স্বল্প-প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালীয়, হাঙ্গেরীয় এবং আলবেনীয় ভাষা। তবে এগুলো সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয় না।

ক্রোয়েশীয় ভাষার দুইটি প্রধান উপভাষা হল একাভীয় উপভাষা এবং ইয়েকাভীয় উপভাষা। এদের মধ্যে ইয়েকাভীয় উপভাষাটিতেই ক্রোয়েশিয়ার অধিকাংশ জনগণ কথা বলেন। দেশটিতে ক্রোয়েশীয় ভাষাভাষীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ। এছাড়া সার্বীয় ভাষায় প্রায় ৪৫ হাজার, ইতালীয় ভাষায় ২০ হাজার, আলবেনীয় ভাষায় ১৪ হাজার এবং হাঙ্গেরীয় ভাষায় প্রায় ১২ হাজার লোক কথা বলেন।

ক্রোয়েশিয়ার রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোতে পরিচালিত হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী একটি বহুদলীয় ব্যবস্থাতে সরকার প্রধান। এখানে নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ক্রোয়েশীয় সংসদ বা সাবরের হাতে ন্যস্ত। দেশটির বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন বিভাগ হতে স্বাধীন। ক্রোয়েশিয়ার বর্তমান সংবিধান ১৯৯০ সালের ২২শে ডিসেম্বর গৃহীত হয়। দেশটি ১৯৯১ সালের ২৫শে জুন প্রাক্তন ইউগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

ক্রোয়েশিয়ার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্লিটভাইসার সিন। এখানে ১৬টি লেক একটির পর একটি ছোট ছোট ঝর্ণা দিয়ে যেন এক সারিতে সাজানো। মনে হবে কাজটি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে করা হয়েছে। কিন্তু তা পুরোপুরি প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের একটি স্থান। এখানে গিয়ে নৌকায় করে ঘুরতেও পারেন ভ্রমণপিপাসুরা। তাছাড়া সমুদ্র পছন্দ করেন না, এমন মানুষ মনে হয় পৃথিবীতে কম। তাই কম খরচে সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে, ক্রোয়েশিয়া হবে আপনার নির্দিষ্ট ঠিকানা। কেননা ক্রোয়েশিয়ার অসাধারণ দৃশ্যগুলো মন কাড়বেই।

ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভের পরেই আধুনিককালের ক্রোয়েশীয় ফুটবল দল ১৯৯১ সালে গঠন করা হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে ফিফা ও উয়েফার সদস্যপদ লাভ করে ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবারের মতো বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশ নিয়ে তারা তাদের সক্ষমতা প্রদর্শন করে ও ১৯৯৬ সালের উয়েফা ইউরো প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

ক্রোয়েশিয়ায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যা সর্বাধিক, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশ। এছাড়াও দেশটিতে ইসলাম, কোনো ধর্ম পালন করে না এমন মানুষসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। এছাড়া শিল্প সাহিত্য ও খাদ্য অভ্যাসেও দেশটির রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য।

এছাড়া এখন ফুটবলে কী নেই দলটিতে! আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মার চেয়েও শক্তিশালি মিডফিল্ড যদি কোনো দলের থাকে তো সেটি হচ্ছে ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বসেরা দুই ক্লাব বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের দুই সেরা মিডফিল্ডার হচ্ছেন ইভান র্যাকিটিক এবং লুকা মদ্রিচ। যারা দু’জনই ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলার। সঙ্গে মাতেও কোভাচিচ, ইভান পেরিসিকের মত মিডফিল্ডার রয়েছেন এই দলটিতে। মিডফিল্ড যাদের যত বেশি শক্তিশালী, দলটাও তত শক্তিশালী।

শুধু মিডফিল্ড, আক্রমণেও রয়েছেন সেরা তারকা। জুভেন্টাসের মারিও মানজুকিক, এসি মিলানের নিকোলা কালিনিকরা রয়েছেন। ডিফেন্সে ডিজান লোভরেন, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সিমে ভারসালকো, সাম্পদোরিয়ার ইভান স্ট্রিনিকরা রয়েছেন। ক্রোয়েশিয়াকে যদি কেউ বিশ্বকাপের ফেবারিট বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়, তাহলে সেটা মোটেও ভুল হবে না। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জন্য দারুণ সমস্যা তৈরি করতে পারে জ্লাটকো ডালিকের শিষ্যরা।

ফুটবল আকাশে ক্রোয়েশিয়ার উদয় যেন ধুমকেতুর ন্যায়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্রথমবার এসেই সেমিফাইনাল খেলেছিল পূর্ব ইউরোপের দেশটি। ডেভর সুকার জিতেছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা গোল্ডেন বুটের পুরস্কার। ক্রোয়েশিয়ার হঠাৎ এই উত্থানে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন অনেক ফুটবলবোদ্ধা। ১৯৯১ সালে পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নতুন স্বাধীনতা পাওয়া ক্রোয়েশিয়াকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আগেও বাংলাদেশের মানুষ চিনতো না বললেই চলে।

কিন্তু এই এক বিশ্বকাপের বিশ্ববাসী জেনেছে ক্রোয়েশিয়া নামেও একটি দেশ আছে। তবে হ্যালির ধুমকেতুর মতো হঠাৎ উদয় হয়ে আবার যেনো হারিয়ে গিয়েছিল দেশটি। ফিফা র্যাংকিংয়ে বরাবরই উপরের দিকে অবস্থান। কিন্তু মাঠের খেলায় উজ্জ্বল না হলেও বিশ্বকাপে অন্যতম শক্তিশালী একটি দল হিসেবেই পরিচিত ক্রোয়াটরা। 

মূলত ১৯৪৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যুগোস্লোভিয়ার অংশ হিসেবেই খেলতে হয়েছে ক্রোয়েশিয়াকে। যুগোস্লোভিয়া থেকে স্বাধীনতা অর্জনের কিছুকাল আগেই ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দল গড়ে ওঠে ১৯৯১ সালে। ১৯৯৩ সালে লাভ করে উয়েফা এবং ফিফার সদস্যপদ। এরপর ১৯৯৬ সালে ইউরো চ্যাম্পিওয়নশিপে প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেয় দেশটি। বিশ্বকাপে অভিষেক ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে এবং অভিষেকেই বাজিমাত। সেমিফাইনালে খেলার পর তারা বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে হয়েছে তৃতীয়। ২০১০ সালে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশের মধ্যে থাকলেও বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি। ২০১৪ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে প্লে-অফ খেলে ব্রাজিলের টিকিট কাটতে হয়েছিল তাদেরকে। রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের জন্যও তাদের খেলতে হয়েছিল প্লে-অফ। তাদেরকে পেছনে ফেলে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আইসল্যান্ড। প্লে-অফে গ্রিসকে ৪-১ গোলে হারিয়ে নাম লেখায় রাশিয়া বিশ্বকাপে।

স্বাধীন ক্রোয়েশিয়া দল গঠন করার পর এত দ্রুত দলটির উত্থান ঘটেছে যে, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তাদের বলা হতো ‘বেস্ট মোভার অব দ্য ইয়ার।’ কলম্বিয়ার পর দ্বিতীয় দল হিসেবে ফিফার দেয়া এই খেতাব জিতেছে শুধু ক্রোয়েশিয়াই। এর কারণ, ফিফা র্যাংকিংয়ে ক্রোয়েশিয়া ছিল ১২৫তম স্থানে। চার বছরের ব্যবধানে এই দলটিই র্যাংকিংয়ে দখল করে নিয়েছিল তৃতীয় স্থান।

১৮৭৩ সালে ক্রোয়েশিয়ান শহর রাইজেকা ও জুপাঞ্জার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করতেন ইংরেজরা। তাদের মাধ্যমেই ক্রোয়াট অঞ্চলে প্রথম ফুটবলের পরিচিত ঘটে। ১৮৯৬ সাল থেকেই মূলতঃ দেশটিতে ফুটবলের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। ১৯০৭ সালে এসে প্রথম ফুটবল ক্লাব গড়ে ওঠে এবং আধুনিক ফুটবলের নিয়ম-কানুন প্রকাশ করা হয়।

এরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধসহ নানা রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯১ সালে নতুন করে পথ চলা শুরু করে ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল। ১৯৯৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই মূলতঃ ক্রোয়শিয়ার সোনালি প্রজন্ম গড়ে ওঠে এবং এ দলটিই ইউরোপ কাঁপাতে শুরু করে। যদিও এর পর গতানুগতিক প্রক্রিয়াতেই চলছে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল। ২০১২ সালে এসে দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্বে আসেন সর্বোচ্চ গোলদাতা ডেভর সুকার। এরপরই ক্রোশিয়ান ফুটবলের পালে আবার হাওয়া লাগতে শুরু করে। বেশ কিছু ফুটবলার নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের সেরা লিগগুলোতে নিজেদের আসন তৈরি করে নেয়।

২০১০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি। এক আসর অনুপস্থিত থাকার পর ২০১৪ বিশ্বকাপে আবারও ফিরে আসে তারা। যদিও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয় ব্রাজিল এবং মেক্সিকোর কাছে হেরে। সেবার লুকা মদ্রিচ আর ইভান র্যাকিটিকরা ছিলেন অপরিণত। চার বছরের ব্যবধানে এবার তারা অনেক বেশি পরিণত এবং নিশ্চিত- ডেভর সুকারের রেখে যাওয়া ক্রোশিয়ান ঐতিহ্য আবার তারা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK