রবিবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৮
Thursday, 11 Jan, 2018 12:23:13 am
No icon No icon No icon

'২০১৭' সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণে ধর্ষণ ..!


 '২০১৭' সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণে ধর্ষণ ..!


এস.এম.নাহিদ : বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরের দিন সকাল ১০টা পর্যন্ত অস্ত্র ঠেকিয়ে দুই বান্ধবীকে আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ বিদায়ী ২০১৭ সালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনার ৩৯ দিন পর বনানী থানায় মামলা করতে গেলে প্রথম দফায় ভুক্তভোগী ওই দুই বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীকে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরের দিন সন্ধ্যায় পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে বনানী থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়। তার একদিন পর তরুণীদেরকে হাসপাতালে পাঠানো হয় শারীরিক পরীক্ষার জন্য।এ নিয়ে দেশ জুড়ে ব্যপক তোলপাড়ের মধ্যে মামলা দায়েরের পাঁচ দিন পর আসামি সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে সিলেট থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ সদর দফতরের বিশেষ দল। পরে অবশ্য মামলার বাকি আসামিদেরকেও গ্রেফতার করা হয়। 
শুধু রাজধানীতে নয়, বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের নেতা তুফান সরকার এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর মা ও ভুক্তভোগী মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনাও কাঁপিয়েছে সারা দেশ। তুফান সরকার ও তার সহযোগীরা এসএসসি পাস এক ছাত্রীকে ভালো কলেজে ভর্তি করার কথা বলে গত বছরের ১৭ জুলাই শহরের নামাজগড় এলাকায় তাদের বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে এ ঘটনা কাউকে না জানাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। ধর্ষণের ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তুফান সরকারের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া আক্তার রুমকিসহ কয়েকজন মিলে ওই ছাত্রী ও তার মাকে বেধড়ক পিটিয়ে মাথা ন্যাড়া করে দেন।পরে এ ঘটনায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে তুফান, রুমকি ও আশাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী কিশোরীর মা। মামলা করার পর রাতেই পুলিশ মূল আসামি তুফান, তার সহযোগী রূপম, আলী আজম ও আতিকুর রহমানকে গ্রেফতার করে।

আলোচিত এ সব ঘটনা ছাড়াও বছরজুড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে গত চার বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আর ধর্ষণের ঘটনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় চার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তুলনামূলক এক অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬ শত ৫০টি। ২০১৪ সালে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬শত ৩৫টি। ২০১৫ সালে ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৯শত ৩০টি, ২০১৬ সালে তা হয়েছিল ৩ হাজার ৭শত ২৮টি। আর ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৯শত ৯৫টি। চার বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় মোট মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯শত ৯৮টি। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালে গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ও মামলা দায়ের করা হয়েছে। 
আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৬৯ জন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৪ জন এবং ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৮০ জন নারীকে। 
ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের দেশে অন্যান্য বছরের তুলনায় বিশেষ করে ২০১৭ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়া অবশ্যই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ভয়ানক চিত্র ও সতর্কবাণী। 

এটিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মূলত তিনটি বিষয় এই ধর্ষণের ঘটনার পেছনে দায়ী। প্রথমটি হলো- প্রযুক্তির অপব্যবহার। অতি সহজে যৌন ছবি, উত্তেজক ভিডিও পাওয়া যায়। ফলে ধর্ষণের নৈরাজ্যকতা বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- পুঁজিবাদের ফলে মানুষের মধ্যেকার যে অস্থিরতা। মানুষের মধ্যেকার যে দূরত্ব, মানুষের প্রতি পারস্পারিক সম্মানবোধ, লিঙ্গভেদে মানুষের প্রতি যে সহনশীল আচরণ- তা অনেকটাই কমে গেছে। আর একইসঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। আর তৃতীয়টি হলো- ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের ক্ষেত্রে এক প্রকার শিথিলতা আমরা লক্ষ্য করি। এটা থেকে বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়। ধর্ষণের দ্রুত বিচার যখন না হয়, তখন এটি আরও একটি ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী। এই সকল বিষয়গুলো যদি সরকার বা রাষ্ট্র মাথায় রেখে কাজ করে, তবে ধর্ষণের ঘটনা অনেকটা কমে যেতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদেরকে রক্ষা করবে, তারা যেন আইনের ভিত্তিতেই অধিকার প্রয়োগ করে। কিন্তু আমরা দেখি যে, এই ক্ষেত্রে অনেকটা শিথিলতা দেখা যায়। এই সমস্ত বিষয়ে সমাজের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, প্রশাসন এবং পুলিশ অনেক সময় এই ঘটনাগুলোকে সমঝোতা করতে বলে বা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। একটি ধর্ষণের ঘটনা এমন এড়িয়ে যাওয়ার মানে হলো আরেকটি ঘটনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়তা করা। আর এই কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো এমন ঘটনার সাথে সাথেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’

গত ৮ জানুয়ারি সোমবার দুপুরে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে টুইট করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। টুইটে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘মহিলা পরিষদ বলছে, ২০১৭-এ ১ হাজার ২৫১ জন মা, বোন ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে, গ্যাংরেপ (সংঘবদ্ধ ধর্ষণ) হয়েছে ২২৪ জন, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ৫৮ জন! আইনশৃঙ্খলার এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ও নারী সম্ভ্রম লুন্ঠনের ঘটনায় আমি নির্বাক। জনগণের রক্তের টাকায় অনির্বাচিত মাথাভারী সরকার বাস্তবে অনবরত তাদের অধিকারকে পদদলিত করছে।’

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK