বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮
Tuesday, 26 Dec, 2017 12:06:44 am
No icon No icon No icon

কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহিতা কি কেবল চিকিৎসকদের?


কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহিতা কি কেবল চিকিৎসকদের?


মৌরি মুসতারি: রোগী দেখছি, দরজার সামনে মোটামুটি ভিড়। কেউ থাই গ্লাস দরজা সরিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, অথচ ভিতরে একজন ৩৬ বছরের নারী, PLID এর চিকিৎসা চলছে। বারবার নিষেধ সত্ত্বেও কাজ হচ্ছে না, ভিতর থেকে শুনতে পাই, “জোয়ান ছেমরি ডাক্তার তো, তাই ভাব বেশি মনে হয়। ত্যাজ দেখছিস, ধমক লাগায় আবার। এম. ডি ম্যাডাম কে ফুন লাগা তো।” কই ব্যংকের লম্বা লাইনে যখন দাঁড়িয়ে থাকি তখন তো কোনদিন কারো অভিযোগ করতে শুনলাম না। অথবা যেকোনো কাস্টমার কেয়ারে তো ১/২ ঘন্টা সুন্দরমতো টোকেন নিয়ে বসে থাকি, তখন তো কেউ ম্যানেজারকে ফোন দেয় না।


প্রায় রোগী এসে বলে, “ম্যাডাম, ওই যন্ত্রটা একটু বেশি সময় ধরে দিয়েন, ওটাতেই আসলে কাজ হয়।” “ইউটিউবে এটার ট্রিটমেন্ট দেখেছি, আপনি এটাই করবেন।” আমি বলি, “ভাই, আপনার পেশা কি??” “ইঞ্জিনিয়ার।” “আমার বাসা কোনদিন বানালে আপনাকে ডাকবো। ইটের বদলে ককশীট দিয়ে গাঁথুনি দিবেন, ঠিকাছে। ডাক্তার হইছি বলে কি ইঞ্জিনিয়ারিং জানবো না?? এত খ্যাত নাকি আমি??”

আর্থ্রাইটিস এর জন্য হাঁটু ব্যথা হলে ঘরের কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই যেমন- হাঁটু ভাজ না করা, সিড়িতে উঠা-নামার সাবধানতা, নামাজের নিয়ম, ছোট উচ্চতার টুলে না বসা, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসা না থাকা। এতগুল উপদেশ দেবার পর রোগীর প্রশ্ন, ‘আমার ছাদে বাগান আছে, প্রতিদিন ২ বেলা ১ ঘন্টা করে নিচে বসে পানি দেই, পাতা কাটি, সার দেই, পারবো না এগুলো করতে?? আপনি যদি এগুলোই করতে না দেন তাহলে আপনার কাছে আসবো কেন? সিংগাপুরে গেলেই আসলে ভাল হত।” আচ্ছা, আপনারা কি ডায়েটিশিয়ান এর কাছে যেয়ে বলেন, রোজ এক্সট্রা চিজ বার্গার খাই ৩ বেলা, এটা কিন্তু খাবই, আমার ডায়েট প্ল্যান দিন, ৩ মাসে যেন ৩০ কেজি কমি।

অনলাইন গার্লস গ্রুপগুলো বা অন্যান্য গ্রুপ দেখেছেন কখনো? “আঙুলে ঘা হয়েছে আম্মুর, ডাক্তার কেউ থাকলে বলুন না কি ওষুধ দিব?” “হাতে র‌্যাশ উঠেছে, ছবিটা দেখে বলুন না আমার কি রোগ হয়েছে?” “বাবুর হাগু ২ দিন যাবত কালো রংয়ের হচ্ছে আপুরা, কি খাওয়ালে ঠিক হবে?” “স্ট্রোক রোগিকে কিভাবে বসাবো, ফিজিওরা একটু ভিডিও দেন না।” বলুন তো কেন আমরা পরামর্শ দিব? এরকম সিরিয়াস কেস ফেবুতে বসে সমাধান নেবার সময় আছে কিন্ত মা-বাচ্চাকে হাসপাতালে নেবার সময় নেই?? আর ডাক্তাররা উত্তর না দিলে, এরা খারাপ। কেউ তো আবার ইনবক্সে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে, এক রোগ সারলে আরেক রোগ, তারপর বাবার রোগ, মায়ের রোগ, প্রতিবেশীর রোগ। কেউ কখনো ফেবুতে আর্কিটেক্ট এর কাছে জিজ্ঞেস করেছেন, আমার বাসার ডিজাইন করছি আমি, আর্কিটেক্ট থাকলে বলুন না বারান্দা কয় ফুট রাখবো?

“এখানে সিনিয়র কেউ নাই, আপনি মনে হচ্ছে ইন্টার্নশিপ করছেন।” “জি না, আমার ইন্টার্নশিপ শেষ, ২ বছর আগেই।” “আপনি বুঝবেন কিনা?? আমার অসুখটা কিন্ত খুব রেয়ার, ইন্ডিয়াতেও ডাক্তারের রোগ ধরতে সময় লেগেছে। বড় ডাক্তার হলে ভালো হত।” উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, যে প্লেনে করে উনি ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন, পাইলটের বয়স জেনে নিয়েছিল তো? নাকি বয়স খালি ডাক্তারের জানতে হয়?

আব্বু চক্ষু বিশেষজ্ঞ, রাত-বিরাতে রোগী দেখতে যাওয়া নতুন কিছু না। সেদিন ও তো রাত ৩টায় পাশের দর্জির চোখ দেখে আসলো। কিন্ত ঈদের ১ সপ্তাহ আগে তার দোকানে গিয়েও যে আমি ঈদের পোশাক বানাতে পারলাম না।

ডাক্তার বেশি টেস্ট দিলে নাকি কমিশন মারে। আর পার্লারে ভ্রু-প্লাক করতে গেলে, “আল্লাহ, আপনার চুল রাফ হয়ে গেছে হেয়ার স্পা করতে হবে। ইশশ মুখেও ব্রণ, ফেসিয়াল তো মাস্ট। নখগুলো শাইনিং না মোটেও, ম্যনিকিউর না করলে হবে?” নিজের এমন বেহাল দশা দেখে শেষমেশ ১০,০০০ টাকা দিয়ে শান্তি পেলাম, অহ নেক্সট সেশন আবার ১৫ দিন পর, বিউটিশিয়ান বলছে।

গরীবদের জন্য চিকিতসা ফ্রি করা উচিত। ডাক্তাররা এত ভিজিট নিবে কেন? আমারো খারাপ লাগে, ফ্রি হোক আমিও চাই। কিন্ত গরীবদের দায়িত্ব কি শুধু আমাদের? মৌলিক চাহিদাতে শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র পড়ে না? তাহলে পাহাড়ধসে কেন শুধু বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিতসকেরা ওষুধ নিয়ে ছুটছে? কই আড়ং, অঞ্জন তো ড্রেস নিয়ে যায় নাই; প্রাণ, ম্যাগী তো খাবার নিয়ে যায় নাই। আহ, দিনশেষে আমরাই কসাই।অন্যকে দোষারোপ করার আগে নিজ পেশায় স্বচ্ছতা আনুন, দায়িত্বটা সবার।


লেখক: ফিজিওথেরাপিস্ট
 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK