শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯
Saturday, 27 Jul, 2019 10:56:17 am
No icon No icon No icon

কলকাতা ও ছত্তিসগড় পুলিশের তৎপরতায় ভেস্তে গেলো আত্মহত্যার ছক

//

কলকাতা ও ছত্তিসগড় পুলিশের তৎপরতায় ভেস্তে গেলো আত্মহত্যার ছক


টাইমস ২৪ ডটনেট, কলকাতা থেকে : পরনে গোল গলা কালো গেঞ্জি, চোখে চশমা। সময় তখন বৃহস্পতিবার রাত প্রায় দশটা। ছত্তিসগড়ের বাসিন্দা মধ্য বয়স্ক এক ব্যক্তি সবে উদয় হয়েছেন ফেসবুক লাইভে। নিজের প্রোফাইল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে নিজের কিছু বক্তব্য রাখছেন সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে। যা প্রায়শই করে থাকেন নেটিজেনরা। এতে আর এমন কি! কিন্তু ব্যাপারটা যে এতটা স্বাভাবিক ছিল তা ঠাওর করা যায় কিছক্ষণ পরেই। অবসর সময়ে ফেসবুক খুলে নিউজ ফিড নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ওই ব্যক্তির লাইভ ভিডিও দেখে রীতিমতো চমকে ওঠেন নবদ্বীপের বাসিন্দা পেশায় ব্যবসায়ী রাকেশ সাহা। দেখা যায় কোনও প্রিয়জনের ওপর অভিমান করে আত্মহত্যা করতে চাইছেন ওই ব্যক্তি। তার জন্য নিয়ে ফেলেছেন সব প্রস্তুতিও। তৈরি রয়েছে মোটা দড়ি ও চেয়ার। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণাও করছেন, আর মাত্র কিছক্ষণ পরেই নিজেকে শেষ করে দিতে চলেছেন। হাড় হিম করে দেওয়া এই লাইভ ভিডিও দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি ওই ব্যক্তির ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা ব্যবসায়ী রাকেশ। হাতের সামনে কোনো উপায় না পেয়ে সরাসরি যোগাযোগ করেন মহানগর এর দফতরে। আমাদের নিয়মিত পাঠকের মুখে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় শুনে আর চুপ করে বসে থাকা যায়নি। এই প্রতিবেদকের তরফে সরাসরি ফোন করা হয় কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) তথা গোয়েন্দাপ্রধান মুরলীধর শর্মাকেই। গোটা বিষয়টি জানিয়ে ফেসবুক লাইভের লিংকটিও তাঁকে পাঠানো হয়। বিষয়টি শোনামাত্রই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি গোয়েন্দা প্রধানও। দ্রুত তাঁর এক ব্যাচমেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন বিলাসপুরের পুলিশ সুপারের সঙ্গে। ঘটনাটি সম্পর্কে অবহিত করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লিঙ্কটিও। ইতিমধ্যেই মহানগরের দফতর থেকে ফোন যায় ছত্তীসগঢ় পুলিশের ডিজির অফিসেও। তাঁরাও দ্রুত তত্পর হয়ে অ্যাকশনে নামার নির্দেশ দেন বিলাসপুরের এসপি প্রশান্ত অগ্রবালকে। রাত ১০টা ১০নাগাদ মহানগরের দফতরে যখন তৎপরতা তুঙ্গে, ততক্ষণে সেলিং ফ্যানের সঙ্গে দড়িটা বেশ শক্ত করে বেঁধে ফেলেছেন ওই ব্যক্তি। হাতে সময় ছিল খুব কম। তবুও অকালে হারিয়ে যেতে বসা একটি প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টার খামতি রাখেনি ছত্তিসগড় পুলিশ। দ্রুত পদক্ষেপ করেন বিলাসপুরের পুলিশ সুপার প্রশান্ত আগরওয়াল। যদিও প্রথম পর্যায়ে তদন্তে বেশ কিছুটা বেগ পেতে হয় পুলিশকে। কারণ ফেসবুক লাইভ দেখে তাঁর সম্পর্কে কোনও ক্লু উদ্ধার করাই যাচ্ছিল না। তবে মিনিট পাঁচেকের প্রচেষ্টাতেই উদ্ধার করা যায় আত্মঘাতী হতে বসা ব্যক্তির দুটি মোবাইল নম্বর। যার দুটিই ছিল সুইচ অফ। যদিও ওই নম্বর গুলি থেকে পাওয়া যায় বিলাসপুরের একটি ঠিকানা। সেই ঠিকানায় মিনিট দশেকের মধ্যেই বাহিনী নিয়ে পৌঁছে যান বিলাসপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক। যদিও ওই ঠিকানায় পৌঁছে জানা যায়, সেখানে আগে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন মধ্য বয়স্ক ওই ব্যক্তি। কয়েক মাস আগেই ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য ঠিকানায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ওই পাড়াতেই একাধিক জনকে তাঁর ছবি দেখিয়ে এক ব্যক্তিকে পাওয়া যায়, যিনি তাঁর নতুন ঠিকানা জানেন। গোটা ঘটনাটি সুদূর বিলাসপুরে হলেও কলকাতা থেকে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে তদারকি চালিয়ে যাচ্ছিলেন গোয়েন্দাপ্রধান মুরলিধর শর্মা। ততক্ষণে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই ব্যক্তির জিপিএস লোকেশন উদ্ধার করে ফেলেছেন তিনি। এরপর ওই লোকেশন এবং পুরোনো পাড়ার পরিচিত ব্যক্তির যৌথ সহায়তায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ আধিকারিকরা পৌঁছে যান তাঁর নতুন ঠিকানায়।
গোটা বাড়ি অন্ধকার, ভেতর থেকে দরজা দেওয়া। সাড়াশব্দ নেই কারও। বাড়িতে যে বেশি লোক ছিল না তা বাইরে থেকেই ঠাওর করা যাচ্ছিল। এরপর ওই পরিচিত ব্যক্তিকে দিয়ে হাঁক দিয়ে বহু কষ্টে বুঝিয়ে সুজিয়ে খোলানো গেল দরজা। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ফ্যানের সঙ্গে দড়ি ঝুলিয়ে তিনি আত্মঘাতী হতে প্রস্তুত। দড়ির ফাঁসে গলা দিয়ে ঝুলে পড়ার ঠিক প্রাক মুহূর্তে সেখানে পুলিশ না পৌঁছলে ততক্ষণে হারিয়ে যেত আরও একটি প্রাণ। পিতৃহারা হতেন তিন মাস আগেই বিবাহিতা এক কন্যা, স্বামী হারা হতেন এক স্ত্রী। রুদ্ধদ্বার ঘরে আত্মঘাতী হতে গিয়ে বাড়িতে পুলিশের আচমকা উপস্তিতিতে হতভম্ব হয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এসে কাউন্সিলিং করা হয়। যোগাযোগ করা হয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর বিলাসপুরের পুলিশ সুপার প্রশান্ত আগরওয়াল মহানগরকে জানান, স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি ও বচসার জেরেই অভিমানে আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলেন তিনি। দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা পালন করে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের জন্য মহানগর ও প্রতিবেদকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ছত্তিসগড় পুলিশের ডিআইজি সুন্দর রাজ। মিশন সফল হওয়ার পর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান মুরলিধর শর্মাও।
ফেসবুক লাইভটি চোখে পড়তেই তৎপর হয়ে যিনি ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন, সেই রাকেশ বাবু বলেন, “চোখের সামনে ওই ব্যক্তির মৃত্যু কিছুতেই দেখতে পারছিলাম না। জন্ম মৃত্যু অবশ্যই ওপরওয়ালার হাতে, কিন্তু এক অসহায় ব্যক্তি মরতে বসেছেন তা তো আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায় না! মনে মনে তখনই জেদ ধরলাম ওনাকে বাঁচাতেই হবে, যে করেই হোক।” এই ঘটনায় বিলাসপুরের এসপি প্রশান্ত অগ্রবালের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) তথা গোয়েন্দা প্রধান মুরলিধর শর্মা। আজ যখন হামেশাই “ওটা আমার এলাকায় পড়ে না” মার্কা দোহাই দিয়ে বহু ঘটনাই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন পুলিশ কর্তারা, সেখানে দাঁড়িয়ে অন্যতম নজির গড়লেন তিনি। এটা তাঁর এলাকা তো নয় বটেই বরং নিজের রাজ্যও নয়। তাও অত রাত্রে ফোন পেয়ে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি তিনি। ভিন রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ করাই নয়, রাত জেগে গোটা ঘটনার উপর নজর রেখেছেন তিনি। ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে লোকেশন উদ্ধার করেছেন, যা তার করার কথা ছিল না। এই ঘটনার মাধ্যমে ফের একবার চরম পেশাদারিত্ব এবং মানবিকতার নজির গড়লেন কলকাতা পুলিশের এই শীর্ষকর্তা। এদিন মহানগরকে তিনি বলেন,”পুরো সময়টায় খুব চিন্তিত ছিলাম। আপনারা সময় মতো খবর না দিলে কাজটা সফল হতো না। তবে শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরে আমরা খুশি।”

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK