রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Monday, 24 Jun, 2019 07:50:13 pm
No icon No icon No icon

দেশে ঝুঁকি নিয়ে চলছে রেল

//

দেশে ঝুঁকি নিয়ে চলছে রেল


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা কমছে না, বরং দিন দিন রেল দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। প্রায়ই রেল ক্রসিংয়ে চলন্ত ট্রেনের সাথে বাস, ট্রাক কিংবা টেম্পোর মুখোমুখি সংঘর্ষে ট্রেন যাত্রীসহ সাধারণ মানুষের নিহত হচ্ছেন। কোথাও আবার লাইন নড়বড়ে থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানোর কারণেও একের পর এক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। গত রোববার মধ্যরাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল স্টেশনের পাশে একটি ব্রিজ ভেঙ্গে খালে ছিটকে পড়ে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেসের ৪টি বগি। এসময় ৬ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়াসহ ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সর্বত্রই দায়িত্বে অবহেলার চিহ্ন।
জানা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশে ২২ লাখ ঘনফুট পাথর থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ৮ থেকে ১০ লাখ ঘনফুট। লাইনের ইলাস্টিক রেল ক্লিপ (প্যান্ডেল), নাট-বল্টু চুরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রেলের একটি সূত্র বলছে, প্রতি বছর ক্লিপ-ই চুরি যাচ্ছে ৫ লাখ পিস, টাকার অংকে এর পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রেল লাইনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে (জোড়া) হুক খোলা দেখতে পাওয়া যায়। সূত্র বলছে, যথাযথ মেইনটেন্যান্স না করার কারণে প্রতি মাসে ৯০-১২০টির মতো ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে।
রেলপথ প্রকৌশল বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্রেন লাইনচ্যুত হয় যথাযথভাবে লাইন মেইনটেন্যান্স না করার কারণে। অথচ লাইনে পথর দেয়ার জন্য বছরে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে রেলের। লাইনচ্যুত বগি ও ইঞ্জিন উদ্ধার এবং লাইন মেরামতে বছরে ব্যয় হচ্ছে ৯৬ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল রেলস্টেশনের কাছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হয়েছিলো কয়েক মাস আগে থেকেই। ওই এলাকার রেল লাইন দীর্ঘদিন থেকে নড়বড়ে ছিলো বলে স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন। রেল লাইনে ছিল না ক্লিপ। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। গত রোববার রাতে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি বরমচাল স্টেশনের ইসলামাবাদ এলাকার বড়ছড়া ব্রিজে লাইনচ্যুত হয়ে ৪টি বগি খাদে পড়ে যায়। এ ঘটনায় ৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। 
সূত্র আরো জানায়, এসব দুর্ঘটনায় রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে ট্রেন যাত্রী তথা সাধারণ মানুষও হতাহত হচ্ছেন। দুর্ঘটনার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ট্রেন পরিচালনায় চালক ও গার্ডস্বল্পতা রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ট্রেন চালানো হচ্ছে। অধিকাংশ সময়ে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের ভুলের কারণে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। 
রেলওয়ে অপারেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রেলওয়েতে যেসব চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টার রয়েছেন তাদের ৪০ শতাংশই চুক্তিভিত্তিতে নেয়া। চুক্তিভিত্তিতে নেয়া চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে চালক ও গার্ডদের অভিযোগ, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও বগির কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে। লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও সিøপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকায় দুর্ঘটনা বেড়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলেই দায় এড়াতে তাদের কাউকে কাউকে লোক দেখানো সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যা কিছুদিন পরেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ে নিয়মানুযায়ী প্রতিদিন তিন বার পর্যায়ক্রমে পুরো লাইন, সিগন্যাল ও ব্রিজ পরিদর্শন করার কথা। একই সঙ্গে প্রতিটি ট্রেন ছাড়ার আগে ইঞ্জিন এবং প্রতিটি বগির বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ ও চাকা চেক করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। গার্ড ও চালকরা জানান, সিগন্যাল ব্যবস্থাতে যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে। ট্রেন চলাচলে লাইন ও সিগন্যাল সঠিক থাকা খুবই জরুরি। লাইনে পাথর নেই, স্লিপার নষ্ট, গজের পর গজ লোহার হুক নেই। ফলে ট্রেন ঘন ঘন লাইনচ্যুত হচ্ছে। বর্তমানে রেলওয়েতে থাকা ইঞ্জিন ও বগির প্রায় ৮০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ।
রেলের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বছরে কমপক্ষে ৫ লাখের বেশি ক্লিপ চুরি বা ভেঙে গেলেও এর মধ্যে ২ থেকে সোয়া দুই লাখ ক্লিপ সরবরাহ করা হয়। সাপ্লাই দেয়া এসব ক্লিপের সব লাগানোও হয় না। ফলে বছরের পর বছর ক্লিপবিহীন লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল করে। এসব ক্লিপে ‘বিআর’ (বাংলাদেশ রেলওয়ে) লেখা থাকলে চুরি রোধ করা অনেকাংশে সহজ হতো। একটি ক্লিপ বাইরে ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ক্লিপ চুরির কথা স্বীকার করে ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি মো. ইয়াছিন ফারুক বলেন, বর্তমানে চুরির ঘটনা কমে এসেছে। তবে লাইনে পাথর আছে কিনা কিংবা যন্ত্রাংশ খোলা রয়েছে কিনা তা রেল পুলিশের দেখার কথা নয়। লাইন পাহারায় পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ ও আধুনিক ক্লিপ লাগানো নিশ্চিত করা গেলে এসব চুরি রোধ সম্ভব।
রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর) আক্তারুজ্জামান জানান, মাঠপর্যায়ে রেলপথের অবস্থা খুবই করুণ। আমরা যতবারই লাইন পরিদর্শন করেছি, ততবারই সমস্যার কথা বলেছি। কিন্তু সমস্যা সমাধান করবে তো সংশ্লিষ্টরা। অনেক স্টেশন বন্ধ। ওই সব স্টেশনের আশপাশ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
রেলের এ দুর্দশা নিয়ে রেল বিভাগের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, রেল হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। সরকার রেলের উন্নয়নে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তা সম্পূর্ণ হলে বদলে যাবে রেল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, লাইনে প্রয়োজনীয় পাথর থাকবে না, ক্লিপ, নাট-বল্টু খোলা থাকবে এটা কি করে সম্ভব। 

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK