বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯
Monday, 25 Mar, 2019 08:45:01 am
No icon No icon No icon

পাকিস্তানের নৃশংসতা: গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায় বাংলাদেশ

//

পাকিস্তানের নৃশংসতা: গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায় বাংলাদেশ


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায় বাংলাদেশ। ২৫ মার্চ তারিখকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে নয়, বরং গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতির চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এই চেষ্টাকে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের সুযোগ এর আগে হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন খোলা আছে শুধু একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের পথ। তবে এ ক্ষেত্রেও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। জানা গেছে, জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিবছরের ৯ ডিসেম্বর ‘গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ ও গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি বাহিনীর নিধনযজ্ঞ শুরু করার তারিখকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায় বেশ কঠিন হবে—এমন বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ নয় বরং গণহত্যার স্বীকৃতির পক্ষে কাজ করছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন গণহত্যা বিষয়ে আজ সোমবার এক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং রোববার ঢাকায় ১৯৭১ সালের গণহত্যাবিষয়ক এক সেমিনারে স্পষ্ট বলেছেন, কোনো দেশে নিপীড়নের মাত্রা ‘গণহত্যা’ কি না তা নির্ধারণ করা বা ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জাতিসংঘের কাজ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনাল যেসব ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে বিচার করেছে সেগুলোকেই জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে থাকে।
আর্মেনিয়া গণহত্যার উদাহরণ দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা বলেন, ১৯১৫ সালের ওই গণহত্যাকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি না দিলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশকেও তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে সহযোগিতা করতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘২০১৭ সালের মার্চে সংসদে বিষয়টি আসার পর থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রাধিকারে এটি আছে। গত দুই বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী যেসব দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক করেছেন সেখানে এটি তুলেছেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বলতে অনেকের ধারণা ছিল যে বিষয়টি জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে বিষয়টি তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা ন্যূনতম যেটি চাই সেটি হলো, বিশ্বের যত বেশি সম্ভব রাষ্ট্র এ দেশের গণহতার স্বীকৃতি দেবে এবং এর সঙ্গে সহমর্মিতা জানাবে, গণহত্যার নিন্দা জানাবে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, একাত্তরে অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্র যারা ইতিহাসের বিপরীতে ছিল, তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে অকপটে তাদের সেই ভুল স্বীকার করে।
সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছে তার তথ্য-উপাত্ত তৎকালীন কূটনৈতিক নথি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে তা উল্লেখ করে এ দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো তাদের পার্লামেন্টগুলোতে প্রস্তাব আনতে পারে। তবে নানা কারণে এখনো এমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক বলেছেন, ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্ব সম্প্রদায় গণহত্যা সনদ গ্রহণ করেছিল। ২০১৫ সালে ওই দিনটিকে জাতিসংঘ ‘গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ ও গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ ঘোষণা করেছে। এ থেকে প্রতিফলিত হয়েছে যে গণহত্যার ভয়াবহতা স্বীকার করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা সময় নেয়। তিনি বলেন, যেকোনো গণহত্যা ভুলতে না দেওয়াটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে গণহত্যা নিয়ে বিশ্বে অনেক আলোচনা হয়েছে। গণমাধ্যম, পার্লামেন্টে ও গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গণহত্যার তথ্য জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তবে জাতিসংঘ নিষ্ক্রিয় ছিল। বড় শক্তিগুলো ওই সংকটের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তারা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখছিল। আর এর ফলে বাংলাদেশে গণহত্যা অস্বীকার করা হয়েছে।
মফিদুল হক বলেন, জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাতেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি গণহত্যার বিচারের দাবি ছিল। তিনি বলেন, জাতিসংঘের দলিলে দেখা যায় যে তারাও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত হয়েছিল। সহকারী মহাসচিবকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সহকারী মহাসচিব পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সরকারগুলো গণহত্যাকে অস্বীকার করতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ বিষয়ে নীরব হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং রোববার ঢাকায় এক সেমিনারে বলেন, ‘আমার এই উপস্থিতির অর্থ বাংলাদেশে গণহত্যার বা ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। কারণ এমন স্বীকৃতি দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। আমার এখতিয়ার হলো সামনের দিকে দেখা।’ তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের কাছে স্বীকৃত গণহত্যা হলো সেগুলোই যেগুলো আদালতের মাধ্যমে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে; যেমন—রুয়ান্ডা, স্রেব্রেনিচার গণহত্যা। গত সপ্তাহে আপিলে কারাদিচের কারাদণ্ডের মেয়াদ ৪০ বছর থেকে বাড়িয়ে আজীবন করা হয়েছে এবং তিনি যে স্রেব্রেনিচায় গণহত্যা করেছেন তা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাকে স্পষ্ট বলতে হবে যে আমার এমন স্বীকৃতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই।’
একাত্তরের গণহত্যা বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ওই গণহত্যা ছিল বিশ্বের ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর অন্যতম। ১৯৪৮ সালের গণহত্যাবিষয়ক কনভেশনে যেসব অপরাধকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তার সবগুলোই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রকাশনায় ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের টেলিগ্রাম, সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনসহ অসংখ্য দলিল রয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার দুই দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ গণহত্যার খবর পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। আর্চার ব্লাডের পাঠানো সেই তারবার্তার বিষয়বস্তু ছিল ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ (বেছে বেছে গণহত্যা)। এরপর আরো অন্তত ১৩টি বার্তায় পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে।
ওই প্রকাশনায় ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনীর তিন স্তরের গণহত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অপারেশন সার্চলাইট চলেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত। মে মাসেই আবার শুরু হয়েছিল ‘সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’ (অনুসন্ধান ও ধ্বংস) মিশন। এটি চলেছিল অক্টোবর পর্যন্ত। ডিসেম্বর মাসে পরাজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী ‘স্কর্চড আর্থ’ নামে জ্বালিয়ে দেওয়ার মিশন চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে প্রায় চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। পরে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার নারীর গর্ভপাত ঘটাতে হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের এক কোটি বাঙালি ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এ দেশে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল তিন থেকে চার কোটি বাঙালি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী ‘হিট লিস্ট’ ধরে প্রায় এক হাজার বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীকে হত্যা করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা গণহত্যায় অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য বিশ্বের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর এ দেশে গণহত্যা তথা ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যার কথা স্বীকার করে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া দূরের কথা বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দিতে চায়নি অনেক দেশ। ওই দেশগুলোই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এ দেশে গণহত্যার ইতিহাস আড়াল করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।

স্বীকৃতির জন্য যত উদ্যোগ: একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির জানান, একাত্তরের গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ সরকারি পর্যায় থেকে সত্যিকার অর্থে কখনও নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার জন্য ২০০৫ সালে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে কথা হয় ইউনেস্কোর। ২০০৭ সালে নির্মূল কমিটি থেকে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দিয়ে ইউনেস্কোর কাছে চিঠি লেখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাব সরকারিভাবে যেতে হয় বলে বেসরকারি এ প্রস্তাবে কোনো কাজ হয়নি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এ ব্যাপারে সরকারি পর্যায় থেকে কোনো প্রস্তাব জাতিসংঘে ২০১৫ সাল পর্যন্তও যায়নি।

শাহরিয়ার কবির জানান, এরই মধ্যে আর্মেনিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের কাছে অন্য একটি তারিখে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২৫ মার্চ বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয় না জানার পর ২০১৫ সালে আর্মেনিয়া এই যুক্তি তুলে ধরে যে, ওই রাষ্ট্রেই যখন দিনটি জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃত নয়, তখন তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাওয়া হয় কীভাবে? সে বছরই আর্মেনিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশও এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়।

শাহরিয়ার কবির জানান, ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে এ প্রস্তাবে বলা হলো, ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা চালানো হবে, যা ছিল কৌশলগত ভুল। কারণ দু'বছর আগে জাতিসংঘে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের পক্ষে ভোট দেওয়া বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কীভাবে আবারও এই স্বীকৃতির প্রস্তাব নেয়, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, প্রস্তাব করা উচিত ছিল 'একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালানো হবে।'

এ ব্যাপারে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির প্রধান ডা. এম এ হাসান বলেন, ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ আর নেই। এখন এ দিবসকে 'যুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতাবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস' হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব দিলে তাতে প্রথমত, একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, ২৫ মার্চকে 'আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতাবিরোধী দিবস' ঘোষণার দাবি জানাতে হবে।

ডা. এম এ হাসান জানান, গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য এর বিস্তারিত বিবরণ যেমন তুলে ধরতে হয়, তেমনি ফরেনসিক প্রমাণও জোগাড় করতে হয়। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি প্রায় দুই যুগ আগে থেকেই একাত্তরের গণহত্যার বিষয়ে ফরেনসিক প্রমাণ জোগাড়ের কাজ শুরু করে। একাত্তরের বিভিন্ন গণহত্যার বিস্তৃত বর্ণনা, তথ্য-উপাত্ত এবং প্রমাণ সংগ্রহের পর এই কমিটির পক্ষ থেকে 'বিয়ন্ড ডিনায়েল' নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বইটি দেওয়া হয়েছে। এ বইটি সরকারিভাবে উন্মুক্ত করা হলে আন্তর্জাতিক মহল একাত্তরের গণহত্যার স্পষ্ট চিত্র পাবে। তিনি বলেন, একাত্তরের গণহত্যার জোরালো তথ্য-উপাত্ত ও ফরেনসিক দলিলসহ নানা প্রমাণ ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির কাছে আছে। সরকার চাইলেই কমিটির পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

যেখানে আটকে আছে প্রচেষ্টা:  কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যেমন, আর্মেনিয়ার গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে লেগেছে প্রায় একশ' বছর। এ গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে বড় বাধা ছিল তুরস্কের বিরোধিতা। কারণ প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তুর্কি সেনাসদস্যদের হাতেই প্রায় ১৫ লাখ আর্মেনীয় নিহত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আর্মেনিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বর 'আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসের' স্বীকৃতি পায়। এ সময় তুরস্কসহ তার মিত্র দেশগুলো ভোটদানে বিরত থাকলেও বিপক্ষে ভোট দেয়নি।
এর পর থেকে একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি আরও উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। তবে এ নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ এখনও তেমন দানা বেঁধে ওঠেনি। যদিও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে বাংলাদেশ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক বিভ্রান্তিও দূর হয়েছে। এখন চেষ্টা করা হচ্ছে যে সব বন্ধুরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে একাত্তরে বাংলাদেশের পাশে ছিল তাদের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রামাণ্য গ্রন্থ 'বিয়ন্ড ডিনায়েল'-এর কপি অনেক দেশে পাঠানো হয়েছে এবং হচ্ছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায় থেকে গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাভাবে যোগাযোগের প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র একাত্তরের গণহত্যার বিষয়ে যথেষ্ট সংবেদনশীল হয়ে উঠলে বাংলাদেশ কূটনৈতিক উদ্যোগের পথে পা বাড়াবে। অর্থাৎ সমর্থন চেয়ে বিভিন্ন দেশের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে। বেশিরভাগ দেশের সমর্থন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব জাতিসংঘে তুলবে।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক জানান, ২০১৭ সালের পর এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পাঁচটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছে। যেখানে বিদেশি গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সামনে একাত্তরের গণহত্যার বিস্তারিত চিত্র ও তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। সামনে এ ধরনের আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের গণহত্যাবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পুরোপুরি বা আংশিক নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে যে অপরাধমূলক কাজ করা হয়, তা-ই গণহত্যা। এ সংজ্ঞা তুলে ধরে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য জাতিসংঘের কনভেনশন বাংলাদেশের পক্ষেই রয়েছে। এখন দরকার শুধু কার্যকর ও দক্ষ কূটনৈতিক উদ্যোগের।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK