বুধবার, ২২ মে ২০১৯
Sunday, 10 Mar, 2019 09:10:42 pm
No icon No icon No icon

সচল হচ্ছে অচল ডাকসু

//

সচল হচ্ছে অচল ডাকসু


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : ২৮ বছরের অচল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে আবারও নির্বাচনের মাধ্যমে সোমবার সচল হচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর ২০১৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীদের আলোয়ে জ্বলবে ডাকসুর ভবন। আবারও হবে আলাপ-আলাপন, চলবে আড্ডা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীরা জানবে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন এমনকি স্বাধীনতা-উত্তর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ডাকসু’র ভূমিকা। আদালতে নিদের্শনায় দীর্ঘ ২৮ বছরের অচল ডাকসু সচল করতেই  উৎসবমুখর পরিবেশের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোমবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এই সময়ের মধ্যে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবে ভোটাররা। ভোটার ও প্রার্থীদের জন্য এরই মধ্যে সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে ডাকসু নির্বাচন কমিশন।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর আলো নিভে যায়। ১৯৯০ সালে দেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের পর বন্ধ হয়ে যায় নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানটি। সাবেক ২৫ শিক্ষার্থীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চআদালতের রায়ে ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাধ্য হয় নির্বাচন দিতে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন। ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আইন জটিলতা কাটতেও আন্তরিক ভূমিকা ছিল অনেকের। সর্বোপরি শেষ পর্যন্ত সদিচ্ছা দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার। এবারের ডাকসু নির্বাচনে ৪২ হাজার ৯২৩ ভোটারের জন্য ১৮টি হলের ৫১১টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে প্রচার-প্রচারণা শেষ করেছেন প্রার্থীরা। গত শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত চলে প্রচার ও প্রচারণা।
হল প্রাধ্যক্ষ ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে বুথ ৩৫টি, শহীদুল্লাহ হলে ২০টি, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫টি, অমর একুশে হলে ২০টি, জগন্নাথ হলে ২৫টি, কবি জসীম উদ্দীন হলে ২০টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ৩২টি, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ৩০টি, রোকেয়া হলে ৫০টি, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫টি, শামসুন্নাহার হলে ৩৫টি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে ২০টি, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১৯টি, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২১টি, স্যার এ এফ রহমান হলে ১৬টি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৪টি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২০টি এবং বিজয় একাত্তর হলে ৪০টি বুথ তৈরি করা হয়েছে। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে একজন শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি এবং হল সংসদে ১৩টি পদে একটি করে মোট ৩৮টি ভোট দিবেন। এ জন্য সময় পাবেন ৩ মিনিট। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ৪২ হাজার ৯২৩জন। কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ মিলিয়ে প্রার্থীসংখ্যা ৭৩৮। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫ পদের বিপরীতে ২২৯ জন এবং ১৮টি হল সংসদে ১৩টি করে ২৩৪ পদের বিপরীতে ৫০৯ জন প্রার্থী। এবার ডাকসুতে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, কোটা আন্দোলন, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নয়টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্রভাবেও জিএসসহ বিভিন্ন পদে প্রার্থী হয়েছেন অনেকে। ডাকসুতে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ২১ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৪, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ১৩, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক পদে ১১, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ৯, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৯, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১, সাহিত্য সম্পাদক পদে ৮, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১২, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১১, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১০, সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৪ জন প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এসব পদের প্রতিটি থেকে একজনকে বেছে নেবেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ডাকসুর ১৩টি সদস্যপদে লড়ছেন ৮৬ জন প্রার্থী। একজন ভোটার সদস্যপদে ১৩ জনকে ভোট দিতে পারবেন। আর ১৮টি হল সংসদের প্রতিটিতে ১৩টি করে পদে ১৩ জনকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবেন স্ব স্ব হলের শিক্ষার্থীরা। ঢাবির হলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার রোকেয়া হলে-৪ হাজার ৫৩০ জন। সবচেয়ে কম অমর একুশে হলে-১ হাজার ৩৪০ জন। এ ছাড়া বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননিছা মুজিব হলে ২ হাজার ২৪০, বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে ১ হাজার ৯২০ জন, বিজয় একাত্তর হলে ৩ হাজার ১৪৭, ড. মুহম্মদ শহীদুল­াহ হলে ২ হাজার ৪৬, ফজলুল হক মুসলিম হলে ২ হাজার ৭০, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ১ হাজার ৯৮২, জগন্নাথ হলে ২ হাজার ৪৩, জাতির জনক শেখ মুজিব হলে ১ হাজার ৯৭৬, জসীমউদ্দীন হলে ১ হাজার ৬২৮, সুফিয়া কামাল হলে ৩ হাজার ৭১০, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২ হাজার ২৫৭, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ১ হাজার ৮০১, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২ হাজার ২৫৫, শামসুন্নাহার হলে ৩ হাজার ৭৩৭ ও স্যার এ এফ রহমান হলে ১ হাজার ৮৩১ জন ভোটার রয়েছেন। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় ৪৩ হাজার ২৫৬ জনের ভোট নেওয়া সম্ভব কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীরা যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোট দিতে পারেন সেজন্য হলগুলোতে পর্যাপ্ত পোলিং বুথের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে প্রশাসন আন্তরিক।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিরোধী মতের কোনো শিক্ষককে যুক্ত করা হয়নি। এছাড়া নির্বাচনের আগে কর্তৃপক্ষ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনা করলেও গঠনতন্ত্র সংশোধন ও আচরণবিধিতে সেসবের প্রতিফলন দেখা যায়নি। গতকাল  রোববার দুপুরে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন তারা। ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ছাড়াও সাদা দলের প্রচার সম্পাদক প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান প্রফেসর কালাম সরকার, প্রফেসর নুরুল আমিনসহ ঢাবি সাদা দলের অন্য শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। তবে গতকাল বিকালে ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব প্যানেলের প্রার্থীরা ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভোটের আগের দিন রোববার ‘অস্বচ্ছ’ ব্যালট বাক্স, সব কেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্ট না থাকা, ভোট গ্রহণের সময় ‘স্বল্পতা’ এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কার কথা জানান তারা। ভোট গ্রহণের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগের দিনও চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি বলে অভিযোগ ছাত্র সংগঠনগুলোর। নির্বাচনের আগেই যাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা না হয়, সেজন্য রাতে হলে হলে ব্যালট বাক্স না পাঠানোর দাবি জানিয়ে ছিলেন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতশীল ছাত্রঐক্যের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী লিটন নন্দী। লিটন বলেন, রাতের আঁধারে হলগুলোতে ব্যালট বাক্স পাঠানো যাবে না। সকালে গণমাধ্যম ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যালট বাক্স উন্মুক্ত করে দেখিয়ে তা স্থাপন করতে হবে। ছাত্রদলের বহিরাগতদের উপস্থিতি নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার একটা কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম বলেন, আচরণবিধি লংঘন করে ছাত্রদল মহানগর থেকে সশস্ত্র ক্যাডাররা ক্যাম্পাসে এনে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা ডাকসু নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে দণ্ডিত খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং পলাতক আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি উপজীব্য করেছে।
এদিকে, নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন প্রবেশের ক্ষেত্রে গতকাল সন্ধ্যা থেকে ২৪ ঘণ্টার কড়াকড়ি বিধি-নিষেধ আরোপ করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সাতটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তলাশি করবে পুলিশ। স্থানগুলো হলো শাহবাগ, নীলক্ষেত, শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং, রোমানা ক্রসিং, পলাশী, দোয়েল চত্বর ও জগন্নাথ হল ক্রসিং। ঢাবির শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশের জন্য আগে থেকে পাস সংগ্রহের অনুরোধ জানান ডিএমপি কমিশনার। ভেতরে কিছু অনুমোদিত রিকশা থাকবে, সেগুলোতে চড়ে চলাচল করা যাবে।
উলে­খ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে তফসিল ঘোষণা করেন ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান। তফসিল অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩ মার্চ প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা এবং ৫ মার্চ প্রকাশ করা হয় চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা। ওই দিন থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়। তিন দশক পর আদালতের নির্দেশে ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। তারপর আর নির্বাচনের মুখ দেখেনি ডাকসু।

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK