সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯
Thursday, 07 Feb, 2019 07:13:08 pm
No icon No icon No icon

হাইকোর্টের রায়: কোচিং বাণিজ্য বন্ধ

//

হাইকোর্টের রায়: কোচিং বাণিজ্য বন্ধ


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: দেশে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের করা নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই রায়ের ফলে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেসুর রহমান। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা ও এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রশ্নে জারি করা রুলের শুনানি শেষ করা হয়। ওই রুলের ওপর রায় ঘোষণা করেন আদালত। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশিদ আলম খান। এক রিটকারীর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। অ্যামিকাসকিউরি ছিলেন অ্যাডভোকেট ফিদা এম কামাল।
কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না, সেজন্য সরকার ২০১৮ সালে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ নোটিশ দেয় সরকার।
এসব নোটিশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২ নিয়ে শিক্ষকরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আদালত ওই রিটের শুনানি নিয়ে ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই চিঠির কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করেন। পাশাপাশি রুল জারি করেন আদালত।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল করে। ওই আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ২০১৮ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চকে এ রুলের নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছিল। পরে ২৭ জানুয়ারি রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করা হয়।
অপরদিকে, কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে শাস্তির বিধানসহ নীতিমালা প্রণয়নের পরও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। কিছু শিক্ষক রীতিমতো সাইনবোর্ড লাগিয়ে, অনেকে আবার সাইনবোর্ডের আড়ালে এই ব্যবসা অব্যাহত রেখেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎপরতায় প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানোর সাথে জড়িত রাজধানীর শিক্ষকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। এতে অনেকে প্রাইভেট-কোচিংয়ের পরিধি সীমিতও করছেন। তবে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক এখনও প্রাইভেট পড়াচ্ছেন ও কোচিং করাচ্ছেন।
২০১২ সালের ২০ জুন কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে তারা নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি নেওয়া সাপেক্ষে অন্য স্কুল, কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। তবে কোনও কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং-বাণিজ্য পরিচালনা করা যাবে না।
রাজধানীর উদয়ন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ইশরাত জাহান (ছদ্মনাম)। সে তার স্কুলের শিক্ষকের কাছে গণিত এবং ইংরেজি পড়ে। ক্লাসের বাইরে তাকে পড়তে হয়। ইশরাত জাহান জানায়, সে উদয়ন স্কুলেরই শিক্ষক বখতিয়ার শাহেদের কাছে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শিক্ষক বখতিয়ার শাহেদ রাজধানীর আজিমপুরের চায়না বিল্ডিংয়ের গলিতে সমীকরণ কোচিং সেন্টারের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে আলাদা আলাদা ব্যাচে শিক্ষার্থী পড়ান। অভিভাবক পরিচয়ে তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থী পড়ান। উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ সেকশনের শিক্ষক তিনি। স্কুল পর্যায়েও ক্লাস নেন। তিনি মূলত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সংবাদকর্মী পরিচয় দেওয়ার পরে তিনি বলেন, আমার শিক্ষার্থী খুবই কম। এছাড়া আমি আমার নিজ স্কুলের শিক্ষার্থী পড়াই না। শিক্ষার্থী পড়ানোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নেননি বলেও জানান তিনি।
সমীকরণ কোচিং সেন্টারের ভেতরে কক্ষ ভাড়া নিয়ে ব্যাচে কোচিং করান আজিমপুর এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি রায়হান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক মামুন। তিনি ছাপড়া মসজিদের পাশে দায়রা নীড় নামের ভবনে নিজ বাসাতেও কয়েকটি ব্যাচে শিক্ষার্থী পড়ান। তিনি বলেন, আমি সমীকরণ কোচিংয়ের ভেতরেই একটি কক্ষ নিয়ে পড়াই। এছাড়া নিজ বাসাতেও ব্যাচ আছে।
আবার রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিসিআইসি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হুমায়ুন কবিরও সমীকরণ কোচিং সেন্টারের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে সপ্তাহে তিন দিন পড়ান। তিনি মিরপুরে অবস্থিত বিসিআইসি কলেজের পাশে নিজ বাসায়ও বাকি তিন দিন কয়েকটি আলাদা ব্যাচে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে পড়ান।
কোচিং নিষিদ্ধ হওয়ার পরও কেন করাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি। স্থায়ী না হওয়া পর্যন্ত আমার চাকরি যখন-তখন চলে যেতে পারে। চাকরি চলে গেলে কিভাবে খেয়ে-পরে বাঁচবো? আমাকে তো কোচিং করাইতে হচ্ছে। কিচ্ছু করার নেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিউ পল্টন টিসার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক আব্দুল কায়েস, দুদকের তালিকায় নাম থাকা গর্ভমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক জাকির হোসেনসহ আরও নামিদামি স্কুলের শিক্ষকরা এই এলাকার কোচিং সেন্টারগুলোতে কক্ষ ভাড়া নিয়ে কোচিং করান।
রাজধানীর আজিমপুরে অবস্থিত আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মোস্তফা কামাল নিজ বাসায় কয়েকটি ব্যাচে শিক্ষার্থী পড়ান বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ইদানিং কোচিং করান এমন শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করা শুরু করেছে দুদক। তাই সাবধানে পড়াতে হচ্ছে। আগামী জানুয়ারি থেকে আজিমপুরে চায়না বিল্ডিংয়ের গলিতে নতুন করে কোচিং সেন্টার খুলে ব্যাচে শিক্ষার্থী পড়ানো শুরু করবেন বলেও তিনি জানান।
একইভাবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুর, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, যাত্রবাড়ী, গুলশান, বনানী, বাংলাবাজার, সূত্রাপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় কোচিং সেন্টারে নামিদামি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ২০১২ সালে নীতিমালা করার মধ্য দিয়ে কোচিং-বাণিজ্যকে এক প্রকার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, আইন করে এই বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হোক। তিনি অভিযোগ করেন, মন্ত্রণালয় এবং মাউশির কিছু অসাধু শিক্ষক এই ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। কোচিং ব্যবসায় জড়িত এমন অনেক শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টার ঘুষ দিয়ে নিজেদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, কোচিং বাণিজ্যকোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর নামিদামি চার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭২ শিক্ষককে কারণ দর্শাতে বলেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। তাদের বিরুদ্ধে কেন কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জানতে চাওয়া হয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারী এ সংক্রান্ত নোটিশ দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। 
স্কুলগুলো হচ্ছে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ,ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩৬ জন, মতিঝিল মডেল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৪, ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭ এবং রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও সুপারিশের পর কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে এই শিক্ষকদের শোকজ করা হয়। গত বছর ১ নভেম্বর কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত ৫২২ শিক্ষকের বদলির সুপারিশ করে দুদক। সর্বশেষ কোচিং করানোয় ৯৭ শিক্ষককে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করে দুদক চিঠি দেয়ও মন্ত্রী পরিষদে।
 

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK