বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
Tuesday, 10 Jul, 2018 10:35:33 am
No icon No icon No icon

ডাক্তারদের হরতাল ডাকা অন্যায়


ডাক্তারদের হরতাল ডাকা অন্যায়


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: হাইকোর্ট বলেছেন, চিকিৎসকদের হরতাল ডাকা ‘অন্যায়’। ‘ভুল চিকিৎসা’ নিয়ে একটি রিট আবেদনের শুনানিতে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার প্রসঙ্গে আদালত এ কথা বলেন। আদালত বলেন, ‘ডাক্তার দেবতা নন। ভুল হওয়াটা অন্যায় নয়। কিন্তু ভুলটা জাস্টিফায়েড করার জন্য হরতাল ডাকা হলে সেটা অন্যায়।’ কতিপয় দুর্বৃত্তের কর্মকাণ্ডে চিকিৎসাসেবার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। দেশে অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক এবং ভালো মানের চিকিৎসাসেবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কতিপয় ভুল চিকিৎসার ভয়ে রোগীরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এতে দেশীয় মুদ্রা বিদেশে যাচ্ছে। মার্চে চুয়াডাঙ্গায় ‘ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টার’র চক্ষুশিবিরে অস্ত্রোপচারে ‘চোখ হারানো’র ঘটনায় রিট আবেদনের ওপর রুলের শুনানিতে সোমবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। পরে আদালত ১৬ জুলাই এ মামলায় জারি করা রুলের পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর আবুল কালাম আজাদকে দেখিয়ে আদালত বলেন, ‘চট্টগ্রামে (চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘোষণা) যা হয়েছে, সেটি দুঃখজনক।
মানুষ বিপদে পড়লে তিন পেশার লোকের কাছে যায়- পুলিশ, আইনজীবী ও ডাক্তার। তিনটি পেশা যদি কিছু দুর্বৃত্তের কারণে ধ্বংস হয়, তবে মানুষ বিপদে পড়বে। মেয়েটাকে (চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রাফিদা খান রাইফার মৃত্যু) তো ফিরিয়ে আনা যাবে না। ডাক্তাররা দেবতা নন।
আমাদের (মানুষের) ভুল হবে বলে একটা উচ্চ আদালত রয়েছে। ভুলটা অন্যায় নয়। কিন্তু ভুলটা জাস্টিফাই (যথাযথ) করার জন্য যদি হরতাল (ধর্মঘট) ডাকা হয় তবে তা অন্যায়।’
চুয়াডাঙ্গা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে চক্ষুশিবিরে চিকিৎসা নিতে এসে চোখ হারানো ২০ জনের প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে কেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। সেই রুলের কোনো জবাব আদালতে দাখিল না করায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনকে ব্যাখ্যা দিতে তলব করেন আদালত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. মো. খাইরুল আলম আদালতে হাজির হন। শুনানির শুরুতেই আদালতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. মো. খাইরুল আলম রুলের বিষয়ে তাদের লিখিত জবাব দাখিলে সময় আবেদন করেন।
তখন আদালত বলেন, লিখিত জবাব দাখিলের জন্য সময় পাবেন। যেহেতু (স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন) দুইজন আছেন। তাই আপনাদের ব্যক্তিগতভাবে শুনব। এরপর আদালত সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ করে বলেন, চক্ষুশিবির করার আগে আপনার অনুমতি নেয়া হয়েছিল কি না? জবাবে তিনি বলেন, না, নেয়নি।
এরপর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য শুনতে চান আদালত। শুরুতে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর আবুল কালাম আজাদকে দেখিয়ে আদালত বলেন, চট্টগ্রামে (চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘোষণা) যা হয়েছে, সেটি দুঃখজনক। আজকের মামলার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত নয়। কিন্তু যেহেতু আপনি (স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক) আছেন তাই বলছি, মানুষ বিপদে পড়লে তিন পেশার লোকের কাছে যায়। একজন পুলিশ, আইনজীবী এবং ডাক্তার। তিনটি পেশা যদি কিছু দুর্বৃত্তের কারণে ধ্বংস হয়, তবে মানুষ বিপদে পড়বে।
চুয়াডাঙ্গায় চিকিৎসা নিতে আসা চোখ হারানো ২০ জনের ঘটনা সম্পর্কে আবুল কালাম আজাদ আদালতকে বলেন, এতে দুটি তদন্ত কমিটি করেছি। তারা এরই মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। আমরা পর্যালোচনা করছি। ইমপ্যাক্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে ওষুধের নমুনা আইসিডিডিআরবি’তে পাঠায়। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী ওই ওষুধে ব্যাকটেরিয়ার নমুনা পাওয়া গেছে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেদনে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আমরা দুটি রিপোর্টই পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি। শুনানি শেষে আদালত প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদকে উদ্দেশ করে বলেন, লিখিত জবাবে যেন ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হয়। যাতে করে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা যায়। এই বলে আদালত স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন।
আদালতে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত। সঙ্গে ছিলেন সুভাষ চন্দ্র দাস। অন্যদিকে ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের পক্ষে ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।
২৯ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চক্ষুশিবিরে গিয়ে চোখ হারালেন ২০ জন!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ মার্চ চুয়াডাঙ্গার ইমপ্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে তিন দিনের চক্ষুশিবিরের দ্বিতীয় দিনে ২৪ জন নারী-পুরুষের চোখের ছানি (ফ্যাকো) কাটা হয়। ওই অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে ছিলেন চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহীন। পরদিন বাসায় ফেরার পর ওই রোগীদের চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। চোখে জ্বালাপোড়া নিয়ে তারা যোগাযোগ করেন ইমপ্যাক্ট হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও পরে কয়েকজন রোগীকে স্থানীয় এক চক্ষুবিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ওই চক্ষুবিশেষজ্ঞ তাদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেন।
তাদের মধ্যে চার রোগী নিজেদের উদ্যোগে স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন। পরে ইমপ্যাক্ট থেকে ১২ মার্চ একসঙ্গে ১৬ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যাওয়ায় ১৯ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়। আরেক নারীর অপারেশন করা বাম চোখের অবস্থাও ভালো নয়। ঢাকায় দ্বিতীয় দফায় অপারেশন করলেও দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসেনি তার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ২০ রোগীর সবাই দরিদ্র। কেউ স্বজনের কাছে ধারদেনা করে, কেউ বাড়ির ছাগল-মুরগি বিক্রি করে, কেউ এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ইমপ্যাক্ট হাসপাতালে গিয়েছিলেন চোখ সারাতে।
পরে আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি সংযুক্ত করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় ১ এপ্রিল রিট দায়ের করেন। রিটের শুনানি নিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে চক্ষুশিবিরে চিকিৎসা নিতে এসে চোখ হারানো ২০ জনের প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে কেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন, চুয়াডাঙ্গার ডিসি ও এসপি, ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টার, ডা. মোহাম্মদ শাহীনসহ ১০ জন বিবাদীকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
আদালত পৃথক এক রুলে চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে তিন দিনের চক্ষুশিবিরে চক্ষু চিকিৎসায় ২০ জনের চোখ অস্ত্রোপচারে কার্যকর, যথাযথ ও পর্যাপ্ত নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণে নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা-ও জানতে চান। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ডাক্তারের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হবে না, তা-ও জানতে চান আদালত।

সূত্র: যুগান্তর।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK