বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮
Sunday, 29 Apr, 2018 07:47:32 pm
No icon No icon No icon

সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতে মৃত্যু ১৬ জন


সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতে মৃত্যু ১৬ জন


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : সারাদেশে রোববার কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সিরাজগঞ্জে ৫ জন, মাগুরায় ৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন, নওগাঁয় ২ জন, গাজীপুরে ১ জন, রাঙ্গামাটিতে ১ জন, নোয়াখালীতে ২ জন ও সুনামগঞ্জে ১ জন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে এসব মৃত্যু। বজ্রপাতে এত প্রাণহানির খবর চমকে দিয়েছে সবাইকে। সকল মহলকে করে তুলেছে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও শংকিত। জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ-প্রবণ দেশ হিসেবেই বিশ্বে পরিচিত। সুদূর অতীত থেকেই বন্যা, ঝড়, ভ‚মিকম্প, খরা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশের  জনজীবনের নিত্যসাথি। এর মধ্যে রোববার দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতে ১৬ জন মানুষ মারা গেছেন। স্মরণাতীতকাল থেকেই বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আগে সাধারণত বৈশাখ মাসেই ঝড়ের দিনে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটত। তাতে হয় তো দু-এজন লোক মারা যেত। তবে সে সংখ্যা এত কম যে তা কখনো উদ্বেগ বা শংকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। গতকাল প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ থেকে আরো জানা গেছে বিস্তারিত তথ্য। 
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, কাজিপুর ও কামারখন্দ উপজেলায় রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন-শাহজাদপুর পৌর এলাকার ছয়আনিপাড়া মহল্লার ফারুক হাসানের ছেলে নাবিল হোসেন (১৭), রাশেদুল হাসানের ছেলে পলিং হোসেন (১৬), কাজীপুর উপজেলার ডিগ্রি তেকানী গ্রামের মৃত পারেশ মন্ডলের ছেলে শামছুল মন্ডল (৫৫) ও শামছুল মন্ডলের ছেলে আরমান (১৪) এবং কামারখন্দের পেস্তক কুড়াগ্রামের মৃত আহের মন্ডলের ছেলে কাদের হোসেন (৩৭)।
স্থানীয়রা জানান, সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের বাদাম ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে পিতা শামছুল হক (৫০) ও পুত্র আরফান হোসেনসহ (১৪) অন্তত পাঁচ জন নিহত হয়েছে।  রোববার সকালে উপজেলার তেকানী চরে বজ্রপাতে এঘটনা ঘটে। নিহত শামছুল হক ও তার পুত্র আরফান হোসেন উপজেলার তেকানী চরের বাসিন্দা। 
মাগুরা প্রতিনিধি জানায়, মাগুরা সদর অক্কুর পাড়া ও রায়গ্রাম এবং শালিখা উপজেলার বুনাগাতী গ্রামে বজ্রপাতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন-অক্কুর পাড়ার ভ্যানচালক শামীম, বøুগ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে আলম ও জয়পুরহাটের মনপুরা এলাকার আলম মিয়ার ছেলে মেহেদী। মাগুরা সদর থানা পুলিশের এসআই আশ্রাফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের দরুইন গ্রামের বাগানবাড়ি এলাকায় বজ্রাঘাতে আব্দুর রহিম (৫০) নামে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। রোববার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের দরুইন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত রহিমের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায় বলে নিশ্চিত করেছেন আখাউড়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন তরফদার।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানায়, নওগাঁর সাপাহারে বজ্রপাতে গৃহবধূ সোনাভান (২৪) মারা গেছেন। এ ঘটনার তিনজন আহত হয়েছেন। রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা শিরন্টি ইউনিয়নের শিমলডাঙ্গা রামাশ্রম গ্রামে এ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন-নিহতের স্বামী রুবেল হোসেন (২৮), সালেহা বিবি (৪২) ও শিশু রাজু (১২)।
অপরদিকে জেলার সাপাহারে বজ্রপাতে সোনাভান (২৪) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহতরা হলেন, সোনাভানের স্বামী রুবেল হোসেন (২৮), সালেহা বিবি (৪২) ও শিশু রাজু (১২)। আহতদের সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মাটিকাটা এলাকায় বজ্রপাতে জাফরুল ইসলাম (২০) নামে পোশাক কারখানার এক চেকম্যানের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নারীসহ পাঁচ শ্রমিক আহত হয়েছেন। গতকাল রোববার সকাল ৮টার দিকে মাটিকাটা এলাকায় ইনক্রেডিবল ফ্যাশন লিমিটেড কারখানার সামনে এ ঘটনা ঘটে। কালিয়াকৈর শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরির্দশক (এএসআই) ফারুক হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানায়, বাঘাইছড়ি উপজেলায় বজ্রপাতে মনছুরা বেগম (৩৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। মনছুরা বেগম বাঘাইছড়ি উপজেলার মুসলিম ব্লক এলাকার বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ি থানা পুলিশের (ওসি) আমির হোসেন। গতকাল রোববার দুপুর ১টার দিকে রাঙ্গামাটির উপজেলার মুসলিম ব্লক এলাকার বাসিন্দা মনছুরা বেগম বজ্রপাতে মারা যান।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানায়, নোয়াখালীর সদর উপজেলায় স্কুল বন্ধ থাকায় সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে বজ্রপাতে ইকবাল হাসনাত পিয়াল (১৩) নামে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। রোববার দুপুর ১২টার দিকে নোয়াখালী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের ল²ী নারায়ণপুর গ্রামের বশিরার দোকানের পার্শ্ববর্তী একটি খেলার মাঠে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত পিয়াল নোয়াখালী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের ল²ী নারায়ণপুর গ্রামের সোহেল রানার ছেলে। তিনি নোয়াখালী জিলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। সুধারাম থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) লিটন দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অপরদিকে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে শাহীন নামে এক কৃষিশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আব্বাস ও মনির হোসেন নামে দুজন। নিহত শাহীন ভোলা জেলার তমিজ উদ্দিন উপজেলার সোনাপুর গ্রামের মো. রজন মিয়ার ছেলে। আহত আব্বাস উদ্দিন ও মনির হোসেন একই এলাকার বাসিন্দা।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে বজ্রপাতে লিটন মিয়া (৩০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
কৃষক লিটন সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়ার ছেলে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম কৃষকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির সামপ্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত বলেই বাংলাদেশকে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 
বজ্রপাত বিশেষজ্ঞ ড. আবদুুল মান্নান বলেন, বজ্রপাতকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তবে এটাকে মোকাবিলা করা সম্ভব। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নেয়া উচিত। বারান্দায় থাকা যাবে না। ঘরের  জানালা বন্ধ রেখে থাকতে হবে ঘরের ভেতরে। সব ভবনে যথাযথ বজ্র নিরোধক লোহার দন্ড স্থাপন করতে হবে। উঁচু জায়গায় অবস্থান নেয়া যাবে না। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। ধাতব বস্তু পরিহার করা উচিত। বজ্রপাতের সময় টিভি-ফ্রিজ ধরা যাবে না। গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা ভালো। খালি পায়ে থাকা চলবে না। মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। নৌকায় থাকলে ছইয়ের ভিতরে অবস্থান নেয়া উচিত। যেহেতু বিদ্যুৎ সব সময় পরিবাহী খোঁজে, তাই বজ্রপাতের সময় তা উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটি ও টাওয়ার জাতীয় কিছুতে পড়ার আশঙ্কা বেশি। তাই এ সময় উঁচু গাছ বা খুঁটির কাছাকাছি থাকা নিরাপদ নয়। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ না করা, এমনকি ল্যান্ড ফোন ব্যবহার না করা ইত্যাদি।
পরিবেশবিদ আতিক রহমান বলেন, বজ্রপাত বাড়ছে। বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা। এ জন্য জলবায়ু পরিবর্তন একটা বড় কারণ। তবে কেন বাড়ছে এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রতিকারের দিকে নজর দেয়া। 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু বিভাগের উপ পরিচালক মো. আব্দুর রহমান বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই আবহাওয়ার এমন অস্বাভাবিক আচরণ। আর সারাবিশ্বের মানুষ জানে, ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক রিসার্চের (এনসিএআর) বিজ্ঞানী ডেভিড এডওয়ার্ডস ও তার সঙ্গীরা কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে দেখতে পেয়েছেন, বায়ুস্তরের কাছাকাছি যেখানেই ওজোনের পরিমাণ বেশি, সেখানেই বজ্রপাত হয়েছে বেশি মাত্রায়। নাসার বিশেষ মহাকাশযানে চেপে এ সমীক্ষা চালানোর পর এডওয়ার্ডস তার গবেষণাপত্রে বলেছেন, দাবানলে যে পরিমাণ ওজোন তৈরি হয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি তৈরি হয় বজ্রপাতে। বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরে ওজোনের পরিমাণ বাড়ার জন্য মূলত বজ্রপাতই দায়ী।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেন বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সচেতনতা দরকার। আশেপাশে যদি কোন উঁচু গাছ থাকে সেখান থেকে দূরে থাকা। টিনের ছাদ এড়িয়ে চলা। উপরে ছাদ আছে এমন জায়গায় চলে আসা। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের খুঁটি ও টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। তাছাড়া জলাশয় ও পুকুর থেকে দূরে থাকলে ভালো হয়। বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে এখন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই বিবেচনা করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।

 

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK