সোমবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৮
Monday, 16 Apr, 2018 09:22:51 am
No icon No icon No icon

দেশজুড়ে রেললাইন এখন মৃত্যুফাঁদ


দেশজুড়ে রেললাইন এখন মৃত্যুফাঁদ


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রেলপথগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ট্রেনে কাটা পড়ে অকাল প্রাণহানি ঘটছে। রেল যাতায়াত খুবই সস্তা হলেও বেশ অনিরাপদ হয়ে পড়েছে বর্তমান রেল ব্যবস্থা। বগি লাইনচ্যুত, ইঞ্জিনে আগুন, অনিয়ন্ত্রিত রেল ক্রসিং, দুর্বল সিগন্যাল ব্যবস্থা ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের কারণেই বেশির ভাগ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে বলে জানা গেছে। রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে টঙ্গী রেল স্টেশনের কাছে ঢাকাগামী জামালপুর কমিউটার ট্রেন দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া একই ঘটনায় আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া গত এক মাসে সারাদেশে ট্রেনে কাটা পড়ে মোট ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ।
সম্প্রতি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ট্রেনের ধাক্কায় একই পরিবারের ৪ জনসহ মোট ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২ জন নারী ও ২ জন শিশু রয়েছেন। স্থানীয়রা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিহতদের লাশ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। গত কয়েক মাস আগে অরক্ষিত রেলক্রসিংয় দিয়ে গোয়ালবাথান গ্রামের মো. বিদ্যুৎ মিয়ার মালিকানাধীন ঢাকা মেট্রো গ ৩৯-৩৬৮৯ নম্বরের প্রাইভেটকারে করে তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (৩২) ও ৬ বছর বয়সী ছেলে তালহা এবং তার চাচাতো ভাই রিপনের স্ত্রী লাকী (৩০) ও তার ৬ বছর বয়সী মেয়ে রিভা আক্তার স্থানীয় খ্রিস্টান মিশন স্কুলে যাচ্ছিল। ঢাকা-কলকাতা মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথান নামক স্থানে অরক্ষিত রেলক্রসিং পারাপারের সময় কলকাতাগামী মৈত্রী এঙ্প্রেস ট্রেন ধাক্কা দিলে প্রাইভেটকারটি এক কিলোমিটার দূরে সোনাখালী ব্রিজের নিচে গিয়ে ছিটকে পড়ে এবং চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় প্রাইভেটকারের চালক মিনহাজসহ ৫ যাত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যান।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অধিকাংশ ট্রেনই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) দিয়ে। এর মধ্যে ৯৪টি ব্রডগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে ৫৫টির আয়ুষ্কাল ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েও ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত চলাচল করছে। পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ঢাকায় বেশিরভাগ রেল দুঘর্টনা ঘটে। গত ৭ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া ইউনিয়নের কুজি শহর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে শুনীল দাস নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। শুনীলের বাড়ি পঞ্চগড় জেলার আটোমারী থানার রাধানগর গ্রামে। রুহিয়া রেল স্টেশন মাস্টার মোশারফ হোসেন জানান, বিকেলে পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা দিনাজপুরগামী ৪২ ডাউন ট্রেনটি কুজি শহর এলাকায় পার হচ্ছিল। এ সময় শুনীল চলন্ত ট্রেনের সামনে যান। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি রাতে টঙ্গীর মধুমিতা রোডের বেলতলী এলাকায় ঢাকাগামী ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে এক ব্যবসায়ী মারা গেছেন। তার নাম মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন (৪০)। তিনি এলাকার বৌবাজারে সেলুনের ব্যবসা করতেন। এ ঘটনায় ঢাকার কমলাপুর জিআরপি থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের শেষে লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে রেলওয়ে পুলিশ লাশ নিহতের আত্মীয়দের নিকট হস্তান্তর করেন।
টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাত সাড়ে ৯টায় ওই সেলুন ব্যবসায়ী তার দোকান বন্ধ করে উলি্লখিত এলাকায় রেলপথ অতিক্রম করার সময় এ দুর্ঘটনায় পড়েন। এর আগে ৪ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া বেলতলা রেলগেটে ট্রেনের ধাক্কায় রাফি (৫) নামের এক শিশু নিহত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে একই পরিবারের আরও তিন ব্যক্তি। আহতদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশংকাজনক। চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোরশেদ আলম জানান, খুলনা থেকে সৈয়দপুরগামী রূপসা এঙ্প্রেস ট্রেনটি বেলতলা রেলগেটে একটি প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দেয়। এতে প্রাইভেটকারে থাকা রাফি ঘটনাস্থলে মারা যায়। একই দিনে গাজীপুরে কালীগঞ্জের শিমুলিয়া এলাকার রেললাইন থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের নাম করিম বঙ্ (৫০)। তিনি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানার সোনাপুর গ্রামের জিগির মিয়ার ছেলে। করিম বঙ্ বাংলাদেশ রেলওয়েতে কার্পেন্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গত ১ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগ রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা কমলাপুরগামী ট্রেনে কাটা পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই গাজীপুরে রেলওয়েতে ঘটে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। গাজীপুরের পূবাইল কলেজ গেট এলাকায় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কুতুবের চর গ্রামের বুদু মিয়ার ছেলে অটো চালক নুর মোহাম্মদ এবং ইসমাইল হোসেনের ছেলে দিনমজুর হাসমত আলী। গত ডিসেম্বরের ৮ তারিখে গাজীপুরে চলন্ত ট্রেনে অগি্নকা-ের ঘটনা ঘটে। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে নারী ও শিশুসহ শতাধিক যাত্রী আহত হয়। গাজীপুরে কালীগঞ্জের আউটার সিগন্যাল এলাকায় আন্তঃনগর উপকূল এঙ্প্রেস ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিন ওই চলন্ত ট্রেনের 'খ' ও 'গ' বগির মাঝখানে হঠাৎ আগুন লেগে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এতে পুরো ট্রেনটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে যাত্রীরা ট্রেন থেকে লাফিয়ে নিচে পড়তে থাকে। যাত্রীদের চিৎকার ও হুড়োহুড়ির একপর্যায়ে ট্রেনটি আড়িখোলা স্টেশনের আউটার সিগন্যালের কাছে থেমে যায়। গত ৩০ ডিসেম্বর গাজীপুরে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবক নিহত হয়েছেন। সিটি করপোরেশনের ধীরাশ্রম এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। পরনে কালো জিন্স প্যান্ট ছিল। একই দিনে কালীগঞ্জ উপজেলার শিমুলিয়া নামক স্থানে টঙ্গি-ভৈরব রেলসড়কে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে জানান ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ। তিনি জানান, শুক্রবার ভোররাতে ট্রেনে কাটা পড়ে কালীগঞ্জ উপজেলার শিমুলিয়া এলাকায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির (৫৫) লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। এছাড়া গত ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের ধাক্কায় অটো রিকশা আরোহী এক নারী ও তার মেয়ে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও দুইজন আহত হয়েছেন। ষোলশহরের মুরাদপুর পিলখানা রেল গেটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মরিয়ম বেগম (৬০), তার মেয়ে আফরিন (১৭)। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর কদমতলী এলাকায় বাচ্চাকে নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে শামসুন্নাহার (৫০) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। শামসুন্নাহার সুপারিওয়ালা পাড়া এলাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন।
১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার বারআউলিয়া এলাকায় মুঠোফোন থেকে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় মিজানুর রহমান (২২) নামের এক যুবক নিহত হন। নিহত মিজান উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বিএমএ গেট এলাকার মুনশিবাড়ির আবদুল আজিজের ছেলে। এছাড়া রাজবাড়ী জেলা সদরের খানখানাপুর ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় রাজবাড়ী-ফরিদপুরগামী ট্রেনে কাটা পড়ে বাক প্রতিবন্ধী মামা ও ভাগ্নের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহতরা হলো-খানখানাপুর ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামের মজিবর রারীর বাক প্রতিবন্ধী ছেলে জাহিদ রারী (২৬) ও তার ভাগ্নে শহীদওহাবপুর ইউনিয়নের নিমতলা গ্রামের হাসানের ছেলে তুষার (২)।
গত ১৭ ডিসেম্বর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের মৃত্যু হয়। সোনাইমুড়ী বাজারের তানিয়া স্টোরের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় রেললাইনের পার্শ্ববর্তী তানিয়া স্টোরের সামনে দিয়ে ওই যুবক রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। গত ২৭ ডিসেম্ব্বর ফেনীতে ট্রেনে কাটা পড়ে আনুমানিক ২৪ বছর বয়সী অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ফেনী পৌর এলাকার বারাহীপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। পৃথক দুটি স্থানে এসব ঘটনা ঘটে। আখাউড়া-সিলেট রেলওয়ে সেকশনের মাধবপুরের ইটাখোলার অদূরে পরমানন্দপুর নামক স্থান থেকে অজ্ঞাতনামা (৪০) এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। অন্যদিকে নয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশনের আউটার সিগন্যালে জুয়েল (২৭) নামে এক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়। নিহত জুয়েল উপজেলার ইটাখোলা গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে। গত ২১ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ধান ক্ষেতে যাওয়ার পথে ট্রেনে কাটা পড়ে বদিয়াজ্জামান (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। উপজেলার ফকিরের কুটি এলাকায় এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। আশঙ্কাজনকভাবে রেল দুর্ঘটনা বেড়ে চলায় রেলে ভ্রমণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। বিগত বছরগুলোর তুলনার ক্রমাগত রেল দুর্ঘটনা বেড়ে চলাতেই মানুষের মধ্যে রেলে ভ্রমণে অনাস্থা এসেছে।
সূত্র: দৈনিক জনতা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK