সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
Monday, 11 Feb, 2019 12:53:12 am
No icon No icon No icon

গাঁজার সাতকাহন


গাঁজার সাতকাহন


জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : গাঁজা শব্দটি সংস্কৃতিতে “গঞ্জজিকা” বা “গঞ্জিকা”।গাঁজার বেশ কিছু স্থানীয় নাম আছে যেমন গঞ্জিকা, গাঞ্জা ,সিদ্ধি, মারিজুয়ানা, হাশিস, শক জাতি ভালোবেসে গাঁজার নাম দিয়েছিল কুনুবু (মানে, যাহা ধোঁওয়া উৎপাদন করে।... বোটানিক্যাল নাম Cannabis sativa. নানান নামে সারা দুনিয়া চষে বেরানো এই গাঁজার স্ত্রী এবং পুরুষ উভয় গাছ আছে। এর মধ্যে কেবল স্ত্রী গাছেরই মাদকতা আছে। ইনফেক্ট গাছের কোন অংশ নেই যেখান থেকে কোন প্রকার মাদক তৈরী হয় না! স্ত্রী গাছের শুকনো পাতাকে বলে সিদ্ধি বা ভাং। এখনো কালীপূজায় ভাং এর শরবতের রেওয়াজ আছে। ! স্ত্রী গাছের মঞ্জুরি শুকালে পাওয়া যায় গাঁজা আর গাছের কান্ড/পাতা/ফুল থেকে যে নির্যাস বের হয় সেখান থেকে তৈরি হয় চরস।

এবার গাজা সংক্রান্ত কিছু টার্ম জানা যাক। গাঁজা কাটার ছুরি নাম "রতন কাটারি" যে পিড়িতে গাঁজা কাটা হয় তার নাম "প্রেমতক্তি"। 'কলকির ভিতরে তিনকোনা পাথরকে বলে "টিকলী" আর ধোয়া ছাকবার ভিজে ন্যাকড়া "জামিয়ার" নামে পরিচিত। অঞ্চলভেদে এই নামের তারতম্য হয়। গাঁজার আসরে সাধারনত গোলাকার হয়ে বসার নিয়ম। বৃত্তাকারে বসা গাঁজার আসরে এক টান দিয়েই পাশের জনকে কল্কি বাড়িয়ে দেওয়া ভাতৃত্বের অনন্য নিদর্শণ যা নিমাই নামে পরিচিত। আর গাঁজাতন্ত্রের শেষ আচার হচ্ছে একটানে কল্কে ফাটানো!

আমরা সবাই কমবেশি “গাঁজা” শব্দটির সাথে পরিচিত।গাঁজা হলো নেশার জগতে বনেদি সদস্য।চরস এবং ভাং এর সাথে এর ভাই ভাই সম্পর্ক।সিদ্ধি গাছের শুকনো মঞ্জরি থেকে তৈরি হয় গাঁজা।তাই একে সিদ্ধি নামেও ডাকা হয়।তবে পশ্চিমা দেশগুলতে এটি “হাশিস”নামেই বহুল পরিচিত।গাঁজা শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে।

গাঁজা নামটি শুনলে বাংলাদেশে চোখ-মুখ বাঁকা করার যে প্রবণতা, তা শুরু হয়েছে ১৯৯০-এর দশকে। বলা হয়, ১৯৮৭ সালে পশ্চিমা একটি সিগারেট কোম্পানির বাজার ধরার পথ সহজতর করতে গাঁজাকে অবৈধ করে আইন পাস করা হয় এবং কৌশলে এর বিরুদ্ধে সোস্যালি লিগ্যাল নারকোটিকস কোম্পানিটি প্রপাগান্ডা চালাতে থাকে। মাত্র বছর দশেকের মধ্যে গাঁজার সোস্যাল ক্রিমিনালাইজেশন সফলতা পায়।

১০ হাজার বছর আগে গাঁজার বীজ খাওয়ার মধ্য দিয়ে গাঁজা গৃহস্থ শস্য হয়ে ওঠে। তবে এর আদি নিবাস কোনটি, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলছেন চীন আবার কেউ বলছেন মেসোপটেমিয়া। চীনারা গাঁজা গাছ থেকে কাগজ উৎপাদন শুরু করে, সুতাও। একই সঙ্গে ওষুধের কাজও করে। নিউরোলজিক্যাল সমস্যার জন্য মিসরীয় ও চীনারা গাঁজার ব্যবহার শেখে তিন হাজার বছর আগে। বঙ্গের মুনি-ঋষিরা বলে থাকেন, এটি ৬৫ ধরনের রোগের ওষুধ।

গাঁজার ইংরেজি নাম ব্যবহার উপযোগিতার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cannabis, যা প্রধানত দুই প্রকার Cannabis Indica ও Cannabis Sativa. সাধারণ গৃহস্থালি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কিংবা গবেষণায় যখন ব্যবহার হয়, তখন নাম cannabis, টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে একে বলা হয় Hemp. মাদকদ্রব্য আকারে ব্যবহার হলে weed/Marijuana বলা হয়।

এশিয়ায় Cannabis Indica হয়। সেটির পাতা হয় চিকন লম্বাটে, আর পশ্চিমে Cannabis Sativa হয়, যার পাতা হয় মোটা। Sativa গাছ লম্বাও হয় ছয়-সাত ফুট।

শুনলে হয়তো অনেকের চোখ কপালে উঠবে, কিন্তু এ ইতিহাস মাত্র কয়েক দশক আগের। গাছ থেকে সুতা উৎপাদন মোটামুটি বন্ধ হয় ১৯৬০-এর দশকে, Dupont-এর নাইলন ব্যাপক ব্যবহার শুরুর পর। ১৯৪০-এর দশকে আমেরিকায় ব্যাপক হারে নাইলনের কাপড় ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৬০-এর দশকে এসে পুরো পশ্চিমে এ কাপড়ের জয়জয়কার শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত গাঁজা গাছ ছিল মানুষের সুতা বা কাপড়ের অন্যতম প্রধান উৎস। পাট বা তুলা দুনিয়ার সব জায়গায় সহজে বা চাহিদামতো উৎপাদন হতো না।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় শক জাতি প্রাচীনকাল থেকেই বিপুল পরিমানে এই উদ্ভিদজাত নেশা দ্রব্যটি সেবন করত এবং জিনিসটি তারাই মধ্য এশিয়া থেকে সংগ্রহ করে গ্রিসসহ প্রাচীন বিশ্বের সমঝদারদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।( শকরা ছিল মধ্য এশিয়ার অশ্বারোহী যাযাবর গোত্র। এরা নিজেদের Skudat বলত যার মানে তীরন্দাজ। শকদের সভ্যতার সময়কাল ছিল ৮ম খ্রিস্টপূর্ব থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী। ) গাঁজা ছিল শক-সংস্কৃতির অন্যতম আচার। এখন আমরা গাঁজাকে যতই দুষিত মনে করি না কেন- শকরা কিন্তু পবিত্র হত গাঁজার ধোঁওয়ায় ।বিশেষ করে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গাঁজা বীজের নানাবিধ ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক! মানবসভ্যতার পরবর্তী প্রজন্ম শক জাতির রেখে যাওয়া স্বর্গীয় বস্তুটির অমোঘ আকর্ষন কাটিয়ে উঠতে পারে নি।

বাংলাদেশেও গাঁজা আদিকাল থেকেই ছিল তবে ইতিহাসের পাতা থেকে নওগাঁ গাঁজা সোসাইটি (সমবায় সমিতি) নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।আঠারোশ শতকে সংগঠিত হওয়া এই সংগঠন ১৯০৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে গাঁজা উৎপাদন শুরু করে।

ব্রিটিশরা আমাদের কাছ থেকে শুধু নীল আর পাট নিয়ে যেত, এ ইতিহাসই শুধু পড়ানো হয়। সুকৌশলে গাঁজার কথা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ বঙ্গ ছিল গাঁজা উৎপাদনের স্বর্গভূমি। বেলের পর বেল গাঁজা সুতা ব্রিটিশরা নিয়ে গেছে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে গাঁজার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সংযোগ পাওয়া যায়। গাঁজাকে শিব প্রসাদ বলা হয়। দেবরাজ শিব মর্ত্যের সাগর মন্থনে সমস্ত বিষ কণ্ঠে ধারণ করে নীলকণ্ঠী হন, সেজন্য দেবরাজকে পরম প্রভু এ বৃক্ষসুধা দেন। তিনি হাড়ের কল্কিতে সিদ্ধি পান করতেন। ভারতে, বাংলাদেশে এমনকি পাকিস্তানেও পূজার সময় বা বিভিন্ন সাধু পুরুষদের জন্ম-মৃত্যু তিথির অনুষ্ঠানে গাঁজার ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

মজার বিষয় হলো, ভারতীয় উপমহাদেশ গাঁজার বহুবিধ ব্যবহার জানত এবং একে খারাপ মনে করা হতো না, কিন্তু বর্তমানে একে অদ্ভুত কিছু একটা মনে করা হয়। পক্ষান্তরে পশ্চিমে গাঁজাকে অত্যন্ত খারাপ জিনিস বলে মনে করা হতো। ত্রয়োদশ বা চতুর্দশ শতকে শয়তান পূজারি ডাকিনি বিদ্যার অধিকারীরা গাঁজা পান করত বলে একে আরো নেতিবাচক চোখে দেখা শুরু হয়। পশ্চিমে গাঁজার সামাজিক ব্যবহারের অগ্রদূত হলো ফরাসিরা।

বব মার্লে জ্যামাইকান হলেও তার ক্ষেত্র তৈরি হয় আমেরিকায়। গাঁজা পানে এ পপশিল্পী অদ্বিতীয়। gunja gun এবং I smoke two joints— তার বিখ্যাত এ দুটি গান গাঁজা পানবিষয়ক। জ্যামাইকানরা গাঁজাকে ‘গাঞ্জা’ বলে। বব মার্লের গাওয়া gunja gun গানটি মূলত uerrillafinga ব্যান্ডের। এটি আরো অনেকে গাইলেও মার্লেরটাই বেশি জনপ্রিয়তা পায়।

গাঁজা গাছজাত কাগজের বড় অংশ উৎপাদন হয় চীনে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সময় আমেরিকায় প্রথম হ্যাম্প পেপার মিল স্থাপিত হয়। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের কাগজ গাঁজা গাছ থেকে উৎপাদিত। ১৯৬০-এর দশকে Hemp Fiber দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে Ford গাড়ির গ্লাস ও বডি প্রস্তুত করা হয়, যা ধাতু ও কাচের চেয়ে ১০ গুণ শক্তিশালী, কিন্তু চাহিদানুযায়ী জোগানস্বল্পতার জন্য এটি ব্যাপক উৎপাদনে কাজে লাগানো যায়নি।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK