মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Friday, 06 Jul, 2018 05:25:11 pm
No icon No icon No icon

ইরানিয়ানদের ঐতিহ্য


ইরানিয়ানদের ঐতিহ্য


জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : নার্গিস, লালা, গোলাপ ও আঙ্গুর-লতার দেশ ইরানের অনুপম শিল্প-রসে সিক্ত কবিতার মতই অনন্য। যুগে যুগে এখানকার নারাঙ্গী বন, সুদৃশ্য ঝাউ গাছ, দ্রাক্ষাকুঞ্জ, চেনার ও দেবদারুসহ দৃষ্টিনন্দন নানা বৃক্ষ শোভিত সবুজ প্রান্তর, উচ্ছ্ল পাহাড়ী ঝর্ণা আর প্রাকৃতিক বীথিকার সমারোহ ইরানীদেরকে করেছে শিল্প ও সৌন্দর্যপ্রেমী। তাই ইরানের সৃষ্টিশীল এই প্রেরণা নিয়ে নগর-সভ্যতাকেও মন-ভোলানো নানা অলংকার দিয়ে সাজিয়ে তুলতে সফল হয়েছেন। প্রকৃতির রূপ-মাধুরির মত ইরানের সৃষ্টিশীল-শৈলী দেখেও আপনার মনে হবে, সুন্দর তুমি কত রূপে কতভাবে প্রকাশিত আপনারে। ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত বিচিত্র সামগ্রীর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ছোট্ট পরিসরে এই আয়োজন ।লিখেছেন জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম)

কার্পেট
ইরানের ঐতিহ্যবাহী কার্পেটের নকশা ও ডিজাইনের মধ্যে অপর একটি ধারা হলো উপজাতীয় নকশা। এই শ্রেণীর কার্পেট বোণার ক্ষেত্রে যেসব ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে সে সবই নেয়া হয়েছে প্রকৃতি থেকে। যেমন গাছ পালা, লতাগুল্ম, জন্তু জানোয়ার ইত্যাদির ছবিই বেশি স্থান পেয়েছে উপজাতীয় নকশার কার্পেটে। উপজাতীয় নকশার অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো ছবিগুলোর জ্যামিতিক গঠন। এই ডিজাইনটি ইরানি কার্পেটের প্রাচীন মডেলগুলোর অন্যতম। এখনও ইরানের গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে বিভিন্ন শ্রেণীর উপজাতীয়দের মধ্যে এরকম জ্যামিতিক ডিজাইনের কার্পেট বোণার রেওয়াজ রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই ডিজাইনগুলো গ্রামীণ বুণন শিল্পীদের কেউ শিখিয়ে দেয় নি। তারা নিজেরাই নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ডিজাইনগুলো তৈরি করেছে।

উপজাতীয়দের তৈরি জ্যামিতিক ডিজাইনের ঐতিহ্যবাহী কার্পেটগুলোর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। তবে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ ইরানের উপজাতীয় যেসব নকশা পছন্দ করে সেগুলো উৎপন্ন হয় তুর্কামান, কাশকয়ি, বাখতিয়রি, লোর এবং কুর্দি উপজাতীয়দের মধ্যে।
কার্পেট শিল্পীরা আরও যে ডিজাইনটি ব্যবহার করেন তার মধ্যে রয়েছে বিল্ডিংয়ের সজ্জা বা অলংকরণের আঙ্গিক। টাইলসের ডিজাইন, বড় বড় বিল্ডিংয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যেসব আঙ্গিক বা নকশা ব্যবহার করা হয় সেসব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এসব ডিজাইন করা হয়েছে। এ ধরনের কার্পেট যারা ডিজাইন করেন তারা অনেক সময় বিল্ডিংয়ের ডিজাইন থেকে পাওয়া ধারণার সঙ্গে নিজস্ব মেধাকে কাজে লাগিয়ে সংমিশ্রিত ডিজাইনের জন্ম দেন। তবে যতোই মেধার প্রয়োগ করেন ভবনের ডিজাইনের মূল আঙ্গিক অক্ষুন্ন থেকে যায়।
ভবনের ডিজাইন থেকে নেয়া উপজাতীয় কার্পেটের নকশার কথা বলছিলাম। এ ধরনের যেসব ভবন বা ডিজাইন থেকে কার্পেট শিল্পীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন সেসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু স্থাপনা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ইস্ফাহানে অবস্থিত ঐতিহাসিক শেখ লুৎফুল্লাহ জামে মসজিদের কথা। কিংবা নিশাবুরের ইমামজাদা মাহরুক স্থাপনার মূল দ্বার, ইস্ফাহানের ইমাম মসজিদ, শিরাজের তাখতে জামশিদ বা পার্সপোলিস এবং কেরমানশাহের ত্বক বোস্তন ইত্যাদি। এইসব স্থাপনায় যেসব নকশা বা ডিজাইন রয়েছে, সেগুলো ঐতিহাসিক নি:সন্দেহে। আর সেইসব ঐতিহাসিক নকশাগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কার্পেট শিল্পীরা যেসব নকশা তৈরি করেছেন সেইসব কার্পেটও এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃতি পেয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন বা ডব্লিও,আই,পি,ও-তে ইরানি হাতে বোণা কার্পেটের জন্য ইরানের বিখ্যাত বহু এলাকার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন তাব্রিজ, হেরিস, খোই, ইস্ফাহান, কোম, মাশহাদ, হামেদান, কশ্মার, কাশান, কেরমান, নয়িন, সরুক, ইয়াযদ, আর্দেবিল এবং তুর্কামান বা গুলেস্তান ইত্যাদি। এসব শহরের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প সামগ্রির দিক থেকে অন্যতম তাব্রিজ শহরকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাপ্টস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে " বিশ্ব কার্পেট বুণন শহর' নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক 'মোজাফফারিয়া বাজার'এবং কার্পেট মিউজিয়াম।

চামড়াশিল্প
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইন পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে বহু দেশই সভ্যতার দিক থেকে ছিল অগ্রসর ও সমৃদ্ধ। ইরান সেসব দেশের একটি। ইরানে প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকেই চামড়া শিল্পে সক্রিয় তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।
চামড়া শিল্পের শিল্পপতি কিংবা শ্রমিক শ্রেণীর মেধাবী পদক্ষেপ। তাদের কর্মতৎপরতায় বিভিন্ন রকমের পোশাক আশাক তৈরি, জুতা তৈরি, ঘোড়ার লাগামসহ ঘোড়াকে গাড়ির সঙ্গে জোড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তৈরি করাসহ ঘরে ব্যবহার্য বিভিন্ন তৈজস তৈরিতেও এই চামড়ার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অ্যাঙ্গেলবার্ট ক্যাম্পফার কিংবা জন শার্দিনের মতো ফরাসি ভুবন পর্যটকগণ সাফাভি শাসনামলে ইরান সফর করেছিলেন। সফর শেষে তারা তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে ইরানের চামড়া শিল্পের বাজার এবং এ বিষয়ক তৎপরতার জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থার কথা লিখেছেন।
পর্যটক শার্দিন চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে ইরানি শিল্পীদেরকে অপরাপর শিল্পীদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ ও নিপুণ বলে মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ট্যানারির কাজে তথা পশুর চামড়া পরিশোধন করা এবং চামড়ায় পরিণত করার কাজের ক্ষেত্রে ইরানি শিল্পীদেরকে অতুলনীয় ও অনেক বেশি দক্ষ বলে প্রশংসা করেছেন তিনি। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন সে সময় ইরান থেকে ঘোড়া,গাধা ইত্যাদির কর্কশ কাঁচা চামড়া পরিশোধন করে ভারতসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হতো। এ বিষয়ে তিনি বেশ খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এ ধরনের চামড়াকে বলা হতো 'সগারি' চামড়া।  সাফাভি শাসনামলে 'সগারি' বলতে সাধারণত তাব্রিজ শহরে যেসব চামড়া পরিশোধন করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হতো সেগুলোকেই বোঝানো হতো।
এই সগারি চামড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বুট ও জুতা তৈরি করার কাজেই ব্যবহার করা হতো। এগুলো বেশ দামী পণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। সাধারণত ধনী লোকেরাই এসব জুতা ব্যবহার করতে পারতো কিংবা সাফাভি শাসনামলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে চামড়া দিয়ে তৈরি বিচিত্র হস্তশিল্পেরও ব্যবহার ছিল প্রচুর। বই বা কিতাবের কভার তৈরি করা হতো চামড়া দিয়ে। চামড়ার ওপরে তাপ দিয়ে নকশা করা হতো। চামড়ার ওপর বিভিন্ন ডিজাইন ও দৃশ্য আঁকা হতো। একইভাবে চামড়া কেটে কেটেও বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করা হতো। এইসবই চামড়া শিল্পীরা হাতে তৈরি করতো সুনিপুণভাবে এবং এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন ধরনের চামড়া।
তাবরিজ, শিরাজ এবং হামেদান। এই শহর কয়টিকে তখনকার যুগের মানুষেরা চামড়া শিল্প পণ্যের শহর হিসেবেই চিনতো। হামেদান শহরটি ছিল ইরানের সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকেও ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ। হামেদানি চামড়ার অনন্য বৈশিষ্ট্যটি ছিল এটা দুম্বার চামড়া থেকে তৈরি করা হতো। হামেদানের পাশাপাশি এই কাজারি আমলে আস্ফাহান, তাব্রিজ শহরের চামড়াও রাশিয়া, ভারত এবং বর্তমান তুরস্ক তথা তৎকালীন ওসমানী সাম্রাজ্যে রপ্তানি করা হতো।

কাঁচশিল্প
কাঁচকে বিভিন্ন ডিজাইনে আঙ্গিক দেয়ার নামই কাঁচশিল্প। হাতে তৈরি কাঁচশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য হলো ফুঁ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনে বিন্যাস করা। অন্তত ৪ হাজার বছর আগে থেকে ইরানে এই শ্রেণীর কাঁচশিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। প্রথমে আগ্নেয় ধাতব খনিজ পদার্থ সিলিকা, গ্লাস বার ইত্যাদিকে তাপ দিয়ে গলানো হয়। এরপর তার ভেতরে বিশেষ ধরনের পাইপ দিয়ে বাতাস  করে অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে শো-পিস কিংবা প্রয়োজনীয় পাত্র তৈরি করা হয়। কাঁচশিল্পের কাজটি যৌথ বা সমন্বিত ও সুনিপুণ একটি কাজ। একাকি এ কাজ করা দুরূহ। কাঁচের তৈরি একটি শিল্পে বেশ কয়েকজন অংশ নিয়ে থাকেন।
কাঁচশিল্প প্রাচীনতম শিল্পগুলোর একটি যে পেশায় মানুষ নিজেকে নিয়োজিত করেছে। অবশ্য ঠিক কোথায় সর্বপ্রথম এই শিল্পের চর্চা শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবে মনে করা হয় যে হযরত সোলায়মান (আ) এর শাসনকালেই কাঁচশিল্পের সূচনা হয়। সে সময় সোলায়মান (আ) এর আদেশে দৈত্যদের মাধ্যমে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ সাজানোর প্রয়োজনে কাঁচের বিভিন্ন সামগ্রী নির্মাণ করার উদ্দেশে বহু চুল্লি তৈরি করা হয়েছিল। কাঁচশিল্পের ইতিহাসের বর্ণনায় এই শিল্পের উৎসস্থল হিসেবে প্রাচীন মিশর, সিরিয়া এবং ইরানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের বিভিন্ন এলাকাসহ লোরেস্তান ও শুশ এলাকাসহ শিরাজের তাখতে জামশিদ বা পার্সপোলিসে কাঁচশিল্পের যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো কয়েক হাজার বছরের পুরনো বলে ঐতিহাসিকগণ মত দিয়েছেন। সুতরাং এই শিল্প যে ইরানে বেশ প্রাচীনকাল থেকেই চর্চিত হয়েছে তা প্রমাণিত সত্য।
কাঁচের হস্তশিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনটি খ্রিষ্টপূর্বকালের। এই শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা আনুমানিক ইলামি শাসনামলের অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪০ থেকে ৩ হাজার ২ শ বছর আগেকার। এই নিদর্শনগুলো পাওয়া গেছে খুজিস্তানের চোগাজাম্বিল প্রার্থনালয়ে। ওটা ছিল ইলামিদের সবচেয়ে বড় উপাসনালয়। হাতে তৈরি বড় বড় কাঁচের বোতলসহ কিছু পাত্র পাওয়া গেছে সেখানে। ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে নীল রঙের কাঁচের দানা দিয়ে তৈরি একটি গলার মালা পাওয়া গেছে। ওই মালাটিকে খ্রিষ্টপূর্ব ২ শ বছর আগের বলে মনে করা হয়। কাঁচের আতরদানি, বাটি, প্লেট ইত্যাদিও পাওয়া গেছে। এগুলোকে সাসানি শাসনামলের বলে মনে করা হয়। তার মানে অনেক আগে থেকেই যে কাঁচশিল্পের চর্চা হয়ে এসেছে ইরানে, এইসব নিদর্শন তারই প্রমাণ বহন করে। "অবগিনে" এবং "ইরান বস্তন" যাদুঘর দুটিতে এসব নিদর্শন এখনও দেখতে পাওয়া যাবে।
ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে খনিজবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান ইত্যাদির উন্নয়নের ফলে ইরানিরাসহ মুসলিম কাঁচশিল্পের শিল্পীরা বিজ্ঞানের উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়ে এই শিল্পে পরিবর্তন আনার সুযোগ পেয়েছেন। কাঁচ কেটে নকশা করা কিংবা কাঁচের পাত্রে লেখালেখি করা এ সময়কার অবদান। বিশেষ পাথর দিয়ে কাঁচ কেটে নকশা করা বা লেখার কাজ করা হতো। পাথরের পাশাপাশি তামা, লোহা, মেঙ্গানিজ, সালফার ইত্যাদিও এই নকশার কাজে ব্যবহার করা হত। বলা চলে যে-কোনোভাবেই হোক, নকশা বা কারুকাজ করা কাঁচশিল্প সামগ্রী এই সাসানি শাসনামলেরই নিদর্শন। তবে সালজুক এবং সাফাভি শাসনামল হলো ইরানি কাঁচশিল্পের স্বর্ণযুগ। কাঁচশিল্পের বহু কারখানা ইস্ফাহান, শিরাজ এবং কাশানের মতো বেশ কিছু শহরে গড়ে উঠেছিল।

খাদ্য পণ্য
বিশ্ব ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৯০০ কোটিতে।এতো বিশাল জনসংখ্যার দৈনন্দিন খাদ্যের জোগান দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।জাতিসংঘের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০৫০ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ যদি ঠিক থাকে তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শতকরা একান্ন ভাগ লোককেই তাদের খাবারের চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য খাদ্য সামগ্রী আমদানি করতে হবে।
ইরান বিশাল বিস্তৃত একটি দেশ,তবে তুলনামূলকভাবে শুকনো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের কারণে, উর্বর কৃষিভূমি থাকার কারণে এবং কৃষিক্ষেত্রে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কারণে সেইসঙ্গে পশুপালন ও মাছের ব্যাপক চাষ হওয়ায় দেশের খাদ্য শিল্পের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছে। ইরানের আবহাওয়ায় বারো রকমের বৈচিত্র্য আছে। এখানকার মাটিও যথেষ্ট উর্বর। সুতরাং নাতিশীতোষ্ণ কিংবা আধা নাতিশীতোষ্ণ এলাকার কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ইরান যথেষ্ট উপযোগী একটি দেশ। ইরানের কৃষিপণ্যের গুণগত মানও খুব ভালো।
ইরানের কৃষিপণ্য বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত বিশেষ করে উন্নত খাদ্য সামগ্রীর দিক থেকে। অন্তত ২০ টি কৃষিপণ্য ইরানে উৎপাদিত হয় যেমন পেস্তা, খোরমা, আনার, আঙুর, টমেটো, বিভিন্ন জাতের লেবু ইত্যাদি। এসব উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে ইরান পাঁচটি দেশের একটি। ইরানের বাগ-বাগিচায় উৎপন্ন পণ্য সামগ্রী রঙ ও স্বাদের দিক থেকে খুবই উন্নত মানের। বাগিচা থেকে উৎপন্ন এবং কৃষিপণ্য ইরানের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ব্যাপকভাবে বিদেশে রপ্তানি হয়। ফলফলাদি কিংবা কৃষিপণ্য থেকে উৎপন্ন সামগ্রী থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও তৈরি করা হয়। যেমন ফল থেকে ফলের জুস তৈরি, মোরব্বা তৈরি, জেলি তৈরি, অ্যাসেন্স তৈরি ইত্যাদি। রূপান্তরিত খাদ্য সামগ্রী এবং পরিপূরক এইসব শিল্পও দেশের ভেতরে বিভিন্ন প্রান্তে যেমন সরবরাহ করা হয় তেমনি রপ্তানি করা হয় দেশের বাইরেও।

রন্ধনশৈলী
ইরানী রন্ধনশৈলী কে ব্যাপকভাবে পারস্যীয় খাবার বলে উল্লেখ করা হয়, ইরানের খাদ্যদ্রব্য, রান্নার পদ্ধতি এবং খাদ্য ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি। ইরানী রন্ধনসম্পর্কীয় শৈলীগুলি প্রতিবেশী অঞ্চলের রান্না যেমন কোজিয়ান রান্না, তুর্কি রান্না, লেভান্তীয় রান্না, গ্রীক রান্না, মধ্য এশিয়ার রান্না এবং রাশিয়ান খাবারের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারস্পরিক ক্রিয়ার দ্বারা সম্পর্কযুক্ত। মধ্য এশীয় মুগল রাজবংশের হাত ধরে ইরানী রন্ধনবিদ্য উত্তর ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীতে গৃহীত হয়েছে।
সাধারণত ইরানের প্রধান খাবারের মধ্যে আছে চাল, মাংস (যেমন ভেড়ার, মুরগিবা মাছ), সবজির (যেমন পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন শাক) সাথে বাদামের মিশ্রণ এবং বাদাম। তাল, ডালিম, কুইন, প্রুনিস, খুরফু, এবং রেসিনসের মতো ফলের সাথে প্রায়শই সবুজ গুল্ম ব্যবহার করা হয়। ইরানীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মশলার মধ্যে আছে জাফরান, শুকনো লেবু, দারুচিনি এবং পেসলে যা বিশেষ খাবারের সাথে ব্যবহৃত হয়।
ইরানিয়ান রন্ধনপ্রণালী যেমন লন্ডন, লস এঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন, ডি.সি., ভ্যানকুভার, এবং টরন্টোসহ বহুসংখ্যক শহরে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইরানী জনগোষ্ঠী রয়েছে। লস এঞ্জেলেস এর তেহের‌্যাংগেলস বিশেষ করে ইরানী রেস্টুরেন্টের সংখ্যা এবং গুণমানের জন্য সুপরিচিত যার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কাবাব। পাশাপাশি বিভিন্ন ইরানী স্টু এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবারগু্লো পরিবেশন করে।

ডেজার্ট
৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন ইরানিরা একটি বিশেষ মজার খাবার তৈরি করেছিল যা গোলাপের পানি ও সেমাই দিয়ে তৈরি করা হতো। যা গ্রীষ্মকালে রাজপ্রাসাদে পরিবেশন করা হতো। বরফকে জাফরান এবং ফল ও অন্যান্য স্বাদের সঙ্গে মিশ্রিত করা হতো। আজকের দিনে সর্বাধিক জনপ্রিয় ইরানী মিষ্টি জাতীয় খাবার হচ্ছে আধা জমায়িত নুডলস দিয়ে তৈরী ফালুদা যার শিকড় সাবেক রাজধানী শিরাজ শহরে। বাস্তানি ই জামেরানী ফার্সি শব্দের অর্থ জাফরান আইসক্রিম একটি ঐতিহ্যবাহী ইরানী আইসক্রিম যা সাধারণত "ঐতিহ্যবাহী আইসক্রিম" নামে পরিচিত।

চাল
প্রথমবারের মতো সাফাভিদ সাম্রাজ্যের রন্ধনপ্রণালীতে চালের ব্যবহার শুরু হয় যা ১৬ শতাব্দীর শেষের দিকে ইরানী রান্নার একটি প্রধান শাখায় পরিণত হয়।ঐতিহ্যগতভাবে চাল উত্তর ইরানের একটি প্রধান খাদ্য উপাদান এবং ধনী পরিবারগুলির প্রধানতম খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত যখন দেশের বাকি অংশে রুটি প্রভাবশালী প্রধান খাবার ছিল।ইরানের চালের বিভিন্ন জাতের মধ্যে আছে জেরড, ডোমাসিয়া, চম্পা, দোদি (ধোঁয়া ওঠা ভাত), লেনজেন (লেনজেন প্রদেশের), তরম (টারম প্রদেশের), আনবারবু ইত্যাদি।

রুটি
ধানের পরে দ্বিতীয় উৎপাদিত শস্য হচ্ছে গম।আর এই গম থেকেই ইরানী রন্ধনশৈলীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন চ্যাপ্টা রুটি এবং পেস্ট্রি রুটির তৈরী করা হয়।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK