রবিবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৮
Friday, 20 Jul, 2018 08:34:41 pm
No icon No icon No icon
ধ্বং‌সের প‌থে যুব সমাজ

রাজধানীজু‌ড়ে ক্যাসিনো জুয়ার ফাঁদ!


রাজধানীজু‌ড়ে ক্যাসিনো জুয়ার ফাঁদ!


এমএবি সুজন, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: আমা‌দের রাজনী‌তির ছত্রছায়ায় দেশ থে‌কে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে নেপালিচক্র। নেপথ্য মদদদাতা ক্ষমতাসীন দলের ক‌তিপয় প্রভাবশালী যুবনেতা। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কমপ‌ক্ষে ৪শ নেপালি; নেই প্রবেশের কাগজ। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর ধাঁচে ক্যাসিনো বা জুয়ার আখড়া বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নেপালের একটি চক্র। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবিতে (আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ) বিবিএ করছেন শাওন (২২)। প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি’র নামে বাবা মোবারক খানের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতেন। সন্দেহ হওয়ায় বাবা এক‌দিন ছেলের গতিবিধি অনুসরণ করতে শুরু করেন। ছেলেকে অনুসরণ করতে করতে হাজির হন গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত ‘ফুয়াং ক্লাবে’। সেখানে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে ছেলের। ফুয়াং ক্লাবের ক্যাসিনোতে জুয়া খেলছিলেন শাওন। বিব্রত বাবা ছেলেকে ঘরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে শাওন স্বীকার করেন টিউশন ফি ও বি‌ভিন্ন অ‌ভিনব কো‌র্সের নামে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে তিনি ক্যাসিনোতে নিয়‌মিত জুয়া খেলতেন। এভাবে গত তিন মাসে আট লাখ টাকা উড়িয়েছেন তিনি। ছেলের এই অধঃপতন দেখে আতঙ্কিত হন মোবারক খান। শুধু নিজের ছেলে নয়, হাজার হাজার যুবককে জুয়ার ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা করতে নিজেই উদ্যোগ নেন। একে একে রাজধানীতে পরিচালিত ক্যাসিনোগুলো সরেজমিনে অনুসন্ধানে যান এবং সেগুলোর তালিকা তৈরি করেন। ওই তালিকার ভিত্তিতে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, গুলশানের ফুয়াং ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, কলাবাগান ক্লাব, মালিবাগ মৌচাক মোড়ে ফরচুন মার্কেটের বিপরীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চতুর্থ তলার সৈনিক ক্লাব, উত্তরায় র‌্যাব-১ এর বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার উত্তরা ক্লাব, এলিফ্যান্ট রোডের এজাজ ক্লাব, পুরানা পল্টনের জামাল টাওয়ারের ১৪ তলায় অবস্থিত ক্যাসিনোতে এ ধরনের আয়োজন চলছে। শুধু জুয়া নয়, দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানে অবৈধ মাদক বিক্রি, দেহব্যবসা ও নানামূ‌খি অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।’ ‘ক্যাসিনোর কারণে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে’- উল্লেখ করে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড দ্রুত বন্ধের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন মোবারক খান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া ওই অভিযোগ সূত্রে কথা হয় মোবারক খানের সা‌থে। তিনি বলেন, ফুয়াং ক্লাবে প্রবেশ করে আমি নিজ চোখে দেখেছি, সেখানে ৮-১০টির মতো টেবিল বসিয়ে টোকেনের মাধ্যমে জুয়া খেলা হচ্ছে। অশালীন পোশা‌কে বিদেশি মেয়েরা তা পরিচালনা করছেন। সরেজমিনে দেখে এবং তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে তারা নেপালের নাগরিক। যারা জুয়া খেলছেন তাদের অধিকাংশই যুবক, তবে অনেক বয়স্কও রয়েছেন সেখা‌নে। তিনি বলেন, শুধু আমার ছেলেই নয় রাজধানীর হাজার হাজার যুবককে জুয়ার মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করতে আমি নিজেই উদ্যোগ নিয়েছি। একে একে বেশ কয়েকটি ক্যাসিনো পরিদর্শন করেছি। সবগুলোতে উঠতি বয়সী যুবকদের দেখা গেছে। যে কাজটি প্রশাসনের করার কথা সেটি নিজ উদ্যোগে আমি করেছি। মাদকের মতো জুয়ার এই মরণ নেশা থেকে অবশ্যই আমাদের সন্তানদের রক্ষা করতে হবে। আমি আমার কাজ করেছি, এখন বাকি কাজ প্রশাসনের। শুধু মোবারক খান নন, এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ক্লাবগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দিয়ে সম্প্রতি পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সকে চিঠি দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপ-সচিব তাহমিনা বেগম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের পাঠানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে ক্যাসিনোগুলোর নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত অভিযোগটির বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত-সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে কার্যালয়কে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ এ বিষয়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) সোহেলি ফেরদৌস বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পেয়েছি। যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে আমরা সেসব যাচাই-বাছাই করছি। এগুলোর একটি তালিকা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে (ডিএমপি) চিঠি দেয়া হবে। আমরা ডিএমপিকে বলব, তথ্যপ্রমাণ পেলে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।’ সম্প্রতি গুলশান-তেঁজগাও লিংক রোডের ফুয়াং ক্লাবে জুয়া খেলেছেন এমন চারজনের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বর্ণনা অনুযায়ী, ক্লাবের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার পর ডান দিকের প্রথম ভবনটিতে ক্যাসিনো রয়েছে। ভেতরে ১৫টি ক্যাসিনো বোর্ড। প্রতিটি বোর্ডের পাশে হলুদ রঙের শার্ট আর কালো রঙের প্যান্ট পরা ২০-২২ বছরের তিনজন করে তরুণী অবস্থান করেন। হলরুমে প্রবেশ করতেই হাতের বাম দিকে চিপস বিক্রির কাউন্টার। চিপস বলতে এক ধরনের প্লাস্টিকের কয়েনকে বোঝায়। টেবিলের ওপর এটা রেখে বাজি ধরে জুয়া খেলা হয়। সেখানে জুয়া খেলেছেন এমন একজন বলেন, দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীরা মূলত খেলোয়াড়দের ম‌নেপ্রা‌ণে উন্মাদনা ও উত্তেজনা তৈ‌রি ক‌রতঃ বেশি বেশি অর্থ বাজি ধরার জন্য উৎসাহিত করেন। ফুয়াং ক্লাব প্রসঙ্গে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, আগে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। দুই মাস আগে মাননীয় ডিএমপি কমিশনার (আছাদুজ্জামান মিয়া) আমাদের এগুলো বন্ধের নির্দেশ দেন। আমরা সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছি। নতুন করে তদন্তের জন্য পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের কোনো আদেশ আমরা এখনও পাইনি। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে কলাবাগান ক্লাবের একজন ক্রিকেটার জানান, রমজান মাসের শেষদিকে একদিন রাতে ক্লাবের ভেতর ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে দেখেছেন তিনি। ধানমন্ডি ও কলাবাগান ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত কারও কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। ধানমন্ডি ও কলাবাগান ক্লাবে ক্যাসিনো চলে না।’ মতিঝিলের ভিক্টোরিয়া ক্লাবে জুয়া খেলেছেন এমন একজন জাগো নিউজকে বলেন, ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে সেখানে চিপস পাওয়া যায়। নগদ টাকা দিয়ে চিপস কিনে খেলতে হয়। শুধু জুয়া নয়, এখানে বিভিন্ন ধরনের মাদকেরও ব্যবস্থা আছে। অর্থের বিনিময়ে এখানে মদ নারীসহ সবকিছু পাওয়া যায়। অবৈধ ক্যাসিনোর বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে ফুয়াং ও উত্তরা ক্লাব সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের কেউই নিজেদের ক্লাবের বিষয়ে কথা বলার মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তি নন বলে জানান। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার ছত্রছায়ায় চলা এসব জুয়া থেকে প্রাপ্ত সব অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। নেপালি জুয়াড়িদের এ চক্রটি আইনের হাত থেকে রক্ষা পেতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিবাজ, লোভী কিছু কর্মকর্তাকেও অর্থের বিনিময়ে হাতের তালুতে বন্দি করে রেখেছে। জুয়া খেলা ছাড়াও এসব ক্যাসিনো মদ-ইয়াবাসহ বিভিন্নরকম মাদক সেবনের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসী, দাগি আসামি এমনকি ভাড়াটে কিলাররাও এখানে নিরাপদ। চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, দেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকায় লাস ভেগাসের আদলে রয়েছে অন্তত ৫০টি ক্যাসিনো। সবগুলোর নিয়ন্ত্রণই এ চক্রটির হাতে। এ চক্রের পালের গোদা নেপালের দিনেশ শর্মা।তার হাত ধরেই রাজধানীর ক্যাসিনো ব্যবসায় আড়াই শতাধিক এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরগুলোয় আরও দেড়শ নেপালি এ দেশে এসেছে; যাদের অনুপ্রবেশের বৈধ কোনো কাগজপত্র পর্যন্ত নেই। এরা ক্যাসিনো পরিচালনায় দক্ষ। সরেজমিন ‘সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ’ এসব ক্যাসিনো ঘুরে এবং সূত্রের মাধ্যমে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত রেস্টুরেন্ট ব্যবসার আড়ালে বসানো হয়েছে ক্যাসিনোগুলো। এ জুয়ার জালে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অসংখ্য মানুষ পথে বসেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোর নেপথ্য মদদদাতা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। নেপালি চক্রের কাছ থেকে তিনিও বাগিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। এ নেতার বিরুদ্ধে একটি গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে লিখিত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে জুয়া খেলা বন্ধে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর থেকে রাজধানীর রমনা, লালবাগ, ওয়ারি, মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান, উত্তরা, ডিবি উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম, সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে যেসব প্রতিষ্ঠানে জুয়া খেলা হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিকানাও তুলে ধরা হয়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোদ ডিএমপি পুলিশ কমিশনারের সে নির্দেশও প্রতিপালিত হয়নি বা হ‌চ্ছেনা। ডিএমপি গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সব ধরনের জুয়া খেলার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব ধরনের জুয়া খেলা নিষিদ্ধ। তারপরও কিছু কিছু ক্লাব আদালতকে ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলার অনুমতি নিয়ে জুয়া খেলা পরিচালনা করে থাকে। ফলে ওইসব ক্লাবে পুলিশি অভিযান পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ হয়ে পড়ে। জানা গেছে, রাজধানীর পুরানা পল্টনের ৩৭/২ জামান টাওয়ারে চলছে দেশের অন্যতম দুটি বড় ক্যাসিনো। ভবনটির ১৪ তলায় লাস ভেগাসের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে পাশাপাশি দুটি ক্যাসিনো। এদের একটিতে গ্যাম্বলিং টেবিল সাজিয়ে চলছে হরেক নামের জুয়া খেলা। অন্যটিতে সারি সারি ডেস্ক বসিয়ে তাতে স্থাপন করা কম্পিউটারে অনলাইনে চলছে ক্যাসিনো গেম। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এগুলোতে কাজ করছে ১৮ নেপালি। তারা সবাই প্রশিক্ষিত জুয়াড়ি। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কথা বলে প্রায় ৮ মাস আগে জামান টাওয়ারের ১৪ তলায় দুটি হলরুম ভাড়া নেয় নেপালের এই জুয়াড়ি চক্র। দিনরাত সচল এই ক্যাসিনোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়। চক্রটি এই খেলা থেকে প্রাপ্ত টাকা হুন্ডির মাধ্যমে নেপাল, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে।১৭ তলাবিশিষ্ট জামান টাওয়ারের লিফটের ১৪ তলায় উঠতেই দেখা মিলবে অবিকল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা দুই নিরাপত্তারক্ষীর। এ দুজন ছাড়াও ফ্লোরটির বাইরের অংশে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য রাখা হয়েছে ৪টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি টিভি ক্যামেরা)। ভেতর থেকে এগুলো মনিটরিং করা হয়। লিফটের দরজা খুলতেই চোখ পড়বে একটি কাচের দরজায়। তাতে ইংরেজিতে লেখা ‘ওয়েলকাম’। পরিচয় গোপন করে একজন জুয়াড়ির সাহায্যে গত রবিবার রাত ১২টার দিকে জামান টাওয়ারে গিয়ে দেখা গেছে, হলরুম দুটির মেঝেতে লাল রঙের বিদেশি কার্পেট। নানান রঙের বাতি দিয়ে জমকালো সাজে সাজানো হয়েছে। ভেতরে রয়েছে নামাজের কক্ষ ও বিশ্রামাগার। জুয়াড়িদের আপ্যায়নের জন্য হলরুমের একদিকে নানা ধরনের খাবারের আয়োজনও রয়েছে। কক্ষ দুটির প্রথম সারিতে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যাংকসদৃশ টাকা আদান-প্রদানের কাচঘেরা বিশেষ কাউন্টার। পরিপাটি পোশাক পরা কয়েকজন কর্মকর্তা বসে আছেন কাউন্টারের পেছনে। জুয়াড়িরা টাকার বান্ডিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সেই কাউন্টারের দিকে। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ভাঙিয়ে কিনে নিচ্ছেন তারা এক ধরনের প্লাস্টিকের কয়েন (চিপস)। প্রতিটি চিপসের মূল্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। একটি হলরুমের মাঝখানে মখমলে মোড়ানো ৮টি গ্যাম্বলিং টেবিল পাতা। প্রতিটি টেবিলের চারপাশে ৭টি করে অভিজাত চেয়ার সাজানো। কোনোটিই খালি নেই। টেবিলের অপর প্রান্তে আছেন ক্লাবের প্রশিক্ষিত জুয়াড়িরা। দক্ষ হাতে টেবিলের ওপর তাস ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। পছন্দসই কয়েকটি তাস তুলে নিয়ে নম্বর মেলাচ্ছেন জুয়াড়িরা। এর পর সেগুলো টেবিলে রাখছেন। একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন জুয়াড়ি তাস তুললেও জিতছেন হাতেগোনা দু-একজন। এভাবে কিছুক্ষণ খেলার পর চিপস শেষ হয়ে গেলে আবারও সেই কাউন্টারে টাকা ভাঙিয়ে নতুন চিপস নিয়ে আসছেন হেরে যাওয়া জুয়াড়িরা। টেবিলে সেই চিপস সাজিয়ে হরদম চলছে বাক্কারাট, রুলেট, পন্টুন, ফ্লাশ, বিট, ডিলার, কার্ডসট, ব্লাকজ্যাক নামের জুয়া খেলা।জুয়াড়িদের অনেকে বিদেশি মদভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে বসছেন জুয়ার টেবিলে। মদের নেশায় বুঁদ হয়ে জুয়া খেলায় মেতে উঠছেন তারা। চেয়ারে বসা জুয়াড়িদের পেছনে ভিড় করে আছেন কয়েকজন দর্শক; খেলা দেখছেন। টেবিলের অদূরে লম্বা দুটি সোফাসেট পাতা। তারা চেয়ার খালি হওয়ার অপেক্ষায় থাকা জুয়াড়ি। অন্য হলরুমে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি কম্পিউটারের সামনে বসে অনলাইনে পোকার (জুজু খেলা) খেলায় মশগুল জুয়াড়িরা। প্রতিটি কম্পিউটারের সামনে একজন করে জুয়াড়ি। হংকং, চীন, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ক্যাসিনোর সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তারা জুয়া খেলছিলেন। জিততেই হৈ-হুল্লোড় করছিলেন কয়েক জুয়াড়ি। অবশ্য তাদের অধিকাংশই রোজ বাড়ি ফেরেন নিঃস্ব হয়ে। জানা গেছে, ক্যাসিনো দুটির নিয়ন্ত্রণ এখন দিনেশ শর্মা ও রাজকুমার নামে দুই নেপালির হাতে। তারা গ্যাম্বলিংয়ের জগতে ডন হিসেবেই পরিচিত। এদের পার্টনার দেলোয়ার নামে এক বাংলাদেশি। এ ছাড়া শক্তিশালী এই চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাবা, বল্লভ, বিজয় নামে তিন জুয়াড়ি। তারা নেপালের নাগরিক। এই চক্রটিই মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার ক্যাসিনো বাণিজ্য। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা প্রশিক্ষিত চারশরও বেশি নেপালি জুয়াড়ি অনুমতি ছাড়াই দেশের বিভিন্ন নামিদামি রেস্টুরেন্ট ও ক্লাবভিত্তিক ক্যাসিনোয় কাজ করছেন। জানা যায়, এই চক্রের টার্গেট যেখানে জনসংখ্যা বেশি সেসব এলাকা। সেখানে বিভিন্ন নামে একটা ভবনের একাধিক ফ্লাট ভাড়া করে, সেখানে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেটা বেশি টাকায় অন্য মালিকানায় দিয়ে তারা নতুন ভবন বা ফ্লাট ভাড়া করে। এভানে গোড়ে তোলে বিশাল জুয়ার আখড়া। এভাবে তারা রাজধানীতেই অর্ধশতাধিক ক্যাসিনো গড়ে তুলেছে। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও নেপালি এই জুয়াড়ি চক্রের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK