সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮
Sunday, 10 Jun, 2018 11:40:16 am
No icon No icon No icon

ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য চরমে


ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য চরমে


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: রাজধানীসহ সারা দেশে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। সংঘবদ্ধ এই চক্রের সদস্যরা প্রতারণার ফাঁদ পেতে নিরীহ লোকজনকে নানাভাবে হয়রানি করছে। প্রতারণা এদের পেশায় পরিণত হয়ে পড়েছে। সাংবাদিক পরিচয়ে এরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এই চক্রে বেশ কয়েকজন নারী সদস্যও রয়েছেন। এরা মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ‘প্রেস’ ‘সংবাদপত্র’ লিখে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। এদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় গত ২৪ জুন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের মতবিনিময়ে এ প্রসঙ্গ আসে। এর প্রেক্ষিতে পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মারুফ হাসানকে ভুয়া সাংবাদিক ধরতে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায় অভিযানে ‘প্রেস‘ স্টিকার লাগানো কাগজপত্রবিহীন ৩৩টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে। এরপর গত শনিবার রাতে যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ মোড়ে এমন বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও গাড়ি আটক এবং একজন ভুয়া সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার ৪৯টি থানা এলাকায় ভুয়া সাংবাদিক বিরোধী অভিযান চলবে। পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, একাধারে কয়েকটি চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। ‘প্রেস/সংবাদপত্র’ লেখা যানবাহন দেখলেই সিগন্যাল দিয়ে সেগুলো তল্লাশি এবং কাগজপত্র নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। অভিযানে অংশ নেয়া ডিবি পুলিশের একজন এসি বলেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোল চত্বরের পেছনে রয়েছে ভুয়া সাংবাদিকদের কয়েকটি আস্তানা। এরা বিমানবন্দর কেন্দ্রিক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত। লাগেজ পার্টির সঙ্গেও রয়েছে তাদের যোগসাজশ। অপর একটি সূত্র বলেছে, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে কথিত পত্রিকা ও অনলাইনের ‘সাংবাদিক পরিচয়পত্র’ বহন করেন। এরা কৌশলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ধরা হবে। পুলিশ জানায়, জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এলাকায় ভুয়া সাংবাদিকদের অনেকের আনাগোনা রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে। যে কোনো সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গোপনে অবগত করে অভিযান চালানো হতে পারে। অবশ্য চলমান অভিযান আচ করতে পেরে রাস্তায় ‘প্রেস’ স্টিকার লাগানো গাড়ি কমে গেছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন। পুলিশ জানায়, গত ১৬ জুন মিরপুর এলাকায় ভুয়া সাংবাদিক চক্রের সদস্যরা এক তরুণীকে ধর্ষণ করলে পুলিশ ওই চক্রের সদস্য এক নারীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া থানায় থানায় রাতে সাংবাদিক পরিচয়ে কথিতদের আড্ডা জমাতে দেখা যায়। ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে সহসাই সব থানায় সতর্ক বার্তা দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। ডিএমপির মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনসের ডিসি মাসুদুর রহমান জানান, অনেকে সাংবাদিক না হয়েও যানবাহনে প্রেস স্টিকার ব্যবহার করছে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে ফুটপাত পর্যন্ত চাঁদাবাজি করছে সাংবাদিক নামধারী এই চক্র। নানা অপকর্ম করতে এসব ভুয়া সাংবাদিক নানা নামে সংগঠনও গড়ে তুলেছে। এমনই একটি সংগঠন ‘যাত্রাবাড়ী-কদমতলী-ডেমরা এন্ড শ্যামপুর প্রেসক্লাব ফাউন্ডেশন’। মিরপুর, উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় রয়েছে বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, উত্তরা প্রেসক্লাব, মিরপুর প্রেসক্লাব, ঢাকা প্রেসক্লাব ও ঢাকা ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির মতো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রাজধানীতে শত শত ভুঁইফোড় অনলাইন গণমাধ্যমের নামেও গড়ে উঠেছে সাইনবোর্ড সর্বস্ব সাংবাদিকদের নানা সংগঠন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি শাহেদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিক পরিচয়ে যারা প্রতারণা করছে তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ডিআরইউ এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করবে। ক্র্যাব সভাপতি আখতারুজ্জামান লাবলু বলেন, সাম্প্রতিক সময় ভুয়া সাংবাদিকদের অপতৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় পেশাদার সাংবাদিকদের ইমেজ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভুয়ারা একের পর এক নানা অপকর্ম করায় পেশাদারদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পেশাদার সাংবাদিকদের ইমেজ ধরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ডিএমপির পক্ষ থেকে ক্র্যাবের সহায়তা চাওয়া হলে ক্র্যাব সহায়তা দিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে কাউকে কোনো ছাড় না দিতে পুলিশকে অনুরোধে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এরা পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য মর্যাদা হানিকর। কোনো প্রতারক চক্র সাংবাদিক পরিচয়ে অপকর্ম করলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিবি পুলিশের একজন ডিসি জানান, ভুয়া ও অখ্যাত পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে অনেকে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন সময় মাদকসহ ভুয়া সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে। এতে মূলধারার সাংবাদিকদের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। সাংবাদিক পরিচয়ধারী এসব প্রতারকের নানা অপতৎপরতায় থানা পুলিশ অতিষ্ঠ। থানায় অপরাধীদের হয়ে নানা তদবির করাই তাদের কাজ। এছাড়া এরা গলায় সাংবাদিক পরিচয়পত্র আর গাড়িতে ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে মাদক পাচার এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতার সময় ককটেল ও বোমাও বহন করছে। অনেকে পুলিশের চোখে ধোঁকা দিতে ক্যামেরা বহন করছে। তবে তারা পেশাদার না। সূত্র মতে, সাংবাদিক পরিচয়ধারী এসব প্রতারক চক্র শুধু নামসর্বস্ব পত্রিকার আইডি কার্ড বহনই নয়, বিভিন্ন ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা মূলধারার বড় পত্রিকার সাংবাদিকও পরিচয় দেয়। তাছাড়া ভুঁইফোড় পত্রিকা অফিসগুলো ‘সাংবাদিক পরিচয়পত্র’ও বিক্রি করে থাকে। এসব পরিচয়পত্র পকেটে রেখে বিভিন্ন প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের সামনে ‘সাংবাদিক’ বা ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে ঘোরে একশ্রেণীর লোকজন। এই চক্রের একজন ‘যাত্রাবাড়ী-কদমতলী-ডেমরা এন্ড শ্যামপুর প্রেসক্লাব ফাউন্ডেশনের’ সভাপতি আনোয়ার হোসেন আকাশ। প্রতারণা যার পেশায় পরিণত হয়েছে। একাধিকবার পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও এ অপকর্ম তিনি ছাড়তে পারছেন না বলে জানা গেছে। যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, ডেমরা ও শ্যামপুর এলাকায় তার মতো অন্তত দেড়শ’ ভুয়া সাংবাদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে সেলিম, জাহাঙ্গীর, কচি, মন্জু, মিলন, মেহেদী হাসান, লিটন, আকাশ, আলম, মীর সেলিম, আফজাল, আজাদ, তাপস, তৌহিদ, জামাল, জীবন, বাবুল, রবিউল, সিরাজ অন্যতম। এরা ওই এলাকার বিভিন্ন থানা, পাইকারি কাঁচাবাজার, মৎস্য বাজার, হোটেল, ফুটপাত, বাস কাউন্টার থেকে নানা কায়দায় সাংবাদিক পরিচয়ে টাকা তোলে। স্থানীয় থানা পুলিশের একশ্রেণীর কর্মকর্তার সঙ্গেও তাদের বেশ সখ্য রয়েছে। অনেকে পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করে। তাদের অনেকে এমপি, মন্ত্রী এবং পুলিশের আইজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে।
স্থানীয় সূত্রমতে, ঢাকার বিমানবন্দর ও উত্তরা এলাকায় এক ডজনের বেশি চক্র সাংবাদিক পরিচয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। তারা কখনো গোয়েন্দা সদস্য ও থানা পুলিশের সোর্স হয়ে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি করছে। আবাসিক হোটেল, ফ্ল্যাট বাড়ি, বেকারি, কারখানা, ইজিবাইক পরিবহন, কমার্শিয়াল ব্যবসায়ী, আদম পাচারকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছে চক্রটি। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সঙ্গে চক্রটির সখ্য রয়েছে। স্থানীয় থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা জানান, রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় ‘সমাজ চিন্তা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সুজন নামের এক ব্যক্তি। অন্যদিকে সম্প্রতি উত্তরায় চাঁদাবাজির ঘটনায় বেশ কয়েকজন ভুয়া সাংবাদিককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয় এলাকাবাসী। উত্তরা-পশ্চিম থানা ১৩ নম্বর সেক্টরে একটি বাড়িতে ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করার সময় হাতেনাতে আটক করা হয় ১১ ভুয়া সাংবাদিককে। পশ্চিম থানা পুলিশ জানায়, সাপ্তাহিক ‘এশিয়া বার্তা’ পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ওই বাড়িতে চাঁদাবাজি করছিল তারা। এর আগে মুজিব নামে এক ভুয়া সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। চাঁদাবাজির মামলায় জেল খেটে সম্প্রতি সে ছাড়া পেয়েছে। সাভার, আশুলিয়ায়ও যে কোনো সময় অভিযান : রাজধানীর পার্শ্ববর্তী সাভার, আশুলিয়া এলাকায় ভুয়া সাংবাদিকরা রীতিমতো প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত রয়েছে। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে সাংবাদিক পরিচয়পত্র। আশুলিয়ার বাইপাইল মোড় ও থানার আশপাশে রয়েছে এদের আস্তানা। অপতৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। পেশাদার সাংবাদিকরা এদের কারণে এখন অনেকটা ‘অসহায়’ হয়ে পড়েছেন। এই চক্রের সদস্যরা মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজিতে সরাসরি ব্যস্ত। এদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, প্রইভেটকার চোরাই এবং কাগজপত্রবিহীন। এ অবস্থায় স্থানীয় পেশাদার সাংবাদিকরা ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের কাছে ভুয়া সাংবাদিক বিরোধী অভিযান চালানোর দাবি জানান। দাবির প্রেক্ষিতে পুলিশ যে কোনো সময় এদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামতে পারে বলে জানা গেছে। এরইমধ্যে পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ভুয়া সাংবাদিকদের ব্যাপারে গোপনে খোঁজখবর নিয়ে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তালিকায় সাভার এলাকায় আলী, জুয়েল, সানি, ফরহাদ, ফারুক, স্বপন, আবু বকর সিদ্দিক, লিজা বেগম, আশুলিয়া এলাকার জনৈক শিকদার, মুনসুরসহ শতাধিক প্রতারকের নাম রয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া কয়েকটি ভুয়া ‘মানবাধিকার’ সংগঠনের সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানা গেছে।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK