মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮
Friday, 11 May, 2018 11:49:20 am
No icon No icon No icon

সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের নেপথ্যে আসলে কী?


সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের নেপথ্যে আসলে কী?


টাইমস ২৪ ডটনেট, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ইস্যু হলো সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব যা শেষমেষ একটি যুদ্ধের দিকেও গড়াতে পারে। সৌদি আরবের সরকারি কর্মকর্তারা এবং বিশেষ করে এর ক্ষমতাশালী উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রায়ই বিপজ্জনক ইরানি হুমকি মোকাবিলা করার কথা বলেন। কিন্তু সত্যটা হলো, রিয়াদের এই ইরানবিরোধী পররাষ্ট্র নীতির উৎস হলো সৌদি আরবের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যুবরাজ মোহাম্মদ জানেন যে, একটি আতঙ্ক জাগানিয়া শত্রু থাকা মানে তার নিজের ক্ষমতার ন্যায্যতার চাবিকাঠি।

গত কয়েকদশক ধরেই সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক পরস্পরের প্রতি উদাসীনতা, শত্রুতা, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর যুবরাজ মোহাম্মদকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি ইরানের সঙ্গে শত্রুতা আরো চরমে তুলতে চাইছেন। কেননা তিনি আরব বিশ্ব এবং এর বাইরেও ইরানের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

তার এই ভয়ের উৎস মুলত সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। সৌদি যুবরাজ আসলে ইরানের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি সামনে এনে নিজ দেশের জটিলতা এবং অনিশ্চয়তাগুলো ঢাকা দিতে চাইছেন।

১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটি তার নিজস্ব ব্র্যান্ডের বিপ্লবী ইসলাম বিদেশেও রপ্তানি করতে শুরু করে। অন্যদিকে, ইরান একটি ইসলামিক রিপাবলিক হয়ে যাওয়ার পর সুন্নী ইসলামপন্থীরা শুধু শিয়া ইসলামের বিজয়ে ঈর্ষান্বিত হননি বরং নিজেদের সংস্করণের ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

সৌদি আরব এরপর থেকে আফ্রিকা, এশিয়া এমনকি ইউরোপেও ওহাবি ইসলাম রপ্তানি শুরু করে। দুটি দেশই মুসলিমদের মন জয়ে তীব্র প্রতিযোগীতা শুরু করে। সৌদি আরবের ধর্মতাত্ত্বিকরা শিয়াবিরোধী চেতনাকে অবলম্বন করে মুসলিমেদের মন জয় করার চেষ্টা করেন। আর ইরান শিয়া ইসলামকে অবলম্বন করে প্যান-ইসলামবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং পাশ্চিমাবিরোধী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে চায়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন। যুবরাজ মোহাম্মদ তার দেশের আভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো থেকে তার দেশের জনগণের মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ইরানের হুমকিকে বড় করে দেখাচ্ছেন। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী যুবরাজকে দমন করে তিনি ক্ষমতা নিজের একার হাতে কুক্ষিগত করেছেন। যার ফল এখনো অনিশ্চিত।

রাজনৈতিক দুর্দশা, বৈষম্য এবং বেকারত্ব সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের নিজেদের দেশের এই বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। কিন্তু সৌদি আরব কখনোই তা শোনেনি। এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর বোমা হামলার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিল।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বাহরাইন, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, এবং ইরাকে তীব্র ইরানবিরোধী চেতনা এবং যুদ্ধের আবহ সৃষ্টি করেন আভ্যন্তরীণ বিরোধীতাগুলোকে দমিয়ে রাখার জন্য।

সৌদিরা ইরানের উত্থানকে প্রাচীন পারসিক জাতীয়তাবাদের উত্থান হিসেবেই দেখে থাকে। ইরানকে একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহত্তর আরব অঞ্চলকে পারসিকীকরন এবং শিয়াকরন থেকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরতে চান।

আর ইরানের সঙ্গে শত্রুতা জিইয়ে রাখলে ২০১৫ সাল থেকে তিনি তারা বাবা রাজা সালমানের আশীর্বাদে সৌদি আরবে যে আদর্শিক রুপান্তার শুরু করেছেন তাও সম্পন্ন করা সহজ হবে। রাজা সালমানের অধীনে সৌদি আরব ওহাবি ইসলাম থেকে বের হয়ে একটি গণমুখী, সামরিকায়িত সৌদি জাতীয়তাবাদের দিকে হাঁটতে থাকে। ইরানের আধিপত্যবাদ ও শিয়া জাতীয়তাবাদের হুমকি দেখাতে পারলে এই রুপান্তর আরো সহজ হবে।

ইরানের সঙ্গে বিরোধীতা সৌদি জাতীয় সংহতিকে দৃঢ় করছে। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত শিয়া হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও সৌদি জাতির টিকে থাকার এবং পারসিকিকরনের বিপরীতে আরবীয়করনের জন্য জরুরি মনে করছে সৌদি রাজতন্ত্র।

ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো ধরনের সমঝোতা হলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান মার্কিন মিত্র হিসেবে সৌদি আরবের যে অবস্থান আছে তা হারাবে সৌদিরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোল্ড ওয়ারের সময় সৌদি আরব এবং ইরান একসঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে। ইরান সহায়তা করেছিল সামরিকভাবে। আর সৌদি আরব সহায়তা করেছিল ধর্মতাত্ত্বিক অস্ত্র- ওহাবি ইসলাম ছড়িয়ে এবং অর্থ দিয়ে।

এরপর সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান মার্কিন মিত্র হিসেবে নিজেকে উস্থাপন করে আসছে। সবসময়ই মার্কিনিদের অনূকুল নীতি গ্রহণ করেছে সৌদিরা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে ছেড়ে আর কারো সাথে মিত্রতা করুক তা সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন।

সম্প্রতি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রে একাধিকবার সফর করেছেন শুধু ইরানকে মার্কিনিদের সামনে দানব হিসেবে হাজির করার জন্য। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবে বিপ্লবী ইসলাম রপ্তানি, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদে মদদ যোগানো এবং ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের উত্থানে সহায়ক ভুমিকা পালনের অভিযোগ করেন। তার মতে, এসব দেশে ইরানের সহায়তায় শিয়াদের উত্থানের ফলে সুন্নীরা কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তিনি এসব দেশে ভয়ানক সশস্ত্র শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলারও অভিযোগ করেন ইরানের বিরুদ্ধে, যারা সুন্নীদের আতঙ্কগ্রস্ত করেছে। আর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তিনি হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেন।

আভ্যন্তরীণ কারণেই সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইরানের পুনর্মিলনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। এই দুই দেশের বিরোধ নিরসন হবে একমাত্র যদি সৌদি আরবের আভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তাগুলো দূর হয়। এবং সৌদি আরব আভ্যন্তরীণভাবে নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে। যার জন্য দরকার একটি গণপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার যা সৌদি আরবের আভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো গণমতের ভিত্তিতে সমাধান করবে। এবং নিজেদের অন্যায়গুলো ঢাকার জন্য বহিরাগত শত্রুর ওপর দোষ চাপানো বন্ধ করবে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, কালের কণ্ঠ অনলাইন ।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK