শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯
Tuesday, 15 Oct, 2019 08:25:20 am
No icon No icon No icon

ঢাকা কালচারাল রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার রূপকল্প-(৫)

//

ঢাকা কালচারাল রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার রূপকল্প-(৫)


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: আনন্দ, উৎসব, ঐতিহ্য এবং বিলাসী প্রিয় ঢাকাইয়া সমাজঃ ঢাকাইয়ারা ধর্মীয় এবং সামাজিকভাবে রক্ষণশীল হলেও চরিত্রগতভাবে প্রবল প্রথা, উৎসব, আনন্দ-উল্লাস, মজা প্রিয়, ভোজন রসিক, বিলাসী। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষন ও নিচে ঢেকচীদানী যাতে না দেখায় সেজন্য ঢাকার হোটেলগুলোতে বিরানীর ঢেকচীর চারপাশ লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকে। আগে অনেকের সিড়ি দিতে উঠার পথে এবং ড্রইং রুমের দেয়ালে হরিন ও মহিষের খুলি শিং, হরিনের চামড়া লাগানো থাকত। মেঝেতে হরিণ ও ভেড়ার চামড়া বিছানো থাকত।

ঢাকাইয়া পোলাঃ কিশোর, তরুন, পুরুষরা মাঞ্জা দেয়া সুতা নাটাইতে ভরে বিকালে বাসার ছাদে ঘুড়ি উড়াতে, কবুতরের পাল পুষতে ও আকাশে উড়াতে, মহল্লার গলি/ক্লাব/বাড়ির ছাদে দল বেঁধে আড্ডা দিতে, ডেক সেট বাজিয়ে গান শুনতে, লুডু, কেরাম ও তাস খেলতে পছন্দ করত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল-কলেজের শেষ দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে ডায়রীতে স্যার-ম্যাডাম, বন্ধু- বান্ধবীদের স্মরণীয় বানীসহ স্বাক্ষর নিয়ে এবং রং দিয়ে খেলে আনন্দ-উল্লাসের সাথে রেগ ডে পালন করে।

আর বয়স্করা পঞ্চায়েত ক্লাবে, মসজিদে সালিশী ও নামাজ পড়ার সাথে সাথে গল্পগুজব করতে পছন্দ করে। আগে পুরান ঢাকার চেয়ারম্যান নির্বাচনে গরু গাড়ি, হাতি, মাছ, হারিকেন, ফুল, মই মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা মিছিলগুলো অত্যন্ত আকর্ষনীয় এবং জাকজমকপূর্ণ ছিল। অনেকে বাসায় কুকুর, বিড়াল, হরিন, বানর, ময়ূর, তিতি, টিয়া, ময়না পুষত।

শবে বরাতঃ এদিন প্রত্যেকের বাসাবাড়িতে হালুয়া-রুটি তৈরি হত। এরপর তা পরিবারের সবাই মিলেম খেত এবং আত্নীয়/প্রতিবেশীদের ঘর/বাসায় পাঠাত। শিশু/ছোট/কিশোররা তারাবাতি, মোররা জ্বালিয়ে, পটকা-বোমা ফুটিয়ে থাকে। আগে বাসাবাড়ির কিশোরী, তরুনী মেয়ে, তাদের সাথে ছোট ছেলেমেয়েরা মিলে বাসার সিড়ি, জানালা ও বারান্দার ধারে জ্বলন্ত মোম সাজিয়ে আলোকিত করত।

ব্রিটিশ আমল থেকেই ঢাকাইয়াদের মাধ্যমে শিশুর প্রথম জন্মদিন/ফাস্ট বার্থ ডে পালন করার রেওয়াজ ছিল। ছেলেদের মুসলমানীর পর সুন্নাতে খাতনা এবং মেয়েদের কান ফুরানীর অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। ইউসুফ বেকারীর বিস্কিট, আনন্দের কেক, আলাউদ্দীনের মিষ্টি ও নেশাস্তার হালুয়া, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, মরন চাঁদের আমিত্তি ও মনসুর, স্টারের ফালুদা ও হালিমের খ্যাতি ছিল ঢাকাব্যাপী।

পাঞ্চিনিঃ ঢাকাইয়াদের মধ্যে পাঞ্চিনি অনুষ্ঠান হয়।এতে ছেলের পরিবার পক্ষের লোকজন আনুষ্ঠানিকভাবে পান-সুপারী ও মিষ্টির ঢালা নিয়ে মেয়ের বাসায় যায় এবং মেয়েকে স্বর্ণের আংটি পড়িয়ে বিয়ের সমন্ধ ঠিক করে। পাঞ্চিনি মানে পারিবারিকভাবে মেয়েছেলের বিয়ের সমন্ধ ঘোষনা।

সন্ধ্যাকুটাঃ পুরান ঢাকাইয়ারা গায়ে হলুদের আগের দিন কনের পরিবারের আত্নীয়, স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশি সবাই মিলে মেয়ের বাসায় মেয়ে ও ছেলের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের বাটা হলুদ বড় দস্তাহামা দিয়ে ছেচে ও পাটায় বেটে তৈরি করে। এই আনুষ্ঠানিকতাকে সন্ধ্যা কুটা বলে।

মেয়ে বাসায় ঢালা পাঠানো, গায়ে হলুদঃ
হলুদের আগে মেয়ের বাড়িতে হলুদ ও বিয়ের কাপড়, প্রসাধনী, দই-মিষ্টি, কাঁচাবাজার ও রান্না করা খাবারের ঢালা পাঠানো দেয়া হয়। হলুদের ঢালাতে ছেলেমেয়ের মত লুঙ্গি ও শাড়ী পড়িয়ে সাজানো একজোড়া বড় আকারের রুই মাছ দেয়ার ব্যাপারটি অত্যন্ত আকর্ষনীয়।

আগের দিনের বাড়িভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজনঃ এক সময় ঢাকায় মেয়ে এবং ছেলেদের গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাত, জন্মদিন, সুন্নাতে খাতনা, কান ফুরানীর অনুষ্ঠান বাসাবাড়ির গেট, উঠান, ছাদ বাঁশ, প্যান্ডেল, গাছপাতা, ফুল দিয়ে গেট, স্টেজ সাজাত, রান্না করার এবং মেহমান খাওনোর ব্যবস্থা করত।

পুরান ঢাকায় গায়ে হলুদ, সুন্নাতে খাতনায় রং, পিচকারী, চমকি/আফসুন খেলা হোত। হিন্দী গান বাজানো হোত/ব্যান্ড সংগীত হোত। হলুদ, বিয়ে, সুন্নাতে খাতনা, কান ফুরানী অনুষ্ঠানে ব্যান্ডপার্টি, ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার হত। পটকা ফুটানো হত। অনুষ্ঠানে স্টিল ক্যামেরাম্যান এবং ভিডিওম্যানদের দিয়ে স্টিল পিকচার উঠানো ও ভিডিও রেকর্ডিং করানো হত।

বিয়ে-বৌভাতঃ আগে বিয়ের দিন মেয়ের বাসায় মেয়ে বিদায়ের জন্য সানাই(কণ্যা বিদায়ের করুণ সুর) বাজানো হত। বর যাত্রা, বিয়ের দিন গেট ধরা, জুতা চুরি, কাজীর বিয়ে পড়ানো, বিয়ে বাড়িতে আগত অতিথি, জামাই ও তার বন্ধুদের বিশেষভাবে জামাই আপ্যায়ন, জামাইকে হাত ধোয়ানো, বর-কনের মালা বদল, আয়নায় নতুন বৌ দেখা, বৌ নিয়ে ঘরে ফেরা, ফুলের পাপড়ি মেশানো পানির বাটিতে আংটি খোজার খেলা, বাসর সজ্জা। ঢাকায় জামাইকে আস্ত খাসির রোস্ট দিয়ে আপ্যায়ন করার রেওয়াজ আছে।

সাকরাইন/ঘুড়ি উৎসবঃ মুঘল আমল থেকে সাকরাইন পুরান ঢাকার মানুষের সার্বজনীন ঘুড়ি উৎসব। প্রতি বছর ১৪ ও ১৫ জানুয়ারী তারিখে সাকরাইন/ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব পালিত হয়। সুতা মাঞ্জা দেয়া, নাটাই দিয়ে আকাশে ঘুড়ি উড়ানো, কাটাকাটি/বাকাট্টা, মোররা ও পটকা ফুটানো, মুখে কেরাসিন ঢেলে আগুনের গোলক বের করা, ডেক সেটে চড়া সুরে গান বাজানো। বিবর্তনের ধারায় এখন চাইনিজ সুতা, বিদেশী ঘুড়ি, দুপুরে পিকনিক করা, সন্ধ্যায় আতশবাজি পুড়ানো, আকাশে ফানুশ উড়ানো, ডিজে পার্টি যুক্ত হয়ে আধুনিক রূপ ধারন করেছে সাকরাইন।

হালখাতা ও বর্ষবরণঃ মুঘল-ব্রিটিশ আমল থেকে ঢাকার হিন্দু-মুসলমান জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী ১লা বৈশাখের দিন হালখাতা খোলা, মিলাদ/পূজা পাঠ, মিষ্টি বিতরণ করে আসছে। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের মাধ্যমে ১লা বৈশাখে বর্ষবরণ সংগীত আয়োজন উৎসব প্রচলন হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে চারুকলা ইন্সটিটিউটের আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা ১লা বৈশাখ উৎসবে বৈচিত্র‍্য নিয়ে আসে। অনেক স্থানে লোকজ মেলার আয়োজন করা হোত।

১লা ফাল্গুণ দিনটি বসন্ত দিবস হিসাবে পালিত হয়। মেয়েরা বসন্ত বরণ উপলক্ষ্যে বাসন্তী রঙের শাড়ী পড়ে থাকে। পৌষ মাসে নবান্ন উৎসব আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলা ঢাকাবাসীর অন্যতম আকর্ষন। নব্বই দশক পর্যন্ত দোয়েল চত্ত্বর থেকে টিএসসি মোড় রাস্তার দু'পাশে ছোট ছোট বই ও বারোয়ারী পণ্যের শতাধিক স্টল ও বিশাল মেলা বসত।

পুরান ঢাকার ঈদঃ ঈদের দিন নতুন কাপড় পড়ে, গায়ে সুগন্ধি আতর মেখে হাইকোর্টের জাতীয় ঈদগাহ/জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররম/মহল্লার কোন মসজিদে ঈদের জামাত আদায়। নামাজের পর পরিবার/আত্নীয়/পরিচিত কারো সাথে রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠানে দেখা হলে কোলাকুলি। বাসায় ছোটরা বড়দের পা ধরে কদমুবুছি/সালাম করলে বড়রা ছোটদের আদর/স্নেহ করে ঈদি/বকশিস উপহার দেয়।

এরপর সকাল/দুপুর/বিকালে মহল্লার ছেলেরা বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির নিচে/রাস্তার ধারে/বাসার ছাদে দল বেধে ডেক সেট বাজিয়ে হাই ভলিউমে গান শুনতে শুনতে আড্ডা দেয়, গল্পগুজব করে। ঈদ উপলক্ষ্যে বাসাবাড়িতে বিশেষ ঐতিহ্যগত মজাদার মুঘলাই ডিস রান্না, পারিবারিক পুনর্মিলন, আড্ডা, মজা, ভোজ উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে আর বাচ্চা শিশু, ছোটদের দৌড়াদৌড়ি, খেলা করার চিরায়ত দৃশ্য।

কোরবানী ঈদের কিছু চিরায়ত প্রথাঃ ঢাকাইয়ারা প্রধানত হাট থেকে কোরবানীর পশু হিসাবে দেশি গরু এবং মিরকাদীমের ষাড় কিনতে ও কোরবানী দিতে পছন্দ করে। ঢাকাইয়াদের মধ্যে মেয়ের জামাই/শশুড় বাড়িতে কোরবানীর গরুর পেছনের বড় রান পাঠানোর রেওয়াজ আছে। অনেকে কোরবানীর পশুর রক্ত হাতে মাখিয়ে দেয়ালে পাঞ্জার ছাপ দেয় এবং গরুর মাথার খুলি ছাদে বাঁশ/রডের মাথায় লাগিয়ে রাখে। এর মূল উদ্দেশ্য বাসাবাড়ির লোকদের বিভিন্ন অশুভ শক্তির কুদৃষ্টি থেকে নিরাপদ রাখা। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। ছবিটি রূপলাল হাউজের ভেতরের দিকের। চলবে-(পরবর্তী ৬ষ্ঠ পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK