মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯
Tuesday, 15 Oct, 2019 08:22:37 am
No icon No icon No icon

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৬

//

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৬


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: মুসলিমলীগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নবাব সলিমুল্লাহঃ ১৮৬৩ খ্রি. নওয়াব আবদুল লতিফের মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সাথে নবাব খাজা আবদুল গনি ও খাজা আহসানুল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নবাব আহসানুল্লাহ ঢাকায় উক্ত সোসাইটির একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮২ খ্রি. নওয়াব আবদুল লতিফ ওই সংগঠনের কাজে ঢাকায় এলে তিনি তাঁকে সংবর্ধনা দেন। ১৮৭৮ খ্রি. সৈয়দ আমীর আলী ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করলে ঢাকার নবাব তাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের সংখ্যানুপাতে সুযোগ আদায়ের লক্ষ্যে উক্ত এ্যাসোসিয়েশন সরকারকে স্মারকলিপি দেয়ার জন্য ১৮৮৫ খ্রি. এক স্বাক্ষর অভিযান চালায়। এতে নওয়াব আবদুল গনি এতদাঞ্চলের ৫ হাজার লোকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ১৮৮৫ খ্রি. নভেম্বর মাসে বঙ্গীয় সরকারের নিকট এক স্মারকলিপি পেশ করেন। দিল্লীর এক রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত খাজা সলিমুল্লাহকে ব্রিটিশ রাজ 'নবাব বাহাদুর' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমলীগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে ব্রিটিশ ভারত এবং পূর্ববাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও শিক্ষা জীবনে নবজাগড়ণ সৃষ্টি করেন।

পূর্ববাংলা এবং কলকাতা প্রবাসী কিছু মুসলিম জমিদার এবং কংগ্রেসী মুসলিম নেতা নিজেদের জমিদারী ও রাজনৈতিক স্বার্থে বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করলেও সার্বিকভাবে পূর্ববাংলার মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের তফসিল হিন্দু সমাজ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল। পূর্ববাংলার অভিজাত হিন্দু জমিদার শ্রেণি, কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষক সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বঙ্গভঙ্গ, নবগঠিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে এবং একটি সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ ভারতের বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃবৃন্দের নিকট পত্রলিপি প্রেরণ করে নিজের অভিপ্রায় তুলে ধরেন। তার উদ্যেগে ঢাকায় ২৮-৩০ ডিসেম্বরে অল ইন্ডিয়া এডুকেশন কনফারেন্স(সর্বভারতীয় শিক্ষা সম্মেলন) আহুত হল এবং নবাবদের শাহবাগের বাগানবাড়িতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের প্রায় আট হাজার মুসলিম প্রতিনিধি যোগ দিলেন। এ সময় ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের সম্প্রদায়গত স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে নবাব ভিকারুন মুলক ও ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নবাব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দগণ কর্তৃক সর্ব সম্মতভাবে অল ইন্ডিয়া মুসলিমলীগ দলের নাম ঘোষনা করা হয়। 

নবগঠিত মুসলিমলীগ কর্তৃক উক্ত সম্মেলনে বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত এবং হিন্দু ও কংগ্রেসের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের নিন্দা করা হয়। এতে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ একজন সর্বভারতীয় নেতায় পরিণত হন। ব্রিটিশ সরকার নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতাকে সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ কর্তৃক দিল্লির রাজদরবারে আকস্মিকভাবে পুনরায় বঙ্গভঙ্গ রদ করে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বিহার ও উড়িষ্যাকে এবং পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ থেকে আসামকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র বাংলাভাষী প্রধান বাংলার দুই স্বতন্ত্র ভৌগলিক ইউনিট(এলাকা) পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গকে একত্রিত করে নতুন যুক্তবাংলা প্রেসিডেন্সী গঠনের এবং কেন্দ্রীয় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত করার ঘোষনা দেন। এতে পূর্ববাংলার জনগণ পুনরায় কলকাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সাবেক পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকা নগরী, এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনগ্রসর, দরিদ্র মুসলমান ও নমঃশুদ্র হিন্দুদের দ্রুত অগ্রগতি, উন্নয়ন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তবে এই পুনঃগঠিত যুক্তবাংলা প্রদেশ ব্যবস্থায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। যদিও তখন এই বিষয়টা কেবল ব্রিটিশ প্রশাসনের কয়েকজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তা জানত। তাই বঙ্গভঙ্গ রদে দুই বাংলার বর্ণ হিন্দুরা উল্লসিত হয় এবং পূর্ববাংলার মুসলমানরা হতবিহবল হয়ে পড়ে।
বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১১ সালের ২৯ আগষ্ট লর্ড কার্জন হলে ঢাকার প্রশাসক ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং তার স্থলে চার্লস বেইলির যোগদান সংবর্ধনা সভায় নবাব সলিমুল্লাহ ধনবাড়ির জমিদার সৈয়দ আলী চৌধুরী, বরিশালের আইনবিদ এ.কে.ফজলুল হককে নিয়ে দুটি মানপত্র পড়ে শোনান এবং পূর্ববাংলার অনগ্রসর মুসলমানদের জন্য উচ্চশিক্ষা লাভের ব্যবস্থা করতে ঢাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার আবেদন জানান। এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ পূর্ববাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দকে ১৯১২ সালের ২রা ফেব্রয়ারী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রথম থেকেই এর বিরুদ্ধে কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও ঢাকার হিন্দু আইনজীবী সমাজের প্রবল বিরোধীতা, সরকারী উচ্চমহলে তদবির করার এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার নানাবিদ কারণে ঢা.বি. প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ দীর্ঘ দশ বছর বিলম্বিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র নবাব হাবিবুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববাংলার মুসলমান নেতাদের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে ১৯২১ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঢা.বি. প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ সরকারকে আর্থিক অনুদান ছাড়াও ঢাকা নওয়াব এস্টেটের রমনা এলাকার শতাধিক একর জমি প্রদান করে। এর উপর ঢা.বি.-এর প্রথম প্রশাসনিক ভবন কার্জন হল, ১৯৩১ সালে ঢা.বি.-এর প্রথম ছাত্রাবাস মুসলিম হল/সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং এরপর ২য় ছাত্রাবাস ফজলুল মুসলিম হল নির্মিত হয়। ঢা. বি.-এর মধুর ক্যান্টিনটি আগে নবাবদের শাহবাগ বাগানবাড়ির নাচঘর ছিল। সলিমুল্লাহ নিজ দানকৃত জমিতে এবং অর্থে পিতার নামে আহসানুল্লাহ সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়/বুয়েটে রূপান্তরিত হয়। 

১৯১৫ সালে ১৬ই জানুয়ারী কলকাতায় রহস্যজনকভাবে সলিমুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। ১৭ই জানুয়ারী দ্য স্টেটম্যানে প্রকাশিত কলকাতায় নবাব সলিমুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ সারা পূর্ববাংলার মুসলমানদের শোকাহত করে। সরকার তার কফিন সড়ক বা রেলপথে না এনে নদীপথে জাহাজে করে এনেছিল। জনসাধারণ, এমন কি নবাব পরিবারের কাওকে তার লাশ দেখতে দেয়া হয়নি এবং তার কবরে একাধারে কয়েক মাস পুলিশ প্রহরা ছিল। এতে অনেকের মনেই সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, তাকে কলকাতায় ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। কথিত আছে, তাকে বিষপানে অথবা গুলি করে হত্যা করেছিল ব্রিটিশ সরকার। তার প্রতিষ্ঠিত মুসলিমলীগের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারত ও বাংলার মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও প্যান ইসলামীজম চেতনার বিকাশ, খিলাফত আন্দোলন, জিন্নাহর ২৩ দফা দাবী, এ.কে.ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব(ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবী), জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলন, মুসলিমলীগের দলীয় পতাকার নক্সা থেকে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার নক্সা প্রণয়ন, যুক্তপাকিস্তান হাসিল, পাকিস্তানের রাজনীতিতে মুসলিমলীগের অব্যাহত প্রভাব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রভৃতি ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে নবাব পরিবারের পরোক্ষ ভূমিকা/অবদান অনস্বীকার্য। ছবিটি প্রথমদিকে নির্মিত কার্জন হলের। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে-(পরবর্তী ৭ম পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK