শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯
Friday, 27 Sep, 2019 12:44:17 am
No icon No icon No icon

তিলোত্তমা শহর কোলকাতার পুরানো গহনা “ট্রাম”

//

তিলোত্তমা শহর কোলকাতার পুরানো গহনা “ট্রাম”


জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: লর্ড কার্জন, যাঁকে আপামর বাঙালি চেনে বঙ্গভঙ্গের কারিগর হিসেবে, তিনি হঠাৎ এই ট্রাম ব্যবস্থা শুরু করতে গেলেন কেন? নাঃ, এই পোড়া বাংলার লোকজনের কথা আদৌ ভাবেননি তিনি!বরং ভেবেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথাই!আসলে কলকাতা তখন বন্দর শহর। গঙ্গায় নিত্য-নতুন মালবাহী জাহাজ এসে ভিড়ত। সেই জাহাজ থেকে মালপত্র নামিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত কোম্পানি বাহাদুরের বিভিন্ন গুদামে পৌঁছনোর জন্য একটি ডেডিকেটেড যানের প্রয়োজন ছিল। সেই কারণেই মূলত ট্রামব্যবস্থা তৈরির কথা ভেবেছিলেন কার্জন!২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৩ সালে যে ট্রামটি কলকাতার রাস্তায় প্রথম চলতে শুরু করে লন্ডনের সাহেবদের তারওপর একটি বিশেষ, প্রচ্ছন্ন স্নেহ ছিল কি না জানা না গেলেও প্রভাব যে ছিল তা অস্বীকার না করে থাকা যাবে না।

সরাসরি সেই সময়ের ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত এই গণ পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীরা রাজার দেশের কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত আছি বলে অন্তরে অন্তরে একটি শ্লাঘা অনুভব করতেন।আর করবেন নাই বা কেন সেই সময় ট্রামের বগি থেকে শুরু করে, টিকিট সব কিছুই আনা হত বিলেত থেকে।''গাড়ি ধীরে ধীরে চলিত- ঘোড়া থপথপ করিয়া একঘেঁয়ে ছন্দে চলিতেছেই- যাইতে যাইতে দর্শণ ইতিহাস সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ক কত তত্ত্ব যে মাথার ভিতর খেলিতে থাকিত, তাহার ইয়াত্তা নাই।'' ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ঘোড়া গাড়ির ট্রামের আরাম সেই দিন থেকেই আপামর বাঙালির জীবনযাত্রাকেই তুলে ধরে। কলকাতা যার হাতের আঙুল ধরে বড় হয়েছে, আরও বেঁধে বেঁধে থাকতে দিয়েছে তা হল এই ট্রাম।

5
১৮৭৩ সালে কলকাতায় চালু হয় ঘোড়ায় টানা ট্রাম তারপর ১৮৯৮ সালে হয় বাষ্পে, তারও পরে ১৯০২ সালে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম চলতে শুরু করে।একটু খুঁজলেই জানতে পারবেন পৃথিবীতে খুব বেশী শহরে এত পুরোনো ট্র্যাম আর নেই। এশিয়ায় কলকাতার পরেই এখনো চলছে এমন ট্র্যাম আছে টোকিয়োতে। ঐতিহাসিক দিক থেকে কলকাতার ট্র্যাম যে খুবই প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় কলকাতা শহরে ট্রাম চালাবার বিষয় নিয়ে ভাবনা-চিন্তার সূত্রপাত হয় ১৮৬৭ সাল থেকে।

১৮৭০ সাল নাগাদ ভারত সরকার বেঙ্গল গভর্নমেন্টকে শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে পণ্য পরিবহনের উদ্দেশে ট্রাম চালাবার প্রস্তাব দিল। ভারত সরকারের প্রস্তাব অনুসারে বাংলার গভর্নমেন্ট শিয়ালদহ থেকে পশ্চিমে গঙ্গার তীরে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ট্রামের লাইন পাতবার জন্য এক লক্ষ টাকা মঞ্জুরও করল। যদিও এই আর্মেনিয়ান ঘাটের কাছ থেকেই তখনকার দিনে হাওড়া স্টেশনে যাওয়ার কাঠের খোলা ব্রিজে উঠতে হত। আর এখানেই ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলের কলকাতা স্টেশন বা টিকিটঘর। অর্থাৎ এখান থেকে টিকিট কেটে নিয়ে ব্রিজে উঠে হুগলি নদী পেরিয়ে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেন ধরতে হত।

তাই এই  শিয়ালদহ থেকে হাওড়া পর্যন্ত ট্রাম চালনোর পিছনে একটি প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল তা হল এই গঙ্গার পূর্বপাড়ের গ্রামগুলি থেকে যে সব পণ্য শিয়ালদহে আসত ট্রামে করে সেগুলিকে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এর ফলে এক সুন্দর যোগাযোগ গড়ে উঠতে লাগল।

স্মরণিকা ট্রাম মিউজিয়াম, কলকাতা
১৮৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমে দেড় লক্ষ টাকা ব্যয়ে শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ট্রাম লাইন পাতার কাজ শেষ হল। প্রত্যেক কামরার আগে দুটি করে মোট ৬টি ঘোড়া-সহ তিন কামরার ট্রাম। দ্বিতীয় গাড়িটিতে একটি প্রথম শ্রেণী ও একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা। এতেও প্রত্যেক কামরার সঙ্গে দুটি করে মোট চারটি ঘোড়া। শুরু হল ভারতবর্ষে প্রথম ট্রাম যাত্রা। প্রায় ৯ মাস চলবার পর লোকসানের কারণে এটা বন্ধ করে দিতে হয়।

এই ঘটনার বছর পাঁচেক পরে কলকাতার কয়েকজন অগ্রণী ব্যবসায়ী বাণিজ্যিক ভাবে ট্রাম চালানোর উদ্দেশে গঠন করলেন ‘ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি’। ১৯৭০ নাগাদ হাওড়া শহরের ট্রামপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বাধীনোত্তর যুগেও বেশ কিছুকাল ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি ছিল ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৫১ থেকে প্রস্তুতি নিতে নিতে শেষে এক অর্ডিন্যান্স জারি করে, ১৯৬১-র ৮ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাম কোম্পানির ভার গ্রহণ করে।


একটা সময়ে সারা কলকাতা জুড়ে প্রায় ৪৯ মাইল বা তারও বেশি ট্রামপথ ছিল। এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। আস্তে আস্তে দেশের অন্যান্য জায়গা যেমন কানপুর, চেন্নাই, দিল্লি, মুম্বই-তে ট্র্যাম উঠে গেছে যথাক্রমে ১৯৩৩, ১৯৫৫, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালে। কলকাতাতেও তুলে দেবার কথা হয়েছিল ১৯৭০ সালে, কিন্তু নানা কারণে আজোও কলকাতার বুকে রয়ে গেছে এই ট্রাম ।

স্মরণিকা ট্রাম মিউজিয়াম, কলকাতা
১ম ও ২য়, এই দুই শ্রেনীতে ট্রাম বিভক্ত। আগে প্রতি কামরাতে ২ টা দরজা ছিল। এখন প্রতিটি কামরার মাঝে ১ টি করে দরজা আছে। যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য মাথার উপরে ফ্যান জালি দিয়ে ঘেরা। প্রতিটি ট্রাম এর দৈর্ঘ্য ১৭.৫ মিটার আর প্রস্থ ২.১ মিটার। খালি অবস্থায় ওজন ২০-২২ টন। গতিবেগ ঘন্টায় সর্বোচ্চ ২০-৩০ কিলোমিটার (সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার)। বর্তমানে চালু আছে প্রায় ১২৫টি ট্রাম (ছিল ২৫৭ টি)। লাইনের সংখ্যা প্রায় ৩২ টি। কলকাতায় মোট ৭ টি ট্রাম ডিপো এবং ১ টি টার্মিনাল রয়েছে। ১ গাড়ির বহন ক্ষমতা প্রায় ২০০ যাত্রী আর সিট সংখ্যা ৬০ টি। এই ট্রামগুলোর বেশিরভাগ তৈরি করেছে কলকাতার বিখ্যাত বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানি। ট্রামের ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে কিছু কিছু ট্রামের ভেতর রেস্তোরার দেখা পাওয়া যায় আজকাল। তাছাড়া কলকাতার ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য ২০১৪ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর ট্রামের ভিতর “স্মরণীকা” নামে জাদুঘর চালু করা হয়, ট্রামের বর্তমান মালিক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তত্ত্বাবধানে।

স্মরণিকা ট্রাম মিউজিয়াম, কলকাতা
দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে ট্রাম বিশেষ জনপ্রিয়। পরিবহন ব্যবস্থায় এটি একটি জনপ্রিয় অঙ্গ ছিল। দূষনমুক্ত যান হিসেবেও এটি পরিচিত। কিন্তু এখন এখন অনেক যানবাহন হওয়ায় ট্রামের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। কলকাতার এই ইতিহাস-ঐতিহ্যে মিশে থাকা ট্রামের ইতিহাসের জন্য ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর দিনটিকে একটি শোকাবহ দিন হিসেবে মনে করা হয়। কেননা, এই দিন বালিগঞ্জে ট্রাম দূর্ঘটনায় আহত হন রূপসী বাংলার কবি হিসেবে খ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ । ট্রামের ক্যাচারে পিষে যায় শরীর, ভেঙ্গে যায় কন্ঠ, উরু আর পাজরের হাড়। ২২ শে অক্টোবর মৃত্যুবরন করেন তিনি।


কলিকাতা নড়িতে চড়িতে চলিতে চলিতে অনেকটা পথ অতিক্রম করে এল। কলকাতা শহর থেকে মহানগরের টাইটেল কার্ডে আজও এই ট্রাম। ধানচারার মতো রোপন, উত্পাটন এবং পুণরায় রোপনের মতোই বন্ধ, চলমান এবং পুণরায় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও আজ বেলাইন হয়নি। এশিয়ার সব থেকে পুরানো চালু এই ট্রাম পরিষেবা আজও শুধুমাত্র একটি জরুরি গণপরিবহনের অঙ্গ-ই শুধু নয়, কোলকাতার বাঙালির জীবনে, জীবিকায়, প্রেমে, বিরহে, ব্যবসা- বানিজ্যে, শিল্প সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে পত্র পত্রিকায়, গানে, কবিতায় এই ট্রামের একচ্ছত্র প্রভাব, বাংলার বিবর্তনের সঙ্গী। কলকাতার মানুষের ঐতিহ্যের প্রতু যে আবেগ আর নস্টালজিয়া, এগুলোকে নিয়েই ট্রাম চলতে থাকুক কলকাতার বুকে।

Image may contain: 1 person, basketball court and outdoor

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK