সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯
Thursday, 29 Aug, 2019 12:58:14 am
No icon No icon No icon

ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চার জ্ঞানপীঠ ঢাকা কেন্দ্র

//

ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চার জ্ঞানপীঠ ঢাকা কেন্দ্র


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: আজকের পুরান ঢাকা আধুনিক ঢাকা ম্যাগাসিটি এবং ঢাকাইয়া সম্প্রদায়ের আদি জন্মস্থান। এখানকার ফরাশগঞ্জ ঢাকার সবচেয়ে পুরান এলাকা এবং প্রাচীন ঢাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে নেমে বামদিক দিয়ে শ্যামবাজারের দিকে এগুলে মোহিনী মোহন দাস লেনের ২৪ নাম্বার বাড়িটি ঢাকা কেন্দ্র। সমাজের অনেক মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বশীলতা থেকে বিভিন্ন সেবামূলক, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা গড়ে তুলে। মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি, সংস্কৃতির সেবা, উন্নতি ও কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এই ধরনের মানুষরা মনে করে স্বপ্ন ও আদর্শের কোন মৃত্যু নেই। তাদেরই একজন ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আজিম বখ্শ। তিনি তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উদ্যেগ ও প্রচেষ্টায় নতুন প্রজন্মকে দেখিয়ে চলেছেন কিভাবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি মানব সেবা করতে হয়, প্রকৃতিকে ভালবাসতে হয়। 
পুরান ঢাকার স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব প্রয়াত মাওলা বখ্শ সরদারের ছেলে আজিম বখ্শ নিজ উদ্যোগে বড় দুই বোন, স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে সম্পৃক্ত করে ১৯৮৮ সালে ‘মাওলা বখ্শ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ গঠন করেন। ১৯৮৯ সালে ট্রাস্টের উদ্যেগে প্রথমে ১০ শয্যার চক্ষু হাসপাতাল চালু হয়। হাজার হাজার মানুষ এখান থেকে স্বল্প ও বিনা মূল্যে চিকিৎসা পেয়েছে। এর পাঁচটি প্রকল্প আছে। এর অন্যতম হচ্ছে পুরান ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা। এই লক্ষ্যে ট্রাস্টের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। চক্ষু হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, সংরক্ষণাগার, বাগান সবই এই ট্রস্ট্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্র। এখানে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে এক দুর্লভ গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে। পুরান ঢাকার ঢাকাইয়াদের অন্যতম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হচ্ছে খোশগল্প এবং মেহমান নেওয়াজী। ঢাকা কেন্দ্রে আসা গবেষক, দর্শনার্থীদের সাথে আজিম বখ্শের সাক্ষাৎ দেখা হলে তাদের সাথে কথা, আড্ডা হবেই এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি তাদের কাওকে আপ্যায়ন করতে ভুলেন না। 

ঢাকা কেন্দ্র গ্রন্থাগারঃ এখানে বাড়ির দোতলায় এক সুবিশাল পাঠাগার আছে এবং এতে রয়েছে অসংখ্য দুর্লভ সংগ্রহ। সর্দার পরিবারের পারিবারিক লাইব্রেরির সংগ্রহিত গ্রন্থরাজি দিয়ে শুরু হয় এর কার্যক্রম। ঢাকা ও দেশের ইতিহাস বিষয়ক মোট গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশই ঢাকা বিষয়ক বই। এছাড়া ঢাকা বিষয়ক তথ্য সংবলিত পত্রিকা, সাময়িকীর সংশ্লিষ্ট অংশ সংগ্রহ করে একত্রে সন্নিবেশ করা হয় পেপার ক্লিপিং ভলিউমের মাধ্যমে। এখানে আছে ঢাকার খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব শ্রী রেবতী মোহন দাস (রায়বাহাদুর) কর্তৃক তার ‘আত্মকথা’ শীর্ষক বইটি ত্রিশ-চল্লিশ দশকের বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’র সম্পাদককে উপহার দেয়া সেই কপি, ১৮৩৮ শকাব্দের (১৯১৬ সাল) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ১৯১৭ সালে প্রকাশিত ‘ঢাকা নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা’ নিয়ে প্যাট্রিক গেডেসের ‘ঢাকা: অ্যা স্টাডি ইন আরবান হিস্ট্রি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, প্যাট্রিক গেড্ডেসের লেখা বই, ঢাকা পৌরসভার ১০০ বছর পূর্তিতে (১৯৬৬) প্রকাশিত আজিমুশ শান হায়দার সম্পাদিত ‘A city and its civic body’, আবু যোহা নূর আহমদের ঊনিশ শতকের ‘ঢাকার সমাজজীবন’, আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’, কেদারনাথ মজুমদারের ‘ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস’, নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’, নির্মল গুপ্তের ‘ঢাকার কথা’, যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’, রফিকুল ইসলামের ‘ঢাকার কথা’, সত্যেন সেনের ‘শহরের ইতিকথা’, হরিদাস বসুর ‘ঢাকার কথা’, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের লেখা ঢাকার ওপর প্রকাশিত সব গ্রন্থ। 

ঢাকা কেন্দ্র সংগ্রহশালাঃ ২০০৬ সালে গ্রন্থাগারের পাশে এই সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে আন্টাঘরের ময়দান বা বাহাদুর শাহ পার্কে যে আন্টা খেলা হতো, সেই আন্টা সংগৃহীত আছে ঢাকা কেন্দ্রে। পুরান ঢাকার বাইশ পঞ্চায়েতের সর্দার এবং বনেদি কয়েকটি পরিবারের ওপর আলাদা গ্যালারি আছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাওলা সর্দার বখ্শ, কাজী আবদুর রশীদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান মজলিশ, ভাওয়াল রাজা, রূপলাল দাস, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ পরিবারবর্গ। এখানে স্থান পেয়েছে এসব পরিবারের দুর্লভ সব ছবি, পানের ডিব্বা থেকে শুরু করে রান্নার তৈজস, হুঁক্কা, শতবর্ষী জাপানি ঘড়ি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বেতারযন্ত্র, বন্দুকের কার্তুজ রাখার চামড়ার ব্যাগ, আলমিরাতে আছে সর্দার পরিবারের স্বর্ণ-রৌপ্যের জরি দিয়ে তৈরি জামাকাপড়, ঢাকায় প্রথম স্থাপিত মোটর সারাই কারখানার যন্ত্রাংশ, পুরনো দিনের বৈদ্যুতিক রেকর্ড প্লেয়ার/কলের গান গ্রামোফোন, টেলিভিশন, টেলিফোন সেট, বাতিদানি, রুপার পানদান, গোলাপ জলদানি, ১৮৯৬ সালে তৈরি একটি জমির দলিল, প্রাচীন মানচিত্র, পুরনো ভবনের নকশাকৃত ইটসহ আরো অনেক পুরানো উপকরণ এখানে স্থান পেয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রের অন্যান্য কার্যাবলীঃ এখানে পাঠাগার ও সংগ্রহশালার পাশে খোলা ছাদে এক টুকরো সবুজ বাগান আছে। এখানে অসংখ্য প্রজাতির অর্কিড আছে এবং বসার ব্যবস্থা আছে। এটাকে প্রকৃতি প্রেমী আজিম বখ্শের বাগান বিলাসী মনের পরিচায়ক বলা যেতে পারে। ঢাকা কেন্দ্রের উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হলো ‘ত্রৈমাসিক ঢাকা’। এ যাবৎ মোট আটটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু জনবলের অভাবে এ পত্রিকার প্রকাশনা কিছুকাল যাবৎ বন্ধ আছে। এছাড়া ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ঢাকা রচনাপঞ্জি সংকলন’। এতে ঢাকা বিষয়ক গ্রন্থ, ম্যাগাজিন, জার্নাল, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের একটি বিশাল তালিকা রয়েছে। ৪০০ বছর উপলক্ষ্যে ঢাকাইয়া উর্দু ও বাংলায় কবিতা আবৃত্তির সিডি প্রকাশ করেছে ঢাকা কেন্দ্র। ঢাকা গবেষক ও প্রবীণ বাসিন্দাদের নিয়ে দুই মাস পর পর নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আয়োজন করা হয় আড্ডা। সেই আড্ডা রেকর্ড করা হয় এবং পরে তা বিষয় অনুসারে লিখিত আকারে প্রকাশ করা হয়। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যারা অবগত হতে চান এবং গবেষনামূলক কাজ করতে চান তাদের জন্য ঢাকা কেন্দ্র এক অপরিহার্য আদর্শ স্থান। 

এখানে শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দা নন; ভারত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থী আসে নিয়মিত। সিঙ্গাপুরের গবেষক জনসন সেহ-এর মন্তব্য, "অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান! এখানে বসবাসরত স্থানীয় নাগরিকদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য! অত্যন্ত আকর্ষনীয়৷!" শত শত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধাভাজন গুণী ব্যক্তিদের পদ চারণায় মুখরিত হয়েছে ঢাকা কেন্দ্র। তাঁদের মধ্যে ড. নওয়াজেশ আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, অধ্যাপক সঞ্জীব সরকার, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, ক্যারোলিন অ্যাডামস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এখানে দর্শনার্থী ও পাঠকদের চেয়ে ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে গবেষক, বিভিন্ন প্রেস ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়ার ব্যক্তিরাই আসেন বেশি। কারণ এই নগর ও নগরবাসীর কোনো কিছু নিয়ে অনুসন্ধানী ও গবেষনা কাজ করতে গেলে ঢাকা কেন্দ্র ছাড়া প্রায় অসম্ভব। বিষয় অনুসারে অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য বহুল দুর্লভ পুরানো-নতুন গ্রন্থরাজি, সংবাদপত্রের ভলিয়মের সন্ধান এক কঠিন, দুর্বোধ্য ব্যাপার। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকা কেন্দ্রের গ্রন্থাগার, সংরক্ষণাগার ও এর চেয়ারম্যান আজিম বখ্শ অজস্র পাঠক, দর্শনার্থী, গবেষক, মিডিয়ার সংবাদ কর্মীদের নানাবিধ সহযোগীতা করছেন এবং তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছেন। ঢাকা কেন্দ্র দেশবিদেশের মানুষের কাছে ঢাকার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরছে এবং তার বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা কেন্দ্রের পাঠাগারে যে কেউ যেতে পারেন। এখানে পাঠক, গবেষকদের সুবিধার্তে প্রয়োজনীয় বই/তার পাতা ফটোকপি করে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। শনি-বুধবার বিকাল ৪টা-রাত ৮টা, শক্রবার সকাল ৯টা-১২টা পর্যন্ত খোলা এবং বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। তবে যাঁরা গবেষণার কাজে আসেন, তাঁরা সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এখানে বসে কাজ করতে পারবেন। এ জন্য ৩ মাসের একটি সাময়িক সদস্যপত্র সংগ্রহ করতে হবে। ঢাকা কেন্দ্রের পুরোনো দুষ্প্রাপ্য বই এবং নিদর্শনের পাশাপাশি এ কেন্দ্রের বাড়তি আকর্ষন চেয়ারম্যান আজিম বখ্শ। তাঁকে ‘ঢাকার জীবন্ত ইতিহাস’ বলে অভিহিত করা যায়। যে কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বললেই এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন। ঢাকা কেন্দ্র একাধারে একটি সেবামূলক, শিক্ষার্থী ও পরিবেশ বান্ধব ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা প্রতিষ্ঠান। ঢাকার নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার অনুরোধ অন্তত একবার ঘুরে আসুন ঢাকা কেন্দ্র থেকে। আমার বিশ্বাস এখানে এসে আপনারা ঢাকা ও ঢাকাইয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে স্বচক্ষে দেখার, হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করার এক অনাবিল সুন্দর সুযোগ এবং অনুভূতি পাবেন। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। 

[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK