বুধবার, ১৪ আগস্ট ২০১৯
Saturday, 29 Jun, 2019 12:12:46 am
No icon No icon No icon

প্রথম বিদেশ ভ্রমন কাহিনী

//

প্রথম বিদেশ ভ্রমন কাহিনী


টাইমস ২৪ ডটনেট: শুক্রবারে ক্লাস করা কতটা বিরক্তিকর তা টের পেলাম ভালমতই.... বাসে করে জুম্মার নামাজ পড়তে গেলাম শহরের একমাত্র মসজিদে, ইংরেজি খুদবা বুঝলেও পরের পার্ট চীনা ভাষাতে হওয়াতে কিছুই বুঝলামনা। নামাজ শেষে মসজিদের সামনে পাওয়া কাবাব, তিল দিয়ে বানানো তন্দুর রুটি ও টাটকা ফলের জুস ভালই লাগলো। অবশেষে এলো প্রতীক্ষার শনিবার ....বৃষ্টির পসরা থামিয়ে সূর্যের আলোয় যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই কর্মবাস্ত শহর সরকারী ছুটির দিনেও।..........সাবওয়ে, পার্ক সমূহ সব পরিপূর্ণ   ..... আমরাও বসে থাকার বান্দা নহে সবাই মিলে গেলাম Lianhua Shan Park -এ, সুন্দর করে পাথর দিয়ে বাধানো অপুরুপ নির্মান শৈলী ও প্রাকৃতিক সুন্দর্যর সন্নিবেশে নির্মিত এই কোলাহল মুক্ত পার্ক দেখে মুগ্ধ হতে হয়.... পাহাড়, জঙ্গল, লেক যাতে আছে কচুরীপানা, শাপলার লতা ও সাদা বগের নিভয় চলাচল। দুপুরে চললাম Window of  the World থিম পার্কে .... এখানে প্রথম বারের মতো অবলোকন করলাম 4D Movie যা সত্যিকার অর্থেই বিস্ময়কর .... অতপর প্রায় ২০০ কলাকৌসুলিদের দ্বারা স্টেজ শো দেখে চীনাদের শিল্পী দক্ষতার পরিচয় পেলাম ভালমতই যদিও এই স্টেজ শো তে চীন শিল্পীদের সাথে সাথে রুশ ও ইউক্রেইক্নীয় শিল্পীও ছিল।  পরিশেষে আতশবাজি উত্সব ............. পরেরদিন রবিবার সকাল আমাদের হাতে সময় খুব কম কিন্তু অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখা বাকি  ... ...  হাতে শহরের রঙিন মাপ, আধো ইংরেজি ও সর্বোপরি হাতের ইশারা দ্বারা ট্যাক্সি কাব ডাকলাম .. যা বলা মাত্র হাজির তারপর শহর থেকে প্রায় ৪০কি:মি: দূরে Sea World এর উদ্দেশে যাত্রা। .... বিশাল বিশাল টানেল যা পাহাড় ভেদ করে চলে গেছে তাও আবার কমপক্ষে চার লেনের।.... এমন বেশ কয়েকটা টানেল অতিক্রম করে হাজির হলাম সমুদ্র তীরবর্তী Sea World এ ............. বিশাল আকুরিয়ামে হাঙ্গর থেকে শুরু করে অনেক প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক জীব প্রদর্শীত হচ্ছে ...রুশ ও ইউক্রেইক্নীয় শিল্পীর জলপরী ও মত্স্যকন্যা সাজে বেশ কিছু প্রদর্শনী চললো বাদ্যের  তালে তালে .... পরেই কাঙ্ক্ষিত ডলফিন, সি লায়ন, শীলমাছ বেশ কিছু নজরকারা খেলা দেখালো। ..বেশ কিছু স্থানীয় দর্শকদের ডলফিন স্পর্শ করা দেখে নিজেও ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। ...যা ভাবা তাই কাজ  ... ক্যামেরা অন্যের হাতে দিয়ে দ্রুত গেলাম ডলফিনের স্পর্শ পেতে .....  50RNB (প্রায় ৬৫০টাকা ) দিয়ে টিকেট কেটে জীবাণু নাশক তরল দিয়ে হাত ধুয়ে বসলাম ডলফিন ছোয়ার জন্য নিধারিত আসনে তারপর স্পর্শ পেলাম ডলফিনের অনেক দিন পর মনে একটা অন্যরকম উচ্ছাস কাজ করলো মনের অজান্তেই কিন্তু সময় শেষ হওয়াতে আমাদের গ্রুপের অন্য সদস্য এটা মিস করায় নিজেও কিছুটা বাথিত হলাম। ... ডলফিন কর্তিপক্ষ ওই মুহুর্তের একটি ছবি দিলেন .... ডলফিন পর্ব শেষ করে দর্শন করলাম বিশাল আকৃতির তিমি, মেরু দেশীয় Wolf ও পেঙ্গুইন। .... মুজিব কোর্ট অনুরূপ রঙের এই বিশেষ প্রাণীটি। ..... সাইজে বড় গুলো প্রথনে চুপ করে দাড়িয়ে ছিল তখন ভেবেছিলাম ওইগুলো বোধহয় প্লাস্টিকের। .... তবে যতদুর  বোঝা গেল প্রানীগুলো গো-বেচারা টাইপ। Sea World পর্ব শেষ করে ছুটলাম Xiaomeisha beach (সামেশা বীচ) আর উদ্দেশে যদিও আমার সাথের অন্য কারো আগ্রহ ছিলনা .... কিন্তু আমার নাছোরবান্দা মনোভাবের জন্য শেষমেষ তারা আমাকে ৩০মিনিট সমুদ্রে ঝাপাঝাপি করার জন্য বরাদ্দ করলেন যার জন্য তাদের ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করলাম না। ... সাগরের উত্তাল ঢেউ-এর আহবান কোনকালেই অঙ্গীকার করতে পারিনি একাই নেমে গেলাম সমূদ্রে। সাতার জানিনা তাই একটা টিউব কিনে ৪০০টাকার প্রবেশ ফি দিয়ে, থ্রি-কোয়াটার পরে যখন সমুদ্রে নামলাম তখন আশে পাশে সবাই দেখি আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন অদ্ভুত কোনো প্রাণী দেখছে  .... প্যারাশুট গ্লাইডিংও করার ইচ্ছা ছিল ... পরে এই ইচ্ছাটাকে  তুলে রাখলাম অন্য কোনো গন্তব্যের জন্য। ...........বেলা ছুটে চলে আমাদের ছুটে চলা শেষ হয়না। .. আবার ছুটলাম  East Oversea Chinese Town Tea Brook আর উদ্দেশে পাহাড়ের গা বেয়ে ঢেউ খেলানো এলোমেলো পথে প্রকৃতির সুন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছিল। ..যখন আমরা পৌছালাম তখন ঘড়ির কাটায় চারটা বেজে গেছে পুরা পার্কটির দর্শন ফি বাংলাদেশী টাকায় ২৬০০টাকা আর ২ দিন সময় লাগে ভালো ভাবে দেখতে যা চারটি ভাগে বিভক্ত তাই হতাশ হয়ে ফিরে এলাম সময়ের কাছে পরাজিত হয়েই ফিরে এলাম আমাদের হোটেলের লবিতে তখন হালকা বৃষ্টি।  বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বের হলাম আবার নিকটবর্তী মার্কেট গুলোতে। ... এশিয়ার বৃহত্তম ইলেকট্রনিক্স মার্কেট ৭১ তালা বিশিষ্ট SEG Plaza তে যাই দেখি তাই কিনতে ইচ্ছা করে বিখ্যাত বেশ কিছু শপিং সেন্টার দেখে চোখ ধাধিয়ে যায়। ..আমাদেরও সপ্তাহান্তিক ছুটি শেষ। .... পরেরদিন আবার যথারীতি ক্লাস করে আমি আর আমার মতোই ভবঘুরে এক ভাই (আমাদের গ্রুপের সদস্য) মিলে ছুটলাম ১০০তলা বিশিষ্ট KK100 নামক ভবনে চড়ে শহর দেখবো বলে। ... আবার ৪০০টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে যখন উপরে পৌছালাম তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু করছে। .... শহরের পাশে বয়ে চলা নদী তখন প্রথম চোখে পড়লো। .. আর সারি সারি বিল্ডিং কে কেবলই মনে হলো শোল দ্বারা বানানো স্থপতির নকশা। ...আমাদের ফ্লোরে অবস্থিত অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায় নির্মিত মোমের ভাষ্কর দেখে মুগ্ধ হলাম আবারও। .. এরপর নামলো রাতের আধার .... চারপাশে বর্ণিল আলোয় আলোকিত চোখ ধাধানো অন্য এক Shenzhen শহর। ...ভবন দর্শন শেষে নিয়নের আলোয় হেটে চলেছি আমরা দুই ভবঘুরে। .... হঠাৎ মাথায় আসলো আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিছু কেনাকাটা করা দরকার। ..যেই ভাবা সেই কাজ সাবওয়ে দিয়ে চলে আসলাম বিখ্যাত শপ Walmart এ। ..... আমার ধারণা ছিল এখানে পন্যের দাম বেশী হবে ..কিন্তু হলো তার উল্টো এই শপে চকোলেট পাওয়া যায় কেজি হিসাবে। ..... আমি বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৬০০হাজার টাকার শপিং করলাম যার মধ্যে প্রায় ৫ কেজি চকোলেট।  বাসাতে ফিরলাম রাত্রি ১১.৩০ এর পর  ... এসেই Team Viewer এর মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থিত সার্ভারে লগইন করে ফেসবুক open করেই দেখি ১৪৩টা notification আর ৫/৭ টা inbox (চীনে ফেসবুক নিষিদ্ধ), চীনে গিয়ে প্রথম টের পেলাম আমার ফেসবুক আসক্তি। ..... বর্ণিল ও আনন্দময় সময় যে খুব দ্রুত শেষ হয় তা টের পেলাম Huawei কর্তিক বিদায়ী ভোজের আমন্ত্রণ পেয়ে .... তুর্কি দেশীয় একটি খুব উন্নতমানের রেস্তারায় এই আয়োজন। পথে দ্বিতীয় পর্বের ট্রেনার জনের সাথে সারাটা পথ অনেক অন্তরঙ্গ গল্প করলাম সে যখন আমার কাছে শুনলো আমাদের দেশে সরকারী ছুটি ২৩দিন আর আমাদের বাত্সরিক ছুটি আরও ৪০দিন ....আমাকে বলে তোমার দেশে আমাকে চাকুরী দিবা ? (চীনে বছরে সরকারী ছুটি মাত্র ৭দিন) সে অনেক আক্ষেপ করলো যে দীর্ঘ দিন সে তার মার কাছে যেতে পারেনি। .... আমাকে চীন সম্পর্কে মন্তব্য  বললে আমি বললাম " অতি নম্র একটি জাতি কেবলই ছুটছে চাকচিক্য আর বিলাসবহুল অভিজাত সমাজের দিকে সব কিছুর বিনিময়ে " সে বললো তুমি সঠিক বলেছ এখানে ছেলে মেয়ে সবাই চাকুরী করে দিন শেষে স্বামী-স্ত্রী কোনো একটা রেস্তারায় বসে রাতের খাবার খায় (চীনারা সন্ধা ৭টার মধ্যেই ডিনার করে ফেলে) অতপর বসাতে ফেরে ....শুধু ছুটির দিনে কেউ কেউ রান্না করে।  ....রেস্তারায় বিশাল খাবারের বহরের মধ্যে একটা জিনিস মনের মধ্যে গেথে গেল আর তা হচ্ছে "আখরোট" শুকনো আখরোট একটি বিশেষ পদ্ধতিতে ভেঙ্গে খাওয়াটা শৈল্পিক পর্যয়ে পড়ে। পরের দিন পরীক্ষা নিয়ে আমাদের কিছুটা টেনশন দেখে জন আমাদের অভয় দিল বললো তোমরা আনন্দ কর মন যা চায় তেমন কঠিন কিছু থাকবে না আর open book exam হবে ......চিন্তায় শুকিয়ে যাওয়া মনে প্রাণ ফিরে পেলাম। ... পরের দিন exam মোটামুটি ভালই হলো তার পরেই সনদপত্র প্রাপ্তি। ... সবশেষে এলো এই সল্প মেয়াদী ক্যাম্পাস হতে বিদায় মুহূর্ত। .... কোনো বিদায়ই আমার ভালো লাগেনা ....অনূভব করলাম এক অজানা ভালবাসা এই ক্যাম্পাসটির প্রতি। .......মনে পড়ে গেল ক্যাম্পাস করিডোরে দুপুরে সোফাতে ক্লান্ত চীনা প্রযুক্তিবিদদের ঘুম, ভূগর্ভস্থ বিশাল ল্যাব ও R&D display Center, Cafetoria ও অনিন্দ্য সুন্দর এই সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে।  জন, সুসি সবাই বিদায় জানালো আমরা বাসে করে শেষ বারের মতো ফিরে আসলাম আমাদের হোটেল লবিতে। নিজেকে প্রথম বারের মত ক্লান্ত অনূভব করলাম তাই দুরে কোথাও না যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম মনের মধ্যে তাড়া করে ফিরছিলো প্রায় ২৯০০কি:মি: দূরে অবস্থিত চীনের প্রাচীরের প্রতি ..."কিছু অপ্রাপ্তি থাকনা মনে যতনে"  বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে আমরা দাড়িয়ে আছি লনে।  ভাবতে ভাবতে এই ঝুম বৃষ্টিতে একাই বের হলাম ঝলমলে এই শহরে ফেরার সময় হাতে ছাতা পরনে রেইন কোর্ট থাকা সত্বেও কাক ভেজা ভিজলাম মনের অপ্রাপ্তি ধুয়ে ফেলতে। .... চীনা লোকজন মনে হয় ভাবছিলো পুরান পাগলে ভাত পায়না সেখানে নতুন পাগলের আমদানী। ... দুই একজন আবার এককাঠি সরেস মোবাইল ছবি তুলে রাখলো প্রিয় জনকে ভিনদেশী পাগল দেখাবে বলে .... বৃষ্টিতে চশমা ঝাপসা হয়ে যায় এটাই বড় সমস্যা  .... চীনে অবস্থানের  শেষ দিন শনিবার আমরা দুই ভবঘুরে সকাল সকাল বের হলাম যতদূর সম্ভব স্থান বেড়ানো যায়। .... শহরের এ মাথা হতে অন্য মাথা টয়-টয় করে ঘুরবো বলে ৪/৫ জায়গা ঘুরে হোটেল এ ফিরলাম মাত্র ৩০মিনিটের জন্য আবার শুরু হলো ২য় পর্ব। ....আমাদের দুইজনেরই দুই পা যেন আর চলে না। .. সময় বাঁচানোর জন্য ট্যাক্সি নিলাম তার পরেও হিসাবের খাতা খুলে দেখি ৩০ভাগ জায়গা আমরা দেখতে সক্ষম হয়েছি মনে হলো। ....আঙ্গুর ফল টক তেমনই মনে হলো ধুর এত্ত বড় শহর হুদায় বানিয়েছে .......... ওই দিন রাত ৪টা তে হোটেল থেকে Guangzhou এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। ...ভাবলাম ঘুম দিলে উঠতে পারবোনা তাই জেগে বসে আছি সারাদিনের ক্লান্তির ধকল কখন যে আমাকে গভীর ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গেল টের পাইনি। ...এলার্ম , আমার সহ যাত্রী ভাইদের অনবরত ফোনকল কোনো কিছুই আমাকে জাগাতে পারেনি। ..অগত্তা তারা হোটেল কর্তিপক্ষের সাহায্য কামনা করতেছিল এমন সময় ঘুম ভেঙ্গে দেখি সবাই আমার হোটেল রুমের সামনে .....আমার অপেক্ষায় দাড়িয়ে ... পড়ি-মরি করে দৌড় দিয়ে বাসে উঠলাম। ..... স্থানীয় চীন সময় ৯টা তে আমাদের ফ্লাইট ....... ৪ ঘন্টা বিমানে ভ্রমন করে বাংলাদেশ সময় সকাল ১১টা তে বাংলাদেশে নামলাম .... আবার আমার মাতৃভূমির ছোয়া ......  বিমান বন্দরের যাবতীয় কর্মকান্ড শেষ করে হরতাল উপেক্ষা করেই নিজের বাসার দিকে রওনা করলাম সাথে নিয়ে ফিরলাম হাজারও গল্প ও প্রায় ৭০০০এর মত ছবি যা বিগত ১৪টি দিনে অতি যতনে তুলেছি ...... জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমনটা চীনে হওয়াটা নিজের ভাগ্যবান  মনে করলাম চীনাদের অতি ভদ্রতা, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সকলের অতিথিসেবক মানসিকতা ও শৈল্পিক দক্ষতায় নির্মিত এই অসাধারণ শহরের মুগ্ধতা অবলোকন করে ..... 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK