বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯
Friday, 21 Jun, 2019 11:52:13 pm
No icon No icon No icon

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৫

//

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৫


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারের কাছে নবাব সলিমুল্লাহ কর্তৃক পূর্ববাংলা প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপনঃ প্রবল ব্যক্তিত্বশীল, সাহসী, জনকল্যাণকামী নবাব সলিমুল্লাহর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী উদ্যেগ পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ অনগ্রসর, দরিদ্র, বঞ্চিত, নিপীড়িত, শোষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের জাতীয় জীবনে নবজাগড়ণের সূচনা করেছিল। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকায় আগমনের সময় ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, বরিশালের প্রখ্যাত আইনবিদ আবুল কাশেম ফজলুল হককে নিয়ে তার নিকট পূর্ববাংলার অনগ্রসর মুসলমানদের সার্বিক সমস্যার কথা, বিবরণ তুলে ধরেন এবং তাদের অগ্রগতির জন্য পূর্ববাংলার মুসলিম প্রধান বিভাগগুলো নিয়ে এখানে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাদের প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববাংলার স্বতন্ত্র ভৌগলিক অবস্থান, প্রশাসনিক, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক সার্বিক দিক বিবেচনায় ভাইসর‍য় লর্ড কার্জন সংযুক্ত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের সর্ববৃহৎ ও জনবহুল ফোর্ট উইলিয়াম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রভিন্সকে দ্বিখন্ডিত করার পরিকল্পনা গ্রহন করেন। এ লক্ষ্যে তিনি ১৯০৫ সালে উক্ত প্রদেশ থেকে মুসলিম অধ্যুষিত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ নিয়ে পূর্ববাংলা গঠন ও বিচ্ছিন্ন করে এর সাথে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে অনগ্রসর আসাম প্রদেশকে যুক্ত করে এবং ঢাকাকে রাজধানী করে ইস্ট বেঙ্গল এন্ড আসাম স্টেট/পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ নামক একটি নতুন মুসলিম প্রধান প্রদেশ গঠন ও ঘোষনা করেন। আর অবশিষ্ট হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা অঞ্চল এবং দুটি দেশীয় রাজ্য নিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রভিন্স পুনঃগঠন করেন। নবগঠিত মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশটির প্রথম প্রশাসক হন লে. গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার এবং নতুন প্রশাসনে স্বাভাবিকভাবে মুসলমানরা প্রাধান্য বিস্তার করে। এরফলে পূর্ববাংলা ও আসামের বিকাশমান শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি, অনগ্রসর দরিদ্র কৃষক এবং রাজধানী হিসেবে ঢাকা নগরীর আত্নবিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ নির্বিঘ্ন ও প্রশস্ত হয়। এতে এই নবগঠিত প্রদেশের স্থানীয় শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানরা প্রাদেশিক সরকার প্রশাসনে অধিক হারে সরকারী চাকরীতে প্রবেশের পর্যাপ্ত সুযোগ লাভ করে।

কেন্দ্রীয় ব্রিটিশ সরকার এবং স্থানীয় প্রাদেশিক প্রশাসন নতুন পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকাকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী প্রশাসনিক ভবন যেমন, নবাবদের দিলখুশা বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশে নতুন প্রাদেশিক প্রশাসকের জন্য দিলখুশা গভর্নমেন্ট হাউজ, সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং(বাংলাদেশ মেডিকেল ভবন), বর্ধমান হাউজ(বাংলা একাডেমি ভবন), হাইকোর্ট ভবন (বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও হাইকোর্ট ভবন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন কার্জন হল, ঢা.বি.-এর ভিসির বাসভবন, ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের ভবন স্থানান্তর করে রমনার নতুন রেলভবন, নতুন নতুন স্কুল, হাসপাতাল নির্মাণ ও স্থাপন করে। ঢাকা শহর রমনা এলাকা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়, নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয় এবং রাস্তার পাশে লাইট পোস্ট লাগানো হয়। ১৯০৮ সালে লুই প্রাউডলক ঢাকা নগরীকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। কলকাতা ও ঢাকার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত ছাত্র-যুব শ্রেণি, পূর্ববাংলার কংগ্রেসপন্থী হিন্দু ও মুসলিম জমিদার শ্রেণির বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন এবং সন্ত্রাসবাদ বিপ্লব শুরু করে। আর তাদের প্রতি সর্বভারতীয় কংগ্রেস অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে। এরফলে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ নবগঠিত এই মুসলিম প্রদেশ ব্যবস্থা স্থায়ী এবং মুসলমানদের সংঘবদ্ধ করার লক্ষ্যে ১৯০৬ সালে ১৬ই অক্টোবর মোহামাডান প্রভেন্সিয়াল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল এই অঞ্চলের বাঙালী মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। এরপর তিনি পূর্ববাংলা ও আসাম মুসলিম শিক্ষা সমিতি গঠন করেন। কেন্দ্রীয় ও নতুন প্রদেশ সরকার এই প্রদেশের অনগ্রসর ও দরিদ্র মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের উপর যথেষ্ঠ গুরুত্বারোপ এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। এতে করে পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। নবাব সলিমুল্লাহর অনুরোধের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাবিভাগে মুসলমানদের জন্য সহকারী পরিদর্শন ও বিশেষ সাব ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি করেন। এ সময় সরকার নতুন বর্গা/আধিয়ারী আইনে পরীক্ষামূলক হিসেবে ঢাকা জেলাতে জমিদারদের খাস জমিতে বর্গা চাষীদের প্রজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরফলে তাদের উপর হিন্দু জমিদার, নায়েবদের লাগামহীন শোষন, নির্যাতন অনেকাংশে হ্রাস পায়। আসামের চা রপ্তানী বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

এই সমস্ত কারণে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববাংলার মুসলমানদের অবিসাংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। স্বতন্ত্র পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান, নমঃশুদ্র হিন্দুদের বৃহৎ অংশের স্বার্থের পক্ষে ইতিবাচক ও কল্যাণকর ছিল বলে তারা বঙ্গভঙ্গকে আশির্বাদ হিসেবে গ্রহন, সমর্থন করে। অপরপক্ষে তা কলকাতার প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থে এবং পূর্ববাংলার কলকাতা প্রবাসী ও স্থানীয় হিন্দু জমিদার শ্রেণির জমিদারী ও আর্থিক স্বার্থে চরম আঘাত হানে। ফলে তারা বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য একদিকে রাজপথে প্রবল গণআন্দোলন, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালাতে থাকে এবং অপরদিকে গোপনে বিভিন্ন ধর্মান্ধ ব্রিটিশ ও মুসলিম বিরোধী জঙ্গী সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদের প্রচার, সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী তৎপরতা চালাতে শুরু করে। কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ তাদের নিজস্ব শ্রেণিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পূর্ববাংলার হিন্দু জমিদার শ্রেণির ব্রিটিশ সরকার বিরোধী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ বিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সাম্প্রদায়িক আন্দোলনকে সমর্থন করে। দুই বাংলা ও ভারতের বাঙালী-অবাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়, কংগ্রেসের কাছে এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও স্বদেশী আন্দোলন এবং পূর্ববাংলা ও আসামের মুসলমানদের কাছে এটি বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত হয়। ব্রিটিশ ভারতের বর্ণ হিন্দুদের স্বদেশী আন্দোলন এবং তার প্রতি কংগ্রেসের সমর্থনের ফলে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের মুসলিম শাসকগোষ্ঠী এবং বিকাশমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই নবাব সলিমুল্লাহ নিজ উদ্যেগে ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জাতীয় সম্প্রদায়গত স্বার্থ, অধিকার আদায়, প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এবং নবগঠিত মুসলিম প্রধান ও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে একটি সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা কল্পে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ছবিটি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুরের। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে-(পরবর্তী ৬ষ্ঠ পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। 

[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK