সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯
Sunday, 02 Jun, 2019 12:19:42 am
No icon No icon No icon

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-২

//

আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-২


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ যুগ পর্যন্ত উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ফার্সী-উর্দূ শিক্ষিত, ঢনাঢ্য, অভিজাত অবাঙালী মুসলমান সওদাগর, ভূস্বামী, রাজদরবারের আমির, উমরাহ, নায়েব নাজিম, কাজী, আমলা, দর্জি, সিপাহী, বাইজীরা বিভিন্ন কারণে ঢাকায় আগমন করেছেন। তাদের অনেকেই এখানে বংশ পরস্পরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেছে এবং এদেশকে নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহন করেছেন। তাদের মাতৃভাষা ছিল ফার্সী ও চোস্ত উর্দূ। এদের উত্তরসূরীরাই পরবর্তীকালে ঢাকায় সুব্বাসী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল এবং তারা ঢাকার স্থানীয় বাঙালীদের কুট্টি হিসাবে অভিহিত করত। ঢাকার স্থানীয় বিখ্যাত খাজা জমিদাররা ছিল অবাঙালী বংশোদ্ভূত কাশ্মিরী, সুন্নি মাযহাব মতালম্বী, ঢাকার সুব্বাসী সম্প্রদায়ভুক্ত অভিজাত ও প্রভাবশালী মুসলিম ভূ-সামন্ত পরিবার এবং সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের খেতাব প্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবার। ঢাকার স্থানীয় আদি বাসিন্দা/ঢাকাইয়া হিসেবে তারা পারিবারিকভাবে বংশ পরস্পরায় ঢাকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস, ব্যবসাবাণিজ্য, জমিদারী/নবাবী, জনসেবা, রাজনীতি এবং মৃত্যুবরন করেছেন। ঢাকার নবাব পরিবারের সকল নবাব এবং সদস্য মারা যাবার পর তাদের বেগমবাজারস্থ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। ঢাকার নবাবগণ ঢাকা এবং এদেশের স্থানীয় অবাঙালী এবং বাঙালী মুসলমানদের অধিকার আদায়, স্বার্থ রক্ষা, প্রতিষ্ঠা, উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। খাজা পরিবারের উত্তরসূরী ঢাকার নবাবগণ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মিত্রতা নীতি এবং মুসলমানদের প্রতি জনকল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে সমগ্র ঢাকাসহ পূর্ববাংলায় নিজেদের পারিবারিক জমিদারী ও নবাবী প্রভাব, প্রতিপত্তি, শক্তি, মর্যাদাকে অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি, সুসংহত করার এবং এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অধিকার আদায়, স্বার্থ রক্ষার সময়োচিত, সাহসী, বলিষ্ঠ, বিচক্ষণ, দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে নবাব আব্দুল গণি, নবাব আহসানুল্লাহ, নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব হাবিবুল্লাহ তাদের কালে ঢাকা শহরের প্রভাবশালী সামাজিক এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের মত জনকল্যাণকামী সামন্ত প্রভু উপমহাদেশে বিরল ছিল।

১৭৭২ ঢাকা জেলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। জেমস টেলরের ১৮৩৯ সালের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সে সময় ঢাকা জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ জেলা, দক্ষিণে বাকেরগঞ্জ(বরিশাল)জেলা, পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য(বৃহত্তর কুমিল্লা পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল), পশ্চিমে ফরিদপুর জেলার অবস্থান ছিল। ঢাকার ঢনাঢ্য প্রতিপত্তিশালী খাজা পরিবার এক সময় ঢাকা জেলার একচ্ছত্র জমিদারে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে ঢাকা জেলার চারপাশের উপরোক্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে খাজাদের জমিদারী বিস্তার লাভ করে। খাজা জমিদারদের ঢাকার নওয়াব এস্টেট ছিল যুক্তবাংলা প্রদেশের সর্ববৃহৎ জমিদারী। খাজারা ছিল যুক্তবাংলা প্রদেশের সবচেয়ে বিত্তশালী, প্রভাবশালী, বৃহৎ মর্যাদা সম্পন্ন মুসলিম জমিদার পরিবার। ঢাকার নওয়াব এস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খাজা আব্দুল হাকিমের পুত্র মৌলভী খাজা হাফিজুল্লাহ। তিনি গ্রীক, আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের সাথে চামড়া, লবন, মসলা সামগ্রীর ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ, বিত্ত-সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত ১৮০৬ সালে ময়মনসিংহ জেলার আতিয়া পরগনা(বর্তমান টাঙ্গাইল)-র চার আনা ক্রয় করেন। এটা থেকে তার সম্মান, প্রতিপত্তি, অর্থ উপার্জন এবং বিত্ত-সম্পদ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাশাপাশি তিনি তার পূর্বতন ব্যবসাও সাফল্যের সাথে চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে তিনি নতুন জমিদারী এবং পুরানো ব্যবসা থেকে বিপুল পরিমান পুজি সঞ্চয় করতে সক্ষম হন। তাছাড়া এ সময় সরকারের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নীতির কারণে যুক্তবাংলার সর্বত্র প্রাচীন জমিদাররা যথা সময়ে খাজনা প্রদান না করার কারণে তাদের জমিদারী হারাচ্ছিলেন। সরকার তাদের জমিদারীর জমি নিলামে বিক্রি করে তার পাওনা রাজস্ব আদায় করে নিচ্ছিল। উপরোক্ত কারণে ঢাকার ঢনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার খাজা হাফিজুল্লাহ প্রবল উৎসাহের সাথে ঢাকার চারপাশের বিভিন্ন জেলার পরগনা ক্রয় করতে থাকেন। খাজা হাফিজুল্লাহর নিজের কোন পুত্র সন্তান/পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি তার জোষ্ঠ্য ভ্রাতুষ্পুত্র খাজা আলিমুল্লাহকে জমিদারী ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তুলেন।

এ সময় খাজা আলিমুল্লাহ তার নিজস্ব ক্রয়কৃত জমিদারীকে চাচার জমিদারীর সাথে সংযুক্ত করায় তাদের বিশাল সংযুক্ত জমিদারীটি অচিরেই একটি এস্টেটে পরিণত হয়। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সাথে সৌহার্দ স্থাপন করেন। নিজে ইংরেজি শিখেন এবং পরিবারের সদস্যদের ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি ব্রিটিশদের সাহায্যে রমনা রেসকোর্স এবং জিমখানা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই আহসান মঞ্জিল ভবনটি ফরাসী কুঠিয়ালদের কাছ থেকে ক্রয় করে সংস্কার ও বসবাস উপযোগী করেন। আভিজাত্য প্রদর্শন করতে প্রচুর মনি-মুক্তা, হীরা ক্রয় করেন। ১৮৫২ সালে একটি সরকারী নিলাম থেকে দরিয়া-ই-নুর নামক একটি বিখ্যাত হীরা ক্রয় করেন। আলিমুল্লাহ
তার মৃত্যুর পূর্বেই ১৮৫৪ সালে এই সংযুক্ত জমিদারিটিকে একটি ওয়াকফ সম্পত্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এই ওয়াকফ সম্পত্তি একজন মুতাওয়াল্লী দ্বারা পরিচালিত হবে। আর খাজা পরিবারের অন্য সকল সদস্য আনুপাতিক হারে মাসিক ভাতা পাবে। এরফলে খাজাদের পারিবারিক জমিদারী এস্টেটটি ভূ-সম্পত্তিগত দিক থেকে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এর অব্যাহত অর্থনৈতিক উন্নতি, সমৃদ্ধি, সীমানা বিস্তারের পথ সুনিশ্চিত হয়। ঢাকা নবাব এস্টেটের জমিদারী কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য দেওয়ান, গোমস্তা, কর্মচারীর দল ছিল। জমিদার খাজা পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনের রাজকীয় ভোজের জন্য রসনাকর দেশীয়, হিন্দুস্তানী, ইউরোপীয় নাস্তা ও খাবার রান্না তৈরি, ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো এবং সদস্যদের প্লেটে তা সার্ভ করার জন্য পেশাদার খানসামা রাখা হোত। তারা হাতি ও ঘোড়া পুষত। সেগুলোর জন্য উন্নত আস্তাবল ছিল। তারা হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে, চার চাকাযুক্ত ঘোড়ার জুড়ি গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করত। তারা বিরাটাকৃতির বজরা নৌযান ও ইঞ্জিন বোট দিয়ে নৌপথে নৌবিহার, শিকার, এবং বনভোজন করতে বের হতো। আর এসব দেখভাল করার জন্য তাদের পেশাদার, দক্ষ, বিশ্বস্ত মাহুত, ঘোড় সওয়ার, কোচোয়ান, মাঝিমাল্লা ছিল। ঢনাঢ্য ও প্রভাবশালী খাজারা তাদের এই সুবিশাল জমিদারী এস্টেট, পরিবার, প্রাসাদ, ধন-সম্পদের নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব দুর্ধর্ষ পেশাদার লাঠিয়াল বাহিনী রাখত। ঢাকার জমিদার খাজা পরিবারের এই বিপুল বিত্ত-সম্পদ, প্রভাব, প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য্য, আভিজাত্য, রাজসিক ভোজ, বিলাসিতা এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তাদের একনিষ্ঠ আনুগত্যবোধ ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ সুদৃষ্টি আকর্ষন করেছিল। এজন্য ব্রিটিশ সরকার ঢাকার নওয়াব এস্টেট এবং খাজা পরিবারের প্রধান আলিমুল্লাহকে নবাব বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। তিনিই ছিলেন খাজা এবং ঢাকার নবাব পরিবারের প্রথম নবাব। চলবে-(পরবর্তী ৩য় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। 
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK