সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮
Saturday, 24 Nov, 2018 01:16:13 pm
No icon No icon No icon

ঘুরে আসুন মিজোরামের আইজল


ঘুরে আসুন মিজোরামের আইজল


হাবিবুর রহমান: নানা কারণে বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছে ভারত দিনে দিনে আরও বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। এত কম টাকায় এত বৈচিত্রময় পর্যটন সবখানে মেলে না। উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য হচ্ছে মিজোরাম। উত্তর-পূর্ব ভারতের সপ্তকন্যার অন্যতম মিজোরাম। মি (জাতি), জো (পাহাড়) এবং রাম (ভূমি), এই তিনটি শব্দ থেকে উদ্ভূত মিজোরাম বলতে ‘পাহাড়ি জাতির ভূমি’ বোঝায়। মিজোরাম শব্দের অর্থ ‘পাহাড়ি মানুষের দেশ’। মনকাড়া সবুজ প্রকৃতি, সদাহাস্যময় মানুষজন, দূষণহীন পরিবেশ এই রাজ্যের সম্পদ। খানিকটা অজ্ঞতার কারণেই এ সুন্দরী আজও পর্যটকদের কাছে অধরা। সমস্ত ভয়-ভাবনার ইতি ঘটিয়ে এক বার পৌঁছে গেলে প্রাপ্তির ঝুলিটা ভরবে। অপ্রাপ্তির খাতাটা শূন্যই থেকে যাবে। আইজল মিজোরামের রাজধানী। ভারতের উত্তর-পূর্বে, এটি সর্বদক্ষিণের স্থলবেষ্টিত রাজ্য এবং ভারতের সাতভগিনী রাজ্যের ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর এই তিনটি রাজ্যের সাথে যার সীমানা রয়েছে। এর আয়তন ২১০৮৭ বর্গকিলোমিটার। এছাড়াও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের প্রায় ৭২২ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে মিজোরামের সীমানা অবস্থিত। এর সর্বমোট আয়তন ২১,০৮৭। মিজোদের উৎপত্তি, ভারতের উত্তর-পূর্বের অন্যান্য আদিবাসীদের মতো রহস্যময়। 


মিজোরামের উত্তর-পূর্ব ভারত একটি একটি স্থলবেষ্টিত রাজ্য যার দক্ষিণাংশে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের প্রায় ৭২২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা রয়েছে, এবং উত্তরাংশের সীমানায় মণিপুর, আসাম ও ত্রিপুরা অবস্থিত। এটি ২১.০৮৭ কিমি (৮,১৪২ বর্গ মাইল) বিষিষ্ট ভারতের পঞ্চম ক্ষুদ্রতম রাজ্য। এটি ২১°৫৬'উত্তর থেকে ২৪°৩১'উত্তর, এবং ৯২°১৬'পূর্ব থেকে ৯৩°২৬'র্পর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্কটক্রান্তি প্রায় এ রাজ্যের মাঝখান দিয়ে সঞ্চালিত হয়েছে। সর্বাধিক উত্তর-দক্ষিণ দূরত্ব ২৮৫ কিমি, এবং সর্বোচ্চ পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত ১১৫ কিমি. পর্যন্ত।
মিজোরামের হালকা জলবায়ু বিরাজমান, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৯° সে (৬৮ থেকে ৮৪° ফা) থাকে, এবং শীতকালে তাপমাত্রা পরিসীমা থেকে ৭ থেকে ২২°সে (৪৫ থেকে ৭২° ফা) তাপমাত্রা। এই অঞ্চল মৌসুমী বায়ু দ্বারা প্রভাবিত, শুষ্ক (ঠান্ডা) মৌসুমে সামান্য বর্ষণের পাশাপাশি মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারী বর্ষণ হয়ে থাকে।


আইজল: কলকাতা থেকে জেট এয়ারওয়েজ, এয়ার ইন্ডিয়া বা স্পাইস জেটের বিমান পৌঁছে দেবে আইজলের নিকটবর্তী বিমানবন্দর লেংপুইতে। আইজল থেকে দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। পাহাড়ের গায়ে অনেকটা এলাকা জুড়ে শহরের পরিধি। যারা বাংলাদেশ থেকে যাবেন তারা মহানগর প্রভাতি যোগে কমলাপুর থেকে আখাউড়ায় যাবেন। সেখান থেকে আগরতলা সীমান্তে যাবেন। আগরতলা থেকে বিমান যোগে আইজল যাবে যাবে। যারা ট্রেনে যাবে তারা বাজারঘাট রেলস্টেশন থেকে শীলচর স্টেশনে যাবেন। সেখান থেকে সুমো গাড়ি যোগে আইজল যেতে পারেন। যারা কোলাসিব দিয়ে আইজন যাবেন, তারা আগরতলা বাজারঘাট রেলস্টেশন থেকে শীলচর না গিয়ে ধর্মতলা নেমে যাবেন। ধর্মতলা একটি সুন্দর শহর। আপনি ইচ্ছে করলে রাতে থেকে ভোরে সুমো গাড়ি যোগে মিজোরামের সীমান্তে চলে যেতে পারেন। কানমুন সীমান্ত দিয়ে সুমো গাড়ি যোগে সরাসরি আইজল যাওয়া যাবে। তবে ভোর সাড়ে ৫টায় একটি সুমো গাড়ি ছেড়ে যাবে আইজলে। আপনি ইচ্ছে করলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে যেতে পারেন আইজলে। কানমুন থেকে দুপুর সাড়ে ১২টায় সুমো গাড়ি যোগে মাত্র ৩শ' টাকায় ভারতের মিজোরাম রাজ্যের কোলাসিব জেলার একটি শহরে পৌঁছে যেতে পারেন। সন্ধ্যায় কোলাসিব শহর থেকে আবারে আইজল শহরে যেতে পারেন। তবে কোলাসিব শহর থেকে আইজলের দূরত্ব ৮০ কিলো মিটার। ভারতের ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে কোলাসিব শহরের জনসংখ্যা হল ১৮,৮৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫১%, এবং নারী ৪৯%।
এখানে সাক্ষরতার হার ৮২%, । পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৩%, এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৮১%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে কোলাসিব এর সাক্ষরতার হার বেশি। এই শহরের জনসংখ্যার ১৩% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী।
কোলাসিব শহর দেখে, পরের দিন আপনি আইজলে চলে যাবেন। তখন আপনি পেয়ে যাবেন চোখের সামনে গোটা আইজল শহর। আইজলের অর্থ ‘ফলের বাগান’। কিছু বেসরকারি হোটেল থাকলেও সরকারি চালতালাং টুরিস্ট লজ বেশ ভাল। দ্রষ্টব্যের তালিকায় আছে সলোমনস চার্চ এবং কেডি’স প্যারাডাইস। সোম থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা।


চাম্ফাই: ইন্দো-মায়ানমার সীমান্তবর্তী শহর চাম্ফাই আইজল থেকে সড়কপথে ১৮৫ কিলোমিটার। গোটা পথটাই পাহাড়ি। কোথাও বনানী, কোথাও বা জনপদ। সেলিং, তুইরিনি, কেইফাং, কাওয়াকুলহ, খাওয়াজল পেরিয়ে চাম্ফাই পৌঁছতে সূর্য পাটে চলে যাবে। অর্কিডে ঘেরা টুরিস্ট লজটি বেশ ভাল। কর্মীরাও আন্তরিক। এখানে দু’রাত থাকা প্রয়োজন। চাম্ফাই থেকে ২৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জোখাওথার শহর। বয়ে চলেছে টুয়াই নদী।
সেই নদীর উপরে বেইলি ব্রিজ। দুই প্রতিবেশী দেশের মাঝের যোগচিহ্ন। এই ব্রিজ পার হলেও মায়ানমারের প্রবেশদ্বার। এই ব্রিজ পেরিয়ে বিনা পাসপোর্টে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মেলে। সীমান্তের ইমিগ্রেশন অফিসটিতে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ যে কোনও একটি সচিত্র পরিচয়পত্র জমা রাখা বাধ্যতামূলক। পাঁচ কিলোমিটার পথের শেষে অপূর্ব নৈসর্গের মাঝে রিহদিল হ্রদ। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, মৃত মানুষের আত্মা এই পবিত্র হ্রদের জলে স্নান সেরে স্বর্গের পথে পাড়ি দেয়।


থেনজোয়াল: ঝর্নার দেশ থেনজোয়াল। এখানকার সরকারি ট্যুরিস্ট লজটির অবস্থান চমত্কার। অবসরযাপনের জন্য অন্তত দিন দু’য়েক থাকা দরকার। একটা দিন কাটুক ঝর্নার সান্নিধ্যে। অন্য দিনটি একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। গাড়ির রাস্তা ছেড়ে পায়ে হেঁটে তিন কিলোমিটার ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছতে হবে ভ্যানতানাং ফলস্‌-এ। সূর্যাস্তের সন্ধিক্ষণে পৌঁছে ওয়াচ টাওয়ারের দখল নিন। মন ক্যামেরায় চিরস্থায়ী হবে কমলা রঙে মাখামাখি হওয়া রুপোলী ধারার সাবলীল পতন।
আর এক ঝর্না তুই রিও। ঘন বনের পথ নয়। এ বার পিচ্ছিল সোপান। ফার্ন, অর্কিডে মোড়া দেওয়াল ধরে নেমে আসা একদম সোজা ঝর্নাতলায়। তবে নির্জনে নয়। মিজো তরুণ-তরুণীর যৌবনের জয়গানে সরগরম। স্নান, নিজস্বী বিলাস সবই চলছে।


লুংলেই: দক্ষিণ-মধ্য মিজোরামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর লুংলেই। আইজলের ১৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান। নামের অর্থ ‘পাথুরে সেতু’। পর্যটক আকর্ষণের প্রধান কারণ এর অনাবিল প্রকৃতি।
রেইক: আইজলের ১২ কিলোমিটার দূরত্বে রেইক। এখানে ঐতিহ্যবাহী মিজোগ্রামের দেখা মেলে। বাঁশ-কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি স্মৃতির পাতায় অমলিন থাকবে দীর্ঘ দিন। রেইক-এর সরকারি টুরিস্ট লজে থাকা যায়। চাইলে আইজল থেকেও ঘুরে আসা যায়।


জরুরি কথা: মিজোরাম যাওয়ার জন্য ইনার লাইন পারমিট লাগে। দু’কপি পাসপোর্ট ছবি এবং ভোটার/আধার কার্ডের প্রত্যয়িত নকল-সহ নির্দিষ্ট আবেদনপত্রে আবেদন করতে হবে বালিগঞ্জের মিজোরাম হাউজে। সাত দিনের পারমিটের জন্য লাগবে ১২০ টাকা। তবে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য শুধুমাত্র পাসপোর্ট দেখিয়ে ইনার লাইন পারমিট নিতে পারবেন।
জেট এয়ারওয়েজ, এয়ার ইন্ডিয়া এবং স্পাইস জেটের বিমান কলকাতা থেকে আইজলকে যুক্ত করেছে আকাশপথে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিমানগুলি যাত্রা শুরু করে। তবে প্রস্থান সময় পরিবর্তন সাপেক্ষ। বিমানে মোটামুটি এক ঘণ্টা সময় লাগে।
লজ বুকিংয়ের জন্য নিম্নলিখিত নম্বরে যোগাযোগ করুন অন্তত মাস দু’য়েক আগে।
চালডালাং টুরিস্ট লজ: (০৩৮৯) ২৩৪ ১০৮৩/৯৪২১
চাম্ফাই টুরিস্ট লজ: ৯৪৩৬৩৬০৩৩৯
থেনজোয়াল টুরিস্ট লজ: ৯৬১২০৬৫৫২৭
লুংলেই টুরিস্ট লজ: (০৩৭২) ২৩৪ ২০১৩/৮৭৩১০/৭০৪৫২
গাড়ির জন্য কথা বলতে পারেন: (০৩৮৯) ২৩০ ০০৬৬ বা (০৩৮৯) ২৩২ ৩৫৮৪ নম্বরে। সুমোর দেখা বেশি মেলে এখানে। দিন প্রতি গাড়ির খরচ ৩৫০০ থেকে ৪৫০০ টাকা (তেল ছাড়া)। কোলাসিব গাড়ির জন্য কথা বলতে পারেন: ৮৭৯৪৪২৪৭৩৮, ৮৪১৬০৭৯৭০৯ এবং কানমুনে গাড়ির জন্য কথা বলতে পারেন: ৮৭৩০৮৩৪১০০ অথবা সরাসরি ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে পারেন: ৯৬১২০৬২৬৮০। পর্যটক মরসুমে খরচ বাড়তে পারে।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK