মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Saturday, 20 Oct, 2018 12:21:47 pm
No icon No icon No icon

সবুজ কার্পেটে শুয়ে আছে সমুদ্র নীল

//

সবুজ কার্পেটে শুয়ে আছে সমুদ্র নীল


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: স্বল্প সময় আর স্বল্প খরচে ঘুরে আসা যায় বলে সীতাকুণ্ড আজকাল ভ্রমণ পিপাসুদের নিকট স্বর্গ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি আমরা চার বন্ধু ঘুরে এলাম সীতাকুণ্ড থেকে। ছাত্রদের ট্যুর যেমন হয়, আগে থেকে কোনো প্ল্যান করে রাখা নেই। হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া আর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়া। মাত্র চার পাঁচ দিন আগেই রক্ত দিয়েছি, সেজন্য এই পাহাড়ের ট্যুর বেশ রিস্কিই ছিল। কেননা এই ট্যুরে প্রচুর স্ট্যামিনা প্রয়োজন। সন্ধ্যার দিকে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতেই যাত্রা শুরু করব, যেই ভাবা সেই কাজ। সীতাকুণ্ড ট্যুরে মেইল ট্রেনে যাওাটাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী, এছাড়া কোনো আন্তঃনগর ট্রেন সীতাকুণ্ড থামে না। তবে মেইল ট্রেনে সিট পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বাসে যাবো। আমরা যাত্রা শুরু করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল থেকে। উবার ডেকে আমরা সায়েদাবাদ পৌঁছালাম রাত দশটায়। সীতাকুণ্ডর চারটা টিকিট কেটে নিলাম, বাস ছাড়বে রাত সাড়ে এগারোটায়। আমাদের অপেক্ষা শুরু হলো। অতঃপর নির্ধারিত সময়ের একটু পরে বাস ছাড়ল। চেয়ার কোচে আমরা ঘুমাতে ঘুমাতে যাত্রা শুরু করলাম।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমরা সীতাকুণ্ড পৌঁছালাম। তখন সবে আলো ফুটতে শুরু করেছে। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। সীতাকুণ্ড বাজারে আমরা ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তখনো কোনো হোটেল খোলেনি। তাই একটু অপেক্ষা করে নাস্তা করে নিলাম। এরপর আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি আর স্যালাইন নিয়ে নিলাম। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উদ্দেশে। খুব কাছেই। দশ মিনিটও লাগল না, আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড়ের নীচে বাঁশ পাওয়া যায়। বাঁশ কিনে নিলাম। এই বাঁশ খুবই কার্যকরী পাহাড়ে ওঠায়। নীচে নেমে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিলে অর্ধেক দাম পাওয়া যায়। 
বুকভরে বিশুদ্ধ নিশ্বাস নিতে নিতে, সেইসাথে অসংখ্য পাখির ডাকে মুখরিত হতে হতে আমরা পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। কয়েক মিনিট ওঠার পর পরই হাঁপাতে থাকলাম। আমরা পাহাড়ে চরে অভ্যস্ত নই, তাই বেশ কঠিন লাগছে। লাঠি বা বাঁশের প্রয়োজনীয়তা এখন টের পাচ্ছি। উঠতে থাকলাম আমরা। পথে পথে মন্দির। কিছুদূর ওঠার পর একটা ঝরনা পেলাম। এই ঝরনা থেকে দুদিকে পথ গেছে। একটা ডানদিকে, অন্যটা বামে মোড় নিয়েছে। ডানদিকের পথ ধরে ওঠা দেখতে সহজ মনে করলেও কিছুদূর গেলে বুঝবেন চরম ভুল করেছেন। অনেকেই তখন আবার ফিরে আসে। এই বিষয়টা সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম, তাই বাম দিকের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম। ক্রমেই কঠিন লাগছিল, প্রচণ্ড ঘামছিলাম। নয় শ ফুট ওঠার পর একটা মন্দির পেলাম। এখানে উঠে আমরা বিশ্রাম নিলাম। সমুদ্র থেকে ভেসে আসা হাওয়া আমাদের ক্লান্তি কমিয়ে দিলো অনেকটাই। সেইসাথে তখন প্রথম আমরা সূর্যের মুখ দেখলাম। সোনালি রোদ যখন মেঘের ওপর পড়ল, মনে হচ্ছিল স্বর্গে এসেছি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। প্রচুর ঘামছিলাম, স্যালাইনও খেতে হচ্ছিলো অনেক। এভাবে চলতে চলতে একসময় পৌঁছলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শীর্ষে!
সেখানে উঠেই মনটা ভালো হয়ে গেল খুব। চন্দ্রনাথ মন্দিরে বিশ্রাম নিলাম। আর সেইসাথে উপভোগ করলাম অপরূপ স্বর্গীয় সৌন্দর্য। মেঘ নেমে গেছে অনেক নীচে। সোনালি রোদ্দুর, আর পাহাড়ি বুনোফুল। এই মায়াবী সৌন্দর্যে মনে হচ্ছিল এখানে থেকে যাই চিরকাল। কিন্তু আমাদের যে আরো অনেককিছু বাকি! এবার নামার পালা। আমরা অন্য রাস্তাটা ধরে নামতে থাকলাম। এটাই সেই সিঁড়ি, যা ঝরনা থেকে ডানে মোড় নিয়েছিল। নামার সময় খেয়াল করলাম এই সিঁড়িগুলো প্রচণ্ড খাড়া, এখান দিয়ে ওঠা খুবই কঠিন হতো। নামার সময় দেখলাম অনেকেই আটকে আছে, আর পারছেন না। নামাটাও পরিশ্রমের কাজ ছিল বেশ। অবশেষে নেমে এলাম পাহাড়ের পাদদেশে। এরপর সেখান থেকে আবার সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সীতাকুণ্ড বাজারে। তখন মাত্র সাড়ে দশটা বাজে! এরপর আমাদের প্ল্যান ছিল গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত। কিন্তু গুলিয়াখালী যেতে হবে বিকেলে, চারটায়। কেননা এখানে যেতে হয় জোয়ার ভাটার হিসেব করে। বিকেল তিনটার আগে গেলে কাদা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। আমাদের হাতে লম্বা একটা সময় আছে। কোথায় যাওয়া যায় ভাবছিলাম। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম সুপ্তধারা ঝরনা থেকে ঘুরে আসি। 
সীতাকুণ্ড বাজার থেকে বাসে উঠলাম ইকো পার্কের উদ্দেশে। বাস থেকে নেমে এক কিলোমিটার হাঁটার পর ইকোপার্কের গেটে পৌঁছলাম। এইপথটুকু বেশ ভালো লাগার ছিল। গ্রামীণ রাস্তা, দুপাশে খেজুরগাছ। ধানক্ষেত। আর দূরে পাহাড়। ইকোপার্কের টিকেট কেটে আমরা ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে সুপ্তধারার দিকে রওনা দিলাম। এক কিমি রাস্তা, এটা হেঁটে না যাওয়াই ভালো। আমরা পরে তা বুঝতে পারছিলাম। বনের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি পথ। ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। অর্ধেক যাওয়ার পর বাকি অর্ধেক খুবই কঠিন ছিল। উঁচু পথ ধরে হাঁটায় হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম খুব। একসময় একটা মোড়ে পৌঁছলাম। সেখান থেকে ডানদিকে নীচু সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি ধরে নামতে থাকলাম। কিছুদূর নেমে একটা গোল ছাউনি পেয়ে সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। তারপর আবার নামতে থাকলাম। নামার সময় মনে হচ্ছিল এইযে এতো নামছি, ওঠার সময় তো কষ্ট হবে অনেক। নামতে নামতে সিঁড়ি শেষ হলো। তারপর একটা ঝিরিপথ। ঝিরিপথ ধরে আমরা বামদিকে এগোলাম। এই ঝিরিপথ ধরে একদম শেষ পর্যন্ত যেতে হবে। অবশেষে আমরা ঝরনার দেখা পেলাম! কী অপরূপ ঝরনা! ছোটবেলায় পড়া কবিতার কথা মনে পড়ে গেল! 

“ঝর্ণা! ঝর্ণা!! 

সুন্দরী ঝর্ণা!

 তরলিত চন্দ্রিকা! 

চন্দন বর্ণা!!”

আমরা ঝরনায় নেমে গেলাম। ঝরনার বরফ শীতল ঠান্ডা পানিতে এক নিমিষেই দূর হয়ে গেল সমস্ত ক্লান্তি। ঝরনায় বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম আমরা। এরপর ফেরার পালা। সেই উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কী যে কষ্ট হচ্ছিলো! তারমধ্যে আবার ব্যাগে ভেজার কাপড়ে ব্যাগ ভারী। রাস্তায় উঠে আসাটা খুবই কষ্টকর ছিল। মাঝপথে মনে হচ্ছিল আর পারব না। কিন্তু না উঠেও উপায় নাই। উঠতেই হবে। অবশেষে উঠে এলাম আমরা। তারপর বাস ধরে সোজা সীতাকুণ্ড বাজার। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছিল। ভাজারে ভালোমানের একটা হোটেল পেলাম ‘ভোজ’ নামে। মেনু দেখে সাদা ভাত আর রূপচাদার অর্ডার দিলাম। বড় প্লেটের এক প্লেটজুড়ে একটা রূপচাঁদা, দাম মাত্র ৭০ টাকা! অবাক হয়েছিলাম। পেটপুরে খেলাম আমরা। সীতাকুণ্ড শহরে এত অল্প মূল্যে এত ভালো খাওয়া হবে ভাবিনি। খাওয়া শেষে আমরা আবার বের হলাম। দুপুর পার হয়ে গেছে, এবার আমাদের গন্তব্য গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত। 
সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম গুলিয়াখালী। তারপর সৈকতের দিকে হাঁটতে থাকলাম। সমুদ্রের বাতাসে হাঁটতে খুব ভালো লাগছিল। এই সৈকত অসাধারণ সৌন্দর্যের জায়গা! সবুজ কার্পেটে সমুদ্র নিদ্রা গেছে। কোথাও কোথাও জেগে উঠেছে শ্বাসমূল। ম্যানগ্রোভ বন আর সবুজ সৈকত দেখতে দেখতে সুমদ্রের কাছে পৌঁছে গেলাম। কী সুন্দর একটা জায়গা! সমুদ্রকে সামনে রেখে শুয়ে পড়লাম এই সবুজে। সমুদ্র দেখতে দেখতে ঘুমে চোখ বুজে এলো। কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। ঘুম থেকে উঠে দেখি দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে! এরপর আরো কিছুক্ষণ আমরা সমুদ্র দেখলাম। সবুজ ঘাসগুলো দেখলাম মুগ্ধ হয়ে। সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমাদের ফেরার পালা এবার। 
সীতাকুণ্ড বাজারে ফিরে এলাম। সেখান থেকে বাসের টিকেট কাটলাম। বাসের জন্য অপেক্ষা তারপর। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বাসে উঠলাম। কুমিল্লায় যাত্রাবিরতিতে রাতের খাবারটা সেখান থেকে সেরে নিলাম। তারপর আবার চেয়ার কোচে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত একটায় পৌঁছলাম ঢাকায়। হলে ফিরে দুদিন টানা ঘুম। অসাধারণ একটা ভ্রমণ গেল, পাহাড় মেঘ ঝরনা আর সমুদ্র দেখে। এই অসাধারণ দৃশ্যগুলো বারবার চোখে ভেসে উঠছে। এই মুগ্ধতার রেশ থেকে যাবে অনেকদিন, আবারও যাবো একদিন সেখানে, সবুজে সবুজে, মেঘে মেঘে...

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK