মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯
Thursday, 30 Aug, 2018 05:45:14 pm
No icon No icon No icon

প্রকৃতিকন্যা সিলেটের জাফলং

//

প্রকৃতিকন্যা সিলেটের জাফলং


সোহেল রানা: সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? সুন্দর, অপরূপ নাকি নতুন কোনো কিছু। এটাকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুন না কেন আপনার মন ভরলে তবেই না আসল সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যাই হোক, আমাদের এ পৃথিবীতে হাজারো সৌন্দর্য রয়েছে। রয়েছে শত শত সুন্দর জায়গা। আমরা সেসব সৌন্দর্য উপভোগ করি আর তার থেকে শক্তি বা প্রাণের সঞ্চার খুঁজে পাই। সে রকমেরই একটি জায়গা বাংলাদেশের শেষ সীমানা ও ভারতের কোলঘেষে সিলেটের জাফলং। যাকে স্থানীয়রা বা অনেক পর্যটকরা বলে থাকেন প্রকৃতিকন্যা। 
প্রকৃতিকন্যা সিলেটের জাফলং সৃষ্টিকর্তার অপরূপ মহিমায় সৃষ্ট। স্বভাবত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভ‚মি এটি। ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা, আর নদীর বুকে 
স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের জায়গা হলো জাফলং। এখানেই শেষ নয় সমতল চা-বাগান, খাসিয়া পল­ী, পানের বরজ- কী নেই জাফলংয়ে! সিলেটের জাফলংকে তাই বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভ‚মি। প্রকৃতিকন্যা নামেও রয়েছে আলাদা পরিচিতি। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এ জনপদকে। জাফলংয়ের সৌন্দর্য দেখতে তাই প্রতি বছরই প্রচুরসংখ্যক পর্যটক ভিড় করেন এখানে। লোকের মুখে না শুনে এবার নিজ চোখে দেখার সুযোগ হলো। কেন জাফলং এ এত পর্যটকের আগমন। কয়েকজন পর্যটক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঋতু-বৈচিত্র্যের সঙ্গে জাফলংও তার রূপ বদলায়। সৌন্দর্যে আসে বৈচিত্র্যতা। বর্ষায় গেলে এখানে দেখা যাবে ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা অগণিত ঝরনা। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝরনাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের। আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং। চারদিকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চ‚ড়ায় গহীন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়ই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে জাফলং। জাফলংয়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে দুই নদী- ধলাই ও পিয়াইন। এ নদী দুটি অনন্যতা এনে দিয়েছে জাফলংকে। ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট মাছ। দুই নদীর পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। নদীর পানিতে নারী-পুরুষের এ ‘ডুবোখেলা’ দেখা যায় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি। সীমান্তের ওপারে ডাউকি নদীর ওপরে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ঝুলন্ত সেতু বাড়িয়ে তুলেছে জাফলংয়ের সৌন্দর্য। পাহাড়, পানি, পান, পাথর, ঝরনা সব মিলিয়ে জাফলং যেন এক রূপকথার রাজ্য। নাগরিক জঞ্জাল আর কোলাহল ছেড়ে শান্তি খুঁজে নিতে তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও দল বেঁধে জাফলংয়ে বেড়াতে আসেন পর্যটকরা। ভাড়া নৌকায় পিয়াইন ও ধলাইর বুকে ভেসে বেড়ান তারা। পাহাড় আর নদীতে সীমাবদ্ধ নয় জাফলংয়ের সৌন্দর্য। জাফলংয়ের সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে সেখানকার আদিবাসীদের জীবনধারা। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। এ পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর।
প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠোনে বসে নারী সদস্যরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। পানবরজ ছাড়াও খাসিয়া পল­ীতে দেখা যাবে কমলা বাগান। কাঁচা-পাকা কমলায় নুয়ে আছে বাগানের গাছ। সংগ্রামপুঞ্জির রাস্তা ধরে আরেকটু এগুলো দেখা যাবে দেশের প্রথম সমতল চা বাগান। এ ভ্রমণে সঙ্গী ছিলেন আমার স্ত্রী বিনা আক্তার, আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দৈনিক নওরোজ পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক মুনসুর আহম্মেদ, তার স্ত্রী, ছেলে সিয়াম ও মেয়ে সোমাইয়া আক্তার। আমাদের এই ভ্রমণ প্রাণবন্ত করতে যোগদেন গাজীপুরের সিনিয়র সাংবাদিক বাইজীদ ভাই। আমাদের কে বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করেছেন সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক কমল চক্রবতী এবং বন্ধুবর জৈন্তাপুরের পাথর ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন। 
নানাভাবে পরিচিতি: বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি এলাকার নাম হলো জাফলং। সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এর অবস্থান। বর্তমানে ওই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।
আশির দশকে সিলেটের সঙ্গে জাফলংয়ের ৫৫ কিলোমিটার সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে জাফলংয়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের কথা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীরাও ভিড় করতে থাকেন জাফলংয়ে।
ব্যবসায়িকভাবেও জাফলং অনেক বিখ্যাত। বিশেষ করে পাথরের জন্য। বাংলাদেশে চার ধরনের কঠিন শিলা পাওয়া যায়, তš§ধ্যে ভোলাগঞ্জ-জাফলংয়ে পাওয়া যায় কঠিন শিলার নুড়ি। এছাড়া বর্ষাকালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী শিলং মালভ‚মির পাহাড়গুলোতে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে ওইসব পাহাড় থেকে ডাওকি নদীর প্রবল স্রোত বয়ে আনে বড় বড় গণ্ডশিলাও। এ কারণে সিলেট এলাকার জাফলংয়ের নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর পাওয়া যায়। আর এই এলাকার মানুষের এক বৃহৎ অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে এই পাথর উত্তোলন ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে।
যাতায়াত ব্যবস্থা: ঢাকা থেকে অনেকে বাস আসে সিলেটের উদ্দেশে। সকাল থেকে রাত সাড়ে ১২টা অবধি বাস পাওয়া যায়। শ্যামলী, সোহাগ, হানিফ, গ্রিন লাইনসহ অনেক বাস রয়েছে। আছে ট্রেন ও বিমানও। যদি কেউ ট্রেনে যাতায়াত করতে চান তাহলে প্রতিি সপ্তাহে মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন ট্রেন ছেড়ে যায়। জয়ন্তিকা, কালনী, উপবন, পারাবত আন্তঃনগর ট্রেনগুলো ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশে। ট্রেনে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা লাগে কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সিলেট রেল স্টেশন পৌঁছতে। যদি কেউ বিমানে যেতে চান তাহলেও যেতে পারবেন।
যেথায় থাকবেন: থাকার জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না আপনাকে। সিলেটে বেশ কিছু থাকার জায়গা রয়েছে। তবে জাফলংয়ে তেমন জায়গা নেই থাকার, তাই আপনাকে সিলেট শহরেই থাকতে হবে এবং সেখানে থাকাটাই সেইফ।
সুতরাং আর দেরি না করে আজই বেড়িয়ে পড়ুন প্রাকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে জাফলং খুব ভালো একটা জায়গা। এটি আপনাকে নিশ্চিত নিরাশ করবে না।

লেখক: সোহেল রানা, সিনিয়র সাব-এডিটর, দৈনিক বর্তমান। 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK