বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯
Wednesday, 09 Jan, 2019 08:36:02 am
No icon No icon No icon

ভারসাম্যহীন উপার্জন সামাজিক বৈষম্যতার প্রধান অন্তঃরায়

//

ভারসাম্যহীন উপার্জন সামাজিক বৈষম্যতার প্রধান অন্তঃরায়


এস.এম.নাহিদ, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : সামাজিক বৈষম্যতার প্রধান অন্তঃরায় ভারসাম্যহীন উপার্জন। এমনকি বৈষম্যতার এই নিষ্ঠুর যাঁতাকলে পড়ে দিনের পর দিন দিশেহারা হয়ে পড়ছে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ। এমনকি আত্মহত্যার পথ ও বেছে নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলে মেয়েরা। বিশ্বের কোন সুস্থ রাষ্ট্রের ও অবশ্য এমনটা কখনোই কাম্য নয়,আমাদের ও নয়।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন ব্যাপক হারে ধনকুবের সৃষ্টি করছে। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ধনকুবের উৎপাদন কারখানার ধারক এখন বাংলাদেশে। প্রতিবেদন বলছে, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে চীন বিশ্বের এক নম্বর দেশ নয়। এ অবস্থান বাংলাদেশের।
সবাইকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ সবার ওপরে। ভাবা যায় - আমরা এখন খুব দ্রুতগতিতে ২৫২ কোটি টাকাওয়ালা মানুষ তৈরি করতে পারছি। ২০১২ সাল থেকে শুরু করে, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়েও বাংলাদেশ বেশি ধনী মানুষ উৎপাদন করেছে। এ সময়ে দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশেরও বেশি হারে,পাশাপাশি সারা বিশ্বে যার গড় প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। খবরটা আনন্দের, দুঃখের,লজ্জার নাকি গর্বের? মুক্তবাজার একটি নির্মম ব্যবস্থার নাম। বিশ্বায়ন একটি প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতার নাম। তবু আজকের বিশ্বে এই শব্দ দুটি সবচেয়ে বেশি জৌলুস ছড়াচ্ছে। ফলে সেই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় ধনীরা আরও ধনী আর গরিবরা আরও গরিব হয়ে উঠছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমাদের দাতা দেশ গুলিকে খুশী করতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা অতি ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। ফলে সমতার নামে সারা বিশ্বে রোপণ করছি বৈষম্যবৃক্ষ। অতি ভক্তি নিয়ে সেই বৃক্ষকে যত্ন নেওয়া হচ্ছে। আর তাই সেই মহব্বত বৃক্ষের ফলটার নামও কিন্তু 'বৈষম্য'। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি মানুষ আজও দরিদ্র এবং ২ কোটিরও বেশি মানুষ আজও হতদরিদ্র। শতকরা হিসাবে যথাক্রমে ২৪.৩ শতাংশ ও ১২.৯ শতাংশ। দেশের দারিদ্র্যতার হার সবচেয়ে বেশি এরকম ১০টি জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, মাগুরা দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল। আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা সম্পদ বানানো মেশিনঘর নাকি সম্পদের সঠিক বণ্টন ব্যবস্থা ? প্রতিবেদনেও বলছে, আমাদের দারিদ্র্যও ব্যাপক অসমভাবে বণ্টিত। 
জেলা হিসেবে কুড়িগ্রাম দেশে সবচেয়ে দরিদ্র জেলা। এখানকার ৭০.৮ ভাগ মানুষ দরিদ্র। কোথাও কোথাও এই হার ৭৭ শতাংশ, তবে ৬৪ নিচে কোথাও নয়।অন্যদিকে দেশে সবচেয়ে কম দরিদ্র নারায়ণগঞ্জে। শতকরা হারে যার পরিমাণ ২.৬। স্থানভেদে এর পরিমাণ ৪ থেকে ৬ শতাংশ। ঢাকায় দারিদ্র্য হার ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৩.৭ শতাংশ। অর্থাৎ বলা যায়, দেশে অঞ্চলভেদে দারিদ্র্য হারের পার্থক্যটা খুবই হতাশাজনক। এটা কোনো সুস্থ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কিন্তু কেন এ বৈষম্য ? আর বৈষম্যের নেপথ্যই বা কী কারণ ? এর উত্তর খুঁজতে দীর্ঘসময়ে আমরা চেষ্টা করিনি, অথবা পারিনি। ফলে আমরা ক্রমাগত একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রের পথেই এগিয়ে চলেছি বছরের পর বছর,যুগের পর যুগ। বর্তমানে আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। কিন্তু দেশের সার্বিক সুষম উন্নয়ন চিত্র আদৌ সন্তোষজনক নয়। উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাদের গড় মাসিক খানা আয় ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে, তাদের মাসিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। যার বিপরীতে, একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়। কিন্তু ২০১০ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯১ টাকা। আজকের হিসাব বলছে, ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৩৮.১৬ শতাংশ আয়। কিন্তু ছয় বছর আগেও আমাদের চিত্রটা এরূপ ছিল না। তখন ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ৩৫.৮৪ শতাংশ আয়। অন্যদিকে, বর্তমানে ১ শতাংশ আয় করেন ১০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু কয়েক বছর আগেও এমনটি ছিল না। তখন এই সমপরিমাণ মানুষের হাতে ছিল ২ শতাংশ আয়। অপর প্রান্তে, দারিদ্র্যতা কমার গতিও ক্রমাগত কমে আসছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ১.৭৮ শতাংশ হারে আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার হার নেমে এসেছে ১.৭-এ। আর পরের ছয় বছর তা আরও কমে নেমে এসেছে ১.২ শতাংশে। এটা আজকের বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র। যা আমাদের ভাবায়, হতাশ করে। আজকের অর্থনীতি উন্নয়ন বলতে বোঝে সুষম উন্নয়ন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন ও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এটা সত্য যে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে। এটা প্রচণ্ড আনন্দের। সে জন্য বাংলাদেশকে হৃদিক অভিনন্দনও। কিন্তু এভাবে বাংলাদেশ যদি ক্রমাগত একটি ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হয় তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা কখনওই অর্জন করা সম্ভব হবে না। কারণ দেশের একশ্রেণির মানুষের হাতে একসময় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে রাষ্ট্রের সমগ্র সম্পদ। ফলে ক্ষুধামুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে। এমনকি বৈষম্যরেখা আরও প্রশস্ত হতে থাকবে। ধনী রাষ্ট্র তৈরির প্রক্রিয়ায় হয়তো আমরা এগিয়ে যাব, তবে সুস্থ, সুষম উন্নয়ন রাষ্ট্র বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় অনেকটা পিছিয়ে পড়তে হবে আমাদের। একটি রাষ্ট্র যখন ধনীবান্ধব হয় তখন তা দীর্ঘ ও স্বল্প উভয় মেয়াদেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি রাষ্ট্র যখন জনবান্ধব না হয়ে বৈষম্যবান্ধব হয়, তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও চরমভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রয়োজন বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং তা অতি দ্রুততম সময়ে। পাশাপাশি অর্থপাচার প্রতিরোধ,ধনকুবেরদের বিদেশে যাওয়া বিদেশে পাড়ি জমানো বন্ধ করাটাও গুরুত্ববহন করে। মনে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রকে বৈষম্যহীন করতে, সুষম উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমরা কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি ? কিংবা যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করছি সেগুলো কি যথেষ্ট ? যদি যথেষ্টই হবে তবে কেন বৈষম্যের পথ ক্রমাগত প্রশস্ত হচ্ছে ? প্রত্যাশা, আজকের বাংলাদেশ সারা বিশ্বে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের উদাহরণ হয়ে উঠুক। সুষম উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। কেন আমরা ধনকুবের তৈরির দৃষ্টান্ত হচ্ছি ? কেন আমরা স্বীকৃত ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হলাম ? এমন দেশ তো আমি চাইনি ? চাইনা কোনদিনই।বাংলাদেশ হোক সুষম উন্নয়ন ধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাম্য ও সমতার এক অনুকরণীয় কারখানা। হাতেগোনা কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে আমাদের দেশের সমগ্র সম্পদ জিম্মি হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না। তাই এখনি বন্ধ হোক উপার্জনের ভারসাম্যহীনতা। দূর হয়ে যাক চিরতরে সমাজের বৈষম্যতা। 
ভূলে গেলে চলবেনা, আমরা গোটা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র ঐ জাতি যারা কিনা মায়ের ভাষার জন্য যুদ্ধ করে অজ'ন করেছি ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তজা'তিক মাতৃভাষা দিবস।রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে নিয়েছি আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ড তথা মহান স্বাধীনতা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK