সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮
Friday, 05 Jan, 2018 06:50:32 pm
No icon No icon No icon

আবাসিক হোটেল দাগী অপরাধী ও ফেরারীদের নিরাপদ আবাস


আবাসিক হোটেল দাগী অপরাধী ও ফেরারীদের নিরাপদ আবাস


এমএবি সুজন, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: রাজধানীসহ সমগ্র বাংলাদেশ বিশেকরে শহরকেন্দ্রিক অতিগুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক জনবহুল এলাকাসমূহে প্রকাশ্যে অনৈতিক যৌনকাম ও অসামাজিক কর্মকান্ডনির্ভর আবাসিক হোটেলে বোর্ডার বা অভ্যাগতদের থাকার পরিবেশ দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হোটেলের ভেতরের নাজুক অবস্থার কারণে অভ্যাগতরা দুর্ভোগে পড়ছেন। অভ্যাগতদের কাছে ভাড়া দেয়া হয় না অনেক হোটেলের কক্ষ। বারবনিতা দেহকর্মী পতিতারা ছাড়া সাধারণ স্বাভাবিক নারী অভ্যাগতদের স্থান নেই আবাসিক হোটেলে। তিন, চার ও পাঁচ তারকা হোটেলে পরিবেশ উন্নত হলেও এক, দুই তারকা হোটেল ও গেস্ট হাউজ নামে পরিচালিত আবাসিক হোটেলের নাজুক অবস্থা। ঢাকাসহ সারা দেশের আবাসিক হোটেলগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আপরাধীচক্র। হোটেলে অবস্থান করে সস্ত্রাসী, অপরাধীরা নানা অপরাধ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হোটেলেই হয় অপরাধীদের কাজের পরিকল্পনা, গোপন বৈঠক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নানা অবৈধ ব্যবসা। এক, দুই তারকা হোটেল ও গেস্ট হাউজের নামে চলছে প্রকাশ্যে অসামাজিক কাজ। ঢাকা শহরে দুই শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে এ অপকর্মের অভিযোগ আছে।
অনুসন্ধানে শতাধিক হোটেলে নারী ও মাদক ব্যবসার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। অপরাধীদের অবস্থান ও অবৈধ বাণিজ্যকে ঘিরে আবাসিক হোটেলগুলোর ভেতরেও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ ঘটছে। কোনো একটি ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়। কিছুদিন পরই আবার তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও বন্ধ হয়নি হোটেলকেন্দ্রিক অপরাধ। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রক ও হোটেল মালিক সিন্ডিকেট। এরা স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে চালাচ্ছে তৎপরতা। অনুমোদন বা লাইসেন্স গ্রহণের ঝামেলা এড়াতে ক’দিন পরপর একই মালিক নাম বদলিয়ে হোটেল চালু করছে। চলছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি। অনুসন্ধানে ঢাকা শহরের ভালো আবাসিক হোটেলগুলোরও নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। বদনাম ও নিরাপত্তাহীনতায় হোটেলে অভ্যাগতদের সংখ্যা কমে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক হোটেল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যবেক্ষণে আবাসিক হোটেলগুলোকে রাজধানীর অপরাধের প্রধান আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও দীর্ঘদিনে আখড়াগুলো উচ্ছেদ করা যায়নি। রাজধানীতে হোটেলের খোঁজে সম্প্রতি রাজধানীর কাওরানবাজার এলাকায় রেলক্রসিংয়ের কাছে হোটেল কাওরানবাজারে প্রবেশ করে জানা গেল, এটি ৫২ শয্যার হোটেল। তবে মাত্র দুজন অভ্যাগত আছেন। হোটেল ম্যানেজার আবদুল জলিল জানান, হোটেলে কোনো ঝামেলা নেই, নেই চাঁদাবাজি। পাশেই আছে হোটেল রয়েল ও গ্র্যান্ড। এগুলোও ঝামেলামুক্ত বলে দাবি করলেন কর্তৃপক্ষ। কাছাকাছি আছে হোটেল আকাশ ইন, নিউ মেট্রোরাজ ও হোটেল পারভেজ। অভ্যাগত সেজে কক্ষ ভাড়া চাইলে জানিয়ে দেয়া হয়, হোটেল বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পুলিশ হোটেলগুলোতে তল্লাশি চালিয়েছে। তবে নিউ মেট্রোরাজের বয় মোঃ মোক্তার বলে, ‘বস, অবস্থা খারাপ, পরে আইসেন।’ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, হোটেল ওয়েস্টার্ন গার্ডেনে হামলার ঘটনার পর থেকে এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। পরের দিন। অভ্যাগত হিসেবে মগবাজারের হোটেলগুলোতে ‘রাতে থাকতে চাই’ এমন কথা বললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জবাব আসে, ‘হোটেল বন্ধ।’ কেউ কেউ বলল, ‘হেইডা কইবেন না।’ রূপসী বাংলা হোটেলের বয় কামাল বলে, ‘স্যার, থাকবেন ক্যামনে? অনেক উরুস (ছারপোকা) আছে। আবার মাইয়া নিয়া কাম চলে। কেউ থাহে না। রেইড হইছে, এহন সবই বন্ধ।’ হোটেল সেবিকার বয় মনির বলে, ‘রাতে থাকতে চাইলে অন্যখানে যান। মাইয়া লাগলে চলেন মহাখালী। আমাগোই হোটেল, যমুনা।’
একই এলাকার হোটেল রাজমহলের স্টাফ ইউনুস জানায়, ৪-৫ মাস ধরে ব্যবসা খারাপ। আর ঈদের পর থেকে একদম বন্ধ। হোটেলে দু-চারজন বোর্ডার থাকে। এদেরই একজন নড়াইল থেকে আগত প্রদীপ বড়ুয়া। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগে একবার মগবাজারে হোটেলে থাকতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম। কেউই রাতের জন্য ভাড়া দিতে চায় না। মদিনা হোটেলে অনেক বলে-কয়ে উঠলাম। রাতে ছারপোকার কামড়, নোংরা পরিবেশ আর যৌনকর্মীদের উৎপাতে রুমে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সারারাত ঘুমাতেই পারিনি। এবার কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে।’ রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে স্থান নেই অভ্যাগতদের। কাওরানবাজার বা মগবাজারের মতো অবস্থা মহানগরের বিভিন্ন হোটেলে। আর তাই রাজধানীর মধ্যমানের আবাসিক হোটেলগুলোয় থাকা বা রাতযাপন করা দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তাদের অনেকেরই রাজধানীতে দু’চারদিন থাকার মতো আত্মীয় বা বন্ধু নেই। স্বাভাবিকভাবেই তারা তাই হোটেলমুখী হন। কিন্তু বোর্ডার বা অভ্যাগত হিসেবে হোটেলে থাকতে গিয়ে বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। নারী অভ্যাগত হলে বিপদ ষোলোআনা। এক ও দুই তারকা হোটেল ও গেস্ট হাউজ নামক বেশিরভাগ পান্থশালায় চলছে এ অবস্থা। অনেক অভ্যাগতের কাছে কক্ষ ভাড়া দেয়া হয় না। হোটেলের নামে চলে মাদক ও দেহব্যবসা। ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী কর্মকান্ডের আখড়া হিসেবে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রকরা। কোনো অঘটন ঘটলে প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়। কিছুদিন পরই আবার তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। আর তাই দুর্নাম ও নিরাপত্তাহীনতায় এসব হোটেলে অভ্যাগতদের সংখ্যা কমে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক হোটেল। লোকসান গুনতে গুনতে অনেকেই আবাসিক হোটেল ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। মানা হচ্ছে না বিধিমালা। হোটেলের সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় চলছে নানা অনিয়ম। হোটেল মালিকরা মানছেন না সংশ্লিষ্ট বিধিমালা। আবাসিক হোটেলগুলোতে শৃঙ্খলা ও সেবার মান বজায় রাখার জন্য ‘বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ বিধিমালা (নিবন্ধন, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণ) ১৯৮৬’ প্রণয়ন করা হয়। নিবন্ধনের শর্ত মেনে ব্যবসা করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পালন করা হয় না। দুই দফা নিবন্ধন নিয়ে আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজগুলো পরিচালিত হওয়ার কথা। নিবন্ধন ফি তিন হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। তারকার ওপর নিবন্ধনের ফির হার নির্ধারণ করা হয়। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যবসা করতে হলে করপোরেশনের নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক। অনেকেই তা মানছেন না। অধিকাংশ হোটেলের নেই ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন। কাস্টম এক্সাইজ এ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের তথ্যে জানা যায়, সব ধরনের আবাসিক হোটেলকে অর্জিত আয়ের ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর পরিশোধ করতে হবে। তারা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) নিয়মিত পরিশোধও করে না। ভ্যাট আদায়ের জন্য কোনো এলাকায় কাস্টম এক্সাইজ এ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেট কর হার নির্ধারণ করে দেন। যেমনঃ মহাখালী-বনানী এলাকার হোটেলগুলো এখন মাসে নির্ধারিত ১০ হাজার টাকা ভ্যাট দেয়। তবে অনেক এলাকায় এ রকম একটি হারও নির্ধারণ করা হয়নি। 
হোটেলগুলোতে বিধিমালা কার্যকর করতে প্রশাসনে কোনো তৎপরতাও নেই। মগবাজার, মহাখালী, কাওরানবাজার ও সায়েদাবাদ এলাকার হোটেলগুলোর প্রায় প্রতিটিই অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা। নেই নিরাপত্তা। আর অসামাজিক কাজ তো ‘ওপেন সিক্রেট।’  বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ (নিবন্ধন, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার ১৭ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, হোটেলের কর্মচারীদের স্বাস্থ্যগত যোগ্যতার সনদ নিতে হবে। এক বা দুই তারকা হোটেলের প্রতি তলায় পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক অন্তত দু’টি গোসলখানা ও শৌচাগার থাকতে হবে। হোটেলে প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ ও জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত ওষুধ থাকতে হবে। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য এ্যাম্বুলেন্স, ভ্যান, গাড়ির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু নগরীর কয়েকটি এক ও দুই তারকা হোটেল ঘুরে এসবের কিছুই দেখা যায়নি। টয়লেট ও মেঝে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। বিছানার চাদর, বালিশ ও মশারি মাসে একবার ধোয়া হয় কিনা সন্দেহ।
আবার বেশিরভাগ হোটেলেই নেই লিফট সুবিধা। ওঠা-নামার সিঁড়িগুলো বড় এবং উঁচু। এসব বিষয়ে নির্দেশনা না থাকায় হোটেল ব্যবসায়ীরা কৌশলে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন। মহাখালীর হোটেল আরফানে কক্ষ ভাড়া নিতে কথা বলছিলেন ফেনী থেকে কামাল পাশা (৬৫) নামের এক রোগীর নাতি স্বপন। রোগী বক্ষব্যাধিতে ভুগছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হবেন। হোটেলের পাঁচ ও ছয়তলা ছাড়া কোথাও সিট খালি নেই। কিন্তু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে রোগী কিছুতেই এত ওপরে উঠতে পারবেন না। তাই তারা পড়েছেন মহাবিপাকে। কার্যত আবাসিক হোটেল নারীদের জন্য উপযুক্ত নয়। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের সাধারণ আবাসিক হোটেলে নারীদের থাকার ব্যবস্থা বা পরিবেশ কোনোটিই নেই। কোনো কর্মজীবী নারী কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় এসে হোটেলে উঠবেন সে সুযোগ নেই। সঙ্গে কোনো পুরুষ ছাড়া নারীর কাছে কক্ষ ভাড়া দেয়া হয় না। আবার ভাড়া দিলেও স্থানীয় থানা পুলিশের অনুমতি নিতে হয়। হোটেলগুলোতে নারীদের জন্য পৃথক কোনো নিরাপত্তা ও নারী কর্মচারী নেই। সর্বোপরি হোটেলে অনৈতিক কাজ ও নোংরা পরিবেশের কারণে কোনো নারী হোটেলে ওঠার কথা চিন্তাও করেন না। আবাসিক হোটেলে ভাড়া আদায় করা হয় ইচ্ছামতো। হোটেলের ভাড়া একেক জায়গায় একেক রকম। মিরপুর এক নম্বর, ফকিরাপুল, কাওরানবাজার, নবাবপুর রোড, সায়েদাবাদ, মগবাজার, কাকরাইল, পল্টন ও মহাখালী এলাকার হোটেলগুলোতে এক বিছানার দৈনিক ভাড়া ৭০ থেকে ১৮০ টাকা। একটু উন্নত হলে ভাড়ার হার ২০০-৩৫০ টাকা। দুই বিছানার ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। একটু ভালো হোটেলে এ হার ৩৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা নিজেরাই হোটেলে সুযোগসুবিধা ও পরিবেশ বিবেচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করে। বেতন নেই কর্মচারীদের আবাসিক হোটেলগুলোর বয় ও কর্মচারীরা নামমাত্র ভাতায় কাজ করছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেতন দেয়। আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। অনেক হোটেলে কোনো ভাতা বা বেতনই দেয়া হয় না। তাদের জন্য অভ্যাগতদের কাছ থেকে পাওয়া বকশিশই আয়। ফলে তারা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধকর্মে। যৌনকর্মীদের সরবরাহ, খদ্দের জোগান ও খদ্দেরদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গেটে দাঁড়িয়ে থেকে নিরাপত্তার নামে পুলিশের তৎপরতার লক্ষ্য রাখাই তাদের কাজ। আবাসিক হোটেলগুলোতে ২০০৬-এর শ্রম আইনে এক হাজার ২৫০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণাসহ নিয়োগপত্র, সার্ভিস বুক চালু করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। দাবি আদায়ের জন্য ঢাকা মহানগর আবাসিক হোটেল কর্মচারী ইউনিয়ন তৎপরতা চালাচ্ছে। মগবাজারের হোটেল তাজমহলের কর্মী মানিক, বাবু, খোকা ও মাসুদ জানায়- তাদের প্রত্যেকের বেতন ৫০০-৭০০ টাকা। যারা হোটেলে ফুর্তি করতে আসে তাদের কাছ থেকে বকশিশ হিসেবে টাকা পাওয়া যায়। আবাসিক হোটেল অপরাধের আখড়া
হোটেলগুলোয় অপরাধী-সন্ত্রাসীদের আনাগোনার বিষয়টি প্রশাসনের কাছে অজ্ঞাত নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জনতথ্য শাখা সূত্রেই জানা যায়, আবাসিক হোটেলগুলোতে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, খুনি, মাতাল, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপরাধীর আনাগোনা রয়েছে। অনেক অপরাধী হোটেলে আত্মগোপন করে থাকে। চলে জুয়ার আসর। বিক্রি হয় মদ, গাঁজা। ২০০৬ সালে হোটেল গ্রিন গার্ডেন থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরার পরও পুলিশ ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে ওই সময় নানা গুঞ্জন চলে। ফকিরাপুলের হোটেলগুলোতে প্রতারক আদম ব্যাপারিদের গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ভুলিয়ে এনে সর্বস্বান্ত করে। ওই এলাকায় আদম ব্যাপারি প্রতারক চক্রকে ঘিরে চলছে অপরাধ কর্মকান্ড। হোটেল থেকে প্রায়ই বড় অপরাধীদের আটক করা হয়। তাই হোটেলের নিবন্ধন বইতে অপরাধীদের (অভ্যাগত) দেয়া তথ্য ভুল থাকে। ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা যাতে হোটেলে থাকতে না পারে সে বিষয়ে পুলিশ উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। গত বছরের ১৬ মার্চ থেকে আবাসিক হোটেলগুলোতে পুলিশের তথ্য ছক পূরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে । গত বছরের ১০ মার্চ তেজগাঁও স্টেশন রোডের তেজগাঁও বোর্ডিংয়ের তৃতীয় তলার এক কক্ষের মেঝেতে একটি লাশ পাওয়া যায়। ৮ নম্বর কক্ষে ওই যুবককে গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। বোর্ডিংটির বর্তমান দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার আবদুল আজিজ জানান, ওই ঘটনায় ম্যানেজার জাবেদ ও এক বোর্ডার গ্রেপ্তার হয়েছে। হোটেলটিতে এখনো কোনো প্রকার তথ্য ফরম পূরণ করা হয় না। দৈনিক ৬০ টাকা ভাড়ায় ২৩টি একক কক্ষে পরিচালিত এ হোটেলে নিম্ন আয়ের মানুষের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও নেই নিরাপত্তা। 
গত আগস্ট মাসে ঢাকার তিনটি হোটেলে তিন জন খুন হয়েছে। খুনের ঘটনার পর দুই হোটেলের ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট আদাবর থানার শ্যামলী রিং রোডের পায়রা আবাসিক হোটেলে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় কল্পনা আক্তার (৩৫) নামের এক নারীকে। ওই হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত কল্পনার স্বামী রফিকুল ইসলাম হোটেলের তথ্য ছকে তার তথ্য দেয়নি। তথ্য না রাখার কারণ জানতে চাইলে হোটেলের ব্যবস্থাপক মোঃ শাহজাহান বলেন, ‘রফিকুল গত আড়াই বছর ধরে ঢাকায় এলে এ হোটেলেই ওঠে। পুরনো কাস্টমার বলে তার তথ্য রাখা হয়নি।’ খুনের ঘটনার পর হোটেলের ব্যবস্থাপক মোঃ শাহজাহানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিনি গত ৪ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন। শাহজাহান জানান, এখন তথ্য ছক পূরণ করা হয়। ওই হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত রফিক ইতোমধ্যে বরগুনা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। ফকিরাপুলের রাকিব হোটেলে গত ১ আগস্ট রত্না আক্তার নামের এক গৃহবধূ খুন হয়। রত্নাকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে এক যুবক ওই হোটেলে ওঠে। হোটেলে শুধু ওই যুবকের নাম জাহিদ এ তথ্যটুকু আছে। হোটেলের ব্যবস্থাপক এরশাদকে গ্রেপ্তার করা হলেও বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত। ছাড়া পেয়ে আবার দায়িত্ব পালন করছেন। তার দাবি, ওই সময় তাদের হোটেলে পুলিশের তথ্য ছক পাঠানো হয়নি। তবে ওই হোটেলে এখন ক্যামেরাও আছে। মহাখালীর সিটিবার্ড হোটেলে গত ১৫ আগস্ট আলমগীর নামের এক ট্যাক্সিক্যাব চালক খুন হন। ওই ঘটনার পর মালিক-কর্মচারীরা হোটেলটি বন্ধ করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হোটেলটি এখনো তালাবদ্ধ আছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এ হোটেলের মালিকানা তিন দফা বদল হয়েছে। সর্বশেষ জাকির গং এটি চালাচ্ছিল। অবাধ অনৈতিক কাজের জন্য অভিযুক্ত হোটেলটি আবারো চালু করার পাঁয়তারা করছে ভবনের মালিক ও হোটেল মালিক চক্র। গত বছরের ৫ জানুয়ারি শুক্রাবাদের হোটেল নিদমহলের দ্বিতীয় তলায় ব্র্যাক ব্যাংকের লকার ভেঙে স্বর্ণালঙ্কার লুট করা হয়েছিল। ওই ঘটনার লুটেরা চক্র হোটেলের তৃতীয় তলার ১০৩ নম্বর কক্ষসহ বিভিন্ন কক্ষে এক মাস ছয় দিন অবস্থান করেছিল। হোটেলের মেঝে কেটে তারা ব্যাংকে ঢোকার পথ তৈরি করে। লুটের প্রধান হোতা শাকুর মাহমুদ শুক্কুরের বাড়ি খুলনার মংলায়। ওই শুক্কুর এর আগে ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে থেকে নানা অপরাধ সংঘটিত করেছে বলে পুলিশের কাছে জানিয়েছে। গত ৫ অক্টোবর দিনের বেলা কাওরানবাজারের ৩/সি এইচকে টাওয়ারের ওয়েস্টার্ন গার্ডেন হোটেলে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। সন্ত্রাসীদের গুলিতে হোটেল ম্যানেজার আবুল হোসেনসহ (৩২) পাঁচজন স্টাফ ও আলম (২৬) নামের এক পথচারী আহত হয়। এ ঘটনার নেপথ্যে চাঁদাবাজি বলে দাবি করা হলেও মালিকপক্ষ মুখ খুলতে রাজি নয়। আহত কর্মচারীরা জানায়, তাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তবে তারা হামলাকারী চাঁদাবাজদের চেনে না। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর কোনো রকমে সুস্থ হয়েই তারা আত্মগোপন করে। গত ১৪ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলের ৩০, ৩১ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে পথচারী আলমকে ছাড়া আর কাউকেই পাওয়া যায়নি। আলম জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জের রইজিন কটন নামের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঈদের ছুটিতে এফডিসি দেখতে এসে তিনি গোলাগুলির মধ্যে পড়েন। আর কিছুই তিনি জানেন না। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হোটেল ওয়েস্টার্ন গার্ডেন এখন চালু। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুলের আবাসিক হোটেল আজমেরী বোর্ডিংয়ে এক কোটি টাকার হেরোইনসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। হোটেলের তিনতলার ৯ নম্বর কক্ষে বোর্ডার আবদুস সালামের (৩৫) রুটির প্যাকেটে কোটি টাকা মূল্যের এক কেজি হেরোইন পাওয়া যায়। 
কোতোয়ালি ও সূত্রাপুর থানা পুলিশ জানায়, এক বছরে পুরনো ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনায় এক মহিলাসহ আটজন নিহত হয়েছে। স্বাগতম হোটেলে নিহত হয়েছে তিন জন। আহত হয়েছে শতাধিক লোক। বিভিন্ন ঘটনায় এ পর্যন্ত স্থানীয় থানায় মামলা হয়েছে প্রায় ২৫টি। অধিকাংশ মামলার চার্জশিট হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফাইনাল রিপোর্ট হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের বক্তব্য, মামলা দায়েরের পর বাদীপক্ষের অসহযোগিতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ অসম্পূর্ণ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীর কিছু আবাসিক হোটেলে অসামাজিক কাজ ও চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঘটছে নানা ঘটনা। ওয়ান ইলেভেনের পর এলাকায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য কমলেও সম্প্রতি সন্ত্রাসীরা আবার এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। এখন তাদের মূল আখড়া আবাসিক হোটেল। গত চার মাসে ওই এলাকায় খুন হয়েছে তিন জন। এর মধ্যে একটি আছে ডবল মার্ডার। হত্যাকান্ডগুলো সংঘটিত হয় বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে। গত ১৫ আগস্ট সিটিবার্ড হোটেলে হত্যা করা হয় আলমগীর নামের এক ট্যাক্সি ড্রাইভারকে। পুলিশ জানায়, হোটেলের চাঁদাবাজি ও গাড়ি ব্যবসার জের ধরে সহযোগীরা ওই যুবককে হত্যা করে। এর আগে গত ৫ মে তাজ হোটেলে হত্যা করা হয় কিশোরগঞ্জের রাসেল ও মাসুম নামের দুই যুবককে। এ হোটেলটি বর্তমানে বন্ধ আছে। দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই মোঃ জসিম জানান, ওই জোড়া হত্যাকান্ডে নেপথ্যেও ছিল চাঁদাবাজি। অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীচক্র হোটেলগুলো থেকে প্রতিনিয়ত চাঁদা আদায় করে। সম্প্রতি ব্যবসা পড়ে যাওয়ায় চাঁদা ঠিকমতো না দেয়ার কারণেই এসব হত্যাকান্ড ঘটছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। পুলিশের বক্তব্য, হোটেলগুলোতে হত্যাকান্ড সংঘটিত হলেও হোটেল মালিকদের ধরা যাচ্ছে না। কারণ হোটেলগুলোর মালিকানা ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুল এলাকায় মুনস্টার হোটেলের একটি কক্ষ থেকে নাইজেরিয়ান ফুটবল খেলোয়াড় সালেচুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ২০৭ নম্বর কক্ষে সকালে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে কর্মচারীরা অচেতন অবস্থায় সালেচুকে পড়ে থাকতে দেখে। ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সালেচু ও তার বন্ধু সিলভা ৩৫০ টাকা ভাড়ায় ওই হোটেলে ওঠে। সালেচুর মৃত্যুর দু’দিন আগে থেকে সিলভা হোটেলে থাকছিল না। হোটেল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, সালেচু অসুস্থ ছিল। কিন্তু পুলিশ এখনো তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। গত ১৩ অক্টোবর সালেচুর লাশ ওয়ারী খ্রিস্টান কবরস্থানে দাফন করা হয়। ১৪ অক্টোবর মুনস্টার হোটেলে যোগাযোগ করা হলে ম্যানেজার খোরশেদ আলম জানান, ‘লাশ দাফন হয়ে গেছে। অসুখে মারা গেছে। এখন এ নিয়ে আবার প্রশ্ন করে কী লাভ।’ আবাসিক হোটেলে অবাধে চলছে অনৈতিক অসামজিক গর্হিত কাজ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর কাওরানবাজার, মগবাজার, নবাবপুর রোড, মিরপুর, পল্লবী, গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, সায়েদাবাদ, ফার্মগেট, মহাখালী, গুলশান, বনানী উত্তরা, দক্ষিণখান, শ্যামলী, যাত্রাবাড়ী এবং ফকিরাপুল এলাকার বেশিরভাগ হোটেলেই অবাধে যৌন-ব্যবসা চলছে। এর মধ্যে মহাখালী, কাওরানবাজার, মগবাজার, কাকরাইল ও ফকিরাপুল এলাকায় গড়ে উঠেছে অনৈতিক কার্যক্রম ও অপরাধী চক্র। হোটেল কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোটেলে কী হয় তা এখন প্রশাসন থেকে সাংবাদিক সবাই জানে। এ জন্য পুলিশকে নিয়মিত বখরা দিতে হয়। সূর্যের আলো না দেখা এক শ্রেণীর পত্রিকার কথিত ভূইফোর নামধারী কার্ডধারী সাংবাদিকরাও মাথা বিকি দিয়ে হোটেল থেকে চাঁদা আদায় করেন। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এসব অনৈতিক ও অবৈধ ব্যবসা কিছুটা কমেছে। কৌশলও বদলে ফেলা হয়েছে। র্যাব-পুলিশ সাধারণত রাতে তল্লাশি চালায় বলে এখন দিনেই চলে অনৈতিক কাজ। মগবাজারে হোটেল গ্রিন টাওয়ারের সাইন বোর্ডে লেখা আছে, সম্পূর্ণ অনৈতিক কার্যকলাপমুক্ত। হোটেল ব্যবস্থাপক মোঃ সেলিম বলেন, ‘মগবাজার এলাকার বদনামের কারণে ভদ্র অতিথিরা আসতে চাইত না। আমাদের হোটেলে কোনো অনৈতিক কাজ হয় না বলেই আমরা এটি লিখেছি।’ রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম দৌলত আকবর দাবি করেন, ‘আগে মগবাজারে অনৈতিক কাজ চালানোর অভিযোগে ১২-১৩টি হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন পরিস্থিতি ভালো। বর্তমানে যেসব অভিযান চলছে, তা অব্যাহত থাকবে।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (অপরাধ) মুহাম্মদ আবদুল আওয়াল পিপিএম বলেন, ‘সরকারের অনুমতি না নিয়েই নগরীর কিছু স্থানে গোপনে এ ধরনের পার্টির আয়োজন করায় অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। তবে গোটা বিষয়কে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্ট করা হচ্ছে।’ অভ্যাগতদের তথ্য রাখা হচ্ছে না
রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে। কখন কারা থাকছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার কোনো হদিস থাকছে না। হোটেলে অভ্যাগতদের তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশ প্রশাসন হোটেল মালিকদের তাগাদা দিলেও অনেকেই তা মানছে না। পুলিশ হোটেলগুলোকে অভ্যাগত ব্যক্তিদের তথ্য রাখতে তথ্য ছক নির্ধারণ করে দিলেও তা ঠিকমতো পূরণ করা হচ্ছে না। এ সুযোগে সস্ত্রাসী ও নানা ধরনের অপরাধীরা হোটেলকে নিরাপদ আখড়ায় পরিণত করেছে। তাই কোনো অঘটন ঘটলে জড়িতদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যে জানা যায়, গত বছরের মার্চ মাস থেকে শহরের হোটেলগুলোতে অভ্যাগতদের তথ্য সংগ্রহের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ জন্য তথ্য ছকে হোটেলে যারা থাকবে তাদের নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোবাইল ফোনের নম্বর উল্লেখ করতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল ক্যামেরায় অভ্যাগতদের ছবিও তুলে রাখার এবং মোবাইল ফোনের নম্বর সঠিক কি-না তাও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার নির্দেশ আছে। আর পূরণকৃত তথ্য ফরমের ফটোকপি প্রতিদিন স্থানীয় থানায় পাঠানোর নির্দেশ আছে। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যানুসারে, দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর ঢাকা শহরেই ১০ হাজার সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন মামলার আসামি আত্মগোপন করে আছে। এদের অধিকাংশই পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন সময়ে আবাসিক হোটেলগুলোতে অবস্থান করছে। বিগত দিনে রাজধানীর কয়েকটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা বেশকিছু শীর্ষ সন্ত্রাসীকে আটক করেছে। বর্তমান সময়ে নজরদারি কমে যাওয়ার কারণে হোটেলগুলোকে ঘিরে অপরাধ বেড়ে চলেছে। 
ঢাকা শহরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ হোটেলেই পুলিশের এ তথ্য ছক পূরণ হচ্ছে না। মানা হচ্ছে না অন্যান্য শর্ত। তবে কয়েক হোটেল মালিক অভিযোগ করেন, তারা পুলিশের তথ্য ছক পাননি। আবার ব্যবসা ধরে রাখার খাতিরে অনেকেই তথ্য সংরক্ষণ করে না। মগবাজারে রূপসী বাংলা হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ক্যামেরা নেই। মহাখালীর আল নূর হোটেলে তথ্য ছক দেখতে চাইলে ম্যানেজার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কোনো কথাই বলতে রাজি হননি। পার্শ্ববর্তী হোটেল আল-আমানত ও চন্দ্রমুখীতে গিয়েও ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলার প্রক্রিয়া দেখা যায়নি। সাময়িকভাবে বেড়েছে পুলিশি তৎপরতা। আবাসিক হোটেলগুলোতে অনৈতিক কাজ ও অপরাধ বন্ধে পুলিশি তৎপরতা বেড়েছে। তেজগাঁও ও রমনা থানাসহ হোটেল ক্রাইম জোনে অভিযান বাড়ানো হয়েছে। তেজগাঁও থানায় গিয়ে জানা যায়, ১৩ অক্টোবর হোটেল পারভেজ থেকে ১৪ নারীসহ ৩২ জনকে আটক করা হয়। ১০ অক্টোবর একই হোটেল থেকে চার নারীসহ ১০ জনকে আটক করা হয়। আকাশ ইন হোটেল থেকে ১ সেপ্টেম্বর ১৬ নারী ও চার যুবককে আটক করে ডিবি পুলিশ থানায় হস্তান্তর করে। রমনা থানায় ১ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৬০ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। এদের ৭৪ ধারায় কোর্টে চালান করা হয়েছে। মগবাজার ও কাকরাইল এলাকার হোটেলগুলোতে অনৈতিক কাজের অপরাধে ১৯৩৩-৮ দি সাপ্রেশন ট্রাফিক ইমমোরাল এ্যাক্ট অনুযায়ী চারটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ১৩ হোটেল স্টাফ-ম্যানেজারকে আসামি করে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহকারী কমিশনারের (অপরাধ) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর একদিনে ঢাকা শহরের আবাসিক হোটেল থেকে ৯২ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে গুলশান থানা এলাকায় ৩৪, বাড্ডা থানায় ২৭, মোহাম্মদপুর থানায় ৭ ও রমনা থানায় ৫ জন। গত ডিসেম্বর মাস থেকে ঝিমিয়ে পড়েছে অভিযান। আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৎপর। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হোটেলে অনৈতিক কাজ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা নিজেরা হোটেলের মালিক বা দালাল হয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে অবৈধ ব্যবসা। এদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অপরাধীচক্র। শহর ঘুরে জানা যায়, অধিকাংশ আবাসিক হোটেলের মালিকই ঢাকার বাইরের। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও, মুন্সীগঞ্জ, বিক্রমপুর ও গাজীপুর এলাকার লোকই বেশি। নারায়ণগঞ্জের কয়েক প্রভাবশালী পৌর কমিশনারও জড়িত এ ব্যবসায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠেছে অনেক চক্র। এসব চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে নাম এসেছে বিনাশ বাবুর। আড়ালে থেকে হোটেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করলেও বিনাশ কখনো পর্দার সামনে আসে না। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাওরানবাজার-মহাখালীকেন্দ্রিক তেজগাঁও জোনে সক্রিয় আছে এমন কয়েকটি সিন্ডিকেট। রাজীব বাবু সিন্ডিকেট : হোটেল আকাশ ইন, ওয়েস্ট ইন, ফ্যাসি ইন, লর্ডস ইন ও ফার্মগেট বাবুল টাওয়ারের হায়াত রেজেন্সি হোটেলের মালিক রাজীব চৌধুরী ওরফে রাজীব বাবু। অনুসন্ধানে জানা যায়, এক সময়ের হোটেল বয় রাজীব বাবু এখন রাজীব চৌধুরী। হোটেলে অনৈতিক কাজ চালিয়ে এখন সে কোটিপতি। এ রাজীব বাবু এক সময় সিদ্দিকবাজারের হায়াত হোটেলের ম্যানেজার ছিল। নারী ব্যবসা করে একের পর এক হোটেল গড়ে তোলে। কাওরানবাজার ও তেজগাঁও এলাকার অপরাধ জগতের সঙ্গে তার রয়েছে সখ্য। সর্বশেষ সে ফার্মগেটে সন্ত্রাসী ও পিচ্চি হান্নানের সহযোগী টাওয়ার বাবুলের মালিকানাধীন বাবুল টাওয়ারে হোটেল হায়াত রেজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেছে। টাওয়ার বাবুলের চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক ও গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয় রাজীব বাবুর হোটেলগুলো। 
সালাউদ্দিন সালু ও সোনারগাঁও সিন্ডিকেট : হোটেল আল বাবর ও সবুজবাংলার মালিক সালাউদ্দিন সালু মগবাজার তথা রমনা জোনের হোটেল জগতের নিয়ন্ত্রক। সে নিজের হোটেলের বাইরেও এলাকার হোটেলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। রমনাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ব্যবসায় জড়িত আছে সোনারগাঁওয়ের অনেক পৌর ওয়ার্ড কমিশনার নেতা। অবৈধ ব্যবসাও তাদের নিয়ন্ত্রণে। এদের মধ্যে রয়েছে সুইডেন প্লেসের মালিক কমিশনার শামীম, বন্ধন ইন্টারন্যাশনালের মালিক সাবেক কমিশনার নাসির, আরশিনগরের মালিক সাবেক কমিশনার জাহের আলী। রমনা জোনের আরেক অবৈধ ব্যবসায়ী মগবাজার ইন্টারন্যাশনালের মালিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিজান। আলম-বাঁধন সিন্ডিকেট : তোপখানা রোডের হোটেল গ্রিন বার্ডের ম্যানেজার আলম ও মগবাজারের লোটাস হোটেলের সাবেক সুপারভাইজার এসএস বাঁধন চক্র দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক ব্যবসা করে আসছে। এ চক্র হোটেল শেল্টার, মগবাজারের হোটেল সুইডেন প্যালেস ও লন্ডন প্যালেসে অনৈতিক কার্যক্রম চালায়। আলম নিজেই হোটেল ভবনের মালিক বনে যায়। আলমের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে। হোটেল লন্ডন প্যালেসের ম্যানেজার খোকন খুন হয়। এ মামলায় আসামি হয়ে জেল খাটে আলম। আবার পার্টনার ইমনের টাকা আত্মসাতের মামলায়ও আলম গ্রেপ্তার হয়। দুবারই সে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে। পারভেজ-মিলন সিন্ডিকেট : কাওরানবাজারের পারভেজ ইন্টারন্যাশনালের মালিক নুরুল ইসলাম পারভেজ দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কাজ ও মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে। হোটেলের পাশেই রয়েছে সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাংলা মদের দোকান। এ দোকানের সঙ্গে হোটেলের গোপন আঁতাতের কারণে বিকাল হলেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়। হোটেলে মদ মজুদ করে রাখা হয়। এসব মদ হোটেলে অভ্যাগত নেশাখোর ও খদ্দেরদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। পারভেজের সহযোগী হিসেবে কাজ করে মহাখালীর কাঁচাবাজার এলাকার হোটেল মিলনের মালিক মিলন। এ চক্র তিন বছর আগে এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় এরোপ্লেন মসজিদের কাছে হোটেল পারভেজ চালু করে। স্থানীয় মুসল্লিরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে পুলিশ মিলনকে আটক করলেও পরে সে বের হয়ে আসে। এ চক্রটি এখন কাওরানবাজার ও মহাখালীতে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আলমগীর-মাহাবুব-মাসুদ-জুয়েল সিন্ডিকেট : তেজগাঁও শিল্প এলাকার মহাখালী বাস টার্মিনালের কাছে হোটেল
যমুনার ছত্রছায়ায় চারটি হোটেলে অবাধে অনৈতিক কার্যক্রম চলছে। হোটেল যমুনার মালিক আলমগীর এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে। এ ব্যবসা পরিচালনা করছে মাসুদ, মাহাবুব, জুয়েল, উজ্জ্বল, কামাল ও মোল্লা। এরা এলাকার অনৈতিক ব্যবসায়ী বলে চিহ্নিত। মাসুদ ও মাহাবুব ওই এলাকার পাঁচটি হোটেলের মালিক। এসব হোটেলে অবাধে মাদক বাণিজ্যও চলছে। কোটি টাকার চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, তেজগাঁও-কাওরানবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে সাতটি গ্রুপ। এ চাঁদাবাজ গ্রুপগুলো আবাসিক হোটেলগুলোতেও চাঁদাবাজি করে। স্থানীয় হোটেলগুলোকে ঘিরে তাদের নানা তৎপরতা চলছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে : কাওরানবাজার, ফার্মগেট-তেজগাঁও এলাকায় নবী সোলায়মান গ্রুপ, পাখি গ্রুপ, বিনাশ গ্রুপ, আশিক গ্রুপ, জিসান গ্রুপ, মকবুল গ্রুপ ও বাবুল-মোরশেদ গ্রুপ চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। পলাতক সন্ত্রাসীদের পক্ষে তাদের সহযোগীরা চাঁদা আদায় করে আসছে। সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আবদুল জব্বার ওরফে তেইল্লা বাবুল ওরফে টাওয়ার বাবুল। কাওরানবাজার কিচেন মার্কেটের সভাপতি টাওয়ার বাবুল ছিল দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানের ক্যাশিায়ার। পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর গোটা এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নেয় শাহাবুদ্দিন গ্রুপ। সেও র্যাবের ক্রসফায়ারে মারা যায়। এরপর বাবুল গ্রুপ এলাকায় পৃথকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করে। টাওয়ার বাবুল পিচ্চি হান্নানের সঙ্গে গ্রেপ্তার হলেও বের হয়ে আসে। কাওরানবাজারে ছোট ভাই মাহফুজকে নিয়ে গড়ে তোলে নেটওয়ার্ক। বাবুল বর্তমানে ‘ল্যান্ড ডেভেলপার এ্যান্ড বিল্ডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নিজের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রমনা জোনের হোটেল চাঁদাবাজী নিয়ন্ত্রণ করছে সুব্রত বাইনের অর্থের জোগানদাতা হোটেল বন্ধন ইন্টারন্যাশনালের মালিক কমিশনার নাছির। 
এসব চাঁদাবাজ চক্রের প্রধান আয়ের উৎস আবাসিক হোটেল। একই অবস্থা শহরের অন্যান্য এলাকায়। হোটেলগুলোকে স্থানীয় সন্ত্রাসী ছাড়াও থানা পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। জানা যায়, থানাভেদে এর পরিমাণ মাসে গড়ে ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। কখনো এ হিসাব লাখে গিয়ে পৌঁছে। তবে এখন অবস্থা অন্যরকম। থানা থেকে সরাসরি চাঁদা না নিয়ে কোনো কোনো অফিসার নেয়। আবার হোটেলে রেইডও দেয়া হয়। চাঁদা নেয় এক শ্রেণীর কথিত সাংবাদিক। এদের চাহিদা সামান্য অঙ্কের। সায়েদাবাদের রোজ হোটেলের ব্যবস্থাপক মিঠু বলেন, ‘এখন কম চাঁদা দিতে হয়। এ বিষয়ে ম্যানেজার ফারুক জানে। তবে মাসে ২০০-৪০০ টাকার বেশি চাঁদা দিই না।’
রামপুরা আবাসিক এলাকার হোটেল মিরাজের ম্যানেজার খসরু দাবি করেন, এখন তাদের অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হয়। তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সাংবাদিকরা এসব বিষয়ে জানতে চায় না। নিজেদেরটা নিয়ে চলে যায়। আপনি আবার কেন প্যাঁচ বাজাচ্ছেন।’
মহাখালী এলাকার হোটেলে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করে পুলক বাবু নামের এক আন্ডারগ্রাউন্ডের দালাল। সে অন্তরালে থেকে গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। শিশির নামের এক কথিত সাংবাদিক, পুলিশের সোর্স ও মানবাধিকারকর্মী পরিচয়দানকারী আবাসিক হোটেলগুলোকে কেন্দ্র করে চালিয়ে যাচ্ছে প্রতারণা। জানা যায়, মুগদাপাড়া এলাকার এ প্রতারকের সহযোগী হিসেবে কাজ করে হাজী ও মন্টু। এ প্রতারকচক্র কোনো হোটেল থেকে চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হলে হোটেলে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলেও টাকা আদায় করে নেয়। তাদের এ কাজে সহায়তা করে কিছু পুলিশ সদস্য। সবুজবাগ থানার এক অফিসারের সঙ্গে তার রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিয়মিত প্রকাশ হয় না এমন কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কয়েকজন প্রতারক ঢাকা শহরে চাঁদাবাজি করছে। সাংবাদিক পরিচয়ে আবাসিক হোটেলে চাঁদাবাজি করে এমন ১৩২ জনের নাম জানা যায়। এদের অনেকেই এখন নিষ্ক্রিয়। তবে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে হোটেলকেন্দ্রিক অপরাধও যেমন বন্ধ হয়নি তেমনি বন্ধ হয়নি কিছু চাঁদাবাজের তৎপরতা। অনুসন্ধানকালে মগবাজার, শান্তিনগর, পুরানা পল্টন, উত্তরা ও ফকিরাপুল এলাকার ২৮ জন চাঁদাবাজ (কথিত) সাংবাদিকের নাম জানা যায়। অভিযোগ আছে, এরা সবাই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে জড়িত। অনেকেরই পত্রিকার অফিসই চালু নেই। এরা প্রতিটি হোটেল থেকে মাসে ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা চাঁদা নেয়। মহাখালীর হোটেল রিফাতের ম্যানেজার গাজী সেলিম বলেন, ‘আমরা এখন খুচরা পুলিশ, সাংবাদিক (কথিত) ও ড্রাইভারদের টাকা দিই। মেইন ডিলিংস মালিকরাই করে।’ কাওরানবাজারের আকাশ ইন হোটেলের ম্যানেজার অন্তু বলেন, ‘বাধ্য হয়ে জীবিকার জন্য আমরা ঝুঁকি নিয়ে এ পেশায় আছি। প্রশাসন পুরোপুরি বন্ধ করেও দেয় না। অবার চালাতেও দেয় না। চাঁদার বিষয়ে মালিকই দেখে।’ অভিযুক্ত হোটেলগুলো হামেশা নাম ও মালিকানা পরিবর্তন করে থাকে অনুসন্ধানে এবং একাধিক সরকারি সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, মহাখালীতে হোটেল যমুনা, মহাখালী, রিফাত, মিলন, বিলাস, লাভ ইন, লডস ইন, ফ্যাসি ইন, পূর্ণিমা, সি কুইন, ম্যানিলা, বনানী ও বনানীর ব্রিটেন হোটেলে অবাধে অনৈতিক কাজ চলছে। কাওরানবাজারের হোটেল পারভেজ, আকাশ ইন, নিউ মেট্রোরাজ, ওয়েস্টার্ন গার্ডেন, ওয়েস্ট ইন, ফার্মগেটের হায়াত রেজেন্সি, মগবাজারের আল জাহিদ, আল-আমানত, চন্দ্রমুখী, সুইট, পারস্য, সেবিকা, তাজমহল, ক্যাপিটাল, রূপসী বাংলা, সেন্টমার্টিন, মগবাজার, হোমল্যান্ড, রূপালী, বন্ধন, রাজমহল, সুইডেন প্যালেস, নিউ স্টার, পুনম, সার্ক, ডায়মন্ড, ইস্কাটন, মেঘনা হোটেলও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। একই অবস্থা কাকরাইলের আল-বাবর, নেপচুন, গ্রিন গার্ডেন, পল্টন প্যালেস, দৈনিক বাংলা মোড়ের প্রিয়জন, গোল্ড স্টার, রাজদূত, সৈকত, নিউ সাগরিকা, তোপখানার আল-জুয়েল, মেট্রোরাজ, গ্রিন হাউজ, আটলান্টিক, টুরিস্ট, এলিফ্যান্ট রোডের গাউছিয়া, মালিবাগের সানরাইজ, কাকরাইলের সি সে, রামপুরার পদ্মা, মিরাজ, ঝিনুক হোটেলের। পুরনো ঢাকার আবাসিক হোটেল এলাকা নবাবপুরের হোটেল শৈবাল, স্বাগতম, মডার্ন, সোনার বাংলা, নিউ রাজধানী, হিল্টন সিটি, বঙ্গরাজ, হিরো সিটি, গার্ডেন সিটি, বন্ধু, উপহার, ঝুমুরসহ কয়েকটি হোটেলেও অনৈতিক কাজ চলার প্রমাণ মিলেছে। হাতিরপুলের ব্রাইট হাউস, ধোলাইখালের হিমেল, দক্ষিণ সায়েদাবাদের রোজ, উত্তরার টু স্টার, প্যারাগন, সূর্যমুখী ও এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন ভিউ হোটেলকে ঘিরেও চলছে একই রকম ব্যবসা। ‘অপরাধ অনেক কমে এসেছে’
মুহাম্মদ আবদুল আওয়াল পিপিএম সহকারী পুলিশ কমিশনার (অপরাধ), ডিএমপি ‘বর্তমানে খুব জোরেশোরে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এতে হোটেলবেজ অপরাধ অনেক কমে এসেছে। আমি মনে করি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে হোটেল বেজ অপরাধ আর থাকবে না। এছাড়া ৮০ শতাংশ হোটেল এখন তথ্য ছক পূরণ করে থানায় জমা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে শতভাগ সফল হলে অপরাধীরা আর হোটেলে আত্মগোপন করে থাকতে পারবে না। ঢাকা একটি মেগাসিটি। এখানে দেড় কোটি মানুষের বাস। এর মধ্যে হাজারো অপরাধী ওঁৎ পেতে থাকতে পারে। তবে হোটেল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অপরাধের মাত্রা অনেক কমবে। অপরাধীরা যেমন কৌশল পাল্টিয়েছে, তেমনই আমরাও নতুন কৌশলে তাদের ধাওয়া করছি। আমার কাছে থাকা তথ্য থেকে বলতে পারি, ফলোআপ ভালো। মতিঝিলে ব্যবসায়ী খুন, পূর্বাণীতে ১০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের সুরাহা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতাও জরুরি।’

সম্পাদনা: আশরাফুল ইসলাম-৩২৫৪/ঢাকা/২০১৮/ডিনা/৯৮৫/ শবনাজ আক্তার/ঢা-৮৭।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK