রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮
Wednesday, 03 Jan, 2018 12:33:33 pm
No icon No icon No icon

স্বাস্থ্য‌সেবায় আস্থা সংক‌টে হাসপাতাল চি‌কিৎসার না‌মে চল‌ছে দূরদর্শী চু‌ক্তি স্বাক্ষর ও অর্থবা‌ণিজ্য


স্বাস্থ্য‌সেবায় আস্থা সংক‌টে হাসপাতাল চি‌কিৎসার না‌মে চল‌ছে দূরদর্শী চু‌ক্তি স্বাক্ষর ও অর্থবা‌ণিজ্য


এমএবি সুজন, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: ইদা‌নিং ‌আমার সোনার বাং‌লা যেমন হাসপাতাল ক্লি‌নি‌কের শহর ও দেশ চল‌ছে বেশ সড়কের দু’পাশে শুধু হাসপাতাল আর হাসপাতাল ক্লি‌নিক আর ডায়াগন‌স্টিক সেন্টার। ‌চি‌কিৎসা সেবার না‌মে ব্যবসা সফল বা‌ণিজ্য ক‌রছে এতদসংক্রান্তরা। মাত্র আধা কিলোমিটার রাস্তায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৪০টি হাসপাতাল। শত শত রোগী আর দালালে গিজগিজ করে ওই এলাকা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শেরেবাংলা নগরে সর্বদা এমনই চিত্র চো‌খেভা‌সে। এখানেই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল), ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ আরো বেশকিছু হাসপাতাল। এসব সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের দিকে দৃষ্টি থাকে ওই এলাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর। এজন্য নিয়োগ করা হয়েছে দালাল। রোগী ধরার ফাঁদ পেতে বসে থাকে দালালরা।
গত কয়েকদিন সরজমিন মোহাম্মদপুর, শ্যামলীসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৈধ-অবৈধ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে বাবর রোড, ও খিলজি রোড ঘিরে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল বাণিজ্য। অর্ধ কিলোমিটারের কম জায়গায় ৪০টির মতো হাসপাতাল। মুন ডায়াগনস্টিক, বেবি কেয়ার হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক, ট্রমা সেন্টার এন্ড ডায়াগনস্টিক, অ্যানালাইসিস ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, আশিক মাল্টি স্পেশালাইজড, সিগমা মেডিকেল, মনমিতা মানসিক হাসপাতাল, শেফা হাসপাতাল, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, জনসেবা নার্সিং হোম, এলিট ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক, চেস্ট কেয়ার, শিশু নিরাময়, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক, প্লাজমা মেডিকেল সার্ভিস এন্ড ক্লিনিক, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল, জয়ীতা মেডি ল্যাব, ইবাদ মেডিকেল ল্যাব, রয়্যাল মাল্টি স্পেশালিস্ট হাসপাতাল, ফেয়ার ল্যাব, হিস্টো বায়া জোন এন্ড ডায়াগনস্টিক, ইসলামিক মানসিক হসপিটাল, সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল, মেডিল্যাব, প্রাইম, ভিক্টোরিয়া, শাহজালাল, ঢাকা জেনারেল, সন্ধি ডায়াগনস্টিক কেয়ারসহ হাসপাতালের ছড়াছড়ি।
ওই এলাকার বেসরকারি কিছু হাসপাতালের নিজস্ব মার্কেটিং প্রতিনিধি আছে। যারা বেতন হিসাবে আবার কমিশন হিসাবে কাজ করেন। তারাই মূলত রোগী সংগ্রহের কাজ করেন। এবং তাদের মার্কেটিংয়ের জন্য প্রসিদ্ধ জায়গা হচ্ছে শেরেবাংলা নগরে গড়ে উঠা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল। মার্কেটিং প্রতিনিধিরা সকাল থেকেই সরকারি হাসপাতালে শুরু করেন জটলা। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এক দুই জন নয়। অন্তত কয়েকশ’ প্রতিনিধি। তারা সবাই রোগী ভাগানোর প্রতিনিধি নামে পরিচিত। রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু করেন তারা। লোভনীয় অফার আর হয়রানি। চলে টানা হেঁচড়াও। অসহায় রোগী আর তাদের অভিভাবকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ফাঁদে আটকা পড়েন। হাসপাতালে ভর্তি করার পর শুরু হয় অন্যরকম হালচাল। টাকা আদায়ের যত নীলনকশা কলা-কৌশল। চিকিৎসার বালাই নাই। উল্টো আদায় করা হয় বিভিন্ন অজুহাতে বড় অঙ্কের টাকা। আর এই চিকিৎসা সেবার ভার বহন করতে গিয়ে অনেকেই হারিয়েছেন মূল্যবান অনেক কিছু। এসব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালালেও তাদের অসাধু কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় প্রভাবশালীর এসব সিন্ডিকেটের অবৈধ চিকিৎসা বাণিজ্য চলছেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি এসব হাসপাতালের রোগীদের নিয়ে বাণিজ্য করে কিছু দালাল কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। রোগী ভাগিয়ে নিয়ে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে নানা কলা কৌশলে টাকা আদায় করেন। নামমাত্র সেবা প্রদান করে হাতিয়ে নেয়া হয় বড় অঙ্কের টাকা। অযথা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে এবং ভর্তি থেকে শুরু করে রোগী রিলিজের দিন পর্যন্ত একাধিক বিষয়ের উপর বিল তৈরি করা হয়। কেউ কেউ যদি টাকা পরিশোধ করতে না পারেন তবে রোগী আটকে রেখে হয়রানি করা হয়।
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. আফজালুর রহমান বলেন, আমাদের মুখ খোলার মতো কোনো সুযোগ নাই। কারণ রোগী ভাগানোর প্রতিনিধিরা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কাজ করে। আগারগাঁও এলাকায় এতো সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এদের প্রত্যেকটি প্রভাবশালী মহলের। তাদের প্রতিনিধিরা রোগী গেইটের ভেতরে ঢোকার আগেই ছলে বলে ক‌লে কৌশলে নিয়ে যায়। আমাদের নিরাপত্তাকর্মীরা আছে। কিন্তু সেই প্রতিনিধিরা সাধারণ বেশে আসে। দেখে বোঝার কোনো উপায় নাই। তিনি আরো বলেন, এই অবস্থা থেকে রেহাই পাবার জন্য এসব অবৈধ হাসপাতাল ক্লিনিক মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। চোখ কান খোলা রেখে চলতে হবে। কে দালাল কে প্রতারক তাদের কথা বার্তা শুনে বুঝে নিতে হবে। আর প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে সেবা দেয়া হয়। রোগীরা চাইলে সেখান থেকে সেবা নিতে পারবে। এবং জরুরি বিভাগে রাত দিন ২৪ ঘণ্টা সেবার ব্যবস্থা আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কোনো ডাটাবেজ নেই। একটা ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। বি‌ভিন্ন সূত্র থে‌কে জানা‌গে‌ছে, দে‌শের সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতা‌লের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন আর মুমূর্ষু রোগীর সুচিকিৎসার জন্য ব্যবহার হচ্ছে না। বেসরকারি কিছু হাসপাতাল একে অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা এখন আইসিইউ আতঙ্কে ভুগছেন। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, কী কারণে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হলো চিকিৎসকরা তা কখনই স্পষ্ট করেন না। রোগীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, কী অবস্থায় কেমন আছেন, তাও জানানো হয় না। কিন্তু হাসপাতাল ছাড়ার সময় তাদের মোটা অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিলের টাকা না দিলে তারা রোগীকে আটকে রাখেন। কোনো কোনো হাসপাতালে লাশও আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধা অপর্যাপ্ত। অনেক সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ঠিকমতো কাজও করে না। এর মধ্যে ঢাকার পঙ্গু ও পুনর্বাসন হাসপাতাল (নিটোর) অন্যতম। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল আইসিইউ বাণিজ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল মালিক-চিকিৎসকদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বড় সিন্ডিকেট এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। বেসরকারি হাসপাতালের দালালরা ঘুরে বেড়ায় সরকারি হাসপাতালে। ওই সব দালালের মাধ্যমে রোগী এনে চিকিৎসার নামে জিম্মি করা হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধার জন্য যে পরিমাণ বাজেট দরকার, তার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকগুলোর আইসিইউ খুবই নিম্নমানের। যেখানে সাধারণদের ভুল-ভাল বুঝিয়ে ভর্তি করা হয় এবং তাদের ঠকিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এসব প্রতিরোধে সরকারের একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা দরকার। একই সঙ্গে পেশাজীবীদেরও সোচ্চার হতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. ফেরদৌসী হক বলেন, আইসিইউ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যত দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে গত সপ্তাহে রাজধানীতেই। তিন দিন আগে মারা গেলেও শুধু টাকার লোভে এক স্কুলছাত্রী আইভীর লাশ আটকে রেখে চিকিৎসা করানোর অভিযোগ উঠে মহাখালীর মেট্রোপলিটন মেডিকেল সেন্টার নামে একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। স্বজনদের অভিযোগ, আইসিইউতে রেখে মেয়ে বেঁচে আছে দাবি করে স্বজনদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কয়েকজন চিকিৎসক। আইভীর মা মোসা. হাসি বলেন, ১৮ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার পর আইভীকে ভর্তি করা হয় মহাখালীর মেট্রোপলিটন মেডিকেল সেন্টারে। সেখানে আইসিইউতে রেখে ১৫ দিন চিকিৎসা দেওয়ার পরও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় গত রবিবার রাতে আইভীকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। তখনই মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে অন্য চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে স্বজনরা দাবি করেন, আইভী তিন দিন আগেই মারা গিয়েছিল। অভিযোগে আরও জানা গেছে, ৪৫ বছর বয়সী জাহানারা বেগম গত ১৬ জানুয়ারি আগুনে দগ্ধ হয়ে ভর্তি হন কক্সবাজার সরকারি হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হলে ২৮ জানুয়ারি স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। আর ১০ ফেব্রুয়ারি তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। সেখানে শয্যার ভাড়া ছিল নামমাত্র। উন্নত চিকিৎসার দোহাই দিয়ে বারডেমের চিকিৎসক ডা. ফয়েজ আহমেদের পরামর্শে পরবর্তীতে তাকে রাজধানীর পান্থপথে ধানমন্ডি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে ওষুধসহ প্রতিদিন ভাড়া পরিশোধ করতে হতো ৩৫ হাজার টাকা করে। ২০ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি গুরুতর জানিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হলে পরদিন দুপুরে মৃত্যু হয় জাহানারার। তিনি ডা. ওমর ফারুকের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ২৮ মার্চ কুমিল্লায় ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ব্রেইন স্ট্রোক করেন। এরপর তাকে নিয়ে আসা হয় রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতে। সেখানে খরচ অনেক হওয়ায় ৩১ মার্চ অনেক তদবির করে স্থানান্তর করা হয় ঢামেকের আইসিইউতে। ৬৫ বছর বয়সী ফুলবাসীকে গত শুক্রবার ঝালকাঠি থেকে প্রথমে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুই দিন পরই নানা তদবিরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা বলেছেন হার্টের বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে ফুলবাসীর। মাদারীপুরের লুত্ফর রহমান নামে এক ব্যক্তির বাবা স্ট্রোক করে ভর্তি হয়েছেন ঢামেক হাসপাতালে। চিকিৎসকরা বলেছেন- অবস্থা খুবই খারাপ, যত দ্রুত সম্ভব আইসিইউতে স্থানান্তর করতে হবে। গত ৫ দিন ধরে অপেক্ষার পরও তিনি পাচ্ছেন না আইসিইউর কোনো শয্যা। এর জন্য তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও একাধিকবার দৌড়ঝাঁপ করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তার। ঢামেক ছাড়াও অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে তিনি খুঁজেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের একটি মাত্র শয্যা। লুত্ফরের ভাষ্য, আমাদের কোনো সাধ্য নেই বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা করানোর। কারণ সেখানকার খরচ অনেক। যে টাকা জোগাড় করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের মাত্র ৭টিতে ৮০ শয্যাবিশিষ্ট আইসিইউ সুবিধা চালু আছে। এর মধ্যে রাজধানীর তিনটি হাসপাতালে আছে আইসিইউ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহেও আছে এ সুবিধা। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা মানদণ্ড অনুযায়ী- প্রতি ২০টি সাধারণ শয্যার বিপরীতে একটি করে আইসিইউ শয্যা থাকার কথা। অর্থাৎ কোনো হাসপাতালে ১০০টি শয্যা থাকলে ৫টি শয্যা রাখতে হবে আইসিইউর জন্য। আর ঢামেক হাসপাতালে আছে ২ হাজার ৬০০টি শয্যা। সেখানে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ৩২০০-৩৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। কিন্তু সেখানকার আইসিইউর শয্যা খুবই অপর্যাপ্ত। আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ৩৫টি। এর মধ্যে বার্ন ইউনিটের জন্য বরাদ্দ রাখা আছে ১০টি। সেখানে আগুনে পোড়া গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে আছে ৮টি। এর ৫টিতে ভেন্ডিলেশন নষ্ট। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আছে ১০টি। তবে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ১১১টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর সুবিধা অনেক বেশি থাকলেও তা অনেক ব্যয়বহুল। যেখানে প্রতি শয্যার জন্য চার্জ নেওয়া হয় ১৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য মানুষ নিজের জমি বিক্রি করে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে তাদের স্বজনদের চিকিৎসার খরচ মিটিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বাণিজ্য চলে একটি সিন্ডিকেট দ্বারা। যারা সব বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সরকারি হাসপাতালের অনেক রোগীকে বাগিয়ে নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করারও নজির আছে ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। আর এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সরকারি হাসপাতালগুলোর কিছু অসাধু চিকিৎসক, ব্রাদার, নার্স, ওয়ার্ড মাস্টার, ওয়ার্ড বয় এমনকি অ্যাম্বুলেন্স চালকরাও। বেসরকারি হাসপাতালে রোগী বাগানো বাবদ কমিশনও আছে তাদের জন্য। মৃত রোগীকে জীবিত বলে আইসিইউতে রেখে পরবর্তীতে ধরা হয় মোটা অঙ্কের চার্জ। সূত্র জানায়, আইসিইউতে কয়েক ঘণ্টা রাখার পর টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত লাশ হস্তান্তর করা হয় না। এমনি একটি ঘটনা ঘটেছে উত্তরা জাহানারা ক্লি‌নিক ও হাসপাতালে। গত বছরের নভেম্বরে আব্দুল্লাহপুর আইচি মা ও শিশু হাসপাতালে ১৬ মাস বয়সী একটি শিশু মারা যাওয়ার পর লাশটি আইসিইউতেই রাখা হয়। বিনিময়ে শিশুটির অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। এ সময় অসৎ উপায়ে বাণিজ্য এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে র‍্যাবের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ওই হাসপাতালকে সাড়ে ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে র‍্যাবের আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বলেন, আমরা ওই এলাকায় অভিযান শেষে ফিরে আসছিলাম। এমন সময় মারা যাওয়া বাচ্চাটির বাবা আমাদের কাছে এসে জানতে চান যে- তার ছেলের চিকিৎসার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে। তাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে- মেডিকেল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে তার ছেলেকে চিকিৎসা দেওয়া হবে, যে জন্য অনেক টাকাও তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে আমরা বাচ্চাটিকে আইসিইউ থেকে নয় বরং অন্য একটি রুম থেকে উদ্ধার করি। পরে জানতে পারি ওই বাচ্চাটি মারা গিয়েছিল ঠিক আগের দিন। দেশজু‌ড়ে একেক বিভাগীয় জেলা ও থানা শহ‌রের একেক এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা বিবেচনায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সরকারী বেসরকারী অত্যাধুনিক হাসপাতালগু‌লো গড়ে উঠে‌ছে মূলতঃ অসৎ কতৃপ‌ক্ষ স্বীকৃত বহুমুখী মুখ্য ব্যবসায়িক মুনাফার আশায়। বি‌শেষক‌রে ছোট বড় বেসরকারী হাসপাতালসমূহ নিজস্ব উদ্যোগে ব্যপক প্রচার প্রচারণায় শুভযাত্রা শুরু কর‌লেও রোগী ও স্বজন‌দের আশা আকাঙ্খা পূরণে দুঃখী, দুঃস্থ্য ও নিরূপায়দের স্বাস্থ্য সেবা এবং জীবন রক্ষায় হাসপাতাল নির্ভার জনগণের আস্থা ও স্বপ্ন পূরণে হাসপাতাল কতৃপক্ষের নানা গাফিলতি ব্যর্থতার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া গ্যাছে। সরেজমিনে উঠে এসেছে প্রচার সর্বস্ব হাসপাতাল, ক্লি‌নিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার নামে কারচুপি ছলচাতুরী এবং গলা কাটা ব্যবসায় নানা অনিয়ম, সুযোগ বুঝে অবিচার, দূর্বলদের প্রতি ক্ষমতার অপব্যবহার, ডাক্তার-নার্স-স্টাফদের লীলাকীর্তি ও ব্যপক দূর্ণীতির হাল চালচিত্র। অনেক ভূক্তভোগীদের অভিযোগ ও দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও সূত্রমতে, ভর্তি রোগী ও স্বজনদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অতিরিক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। যেমন: পায়ের গোড়ালীর ব্যথায় সিটি স্ক্যান ও মাথা কিংবা সামান্য পেট ব্যথা নিয়ে আসা রোগীদের এপেনডিক অপারেশন করাতে বাধ্য করা অন্যতম। অনভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে অহরহ। অহেতুক অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্ররোচনায় বিনা প্রয়োজনে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আইসিইউ ভর্তি বাণিজ্য জমে উঠেছে চরমে। তাতে করে কোন কোন হাসপাতা‌লে কেবিন বা ওয়ার্ড অপেক্ষা কদাচিৎ আইসিইউতে বেশি রোগী ভর্তি দেখা যায়। নরমাল ডেলিভারীর পরিবর্তে কৌশল অবলম্বন করে সমূহ সংকট ও শংকার কথা বলে সিজারিয়ান অপারেশন করাতে বাগে আনে বাধ্য ক‌রে এতদ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারসকল। রীতিমত ধোকা খেয়ে প্রতারণার শিকার জনে জনে জানা যায়, উত্তরা শহরের যেকোন হাসপাতাল ও ক্লি‌নি‌কে বেশি বিল করে ঘোষিত সামান্য ছাড় বা মওকুফ করে সববিভাগে যে পরিমাণ বিল একরকম জোড়পূর্বক আদায় করা হয় তাতে বিশেষ ছাড়, কমিশন বা বিল মওকুফের বিষয়টি হাসপাতালের নাটকীয় দৃশ্যায়ন মাত্র। গোপন সূত্র জানায়, হাসপাতালের চার্টে বর্ণিত ডাক্তারদের ভুয়া নাম তালিকার সাথে নিয়মিত সিডিউল ডাক্তারদের প্রকৃত নাম পরিচয়ে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যত্রতত্র ভুল রিপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে ডায়াগনষ্টিক বিভাগ। অবস্থাসম্পন্ন স্বচ্ছল রোগী না হলে ভর্তি না নেয়ার অভিযোগ আছে। ভর্তির সময় চুক্তি করে আইসিইউতে ভর্তির সামর্থ অস্বীকার করলে মূমুর্ষূরোগীদের প্রত্যাহারের ঘটনা বিরল নয়। সোচ্চার সিকিউরিটি দিয়ে সর্বদা চিহ্নিত গরীব, অসহায়, নিরূপায়, দুঃস্থ্য, দুঃখী ও দুর্দশাগ্রস্ত রোগীদের হাসপাতালে ঢুকতে না দিয়ে ১০ টাকার বিনিময়ে কুর্মিটোলা সরকারী হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়াকে অমানবিক বলে দাবী করেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা ক্রি‌সেন্ট হাসপাতা‌লের একজন দায়িত্বশীল স্টাফ বলেন, “এখানে ডায়াগনষ্টিক বিভাগে অভিজ্ঞ ডাক্তার তালিকায় নামে আছে কিন্তু কামে নাই। টেকনিশিয়ানরাই বড় বড় পাশের ডাক্তার। তারাই সবকিছু কমপ্লিট করে রিপোর্ট তৈরি করে থাকে এবং ছাপা কাগজে ডাক্তারদের নামের উপরে সহি স্বাক্ষর করে দেয়। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, এখা‌নে ভুল স্বাস্থ্য পরীক্ষা অনুযায়ী ভুল চিকিৎসা দেয়, পরে আমরা হাসপাতাল থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতায় রোগী নিয়ে অন্য হাসপতালের আশ্রয় নেই। এই হাসপাতালে মাথা ব্যথা নিয়ে এক রোগী ভর্তি হলে তার ব্রেইন টিউমার হয়েছে বলে ঐ রোগীকে ৩৭ দিন আইসিইউতে ভর্তি রেখে লক্ষ লক্ষ টাকা বিল করলেও রোগীর অবস্থার অবনতি দেখে ঐ রোগীকে কু‌র্মি‌টোলা জেনা‌রেল সরকারী হাসপাতালে নিলে তার সাইনোসাইটিস সমস্যা ধরা পড়ে। বি‌ভিন্ন হাসপাতা‌লের নার্স ও আয়া বুয়া সূত্রে জানা যায়, অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে বেসরকারী হাসপাতাল ক্লি‌নি‌কে গর্ভপাতের মত নিষিদ্ধ ও জঘন্য পাপকাজ করা হয় দেদারছে। গভীর রাত ৩:১০ মিঃ। ৮ তলা পুরুষ ওয়ার্ডের এক রোগীর অবস্থা ভাল নয় বলে ডাক্তারকে খুঁজতে যায় আব্দুল বাকি। তার কথায় দরজা বন্ধ দেখে দরজায় কড়া নাড়ে সে। ভিতরে নারী-পুরুষের হাসাহাসি শোনা যায়। প্রায় ২০ মিনিট পর দরজা খুলে হাস্যজ্জ্বল এক পুরুষ ও এক মহিলা ডাক্তার একত্রে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর তারা দুজন অপমান করে তাড়িয়ে দেয় রোগীর স্বজন ঐ আব্দুল বাকীকে। আব্দুল বাকীর পিছে পিছে ডাক্তার যুগল পুরুষ ওয়ার্ডে ঢোকে। অত্যন্ত লজ্জিত ও বিব্রত আব্দুল বাকী তার রোগী পরহেজগার বাবাকে স্পর্শ করতে নিষেধ করে। দিনরাত ২৪ ঘন্টায় সময় সুযোগ বুঝে নার্সরাও কম যায়না ডাক্তার ও স্টাফদের সাথে দেহের ভাষা, চোখের পাশা ও মনের আশা আদান প্রদানে। এসব চিত্র উত্তরা আধু‌নিক হাসপাতা‌লের ব‌লে জানায় আব্দুল বা‌কী। আছিয়া নামে এক মহিলা রোগী জানায়, “আমি সামান্য লো প্রেশারের চিকিৎসায় ৩ দিন ২ রাত ডাক্তারের কারসাজিতে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলাম। নিজের চোখে দেখেছি চেতন কিংবা অবচেতন অবস্থায় আইসিইউতে পুরুষ ডাক্তাররাই মহিলা রোগীদের দেখভাল করে। রোগীর কোন আপনজনকে সেখানে থাকতে দেয় না”। শতাধিক মাঠকর্মী নিয়োগ দিয়ে জনগণকে প্রলোভন দেখিয়ে হাসপাতালের কার্ড বাণিজ্য করে উত্তরা সেন্ট্রাল হাসপাতাল কতৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতাল ম্যানেজার ব‌লেন, আমা‌দের কার্ডধারী মা‌র্কে‌টিং মাঠকর্মী ৫০ জ‌নের বে‌শি হ‌বেনা। এরা আমা‌দের চি‌কিৎসা সেবার বার্তা পৌঁ‌ছি‌য়ে দেয় ঘ‌রে ঘ‌রে। এদি‌কে সারা‌দে‌শে অনুমোদনহীন 'ক্লিনিক'ও 'হাসপাতালে'র ছড়াছড়ি ব‌লে মাছ বিক্রেতা, আড়তদার, গা‌র্মেন্টস ব্যবসায়ী ও গ্যারেজ মালিকরাও এই ব্যবসায় নেমেছেন পাল্লা‌দি‌য়ে। ইতিপূ‌র্বে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে প্রবীণ সাংবাদিক জগ্লুল আহমেদ চৌধূরীকে মোহনা ক্লিনিক নামে যে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, সেটির কোনো অনুমোদন নেই। এমন অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও 'হাসপাতালে'র ছড়াছড়ি রাজধানীসহ সারা‌দে‌শে। এ ধরনের ক্লিনিক খুলে যারা চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিচ্ছে, মানুষ মারছে, তাদের একটি গানে 'কসাই' বলেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতা। তার গানের একটি ছত্র :'কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে, তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার।'
দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিক যেন কসাইখানা। মানুষের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে স্বাস্থ্যসেবার নামে দেশের আনাচে-কানাচে শত শত অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক খুলে কী ভয়ঙ্কর প্রতারণাই না করা হচ্ছে! মাছ বিক্রেতা থেকে শুরু করে কাঁচামালের আড়তদার, রিকশার গ্যারেজ মালিক_ সবাই হাসপাতাল-ক্লিনিকের মালিক বনে গেছেন। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থ ও লাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে রোগীদের। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নেওয়া, নিম্নমানের ওষুধ লিখে কমিশন নেওয়া, ডায়াগনস্টিক টেস্টের নামে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে পাঠিয়ে এমন কোনো অবৈধ বাণিজ্য নেই, যা তারা করেন না। এবিষ‌য়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোঃ না‌সিম গতকাল বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অবৈধ বাণিজ্য কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই এবং শর্ত পূরণ করবে না, অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। অবৈধ ও মানহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক উচ্ছেদে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে চানখাঁরপুলের ৭২/৭৫ নম্বর মাজেদ সরদার রোডের 'সেবা জেনারেল হাসপাতাল' গড়ে তুলেছেন ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. কামরুল। জরাজীর্ণ পুরনো ভবনটির নিচ তলায় ভাঙাড়ি ও পুরনো কাগজ বেচাকেনার গুদাম। নেই অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষাগার। চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব। মাত্র তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। সেবা হাসপাতালের বিপরীত পাশেই ১০/১ নবাব কাটারা রোডের তৃতীয় তলায় চানখাঁরপুল জেনারেল হাসপাতালের মালিক জনৈক শফিকুর রহমান। সাইনবোর্ডে কমপক্ষে ২০ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নাম সাঁটানো থাকলে ১৮ জন অনকলে আসেন। গতকাল হাসপাতালটিতে গিয়ে একজন ডাক্তারও পাওয়া যায়নি। চানখাঁরপুল থেকে আজিমপুরের দিকে যেতে ৮১/বি-২ নম্বর হোসনি দালান রোডের পুরনো ও বিবর্ণ ভবনের 'আরাফাত জেনারেল হাসপাতালে'র মালিক ডা. মতিন। কোনো যন্ত্রপাতি নেই। কক্ষগুলোর অবস্থাও বেশ জরাজীর্ণ হাসপাতালজুড়েই ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নবাব কাটারার ১৯ নম্বর ভবনের দোতলায় তিনটি ছোট কক্ষ নিয়ে 'রেখা মেটারনিটি' নামে একটি ক্লিনিকের মালিক মম আহমেদ। শিশু চুরির অভিযোগে ২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে সেখানে অভিযান চালিয়ে দুই স্টাফ ও দালালসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে জামিনে বেরিয়ে ফের ক্লিনিকটি চালু করে তারা। ৩৯ নম্বর মিটফোর্ড রোডে 'আল-আরাফাত' হাসপাতালের মালিক জনৈক হাবিবুর রহমান দুলাল। দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে এ হাসপাতালটি চালানো হচ্ছে। কমপক্ষে ১০ জন ডাক্তারের নাম থাকলেও তাদের কাউকেই হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। পোস্তগোলা ডিআইটি এলাকায় একজন হাতুড়ে ডাক্তারের 'নিরাময় ক্লিনিকের' চারপাশ কল-কারখানার ধুলা ও বর্জ্যে ঠাসা। টিনশেড ঘরে পাঁচটি বেড পেতে গড়ে তোলা হয়েছে নামসর্বস্ব এই ক্লিনিকটি। খিলগাঁও রেলগেট এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী রহিম আলী রাজধানীর মুগদা এলাকায় গড়ে তুলেছেন 'রোগমুক্তি ক্লিনিক'। সরু গলিপথে তিন রুমের ঘুপচি একটি ফ্ল্যাটে চার বেডের ক্লিনিক খুলেছেন তিনি। সব ধরনের রোগের চিকিৎসা করা হয় বলে সাইনবোর্ড সাঁটানো হলেও এই ক্লিনিকে মূলত অবৈধ গর্ভপাত ঘটানো হয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। একটি ক্লিনিকের আয়া হোসনে আরা বেগমও নিজের নামে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে ক্লিনিক খুলেছেন। এর পাশেই 'মেডিকেয়ার' নামে আরেকটি ক্লিনিকে সাইনবোর্ড আর সাদা পর্দা ছাড়া কোনে চিকিৎসা সরঞ্জামের অস্তিত্ব নেই। বাসাবো দশের মোড় এলাকায় একজন নার্সের সহকারী 'বেবি ক্লিনিক' নামে একটি ক্লিনিক খুলে বসেছেন। মাণ্ডার রিকশা মেকানিক আলাউদ্দিনের স্ত্রী রাহেলা দোতলা একটি ভবন ভাড়া নিয়ে 'লাইফ সাপোর্ট নামে একটি ক্লিনিক গড়ে তুলেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আলাউদ্দিন প্রায় ১০ বছর আগে মাণ্ডায় রিকশার গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। এখন তিনি ক্লিনিকের মালিক। মোহাম্মদপুর কলেজ গেট গলিতে নেবস ডেন্টাল ক্লিনিক, টেকনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইউনিক মেডিকেল সেন্টার, সিপিএল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ভাইটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জেনিথ মেডিকেল সার্ভিস, নিউ মেডিকম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ ক্যাপিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও আবেদ্বীন হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শর্ত না মেনেই এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক বলেন, বিভিন্ন সময়ে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অধিদপ্তরের একশ্রেণীর কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের অনুমোদন দিয়েছেন। সূ‌ত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিনি। ভালোবাসেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রকে। তাদের দুইজনের বাড়িই রংপুরে। একই কলেজে পড়ার সুবাধে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। সময় পেলেই একে অন্যের কাছে ছুটে যেতেন। এভাবেই তাদের এ ভালোবাসা গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে। গতমা‌সের শুরুতে তাদের সামনে নেমে আসে কালো ছায়া। প্রেমিকা বুঝতে পারেন গর্ভধারণ করেছেন। তার বয়ফ্রেন্ডকে জানালে তিনিও চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমন ঘটনা জানাজানি হলে সমাজে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেন গর্ভপাত ঘটানোর। দুজনই চলে আসেন ঢাকায়। স্বামী-স্ত্রী পরিচেয়ে ভর্তি করা হয় রাজধানীর স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে। কিন্তু তাতে বাদ সাধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা কোনো ধরনের গর্ভপাত করান না। চোখে-মুখে অন্ধকার যেন ভর করছে তাদের ওপরে। কূলকিনারা না পেয়ে হাসপাতালেরই আয়া মাহফুজা খানমের দেয়া ঠিকানা মতে কল্যাণপুরের এক ক্লিনিকে যান। এ মাহফুজাই দালালের ভূমিকা পালন করেন ওই ক্লিনিকের। কল্যাণপুরে এ ক্লিনিকে ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে নাদিয়ার গর্ভপাত করানো হয়। গর্ভপাতের পর ওই প্রেমিকা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনদিনে ১০ ব্যাগ রক্ত দিতে হয় তাকে। শুধু এই প্রেমিক জুটিই নন। এরকম হাজারো জুটি অনিরাপদভাবে গর্ভপাত ঘটান দেশে। শুধু অবৈধ গর্ভপাত নয়, স্বামী এবং স্ত্রীর ভুলে গর্ভধারণ করা দম্পতিও গর্ভপাত ঘটাচ্ছে অহরহ। এভাবে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও রয়েছে কারো। অনেকে আবার পরবর্তীতে আজীবনের জন্য মাতৃত্বের স্বাদ হারান। রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে এমন অসংখ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। যেখানে গর্ভপাত ঘটানো হচ্ছে। বেআইনি এ কাজ করেন হাতুড়ে ডাক্তার, নার্স এমনকি ক্লিনিকের আয়া। বৈধতা না থাকায় গর্ভপাত করাতে তাদের গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা। অথচ দেশের আইনে গর্ভপাত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে বছরে কত সংখ্যক গর্ভপাত হয় তার একটি জরিপ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে গবেষণার কাজটি করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অব সেপটিক অ্যাবরশন বাংলাদেশ (বাপসা)। তারা মাঠপর্যায়ে গর্ভপাতের ওপর একটি জরিপ চালায়। গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট গত বছরের মার্চে তা প্রকাশ করে। এ জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে দেশব্য‌পি ৯ লাখ ৪৯ হাজার অনিরাপদ গর্ভপাত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে বছরে হাজারে ২৯ জন গর্ভপাত করান। গর্ভপাতের হার খুলনা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বনিম্ন।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK