শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৮
Monday, 18 Dec, 2017 04:00:48 pm
No icon No icon No icon
দলাদলি আর গ্রুপিং চলছে প্রত্যেকটি বিভাগে

দুর্নীতিতে স্থবির সিভিল এভিয়েশন


দুর্নীতিতে স্থবির সিভিল এভিয়েশন


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: সিভিল এভিয়েশন দুর্নীতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক বিভাগেই কর্মকর্তাদের রেষারেষি, দলাদলি ও লাগামহীন দুর্নীতি চলছে। গত মঙ্গলবার সকালে সিভিল এভিয়েশন কার্যালয়ের সামনে দুর্নীতিবাজ সিভিল এভিয়েশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আসির উদ্দিনকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপর থেকেই সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান পদে রদবদল হবার পর থেকেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান চেয়ারম্যান আর মেম্বার অপারেশন একদিকে, আর অন্য সব মেম্বার ও পরিচালক আরেক দিকে। সবচেয়ে গুরুতর সংকট চলছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এখানে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাশেদা সুলতানার সঙ্গে পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কাজী ইকবাল করিমের বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। সাবেক চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরীর আমলে রাশেদা সুলতানাকে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ার পর থেকেই একটি মহল তাকে ঘায়েল করার জন্য ওঠেপড়ে লাগে। তিনি সফলতার সাথে বিমানবন্দরের চোরাচালান প্রতিরোধসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করলেও তার সাথে অদৃশ্য কারণে পরিচালক ইকবালের মতদ্বৈততা দেখা দেয়। প্রথমেই রাশেদার কাছ থেকে ডিউটি রোস্টার ও নিরাপত্তা ইস্যুর এখতিয়ার প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিনাকাজেই অনেকটা অফিসে বসিয়ে রাখার মতো অবস্থা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতি সম্প্রতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে যোগ দিতে বারণ করাসহ তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। এতে চরম হেনস্থার শিকার হন তিনি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গড়ায়। তারপর তাকে তার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়।

একই অবস্থা সদরদফতরে। এখানে চেয়ারম্যানের দফতরে অর্গানোগ্রাম বহির্ভূতভাবে দুজন পিএস কাজ করছে। এ নিয়ে গোটা সিভিল এভিয়েশনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে।

এদিকে সিভিল এভিয়েশনে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা পাওনা বকেয়া রেখেই শাহাজালাল বিমানবন্দরে চুটিয়ে ব্যবসা করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ভেতর বাহিরের বিভিন্ন দোকানপাট ও বিলবোর্ড ইজারা গ্রহীতাদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন। সিভিল এভিয়েশন বার বার তাগিদ দিলেও তাতে কর্ণপাত করছেন না সংঘবদ্ধ এই চক্র। একজন ঠিকাদার জানিয়েছে, প্রায় এক ডজন ব্যবসায়ীর কাছে সিভিল এভিয়েশনের পাওনা রয়েছে শতাধিক কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা রয়েছে নঙ্ীকাথা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। বাকিদের মধ্যে মোটা দাগের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ইউনিকম, কে মার্টর্ ও খন্দকার স্ন্যাকস। এছাড়া খুচরা পর্যায়ে আরও ৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া পাবে সিভিল এভিয়েশন। কেন এসব পাওনা আদায় করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে সিভিল এভিয়েশনের নতুন চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেছেন, আগে কি হতো সেটা বলতে পারব না। তবে আমি যোগ দেয়ার পর পরই এসব ব্যবসায়ীকে কড়া নোটিশ দেয়া হয়েছে। তাতে কয়েকজন জরুরি ভিত্তিতে টাকা জমা দিয়ে গেছেন। অনেকেই যোগাযোগ করছেন। তারপরও যদি কেউ বকেয়া পরিশোধ না করেন-তাহলে তাদের দোকান ও বিলবোর্ডের ইজারা বাতিল করা হবে। আর ক্ষমা করা হবে না। একটু অপেক্ষা করুন। দেখুন কিভাবে টাকা আদায় হয়।
জানা গেছে, বিমানবন্দরের দোকান ও দেয়াল গ্রহীতারা ইজারা লাভের পর কিছুদিন নিয়মিত পাওনা টাকা পরিশোধ করেন। তারপর সম্পত্তি বিভাগ ও অর্থ বিভাগের একটি অসাধু চক্রের যোগসাজশে টাকা পরিশোধে টালবাহানা করতে শুরু করে। এদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না। বার বার তাগিদ দেয়া হলেও টাকা পরিশোধ করা দূরের কথা উল্টো আদালতে গিয়ে একটি নামকাওয়াস্তে রিট করে। তারপর সেই রিট চলতে থাকে বছরের পর বছর ধরে। এভাবে সারা বিমানবন্দরের আনাচে কানাচে বিলবোর্ড, লাইট হাউজ, নিয়ন সাইন, স্টীকার, প্লেকার্ডের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বিজ্ঞাপন থেকে কতো টাকা রাজস্ব আসছে কতো টাকা বকেয়া রয়েছে সে হিসাবও দিতে পারছে না সিভিল এভিয়েশন।

সূত্র জানায়, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে ইজারা বরাদ্দ না নিয়েই বিজ্ঞাপন ব্যবসা করছেন। এত অনিয়ম অরাজকতা সবার চোখে পড়লেও কর্তপক্ষ কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।

সম্পত্তি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরের পার্কিং এরিয়ার (নিচতলা) ভেতরে খন্দকার স্ন্যাকসের কাছে কোটি কোটি টাকা পাওনা জমা হবার পর তিনি হাইকোর্টে গিয়ে একটি রিট দায়ের করেন। তারপর গত ৬ বছর ধরে চলছে সেই রিট। সিভিল এভিয়েশনের মোটা অংকের টাকার বেতনে দুই আইন কর্মকর্তা এত বছরেও সেই রিট খারিজ করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ইজারা গ্রহীতা খন্দকার সেলিমের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ঐ রিট নিস্পত্তি করার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা পালন করা থেকে বিরত রয়েছেন।

একইভাবে নঙ্ীকাথার মালিক মাহফুজকে বার বার তাগিদ দেয়া হলেও তিনি টাকা পরিশোধ করছেন না। তার কাছেই সিভিল এভিয়েশনের পাওনা প্রায় ২০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন তা কিছুতেই স্বীকার করছে না। সিভিল এভিয়েশনের কাছে জানতে চাইলে বলা হয়, মাহফুজের কাছে পাওনা বেশি নয়, মাত্র ১০ কোটি টাকার মতো হবে। আর শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরের পরিচালক অফিস সূত্রে জানা যায়, মাহফুজের নঙ্ীকাথার নামে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দরেই ৩৫টি বোর্ড ইজারা দেয়া হয়েছে। এর একটিরই ভাড়া বকেয়া রয়েছে ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ হিসেবে বাকিগুলোর কাছে কত টাকা বকেয়া সেটা সহজেই অনুমেয়।

জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে বোর্ড ইজারা নিয়ে অনেকগুলোরই টাকাই আজ পর্যন্ত পরিশোধ করেননি। তারপরও সম্প্রতি তাকে শাহজালালের ৩ তলায় একটি লাউঞ্জ ইজারা দেয়া হয়েছে। যা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা অগ্রিম হাতিয়ে নিয়েছেন। তারপরও সিভিল এভিয়েশনের মূল বরাদ্দের ইজারামূল্য বাবদ ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ৫শ ৪ টাকা পরিশোধ করছেন না। এত টাকা যার কাছে পাওনা সেই ব্যক্তিকে কেন আবার আরও একটি লাউঞ্জ ইজারা দেয়া হলো জানতে চাইলে মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ অবহিত করেনি। এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনই ভাল বলতে পারবে। তবে টাকা পরিশোধ করতেই হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এনিয়ে নতুন যোগদানকারী (অর্থ সদস্য) অনুসন্ধান শুরু করলে হিসাব বিভাগের আনোয়ার তার স্বপক্ষে কিছু কাগজপত্র জমা দেন। পরে ব্যাংক থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাহফুজ ঐ টাকা জমা দেননি। এতে হিসাব বিভাগের জালিয়াতির প্রমাণ ফুটে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, আবুল কালাম আজাদ ও মেম্বার অপারেশনের বিশেষ আশীর্বাদে এই চক্রটি একের পর এক দেয়াল ইজারা বরাদ্দ নিতে সক্ষম হয়। অথচ কেন তার কাছ থেকে বকেয়া আদায় করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে সিভিল এভিয়েশনের সম্পত্তি বিভাগের আবুল কালাম কিছুই জবাব দিতে পারেননি। সম্প্রতি উত্তরার লি. মারিডিয়ান হোটেলে তার সঙ্গে মাহফুজকে ডিনার করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ বিভাগের আনোয়ার, সম্পত্তি বিভাগের ওয়াদুদ, আবুল কালাম, মহসীন ও শামসুল, মিজানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশেই এসব ইজারাদাররা বকেয়া পাওনা পরিশোধ করছে না। তাদের নিস্ক্রিয় ভূমিকার জন্যই পাওনা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে বিনা টেন্ডারে সদরদফতরে কোটি কোটি টাকার ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ করে চলছেন ফারহানা নামের এক নারী ঠিকাদার। যার পিতা দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে জেলে রয়েছেন। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান মেম্বার অপারেশন এয়ার কমোডর মুস্তাফিজুর রহমানের কক্ষটিকেই চোখ ধাধানো সাজে সজ্জিত করার পর তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। এরপর তার আর্শীর্বাদ ও নির্দেশেই বাকি সব কাজ করার সুযোগ পায় ফারহানা। অথচ অভিযোগ রয়েছে, এই মোস্তাফিজের ধীরগতির কারণেই কার্গো ভবনের অটোমেশিনসহ সিভিল এভিয়েশনের অনেক গুরুতপূর্ণ কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এতে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পণ্য রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
সূত্র: দৈনিক জনতা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK