মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
Wednesday, 08 Nov, 2017 01:05:26 am
No icon No icon No icon

ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা


ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই কিশোরদের অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি তারা পরিকল্পিত হত্যার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে। সহপাঠী ও বন্ধুদের খুন করতেও দ্বিধা করছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, অভিভাবকদের ঔদাসীন্য ও আইনের যথাযথ ব্যবহার না থাকায় কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। রাজধানীতে অক্টোবর মাসেই কিশোরদের হাতেই খুনের শিকার হয়েছে তিন কিশোর। এর মধ্যে ২৭ অক্টোবর ‘জুনিয়র-সিনিয়র বিতর্কে’ রাজধানীর চক বাজার এলাকায় হাসান আলী নামের ১৪ বছর বয়সী জেএসসি পরীক্ষার্থী এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে একই এলাকার খোকা আলীসহ কয়েক কিশোর। ঘটনার পরদিন ২৮ অক্টোবর ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসানের মৃত্যু হয়। 
৮ অক্টোবর রাজধানীর পশ্চিম ধানমণ্ডি’র নিরিবিলি হাউজিং এলাকায় চাকু মেরে ইরফান নামে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে হত্যা করে তারই সমবয়সী রাজন নামে আরেক কিশোর।  এর আগে ৬ অক্টোবর কদমতলীর রায়েরবাগের মুজাহিদনগর এলাকায় গ্রিল মিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম শিপনকে (১৮) ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তার বন্ধুরা।
সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ২৫ আগস্ট দারুসসালামের টোলারবাগে ছুরিকাঘাত করে শাহিনকে (১৬), ২২ আগস্ট ভোরে মিরপুরের উত্তর পীরেরবাগ এলাকায় খুন হন কবির হোসেনকে (২১), ১৩ আগস্ট মোহাম্মদপুরের কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র মোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করে কিশোররা। এছাড়াও ১ জুলাই আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় সজল (১৫) নামে এক টেইলার্স কর্মীকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করে তার বন্ধুরা। 
৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার রাজধানীর উত্তরায় দুটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতে খুন হয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান। এ ঘটনার মাত্র ১২ দিনের মাথায় ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর তেজকুনিপাড়ায় ‘কে বড়, কে ছোট’ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কয়েক কিশোরের হাতে খুন হয় আবদুল আজিজ নামে আরেক কিশোর। ঠিক ১০ দিন পরই ২৮ জানুয়ারি বরিশালে দশম শ্রেণীর ছাত্র হৃদয় গাজী নামে এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা করে তারই সমবয়সী অপর একদল কিশোর। এভাবে একের পর এক কিশোরদের অপরাধ কর্মকাণ্ড বেপরোয়াভাবে বেড়েই চলছে।
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের কফিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ও পরবর্তীতে কুপিয়ে হত্যা করে তাদেরই মেয়ে ঐশী। ২০১৬ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে ফরিদপুরে বাবাকে হত্যা ও মা’কে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে এক কিশোর। দুটি ঘটনাই দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গত কয়েক বছরে কিশোর কর্তৃক সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত অপরাধের ঘটনা হচ্ছে, জুরাইনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ হত্যা, আগারগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুল হক হত্যা, কদমতলীর বাবু, জনি ও হাসান হত্যা, পুলিশ কর্মকর্তা ফজলুল হক, মগবাজারের ট্রিপল মার্ডার, ভাসানটেকে নাসির এবং মিরপুরে ইমন হত্যা ইত্যাদি।
কিশোর অপরাধ নিয়ে গবেষণা কী বলছে
২০১৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ‘বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতি’ এর একটি প্রকল্পের আওতায় কিশোর অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, সময়ের সাথে সাথে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গবেষণায় ১৯৯০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কিশোর অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় কিশোর অপরাধের মোট মামলা ছিল ৩,৫০১টি। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছরে অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত এ দশ বছরে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৮২টি।
এদিকে গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, কিশোর অপরাধীরা তাদের সাধারণ অপরাধের ধরণ পরিবর্তন করে ভয়ংকর ফৌজদারী অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এসবের মধ্যে খুন ও ধর্ষণই প্রধান। ওই গবেষণার তথ্যমতে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এ বছরে ৮২টি হত্যা মামলা এবং ৮৭টি নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ মামলা ছিল। কিন্তু পরবর্তী ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ পরবর্তী ১০ বছরে এ মামলার সংখ্যা যথাক্রমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩৮ ও ২২৪-এ! 
এছাড়া ২০০১ সালে কিশোর অপরাধের ৫১২ টি মামলার মধ্যে ১৩৮টি চুরি, ১৪টি হত্যা ও ১৮টি নারী নির্যাতন মামলা হয়। পাঁচ বছর পর ২০০৬ সালে ৫২৮ টি মামলার মধ্যে নারী খুন ও নারী নির্যাতন মামলা বেড়ে হয় যথাক্রমে ১৫ ও ২২। গবেষণায় সর্বশেষ ২০১২ সালের তথ্যে দেখা যায়, কিশোর অপরাধের মামলা কমলেও খুন-ধর্ষণের মত ভয়ানক অপরাধ আরও বেড়ে গেছে। ওই বছরে ৪৮৫টি মামলার মধ্যে ১৭টি হত্যা ও ৩৮টি নারী নির্যাতন এবং ৮৫টি মামলা হয়। তবে ২০১২ সালে ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, ৯ থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছরর বয়সী ছেলে শিশু অপরাধে জড়ালে তাদেরকে বড়দের মতো কারাগারে পাঠিয়ে শাস্তি না দিয়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং তাদের মানসিকভাবে শোধন করার ব্যবস্থা করা হয়। এই দুটি কেন্দ্র থেকে সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে পাঠানো তথ্যে জানা গেছে, দুটি কেন্দ্রে মোট কিশোর অপররাধীর সংখ্য ৫৯৭ জন যাদের ১২০ জন হত্যা এবং ১৪২ জন নারী নির্যাতম মামলার আসামি। শতাংশের হিসাবে ২০ শতাংশ খুন এবং ২৪ শতাংশ নারী নির্যাতন মামলা আসামি। এসব কিশোরের বেশিরভাগের বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।  
তেজগাঁও জোন পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, পুলিশ সর্বশেষ ২০১০ সালে পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। ওই তালিকায় ৫১৬ জনের নাম ছিল। তবে বর্তমানে যেসব কিশোর অপরাধ জগতে পা বাড়াচ্ছে তাদের আনুন্ঠানিক কোনো তালিকা পুলিশের কাছে নেই। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শেখ তৌহীদুল ইসলাম মনে করেন, কিশোর অপরাধীদের মধ্যে এখন তিনটি শ্রেণি আছে। এর মধ্যে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোরেরা দারিদ্র্যের কারণে, মফস্বল থেকে বড় শহরে আসা কিশোরেরা সমাজে টিকে থাকার জন্য এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে।
পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে দায়ী করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম বলেন, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, চরম ভোগবাদী চেতনার প্রসার, কুরুচিপূর্ণ ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতির প্রতি আসক্তি, ক্ষুধা-দারিদ্র, মাদকাসক্তি ইত্যাদি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হচ্ছে এসব কিশোর অপরাধীরাই এক সময় বড় অপরাধীর জন্ম দেয়। যা সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলে। পরিবার ও সরকার প্রত্যেকেরই উচিত নিজের অবস্থান থেকে জরুরি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে এ প্রবণতা ঠেকানো, তা না হলে অপরাধপ্রবণ তরুণ সমাজ দেশের জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠবে।
সন্তানের অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে দুর্বল পারিবারিক বন্ধন ও সন্তান প্রতিপালনের ভুল পদ্ধতিই মূল কারণ বলে মন্তব্য করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনইস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিশুকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে সন্তান প্রতিপালনে যে তিনটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে সে সম্পর্কে প্রায় সব মানুষই অজ্ঞ। ফলে সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের দুর্বল প্রকৃতির বন্ধনে শুরুতেই তৈরি হয় এক ধরনের প্রচ্ছন্ন দূরত্ব। এতে বাবা-মা সন্তানদের পারিপাশ্বিক অবস্থা সম্পর্কে যেমন খোঁজ রাখেন না, সন্তানরাও তাদের কর্মকাণ্ড গোপন রেখে চলেন। সমস্যার সূচনা হয় এখানেই। 
তথ্য প্রযুুক্তির অবাধ ব্যবহার, ভোগবাদী প্রবণতা বৃদ্ধিতে অর্থের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াও কিশোরদের বিপথগামী করে তোলে বলে মন্তব্য করেন ডা. তাজুল। তিনি বলেন, কিশোরেরা ভোগবাদী প্রবণতা ও ক্ষমতার চর্চার প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়। ক্ষমতা ও টাকাই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। ঠিক ওই সময়ে সমাজের অন্যান্য অপরাধীরা তাদের স্বার্থে কিশোরদেরকে ছায়া দিয়ে বড় অপরাধী করে তোলে।
‘এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ঘটনাগুলো কিশোদের অপরাধ প্রবণতায় উৎসাহিত করে তোলে। ফলস্বরূপ কিশোর অপরাধীদের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে বড় বড় অপরাধী’, যোগ করেন তাজুল ইসলাম।
অপর একটি সূত্র জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তের সন্তানরা পা বাড়াচ্ছে এ অন্ধকার জগতে। তাদের অনেকে মাদকাসক্তও হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে তারা। এমনকি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে পড়ছে নৃশংস খুনাখুনিতে। মা-বাবার উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে এসব কিশোর নির্বিঘ্নে বিপথে চলে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সামাজিক মূল্যবোধহীন এক সমাজে বেড়ে ওঠা এসব কিশোর ক্রমেই যেমন অস্থির হয়ে উঠছে, তেমনি পরিবারের অজান্তেই হয়ে উঠছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী। গড়ে তুলছে নিজস্ব বাহিনী। অধিপত্য বিস্তারে এক বাহিনী আরেক বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় উঠতি এসব কিশোর সন্ত্রাসীর উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবনও। অনেক সমস্যার নগরী ঢাকার নতুন আতঙ্ক কিশোর অপরাধ। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরদের হাতে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডও ঘটেছে। যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে গ্যাংস্টার তথা সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধীদের সংঘের সংখ্যা। অভিভাবকরা বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ার পরও এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সন্তোষজনক নয়। আর পুলিশ বলছে, বখে যাওয়া কিশোরদের বেশির ভাগই বিত্তে-ক্ষমতায় প্রভাবশালী বলে অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। পুলিশ-প্রশাসনের এই অসহায়ত্ব, এই নতজানু নীতি কোনো ভালো কথা নয়। নিন্দনীয় সেইসব অভিভাবকের ভূমিকাও, যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং সন্তানের সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছেন না।

কিশোর অপরাধ ঠেকাতে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা জোন। এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুলড্রেস পরা অবস্থায় ঘোরাঘুরি করা কিশোরদের আটক অভিযান জোরদার হয়েছে। গত এক মাসে এই এলাকায় ৮০০ কিশোর শিক্ষার্থীকে আটক করে অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করেছে পুলিশ। অন্যদিকে পুরো রাজধানীতেই এই অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এজন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি। আছাদুজ্জামান মিয়া এ ব্যাপারে বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভ‚মিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চাই। তিনি আরো বলেন, রাজধানীতে বিভিন্ন চেকপোস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কিশোরকে আটক করার পর সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে মুচলেকা দিয়ে হস্তান্তর করা হচ্ছে। অপরাধী হিসেবে নয়, প্রথম অবস্থায় সতর্ক করার জন্য ধরা হচ্ছে। তবে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের উত্তরা জোনের উপকমিশনার (ডিসি) বিধান ত্রিপুরা বলেন, উত্তরায় কিশোর অপরাধ দমনের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে গত ৩০ জানুয়ারি কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও মাদকবিরোধী সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে স্কুল ড্রেসে বাইরে ঘোরাফেরা করলে শিক্ষার্থীদের আটক করে অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শিশুরা অপরাধে জড়ালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্তে গত এক মাসে এই এলাকায় ৮০০ কিশোরকে শিক্ষার্থীকে আটক করে অভিভাবকদের কাছে সোপর্দ করা হয়। অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে শিশুদের সব বিষয়ে যেন তারা খোঁজ-খবর রাখে। এছাড়া ফেসবুকেও নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর কিশোরদের মোটরবাইক দিয়ে মহড়া এবং দলগতভাবে আড্ডা দেয়া বন্ধে করতে পুরো রাজধানীতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি উত্তরায় কিশোরদের এলাকাভিত্তিক গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হয় উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান কবীর। অন্যদিকে গত ১৮ জানুয়ারি ফার্মগেটের তেজকুনি পাড়ায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয় আবদুল আজিজ নামে এক কিশোর। উত্তরায় আদনান কবীর এবং ফার্মগেটের তেজকুনি পাড়ায় আবদুল আজিজ হত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। এসব হত্যার তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। পুলিশের তথ্য থেকে জানা যায়, ফেসবুকে নাইন স্টার, ডিসকো বয়েসসহ বিভিন্ন গ্রুপ খুলে  দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছে কিশোরেরা। এই ফেসবুক দ্বন্দ্বের কারণেই খুন হয় আদনান। উত্তরা এলাকায় ‘নাইন স্টার’ আর ‘ডিস্কো বয়েজ’ ছাড়াও কিশোরদের আরও বেশ কয়েকটি গ্রুপের খোঁজ পায় পুলিশ। এদিকে পুলিশের এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পুলিশ কিশোর অপরাধ দমনে যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে মনিটরিং প্রয়োজন। এ ছাড়া কোমলমতি শিশু ও অভিভাবকেরা যেন হয়রানির শিকার না হয় সে দিকেও পুলিশের খেয়াল রাখা দরকার বলে মনে করেন তিনি। রাশেদা কে চৌধুরী শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, পুলিশের পাশাপাশি অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক ক্ষেত্রে সচেতনতারও অনেক গুরুত্ব রয়েছে বলেও জানান তিনি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাজ্জাদ হোসেনের বাবা আকরাম হোসেন বলেন, পুলিশের উদ্যোগে আমরা খুশি। আমরা পুলিশকে সহযোগিতা করতে চাই। তাছাড়া আমরা পারিবারিকভাবেও সচেতন রয়েছি।

কিশোর অপরাধের কয়েকটি ঘটনা : গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকে একটি সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপের দ্বন্দ্বে বখাটে চক্রের হাতে খুন হয় মেহেদী হাসান নামে সম্ভাবনাময় এক কিশোর ক্রিকেটার। সে ছিল অনূর্ধ্ব-১৫ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় এবং মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। মেহেদীর বাবা হাজী মোশাররফ হোসেন ঢালী এলাকায় নান্নু ওরফে নান্না মিয়ার মাদক-বাণিজ্য বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন। আর ওই নান্নার ছেলে অলি বখাটে চক্রের দলনেতা। অলি তার বন্ধু আশিক, ছট্টু, ফয়সাল ও সাদ্দামকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর কয়েকদিন আগে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ‘এ’ ব্লকের মাইদুল ইসলাম ইমন নামে ১৪ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করে কিশোর বখাটে চক্রের সদস্যরা। জানা গেছে, মিরপুর ১০ নম্বরে কিশোর পিয়াস ও মিরাজ গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। এরই জেরে পিয়াসের নেতৃত্বে কিশোর অপরাধী গ্রুপটি ইমনকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে খুন করে। ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর কদমতলীতে এক কিশোরের হামলায় রিয়াদুল, মেহেদি হাসান ও আহাদ নামে তিন কিশোর ছুরিকাহত হয়েছে। এরা রাজধানীর কদমতলী থানার ধনিয়া বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র। আর হামলাকারী কিশোর সাব্বির হোসেন ওই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। তাকে আটক করেছে পুলিশ। ২৯ নভেম্বর কামরাঙ্গীরচরে দুই কিশোরের হাতে খুন হয় আলিফ নামে এক কিশোর। এছাড়া ৪ ডিসেম্বর রাতে লালবাগে রবিন নামে এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে আবু সালেহ রাব্বী নামে এক যুবক খুন হন। সর্বশেষ শুক্রবার ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আদনান কবির (১৪)।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, টিনএজ বা কম বয়সের অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে, এটা ঠিক। তারা যেমন পাড়া-মহল্লায় অপরিচিত, তেমন পুলিশের কাছেও। ফলে অপরাধ করে এসব কিশোর অপরাধী সহজেই গা ঢাকা দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালে পুলিশ এলাকাভিত্তিক ১ হাজার ১০০ কিশোর সন্ত্রাসীর একটি তালিকা তৈরি করে। ওই তালিকার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও তরুণ বখাটে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালিকা অনুযায়ী ওয়ারী অঞ্চলে ১৪৪, মিরপুরে ১০৬, মতিঝিলে ৭৫, রমনায় ৫১, লালবাগে ৩৬, তেজগাঁওয়ে ৪৬, গুলশানে ৪৮ এবং উত্তরা অঞ্চলে ১০ কিশোর অপরাধী রয়েছে। যারা এরই মধ্যে কিশোর থেকে যুবকে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমানে এ সংখ্যা জানা নেই সংশ্লিষ্টদের।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওপরের মহল থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে, এবার আর কাউকে ধরতে অসুবিধা হবে না। টাকার জোরে পুলিশের দায়িত্ব পালনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারার এই যে সংস্কৃতি, এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পুলিশ যদি তার দায়িত্ব পালনই করতে না পারে, সমাজ টিকবে কী করে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তো আরো অবনতি ঘটবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। বখে যাওয়া সন্তানকে সংশোধনের প্রয়োজনেও তাঁদের তরফে সহযোগিতার মনোভাব থাকা উচিত। এর সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধেরও প্রশ্ন জড়িত। সন্তান অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়াবে, আর বাবা পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে দেবে না এমনটা অনুচিত। দেশে মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও কিশোর সংশোধনাগারের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সময় থাকতে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সন্তান যেমন নতুন জীবন পাবে, বাড়বে সামাজিক নিরাপত্তা।

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK